মধ্য দুপুরে সুড়কি বিছানো সবুজ চিরে গাড়ী ছুটে চলেছে রাশান সীমান্তের দিকে, অদূরেই বিশাল হ্রদ পেপসইয়ারভি, যার অন্যপাশে রাশিয়া এপাশে এস্তোনিয়া, সারা ইউরোপের ৫ম বৃহত্তম হ্রদ হলেও দুই দেশের সীমান্তে অবস্থিত সকল হ্রদের মাঝে এটি বৃহত্তম। দৃষ্টিনিবদ্ধ কোলে রাখা ম্যাপে, সামান্য ভুলচুক হলেই সরু কোন রাস্তায় ঢুকে কয়েকমাইল খামোখা নাকানিচুবানি খেতে হবে পথ হারিয়ে! অবশ্য পথ হারানোর জন্যই পথে নামা বলে খুব একটা খারাপ লাগে না অজানা জায়গায় এভাবে ঘুরপাক খেতে, বরং এভাবেই দেখা হয়ে যায় নাম না শোনা জনপদ, মিলে যায় নতুন বন্ধু, কিন্তু এই দেশে সেটা হলে বিপদ, সরু সরু রাস্তা চলে গেছে দূরের কোন ফার্ম হাউসে, বা দিগন্ত ছোঁয়া কোন জলাতে, তখন আবার কেঁচে গন্ডুষ! হাতে সময়েরও স্বল্পতা আছে, হ্রদ তীরের ভারনিয়া শহরে পৌঁছাতে হবে সময় মত। রাস্তা মসৃণ না হওয়ায় বেশ কেঁপে কেঁপে এগোচ্ছে চতুস্পদ, ম্যাপের ক্ষুদের অক্ষর দেখতে সমস্যা হওয়ায় আনমনেই সামনের দিকে তাকাতে কনিফারের বনের উপর দিয়ে আলোতে ভেসে চলা এক কালো বিন্দু নজরে আসল, তার ওড়ার ভঙ্গীতেই বোঝা গেল আকাশের রাজা ঈগল ছাড়া কোন আর পাখি এমন রাজসিক ভঙ্গীতে বাতাস চিরে এগোবে না। কিন্তু কোন প্রজাতির ঈগল এটি?

 আকাশের রাজা ঈগল আকাশের রাজা ঈগল

তার মুখে আবার কি যেন একটা ঝুলছে, হতভাগ্য কোন শিকার হবে, গাড়ী চালানোতে ব্যস্ত সহযাত্রী বন্ধু স্টেফানের উদ্দেশ্য যেই না বলেছি ঈগল, মুহূর্তের মাঝে সে রাস্তার একপাশে গাড়ী থামিয়ে চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল বিহঙ্গরাজকে সনাক্ত করার কাজে।

 ছোট গুটিঈগল ছোট গুটিঈগল

বিরল ছোট গুটিঈগল! দুই নজর দেখার পরেই সে উৎক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের মতই সাঁ করে শুন্যে মিলিয়ে গেল, টেলিস্কোপ ফিট করে তার সাবলীল ভঙ্গিমা দেখার আর সময় দিল না! শুধু দূরবীনের মাধ্যমে বোঝা গেল মুখের খাবারটা ছিল কোন রসালো নাদুসনুদুস ব্যাঙ, যা এই ঈগলের প্রধানতম খাদ্য, অবশ্য বাগে পেলে সে কোন কিছুই ছাড়ে না, বছর দুই আগে তার গিরগিটি শিকার চাক্ষুষ করেছিলাম।

 ছোট গুটিঈগল ছোট গুটিঈগল

এই জাতের পাখিরা শিকারের সন্ধানে সাধারণত চক্রাকারে বাতাসে ভেসে ভেসে ঘুরে বেড়ায়, তাই সিদ্ধান্ত হল কিছুক্ষণ এই জায়গাতে থেকে সুযোগ দেওয়া যাক ব্যাটাকে ফটোশেসনের, আমাদের অপার আনন্দের সাগরে ভাসিয়ে বাতাসে ভেসে ভেসে অল্পক্ষণের মাঝেই হাজির হল, এবং এক জোড়া! বাংলাদেশে বড় গুটিঈগলের দেখা মিললেও সামান্য ছোট আকৃতির এই জাত ভাইয়ের দেখা মিলেনি এখন পর্যন্ত। সাবলীল ভাবে আমাদের দৃষ্টিসীমার মাঝে চক্কর দিল দুইজনই বেশ কয়েকবার, শিকারের হদিশ করতে পারল না তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, আস্তে আস্তে আবার আবছা হতে হতে মিলিয়ে গেল বিশালদেহী পাখিগুলো আকাশের নীলে।

বিশালদেহী পাখিবিশালদেহী পাখি

মহাখুশী হয়ে ফেরার এন্তেজাম করছি এই সময় পাশের দিঘল ঘাসের বিস্তীর্ণ রাজ্য থেকে গুরুগম্ভীর শব্দ ভেসে আসল- কর্ন ক্রেক ( ক্রেক জাতীয় পাখির বাংলা নাম রাখা হয়েছে গুরগুরি, সেই হিসেবে কর্ন ক্রেকের নাম ভুট্টা গুরগুরি দেওয়া যেতে পারে, ইতিমধ্যেই এই নাম পাঠিয়ে দিয়েছি) ! অতি লাজুক এই পাখির ডাক মাঝে মাঝেই শোনা যায় কিন্তু তার দর্শন মেলা অতি দুরূহ। মাঝে মাঝে হঠাৎ মনে হয় ঘাস বুঝি একটু নড়ে উঠল, মুরগীর মত কিছু একটা সরসর করে চলে গেল, একটু ঠোঁটের আদল, মেটে রঙের পালক, এর বাহিরে কিছু দেখার আশা করাই বৃথা! বছর খানেক আগে এক গ্রীষ্মে টানা কয়েক ঘণ্টা তার গান শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল, তার টিকির পালকের দেখাও মিলে ছিল না!

যেহেতু সে খুব কাছে থেকে ডাকাডাকি করছিল, স্টেফান মুচকি হেসে বলল- দাড়াও, ব্যাটাকে রাস্তায় বের করে আনার চেষ্টা করি।

কীভাবে?

আর কেমন করে, তার ডাক দিয়েই! সাথে হাজার পাখির গান রেকর্ড করা আছে, সেখান থেকে ভুট্টা গুরগুরির ডাক এক বিশেষ মাইক্রোফোনে বাজিয়ে সেটাকে প্রলুব্ধ বা ক্ষুব্ধ করার চেষ্টা করে দেখা যাক!

গুরগুরি গুরগুরি

রেকর্ড ছাড়ার প্রায় সাথে সাথেই ভুট্টা গুরগুরি পাল্টা জবাব দিল মহারোষের সাথে, যেমন বলছে- কার এত্ত সাহস আমার হারেমের রমণীদের সাথে ফস্টিনস্টি করতে আসে ! এমন বেশ কবার পাল্টাপাল্টি হবার পর ঘাসের দঙ্গল থেকে তার আবছা অবয়ব দেখা গেল, প্রথমেই খানিকক্ষণ আন্দজা করার চেষ্টা করল ব্যাপারখানা কী! আরেকটা পুরুষ গুরগুরির বদলে দুইখানা মানুষ আর একটা গাড়ী মেঠোপথে কেন সেটা তার বোধগম্য হল না! তারপর আমাদের অবাক করে ভীম গতিতে দৌড়ে অন্য পাশের ঝোপে ঢুকে পড়ল!

ভীম গতিতে দৌড়ভীম গতিতে দৌড়

এক্কেবারে টি-রেক্সের মত সেই দৌড়! পাখিরা যে বর্তমান পৃথিবীতে ডাইনোসরদের সবচেয়ে কাছের টিকে থাকা বংশধর এই নিয়ে কারো সন্দেহ থাকলে তাদের পা জোড়া এবং দৌড়ানো খেয়াল করার চেষ্টা করেন , ডাইনোসরের মতই সামনের দিকে ঝুকে বিশাল লম্বা লম্বা পা ফেলে মুহূর্তের মাঝে পগার পার!

টি-রেক্সের মত সেই দৌড়টি-রেক্সের মত সেই দৌড়

ব্যাটা কী আর আসবে! নাকি বুঝে গেছে আমাদের ফন্দী? খানিক পরেই আশ্বস্ত হয়ে তার আগমন লক্ষ্য করলাম, একেবারে সেই ইলেকট্রনিক যন্ত্রের কাছে যেয়ে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে শব্দ বাহির হচ্ছে ! শুধু তাই না, সেটার সাথে পাল্লা দিয়ে ডাকাডাকিও করল বেশ!

ইলেকট্রনিক যন্ত্রের কাছে যেয়ে দাঁড়িয়েছেইলেকট্রনিক যন্ত্রের কাছে যেয়ে দাঁড়িয়েছে

সেটার সাথে পাল্লা দিয়ে ডাকাডাকিসেটার সাথে পাল্লা দিয়ে ডাকাডাকি

কী অপূর্ব একটা পাখি! দেখা মেলে না বলে তার পালকের চোখ ধাঁধানো সন্নিবেশন নজরে আসে না কখনো, আপন পরিবেশে একেবারে মাতিয়ে রাখল নানা অঙ্গিভঙ্গি করে! তবে খুবই লাজুক, ফাঁকা পথটাতে কোনবারই বেশিক্ষণ থাকল না, খানিকটা পরখ করে, ইতিউতি চেয়েই আবার দৌড় দেয় অন্যপাশে!

ইতিউতি চেয়েই আবার দৌড়ইতিউতি চেয়েই আবার দৌড়

রাস্তার একদিকে ঘাসের মাঝে উবু হয়ে বসে স্টেফান তার বুনো সৌন্দর্য ফ্রেমবন্দী করার চেষ্টারত, অন্যপাশে আমি। কখনো তার দেখা মেলে, কখনো কেবল দৌড় বোঝা যায়!

 স্টেফান স্টেফান

এর মাঝেও সফল হল তাকে ফাঁকায় ডেকে এনে দেখার এবং দেখাবার চেষ্টা, হয়ত তাতে অল্প চাতুরি ছিল কিন্তু তারচেয়েও কোটি গুণ মিশে ছিলে ভালবাসা।