বাংলাদেশের শেষ আদর্শ গ্রামগুলোর একটি চর কুকরি মুকরির পাশ দিয়ে চলে গেছে স্নিগ্ধ একটি খাল, ( আদর্শ গ্রাম মানে নেই বৈদ্যুতিক বাতির আস্ফালন, কোন মোটরচালিত যান এমনকি রিকশাও, সাঁঝের সাথে সাথে কুপির টিমটিমে আলো নিয়ে আসে ঐন্দ্রজালিক পরিবেশ ), যদিও প্রথম দর্শনে নীলাভ-সবজেটে জলের সরু খালটি দেখে অবশ্য তা ভোলা জেলার অন্তর্গত বলে মনে হয় না, বরং যে কোন বাদাবনের সাথেই টার মিল অনেক বেশী। আর খালের একটু ভিতরে সেধোতে পারলেই মনে হয় সুন্দরবনের গা ছমছমে পরিবেশে চলে এসেছি, নানা ম্যানগ্রোভ গাছের সবুজ প্রাচীরে আমাদের কৌতূহলী দৃষ্টি আটকে যায়, সেখানে কেওড়া , ছৈলা, হারগোজা , গোলপাতা সবাই উপস্থিত। সেই সাথে আছে নানা রঙের পাখি- বাতাসে, জলে, স্থলে, গাছের আড়ালে- আবডালে। গেল বছর খালের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় এক দঙ্গল হৃষ্ট পুষ্ট শেয়ালের দলের সাথে মোলাকাত হয়েছিল, আমাদের লোভী ক্যামেরার সামনে তারা শুধু নেকড়েদৃষ্টি নিক্ষেপ করেই বিদায় নিয়েছিল সেযাত্রা, দেখা যাক এবার আমাদের মত অনাহুত আগন্তকদের সাথে আর কার সাক্ষাৎ হয়।

নীলাভ-সবজেটে জলের সরু খালনীলাভ-সবজেটে জলের সরু খাল

 

ফি-বছরই উপকূলীয় জলচর পাখিশুমারির সময় চর কুকরি মুকরিতে থামা হয় পাখি দেখার ও গোনার জন্য, সেই সাথে নয়নাভিরাম খালটিতে ঢোকা হয় জোয়ারের সময়, শেষ মাথা পর্যন্ত যেতে ভালই ভালই আবার ফিরে এসে নোঙ্গর ফেলা হয় গ্রামের পাশে। সরু খালটি দিয়ে বাণিজ্যিক জলযানও চলাচল করে, তবে সবচেয়ে বেশী চলে স্থানীয় জেলে আর কাঠ সংগ্রহকারীদের ছোট নৌকা। এক যুগেরও বেশী সময় ধরে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব নিয়মিত বার্ষিক পাখিশুমারি করে যাচ্ছে, এইবার সাথে যোগ দিয়েছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের তিন জন্য সদস্য। সতর্ক দৃষ্টি মেলে সবাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করছি প্রতি বর্গ ইঞ্চি যাতে কোন প্রাণী নজর না এড়িয়ে যায়, যদিও ভাল মতই জানি সোদরবনের বাঘের মতই আমাদের দেখবে সব প্রাণী, কিন্তু আমরা সবাইকে দেখতে পাব না,সকল সতর্কতার পরেও, তারা যে মিশে আছে আপন আলয়ে! তবে খালের অপরূপ সৌন্দর্যে অবগাহনের ইচ্ছাও সকলে ষোল আনা, তাই নৌকার সবখানেই দূরবীন হাতে দাঁড়িয়ে সবাই।

নীলাভ-সবজেটে জলের সরু খালনীলাভ-সবজেটে জলের সরু খাল

 

গলুইয়ের কাছে দাঁড়িয়ে মনে মনে ‘ একটি বাংলাদেশ, তুমি জাগ্রত জনতায় ”-র সুর ভাজছি, এমন সময় আমাদের ট্রলারের সামনে দিক থেকে হৈ হৈ রৈ রৈ, কজন একই সাথে জোরে জোরে বলে উঠল – উদ, উদ!! কয়েক পলকের জন্য দেখা গেল সরু একটা পথের মত উঠে গেছে খাল থেকে বনের দিকে, হয়ত বুনো প্রাণীরা নিয়মিত জলপান করতে আসে এই পথ ধরেই, সেখানে তিন তিনটে মূর্তিমান ভোঁদড় ( উদবিড়াল ) !!!

মূর্তিমান ভোঁদড় ( উদবিড়াল )মূর্তিমান ভোঁদড় ( উদবিড়াল )

মূর্তিমান ভোঁদড় ( উদবিড়াল )মূর্তিমান ভোঁদড় ( উদবিড়াল )

 

তারা সপরিবারে বেরিয়েছে বৈকালিক আহারের জন্য, কিন্তু আমাদের ট্রলার অতি নিকটে চলে আসায় আপাত বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। তাই লেজ তুলে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে যাবে নাকি জলকেলি করে মাছ ধরবে তা নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছে ভোঁদড় পরিবার, মাঝে মাঝেই পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ইতি-উতি তাকাচ্ছে দুলে দুলে, দেখেই মনে হচ্ছে শিশুকালের ছড়া-

ওরে ভোঁদড় ফিরে চা
খোকার নাচন দেখে যা !

 দ্বিধান্বিত ভোঁদড় পরিবার দ্বিধান্বিত ভোঁদড় পরিবার

 

এখন দেখে অবশ্য মনে হচ্ছে ভোঁদড়ই নাচ জুড়ে দিয়েছে, এত কাছ থেকে বুনো ভোঁদড় বা উদবিড়াল দেখার সৌভাগ্য আমাদের দলের কারোরই হয় নি, বিশেষ করে এই দুর্লভ Indian Smooth-coated Otter ( Lutrogale persipicilata ) জাতের সাথে। সুন্দরবনে যারা গিয়েছেন তাদের অনেকের সাথে Smooth-coated Otter সাথে দেখা হয়েছে হয়ত, কিন্তু Smooth-coated Otterএর দর্শন সত্যিই দুর্লভ। মনে পড়ে WWFর ভোঁদড় বিভাগের প্রধান PAT FOSTER-TURLEY তার বাংলাদেশের অবস্থানকালীন সময়ে কোন বুনো ভোঁদড়ের দেখা না পেয়েও সুন্দরবনে ভোঁদড়ের বিষ্ঠা পেয়ে মহা খুশী হয়ে তাই নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন গবেষণার জন্য, আর সেখানে আমরা অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে তিন তিন খানা বিরল এবং সংকটাপন্ন প্রাণীটির দেখা পেলাম।

 ভোঁদড় ভোঁদড়

 ভোঁদড় ভোঁদড়

 

ইতিমধ্যেই প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের মূল ভিডিওম্যান বেলাল ভাই এবং তার সহকর্মী শফিক ব্যস্ত হয়ে গেছে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে তীরে নেমে ভোঁদড়গুলোর কিছু ক্লোজআপ ভিডিও করার জন্য, কিন্তু ততক্ষণে ট্রলারখানা আর আগের জায়গায় নেই। জোয়ারের টান আর নিজস্ব গতি জড়তায় সে এগিয়ে গেছে অনেকখানি, ভোঁদড়েরা তখন আবার সাহস পেয়ে ফিরে এসেছে জলের কাছে। তেল চুপচুপ করছে যেন তাদের ভেজা শরীরে, এই চামড়ার জন্যই হাজার বছর ধরে তারা পরিণত হয়েছে মানুষের শিকারে। কিন্তু সূর্য তখন আমাদের বিপরীতে, এই আলোতে ভাল ছবি তোলা সম্ভব নয় আমুদে প্রাণীগুলোর, বিঁধায় সরু খালে আগুপিছু করে ট্রলার ঘুরিয়ে ফের আসা হল আগের জায়গায়, ততক্ষণে ভোঁদড়েরা গেছে বনের সবুজে মিলিয়ে! কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মাঝেই ঘাসের জঙ্গলে দেখা গেল তিনটে চলমান কালো বিন্দু, তারা হয়ত আমাদের নিরাপদ ভেবেই ফিরে এসেছে মাছ শিকারে।

এসেছে মাছ শিকারেএসেছে মাছ শিকারে

 

সাথে সাথে ডিঙ্গি চলল সেদিকে, আমরা নৌকা থেকে ফ্রেমবন্দী করলাম দুই ক্যামেরাম্যানের ভিডিও করার প্রচেষ্টা, সে এক দেখার মত দৃশ্য, উদবিড়ালগুলো একবার থামে, তো লুকানোর চেষ্টা করে, আবার পর মুহূর্তে সরসর করে এগিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে তাকায়, আবার কখনো দুপা ভর দিয়ে ঝট করে দাঁড়িয়ে যায়!

কৌতূহলী দৃষ্টিকৌতূহলী দৃষ্টি

ভোঁদড়েরা লুকিয়ে পড়ে বনের ফাঁকেভোঁদড়েরা লুকিয়ে পড়ে বনের ফাঁকে

 

এর ফাঁকেই চলতে থাকে ক্যামেরাবাজি।

ভোঁদড়েরাভোঁদড়েরা

 

অল্পক্ষণের মাঝেই ভোঁদড়েরা লুকিয়ে পড়ে বনের ফাঁকে, তাদের সন্ধানে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে চলে যান ভিডিওম্যানরা, ট্রলার নোঙ্গর ফেলে আপাত থিতু হবার জন্য। পাখি গবেষক সামিউল মোহসানিন ও প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের গবেষক হুমায়ূন কবিরের সাথে আমি লাফ দিয়েই ট্রলার থেকে নেমে বন ভেদ করে ছুটতে থাকি ভোঁদড়দের সম্ভাব্য গন্তব্যের দিকে, এবং জড়িয়ে যাই বিপাকে!

 হারগোজার ঝোপ হারগোজার ঝোপ

 

এ যে হারগোজার ঝোপ ! মারাত্নক তীক্ষ কাঁটা আছে তার প্রতি পাতায় একগাদা করে, বাওয়ালীরা বলে সুন্দরবনের বাঘও হারগোজা বা হরগোজার এই ঝোপ এড়িয়ে চলে, আর সেখানে আমরা এসেছি হাফপ্যান্ট আর টি-শার্ট পরে! অসংখ্যবার খোঁচা খেয়ে খেয়ে বিরক্তি ধরে গেল, কাঁহাতক আর সহ্য করা যায় এই সুচালো আদর! যদিও এই নরক ঝোপের মাঝেই স্থানে স্থানে দেখা গেল মানুষের মল ! সত্যই মানুষ অদ্ভুদ প্রাণী, এই অদ্ভুতুড়ে প্রাণসংহারী স্থানে এসেও মনের সুখে প্রাকৃতিক কাজ করে গেছে ইচ্ছে মত ! তাদের অধ্যবসায়কে সাধুবাদ দিয়ে খালের তীরে এসেই পেয়ে গেলাম এক স্থানীয় জ্বালানীকাঠ সংগ্রাহকের নৌকা, সেই আমাদের খাতির করে পৌঁছে দিল ট্রলারে। মাঝি বাই জানালেন বিকেলের দিকে কেওড়া গাছের মাথাতে বানরের পালের দেখা মিলে, ভোঁদড় সে দেখে মাঝে মাঝে, তার ভাষায় যাদের নাম উদবিলাই।

জ্বালানীকাঠ সংগ্রাহকের নৌকাজ্বালানীকাঠ সংগ্রাহকের নৌকা

 

সবার ফেরার পর আবার রেকি করতে যাওয়া হল খালের অপর প্রান্ত, ৪ ধরনের মাছরাঙা দেখা দিলে ঝলমলিয়ে, বিশেষ করে ধলা ঘাড় মাছরাঙার যেন মেলা বসেছে।

ধলা ঘাড় মাছরাঙাধলা ঘাড় মাছরাঙা

 

শেষ প্রান্ত থেকে ফেরার সময় এবার বেলাল ভাইয়ের চিল চিৎকার- বাঘ, বাঘ ! জানা গেল একটি মেছোবাঘ যাকে মেছো বিড়াল (Fishing Cat)ও বলা হয়ে থাকে আয়েশ করে বসে ছিল খালের ধারে, তার সান্ধ্যকালীন শিকারের জায়গা হয়ত সেটি, যেখান বসে নিয়মিত মাছ শিকার করে অপূর্ব প্রাণীটি। আমেরিকান র‍্যাকুনের মত তারও খাবার আগে তা জলে পরিষ্কার করে নেবার অদ্ভুত স্বভাব আছে বলে জানা গেছে। আবার নৌকা ফেরানো হল, বনের মাঝে মেছোবাঘ দেখা তো চাট্টিখানি কথা নয়! এবং দেখা গেল বড়সড় কিউট বেড়ালটি যেন ফটোশেসনের জন্যই বসে আছে গোঁফে তা দিয়ে, বার কয়েক শ্বদন্ত দেখিয়ে আয়েশি হাই-ও তুলল।

একটি মেছোবাঘ একটি মেছোবাঘ

 

তারপর তার বিশ্রামের এবং আহারের সময় বিরক্ত করার জন্য খানিকক্ষণ আমাদের দিকে ভৎসনার দৃষ্টি হেনে সে চলল বনের গহনে-

ভৎসনার দৃষ্টি হেনে সে চলল বনের গহনেভৎসনার দৃষ্টি হেনে সে চলল বনের গহনে

 

সন্ধ্যা করে দেওয়া এক অপূর্ব বিকেলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তখন আমরা বিভোর।

লেখকলেখক