শীতের সকালের জমাট কুয়াশা ভেদ করে রোদ ঝলমল করতে দশটা বেজে যায়। সুতরাং আমাদেরও বেরুতে হলো বেশ বেলা করেই। ইছামতীর আঁকাবাঁকা গতিপথকে অনুসরণ করে বয়ে গেছে প্রশস্ত মেঠোপথ। খালাতো ভাইকে সাথে নিয়ে চলেছি মাঠপানে, পাখির খোঁজে। মাঝপথে এক চাষি ভাই শামখোলের খবর দিলেন। শামুকভাঙার দলটি নাকি আস্তানা গেঁড়েছে ইছামতীর তীরে। আমাদের এলাকায় শামখোলকে মানুষ শামুকভাঙা বলে। ছোটবেলায় দূর আকাশে উড়ন্ত শামুকভাঙা দেখেছি বহুবার। গ্রামের বিলে নাকি শামুকভাঙা থাকে। অতদূরের রাস্তা ভেঙে দেখতে যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। তাই সামন-সামনি দেখার সুযোগ পাইনি। এতদিনে পেলাম।। এসময় ইছামতীর পানি হাঁটুর নিচে নেমে যায়। তাই ওদের পর্যপ্ত খাবার মিলবে।

ইছামতীর বুকে তখন উত্তরের হিমেল হাওয়া শপাং শপাং করে বাড়ি মারছে। সূর্যের সেই তেজ নেই যে ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচায়। অথচ পাখিগুলো কী সাবলীল!

পাখিগুলো কী সাবলীল!পাখিগুলো কী সাবলীল!

বরফের মতো ঠাণ্ডা পনিতে পা ডুবিয়ে খাবার খুঁজছে ৩০-৪০ জনের একটা ঝাঁক। হঠাৎ কী মনে করে উড়ে গিয়ে বসল ওপারের একটা শিমুল গাছে। সাধ থাকলেও সাধ্য নেই ওপারে গিয়ে ভালো করে ছবি নেওয়ার। ইছামতী আর দশটা নদীর মতো নয়। সে শুধু স্থলভাগের বিভক্তিই টানেনি, আন্তজার্তিক সীমারেখাও নির্ধারণ করেছে। তাই শামুকভাঙার পিছু ধাওয়া করতে গেলে আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘন করে ভারতের মাটিতে পা রাখতে হবে। সেটা যথেষ্ট ঝুঁকির এবং জীবন-সংশয়ী। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম। কিন্তু পাখিগুলো একবারও ইছামতী পেরিয়ে এপারে এলো না।

শামুকভাঙাশামুকভাঙা

আসলে ওপার থেকে কাঁটাতার পযর্ন্ত নোম্যান্সল্যান্ডের যেটুকু ভারতের অধিকারে আছে সেটুকুতে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করেছে ভারত সরকার। তাই পাখি আর বন্যপ্রাণীরা অনেকটা নিরাপদ ইছামতীর ওপারে। কিন্তু এপারটা ওদের জন্য মনুষ্যসংকুল! খুব বেশি দূরে নয়। তাই এপার থেকেও স্পষ্ট দেখতে সমস্যা হলো না। তবে স্বল্পপাল্লার পয়েন্ট অ্যান্ড শুট ক্যামেরায় ভালো ছবি উঠল না। খেদ একটা রয়েই গেল।

দুর্লভ পাখিদুর্লভ পাখি

বাংলাদেশের আবাসিক দুর্লভ পাখি। দেখতে বকের মতো। তবে অনেক বড়। গায়ের রং ধূসর সাদা। তবে বাসা বাঁধার সময় শরীর একদম সাদা হয়ে যায়। লেজ ও পাখার শেষভাগ কালো রংয়ের। বাংলাদেশের বড় পাখিদের একটা। একাশি সেন্টিমিটার লম্বা হয়। প্রতিটা পাখার দৈর্ঘ্য চুয়াল্লিশ সেন্টিমিটার। ঝাঁক বেঁধে চলে। একেক ঝাঁকে চল্লিশ থেকে ষাটটি পাখি থাকে। জলচর পাখি। নদী, হাওড়-বাওড়, মিঠাপানির জলাশয়, হ্রদ, ধানক্ষেত ও উপকূলীয় বনে এদের দেখা যায়। এদের দেহের সবচেয়ে আকর্ষণী অংশ হলো ঠোঁট। ইয়াবড় আর ভারী ঠোঁট। চৌদ্দ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। দুই ঠোঁটের মাঝখানে ফাঁক থাকে। এরা শামুক খেতে খুব ভালবাসে। একটা শামুক পেলে ঠোঁট দিয়ে শামুকের খোল ভাঙে। তারপর সেটা ওপরে তুলে আকাশের দিকে মুখ করে গিলে ফেলে। এজন্য এর নাম শামুকখোল। তবে এরা শুধু শামুকই খায় না। মাছ, কাকড়া, ছোট ছোট প্রাণী, ব্যাঙ ইত্যাদিও খায়।

শামুকখোলশামুকখোল

এরা যেসব এলাকায় থাকে সেসব এলাকা বিরাট একটা কলোনী গড়ে তোলে। একেকটা বড় গাছে একটা করে ঝাঁক বাস করে। তবে গাছ যদি আরও বড় হয় তবে ঝাঁকও অনেক বড় হয়। বগুড়ার বিহার হাটের দুটি অশ্বত্থ গাছে প্রায় চারশো পাখি বাস করে। এরা সারাবছর একই জায়গায় কাটিয়ে দেয়। তবে খাবারের অভাব হলে অন্য জায়গায় চলে যায়। বাসা বাঁধার সময় এরা পানকৌড়ি ও বকের সাথে বিরাট কেলোনি গড়ে তেলো। কলোনীতে বাস করার কারণ হলো বচ্চাদের নিরাপত্তা। চিল, বাজ পাখি, কাক কিংবা মানুষ এদের ছানাদের ক্ষতি করতে এলে ঝাঁকবেধে তেড়ে আসে।

শামুকখোলের বাসাও প্রকাণ্ডশামুকখোলের বাসাও প্রকাণ্ড

বড় পাখিদের বাসাও বড় হয়। শামুকখোলের বাসাও প্রকাণ্ড। বড় বড় আমগাছ, শিমুলগাছ, বট ও অশ্বত্থ গাছের উঁচু ডালে বাসা বাঁধে। একেকটা গাছে বিশ থেকে ত্রিশটা বাসা দেখা যায়। কোনও কোনও গাছে একশোরও বেশি বাসা থাকে। গাছের শুকনো ডাল, কঞ্চি ও লতাপাতার সমন্বয়ে বাসা তৈরি করে শামুকখোল পাখি। স্ত্রী ও পুরষ পাখি মিলে দশ-বারোদিন ধরে বাসা তৈরি করে। বাসার দৈর্ঘ্য পাঁচফুট পর্যন্ত হয়। জুলাই-অগাস্ট মাসে তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে । ডিম মুরগির ডিমের চেয়ে বড়। স্ত্রী-পুরুষ দুজন মিলে ডিমে তা দেয়। পঁচিশ দিন লাগে ডিম ফুটে ছানা বেরুতে। ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ দিন বয়স হলে ছানারা উড়তে শেখে।

শামুকখোল পাখিশামুকখোল পাখি

প্রথম দেখার পর কয়েকমাস কেটে গেছে। শামখোলের দুটো কলোনির খবর পেয়েছি নাটোর আর বগুড়ায়। দুদিনের সরকারি ছুটি এলো, সুযোগটা কাজে লাগালাম। রাতেই বেরিয়ে পড়লাম নাটোরের উদ্দেশ্যে। সকাল সকালই পৌঁছে গেলাম নলডাাঙার শমসখোলসি গ্রামে। সেখানে পাখিপ্রেমী বন্ধু জুয়েল রানা থাকেন। ওদের একটা স্বোচ্ছাসেবী ক্লাবও আছে নাম ‘ইডা’। পাখি ও বন্যপ্রাণী রক্ষা আন্দোলন সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি।

এশিয় শামখোলএশিয় শামখোল

শমসখোলসি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিরল কুমারের বাড়িতে দুটি আমগাছ ও দুটি শীরিষ গাছে শতাধিক এশিয় শামখোল কলোনি গড়েছে। বাড়ির উঠোনে পা দিতেই অন্যরকম রোমান্স ভর করল মনে। এত পাখি এক সাথে হাঁক-ডাক করছে, এ যেন সপ্নের এক জগত। আলো, পাখির অবস্থান-- সবই ছবি তোলার জন্য অনুকুল। তাই ভালো ছবি পেতে সমস্যা হলো না।

পাখি আর বাসার ছবিপাখি আর বাসার ছবি

পাখি আর বাসার ছবি পেলাম, কিন্তু কোনও বাসাতেই ছানাদের আবির্ভাব ঘটেনি। বিরল কুমার, জুয়েল রানাদের মতো পাখিপ্রেমী যেমন আছে শমসখোলসিতে, তেমনি কিছু দুর্জন মাুনষও আছে। এঁরা পাখিগুলোকে গ্রামছাড়া করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। পাখির ডাক নাকি বড্ড কর্কশ, ওদের প্রাতকৃতের গন্ধে নাকি ঘরে টেকা দায়। তারা পটকা-বাজি ফুটিয়ে পাখিদের পাখিদের ভয় দেখান, সুযোগ পেলে দুয়েকটা মেরেটেরেও বীরত্ব জাহির করেন। তবে আশার কথা এ গাঁয়ে দুর্জনের চেয়ে সুজনের সংখ্যায়ই বেশি। আপাতত পাখিগুলো নিরাপদ।

পাখি আর বাসার ছবিপাখি আর বাসার ছবি

শমসখোলসির পাঠ শেষে চলে গেলাম বগুড়ায়। সেখানকার সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষক ও উদ্যমী ছাত্ররা মিলে গড়ে তুলেছেন শিক্ষার্থীদের পরিবেশবাদী সংগঠন ‘তির’। পরিবেশ ও পাখি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি। ওই প্রথিষ্ঠানের এক সদস্য মিজানুর রহমানের সাথে পরিচয় ছিল। তাকে সাথে নিয়েই চললাম পাখির কলোনি দেখতে। কলোনিটা বগুড়া শহর থেকে ৭-৮ কিলোমিটার দূরে ভাষুবিহারে কাছে। ছোট্ট একটা বাজার বিহারহাট।

শামখোলের বাসাশামখোলের বাসা

সেখানে দুটো বড় বড় অশ্বত্থ গাছ। দুইগাছের শাখা-প্রশাখায় একটা করে শামখোলের বাসা। মিজানুর জানালেন প্রায় চারশোটি শামখোল বাস করে এই দুই গাছে।


প্রতিটা বাসায় দু-তিনটে ছানা।প্রতিটা বাসায় দু-তিনটে ছানা।

বিশাল ঠোঁট ছানার ঠোঁটের ভেতর ঢুকিয়ে খাইয়ে দিচ্ছেবিশাল ঠোঁট ছানার ঠোঁটের ভেতর ঢুকিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে

সে এক অদ্ভুদ দৃশ্য! ছানারা বেশ বড় হয়ে উঠেছে। কেউ ঘুমিয়ে আছে, কেউ বা ভাইবোনের সাথে খুঁনসুটিতে ব্যস্ত, কেউবা করুণ সুরে বাবা-মায়ের কাছে খাদ্যের জন্য বায়না করছে। একটা পাখিকে দেখলাম তার বিশাল ঠোঁট ছানার ঠোঁটের ভেতর ঢুকিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে। ছবি তোলার জন্য পজিশনও পেয়েছিলাম, কিন্তু আকাশ মেঘলা ছিল। পর্যপ্ত আলোর অভাবে ছবি ভালো হলো না। তবে পাখি দেখার অন্যরকম অনুভূতি নিয়ে সেদিন রাতে ঢাকায় ফিরেছিলাম।

শামুকভাঙাশামুকভাঙা

স্থানীয় নাম : শামুকভাঙা, এশিয়-শামখোল, এশিয়-শামুকখোল
ইংরেজি নাম : Asian Openbil‌‌‌‌.
বৈজ্ঞানিক নাম : Anastomus oscitan.