হেমন্তের পড়ন্ত বেলায় যখন শীতের মিষ্টি হাওয়া বইতে শুরু করেছে, ঠিক এমনই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্য্যালয়ের মহাপরিচালক জনাব কবির বিন আনোয়ার মহোদয়ের পাইলট প্রকল্প ‘নদী ও জীবনের সন্ধানে’ কর্ণফুলী নদী ও এর চারপাশের বন্যপ্রাণীর উপর দুই মাসের গবেষণা কাজের ডাক এলো। বাক্সপেটরা গুছিয়ে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম চট-জলদি। সেখান থেকে লঞ্চে করে গন্তব্য বরকল উপজেলার ছোট হরিণা। ওখানে আমাদের গবেষক টিম থাকবে। আমরা কাজ শুরু করি লুসাই পাহাড়ের পাদদেশে, বাংলাদেশ অংশের কর্ণফুলী নদীর উৎপত্তিস্থল থেগামুখে। ‘অভিযাত্রী’ নামে মাঝারী আকৃতির একটি লঞ্চে আমাদের ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের গবেষণার সব রকমের সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে এতে। গবেষণা দলটিতে আছেন বন্যপ্রাণী গবেষক, উদ্ভিদবিদ, মৎসবিদ, নৃবিদ, আন্ডারওয়াটার এক্সপার্ট, সাংবাদিক, ভিডিওগ্রাফার। সবাই এক সাথে কাজ করেছেন নদী ও তার চারপাশের জীবনের ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে। বন্যপ্রাণী গবেষক দলের সাথে ছিলেন শ্রদ্ধেয় ইনাম আল হক ও ড. আনোয়ারুল ইসলাম। মাঠ পর্যায়ে আমাকে দলের দলপতি নির্বাচন করা হয় এবং আমার সাথে সহ-গবেষক মাইনউদ্দিনসহ ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন’-এর এক দল সদস্য ছিলেন। আমরা মূলত কাজ করি নদী, নদীর চারপাশের জলাভূমি ও সংরক্ষিত পাহাড়ি বনাঞ্চলে।

purple sunbirdpurple sunbird

কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি বিস্তীর্ণ চিরসবুজ ও মিশ্র চিরসবুজ বনের পাহাড়ি অঞ্চল, পাহাড়ের বুক চিরে চলে যাওয়া অজস্র ছড়ায় হেঁটেছি দিনভর, চষে বেড়িয়েছি নদী ও নদীর চারপাশের জলাভূমি। তথ্যউপাত্ত যেমন সংগ্রহ করেছি তেমনি মনভরে উপভোগ করেছি এখানকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য। দেখা পেয়েছি অতি পরিচিত অনেক পাখির। আবার কখনই দেখা হয়নি এমন পাখি দেখেও চোখ জুড়িয়েছি। সারাদিন ধরে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘোরার সীমাহীন ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে কাছ থেকে সবুজ-তাউরাদের মতো অনেক মন ভোলানো পাখির ছোটাছুটি দেখে। প্রায় সব ছড়াতেই মিষ্টি শব্দে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে কালাপিঠ- চেরালেজ। একদিন দেখা হয়ে গেল নীল-শিসদামা ও স্লেটপিঠ-চেরালেজের সাথেও, কোনো এক গহীন ছড়ায়। ধলা-খঞ্জন, সিট্রিন-খঞ্জন, হট-টিটি, মেটেমাথা-টিটি, নদী-টিটি, নানান প্রজাতির বক, মেঘহও, ধলাগলা, পাকরা আর পাতি মাছরাঙা, নীলকান্ত, হরেক রকম মৌটুসি, পাতি-আবাবিল, পাকরা-ঝাড়ফিদ্দা, তাইগা-চুটকি, ছোট- পানকৌড়ি, বড়-পানকৌড়ি, পাতি-চ্যাগা, ঝুঁটিয়াল-গোদাশিকরে, কালামাথা-বুলবুল, কালাঝুঁটি-বুলবুল, বাংলা- বুলবুল, সিপাহী-বুলবুল, নানান প্রজাতির ফুটকির সাথে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হত। এ ছাড়াও দেখা মিলেছে এশিয়-দাগিপ্যাঁচা, কণ্ঠী-নিমপ্যাঁচা, খয়রা-মেছোপ্যাঁচা, খুড়–লে-প্যাঁচা, ধলাকোমর-শ্যামা, কালা-গির্দি, নীলগলা-নীলচুটকি, অম্বর-চুটকি, ধলাভ্রু-চুটকি, বড়-খোপাডুবুরি, নেউ-পিপি, দল-পিপি, পাতি-বাটান, নীলডানা-হরবোলা, উদয়ী-পাকরাধনেশসহ আরও অনেক প্রজাতির পাখির। এক সকালে ছোট হরিণা বিজিবি ক্যাম্পের পাশের বাজারের নৌকোঘাটে দেখা মিলল ইউরেশিয়-গাছচড়–ইয়ের, যা এই অঞ্চলে প্রথম রেকর্ড। তাকে দেখার বহুদিনের প্রতীক্ষার অবসান হল। এরপর তাকে দেখেছি প্রায় প্রতি সকালেই।

ইউরেশীয় গাছ-চড়ুইইউরেশীয় গাছ-চড়ুই

‘অভিযাত্রী’ লঞ্চটি এই ঘাটেই নোঙর করেছিল প্রায় ১৫ দিন। পরে বরকল উপজেলা ঘাটে আমরা এক মাস অবস্থান করেছি। বরকলে ক্যাম্পে থাকাকালীন সময়েই আমাদের সাথে যোগ দেন শ্রদ্ধেয় ইনাম আল হক ও ড. আনোয়ার হোসেন স্যার। পরদিন তাঁদেরকে নিয়ে আমরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা দ্বন্দ্ব ছড়ায় গেলাম বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণে। সারাদিন কাজ করে রাত-যাপন হল স্থানীয় এক আদিবাসী পরিবারের বাড়িতে। জায়গাটি স্মরণে থাকবে এখানকার মানুষের সান্নিধ্য আর অবশ্যই জীবনে প্রথম দেখা তামারং-বেনেবউর জন্য। বরকলের সবচেয়ে উচু পাহাড় ২০০০ ফুট উচ্চতার। শহিদ সাত্তার টিলা সংক্ষেপে এসএস টিলা।সেই পাহাড়ে আরও একটি চমৎকার দিন কাটল ইনাম আল হকের নেতৃত্বে। হাইকিং করতে করতে দেখা মিলল বাংলাদেশের বিরল পরিযায়ী পাখি পাতি-তুতির। ওই পাহাড় থেকে ফেরার সময় আমাদের বিস্মিত করে আকাশে ডানা মেলে বিদায় জানাতে এলো ২৪টি দুর্লভ হিমালয়ী-গৃধিনী!

Barn SwallowBarn Swallow

বরকলের পালা শেষে এবার অভিযাত্রী দলের নোঙর ভিড়ল শুবলংয়ে। এখানকার বিস্তীর্ণ নীল জলরাশিতে দেখা পেলাম টিকি-হাঁস, মরচেরং-ভুতিহাঁস, খয়রা-চকাচকি আর ঝাঁকে ঝাঁকে পাতি-সরালি ও এশীয়-শামখোল দলের। আমাদের পরবর্তী ঘাঁটি কাপ্তাই লেক। হৃদের মনোরম নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর এর স্ফটিক স্বচ্ছ জলরাশি যেমন মুগ্ধ করেছে, তেমনি বড়-খোঁপাডুবুরি, কালামাথা ও খয়রামাথা-গাঙচিল, পাতি-পানচিল আর জুলফি-পানচিল আরও বৃদ্ধি করেছে মুগ্ধতার মাত্রা। পাহাড়ি অঞ্চলে একটানা ফিল্ডওয়ার্ক যথেষ্ট শ্রমসাধ্য বলে মাঝে

মাঝে নিজেদের সজীব রাখতে একদিনের বিশ্রাম নিয়ে কোনোদিন মাছ ধরতে যেতাম, কোনোদিন হয়ত যেতাম পাহাড়িদের জীবনধারা দেখতে। একদিন গিয়েছিলাম কাপ্তাই লেকে স্কুবা ডাইভিংয়ে। জলের নিচের জগৎ সত্যিই অনেক বেশি উত্তেজনাময় ও আনন্দদায়ক বলে মনে হল।

রাঙ্গামাটির পর্ব শেষে আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান। কাপ্তাইয়ের পরবর্তী ভোরটি যে আমাদের জন্য এত বড় সারপ্রাইজ নিয়ে বসেছিল তা কখনও ভাবিনি! একদল লাল-বনমুরগি আর বিরল কালা-মথুরা আপন মনে ভুরিভোজন করছে! খুব কাছ থেকে অসাধারণ এই মুহূর্তটি উপভোগ করার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য নেই! বনমোরগ আর মথুরা এর আগেও দেখেছি অনেকবার। কিন্তু এক সাথে এই বিরল সমাবেশ আর কখনও দেখিনি! কাপ্তাই যেন এবার আমাদের দুহাত ভরে দেবে বলেই ঠিক করে রেখেছিল! লালমাথা-কুচকুচির সাথে এক আনন্দময় দিন কাটল। তারপর দেখা হলো তামারঙ-বেনেবউ, মেটেগলা-ছাতারে, নীলডানা-হরবোলা, সবুজ-ধুমকল, পাকরাধনেশ, পাহাড়ি-নীলকান্ত প্রভৃতি দুর্লভ পাখি ছাড়াও সচরাচর দেখা যায় এমন অনেক পাখির সাথে। 

গত দুমাস ধরে আমরা চষে বেড়িয়েছি রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার দুর্গম সব পাহাড়ি বনভূমি, কর্ণফুলী নদী ও এর চারপাশের জলাভূমিতে। দেখেছি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা। মুগ্ধ হয়েছি তাদের আন্তরিক সহযোগিতা, আতিথেয়তা আর অবশ্যই নির্মল হাসিতে। আমরা আমাদের দুমাসের গবেষণায় দুশোরও বেশি প্রজাতির পাখি, ৫৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৪১ প্রজাতির সরীসৃপ ও ১০ প্রজাতির উভচর প্রাণী পেয়েছি। প্রত্যক্ষ করেছি এখানকার বন্যপ্রাণীর আবাস ও প্রাচুর্যের বর্তমান অবস্থা। বাস্তুগত দিক থেকে এই অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখনো এখানে উজাড় হচ্ছে বনভূমি, অবাধে শিকারের কবলে পড়ছে বন্যপ্রাণী। তবুও এখনো এখানে অনেক সম্ভাবনার ক্ষেত্র রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রণয়ন করতে পারলে হয়ত আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারব।