২০১৫ সালের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে চিন্তা ভাবনা করছি এবারের ভ্রমন বিষয়ে। প্রতি বছরই আমরা কয়েকবার ভ্রমনে বাহির হই। এর মধ্যে ২/১ টি থাকে পাহাড় পর্বতে। পেশাদার ট্রেকার না হলেও ট্রেকিংটাকে খুবই উপভোগ করি। অজানা-অচেনা, এবড়ো-থেবড়ো, আঁকাবাকা, সরু নিরিবিলি পাহাড়ী পথগুলো আমাকে খুব টানে। কয়েকমাস আগে জানুয়ারীতে ঘুরে এসেছি বান্দরবনের বগালেক, কেওক্রাডাং, জাদিপাই, ডাবল ফলস ও জিংসিয়াম সাইতার। এবারের মিশন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ সাকাহাফং ও খুমের রাজ্য অর্থ্যাৎ সাতভাইখুম, আমিয়াখুম, নাইক্ষংমুখ সহ আরো কিছু জায়গা।

সাজেকে মেঘের ভেলাসাজেকে মেঘের ভেলা

অনেক চিন্তা ভাবনা করে গাইড সাদেকের সাথে কথা বলে এবং বাংলার ট্রেকারের নিজাম ভাইয়ের পরামর্শ মত তারিখ ঠিক হলো ৭ অক্টোবর। সদস্য তিন জন। আমি বাদে ডাঃ ইসমাইল ও সুমন। সবকিছুই ঠিকঠাক, দিন গুনছি দেশের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পা রাখার। সে সময় আসলো দেশের পর্যটন জগতে একটি চরম আঘাত। অক্টোবরের ৩ তারিখে মুন্না ও জোবায়ের নামে দুই ট্রেকার বান্দরবনের সেপ্রু পাড়ার কাছ থেকে নিঁখোজ হয়ে গেল। মাথা ব্যাথার চিকিৎসা মাথা কেটে ফেলার মত বন্ধ হয়ে গেল পার্বত্য অঞ্চলে সদ্য কৈশরে পা রাখা ট্রেকিং এর ভবাষ্যৎ।

কংলাক পাড়ায় সূর্যাস্তকংলাক পাড়ায় সূর্যাস্ত

কি আর করা? অগত্যা ট্রেকিং এর চিন্তা বাদ দিয়ে ছুটলাম মেঘ পাহাড়ের দেশ সাজেক ভ্যালীর উদ্দেশ্যে অক্টোবরের ২৬ তারিখে ৮ জনের দল নিয়ে। ইচ্ছা ২৭ অক্টোবর প্রবারনা পূর্নিমা সাজেকে উৎযাপন করবো। আগেই দিঘীনালার সমীর মল্লিকের মাধ্যমে রুইলুই পাড়ার কারবারী মনা দাদার সারা রিসোর্টের ৪ টি রুম ভাড়া করলাম। আর নিজামউদ্দীনের মাধ্যমে ড্রাইভার রাজের চাঁন্দের গাড়ী ঠিক করলাম। ভ্রমনে সব সময় আমি রিজার্ভ গাড়ী নেই। যদিও এটা ট্রাভেলিং এর সাথে যায় না। কিন্তু কম সময়ে বেশী জায়গা দেখার এর থেকে ভাল উপায়ও আমার জানা নাই। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত ৭০৩ বর্গ মাইল আয়তনের সাজেক দেশের সর্ব ববৃহৎ ইউনিয়ন। রুইলুই পাড়া ও কংলাক পাড়া নিয়ে নিয়ে সাজেক গঠিত। সাজেক রাঙামাটির মধ্যে হলেও এর যোগাযোগ ব্যবস্থা খাগড়াছড়ি দিয়ে সহজ।

সাজেকসাজেক

যাহোক ঢাকা থেকে শান্তি পরিবহনের গাড়ীতে রওনা দিয়ে দীঘিনালা পৌঁছালাম ভোর সাড়ে ৬ টায়। এরপর নাস্তা সেরে চাদের গাড়ীর ছাদে উঠে আমি, ইসমাইল, রায়হান ও তপু হেড়ে গলা ছেড়ে দিয়ে শুরু করলাম গান। আঁকাবাকা পাহাড়ী পথ সাথে নির্ভেজাল বাতাস। সে অন্যরকম অনুভুতি। তারপর হাজাছড়া ঝর্নার সুশীতল পানিতে জলকেলী ও লংগদুতে কাপ্তাই লেকে ঘোরাঘুরি করে সাজেকে অর্থ্যাৎ রুইলুই পাড়ায় ব্যাগপত্র রেখে ৫ টাকায় লাঠি কিনে হালকা ট্রেকিং করে গেলাম ১৮০০ ফুট উচ্চতার কংলাক পাড়ায় সূর্যাস্ত দেখার জন্য। অসাধারন সে দৃশ্য আজও চোখ বুঝলেই দেখতে পাই প্রতিদিনের দেখা চেনা সূয্যি মামা সেদিন কেমন অচেনা হয়ে গিয়েছিল! কি তার রুপ! আর কতই তার সৌন্দর্য!

রিসাং ঝর্নারিসাং ঝর্না

সবাই মিলে হই হুল্লোড় করে, ছবি তুলে পাহাড়ী কলা খেয়ে চলে আসলাম মনা দাদার ছোট্ট শান্তির কুটিরে। এরপর রাতের খাওয়া সেরে ভরা পূর্নিমায় হেলিপ্যাডের পাশের রাস্তায় বসে শুরু হলো রায়হানের গান। তখন গাইতে ইচ্ছে করছিল এই রাত যদি না শেষ তবে ভালই হতো! আমি ও ইসমাইল তো সিদ্ধান্তই নিলাম আজ রাতটা জোসনা মোড়ানো পাহাড় দেখেই কেটে দিব। তবে আমাদের সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় নাই অনিবার্য কারনে। কোনো রকমে রাতটা কেটে খুব ভোরে হেলিপ্যাডে গেলাম সুর্যোদয় দেখার জন্য। সুর্য মামার রুপ সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি হাত দিয়ে মেঘ ছোঁয়ার অভিজ্ঞতাও অর্জন করলাম। সাজেক ভ্রমন শেষে খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা ও রিসাং ঝর্নায় গোসল স্লিপারি করে জিন্সের প্যান্ট ছিড়ে শেষ করলাম মেঘ ছুয়ে দেখার ভ্রমন কাহিনী। এরপর যাত্রা করলাম খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, বোয়ালিয়া, বাউশা ঝিরি দেখতে মিরেরসরাইয়ের উদ্দেশ্যে।