One's destination is never a place, but always a new way of seeing things
- Henry Miller

যথারীতি অ্যালার্ম দিয়ে রাখা হলো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠার। আজকে আইসল্যান্ডে চতুর্থ দিন । দীর্ঘ লম্বা পাঁচ ঘন্টার ড্রাইভে ওকুলসআরলোন (আইসল্যান্ডিক ভাষায় লেখে Jökulsárlón) এর গ্লেসিয়ার্স লেগুন এবং diamond বীচ এ যাবার প্ল্যান। প্রতিদিনের মতো একই অবস্থা। অ্যালার্ম বেজে যাচ্ছে কিন্তু শরীর বিছানা ছাড়তে চাচ্ছিলো না। আরো ঘন্টা খানেক বিছানায় নিজেকে রেখে তড়িঘড়ি করে উঠে পড়লাম। আগের গত কয়েকদিনের মতো হোস্টেলের সেরকম হৈহুল্লাহ নেই কিন্তু অচেনা নতুন কয়েকটা মুখ বসবার ঘরে এখানে সেখানে। সকালের নাস্তা হাল্কা বানিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম এবং সাথে কিছু কফি। বলা যায় আজকের ওয়েদার গত দুই তিন দিনের তুলনায় অনেক ভালো। সূর্য আজকে খুব ভালো মতো হাজির। সূর্যের উপস্থিতিতে আইসল্যান্ডের রূপে ভিন্ন একটা সজীবতা দেখা যায়। ওকুলসআরলোন লেগুন আইসল্যান্ডের দক্ষিণ কোস্ট-এ অবস্থিত এবং দর্শনার্থীদের জন্য আবশ্যক একটা স্থান ।

ওকুলসআরলোন (আইসল্যান্ডিক ভাষায় লেখে Jökulsárlón) এর গ্লেসিয়ার্স লেগুন এবং diamond বীচওকুলসআরলোন (আইসল্যান্ডিক ভাষায় লেখে Jökulsárlón) এর গ্লেসিয়ার্স লেগুন এবং diamond বীচ

রাজধানী রেকাভিক থেকে চার ঘন্টার ড্রাইভ। রেকাভিক ছেড়ে একটু যেতেই ধু ধু লাভা ফিল্ড , দিগন্তে মেঘ , আর আগ্নেয়গিরির ধূসর কালো পাহাড় আর পাহাড়ের গা ঘেঁষে আগ্নেয়গিরির ধোঁয়া একটু পর পর। সব কিছু মিলে অপূর্ব মনোরম একটি দৃশ্য। এই রকম দৃশ্যের পর দৃশ্য ছেড়ে গাড়ি ছুটে চলেছে হাইওয়তে। আইসল্যান্ডে ড্রাইভিং অনেক সহজ। মাত্র তিন লক্ষ মানুষ পুরো দেশে। তাও বেশির ভাগ রাজধানী রেকাভিক এর দিকে। সেজন্য রাস্তা ঘটে যান্ত্রিকতা একেবারে নেই। এখানে প্রায়শই বৃষ্টি হয়। কিন্তু এক নাগাড়ে নয়। দেখা যায় এই বৃষ্টি শুরু হলো আবার মিনিট কয়েক পর ঝকঝকে রৌদ্দুর। এর ফলে রাস্তা জুড়ে দিগন্ত রেখাই প্রায়ই রংধনুর বর্ণালী। আর বিশাল রংধনু এই এক কোনা থেকে শুরু হলো আর পৃথিবীর অন্য কোনায় যেয়ে শেষ হলো, ঠিক যেন এক বর্ণালী গেট দিগন্ত জুড়ে।

পৃথিবীর সব রং দিগন্তে যেয়ে মিশেছেপৃথিবীর সব রং দিগন্তে যেয়ে মিশেছে

আইসল্যান্ডে প্রথম কয়েকদিন রংধনু দেখলেই হুটহাট গাড়ি থেকে নেমে পড়তাম এবং ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতাম নয়তো ভিডিও রেকর্ড করতাম, আর কেবল ওয়াও , ওয়াও করতাম। কিন্তু দুই একদিন পরে বুঝতে পারলাম রেইনবোর সাক্ষাৎ পাওয়া আইসল্যান্ডে খুব সহজ। একপাশে রৌদ তো অন্যপাশে বৃষ্টি। রংধনু হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। 

টার্ফ হাউস
ওকুলসআরলোন এ যাবার পথে ছোট্ট একটা বিরতি নিয়ে পনেরো মিনিটের detour নিয়ে দেখে এলাম ছোট বেলার শোনা গল্পের টার্ফ হাউস গুলো। মাত্র তিনটা টার্ফ হাউস íslenski bærinn নামে এই টার্ফ হাউস মিউজিয়ামে। ভেজা তৃণাচ্ছাদিত জমির ছোট ছোট টুকরো নিয়ে বাড়ির ছাদে এবং দেয়ালে লাগানো হতো , এবং তা থেকে লতাপাতা বড়ো হয়ে বাড়ির চারপাশে ছাদে দেয়ালে ছড়িয়ে পরে। বাতাস আর ঠান্ডা আবহাওয়ার থেকে বাড়ির ভিতরটা সুরক্ষিত রাখে। মজার বেপার হচ্ছে বাড়ির ছাদে টার্ফ গুলো (তৃণাচ্ছাদিত জমি) recycle করা যায়।টার্ফ হাউস

ভেজা তৃণাচ্ছাদিত জমির ছোট ছোট টুকরো নিয়ে বাড়ির ছাদে এবং দেয়ালে লাগানো হতো । বাতাস আর ঠান্ডা আবহাওয়ার থেকে বাড়ির ভিতরটা সুরক্ষিত রাখেভেজা তৃণাচ্ছাদিত জমির ছোট ছোট টুকরো নিয়ে বাড়ির ছাদে এবং দেয়ালে লাগানো হতো । বাতাস আর ঠান্ডা আবহাওয়ার থেকে বাড়ির ভিতরটা সুরক্ষিত রাখে

একটি জেনারেশন বাড়িতে থাকার পর পরবর্তী জেনারেশন সে বাড়ির টার্ফ গুলো খুলে ফেলে আবার নতুন টার্ফ লাগাতে পারে। এভাবে বাড়িগুলো জেনারেশনের পর জেনারেশন ব্যবহার করতে পারে। অধিকাংশ টার্ফ হাউস দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর ভেঙে ফেলা হয় এবং আধুনিক বাড়ি নির্মাণে উৎসাহিত করে। সেজন্য আইসল্যান্ডে এখন খুব কম সংখ্যক টার্ফ হাউস দেখা যায়। কিছু সময় টার্ফ হাউস গুলোর আসে পাশে কাটিয়ে গাড়িতে উঠে আবার রওনা দিলাম ওকুলসআরলোনে গ্লেসিয়ার্স ল্যাগুনের পথে।

১০০০ বছর পুরোনো হীরার টুকরার মতো বরফ১০০০ বছর পুরোনো হীরার টুকরার মতো বরফ

আইল্যান্ডের অনেক আকর্ষণের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ হলো এই দেশের ঘোড়াগুলো। এই দীর্ঘ হাইওয়ের দুইপাশে কিছুক্ষন পর পর নানা রকমের ঘোড়ার দেখা মিলে। অনেকসময় কিছু কিছু ঘোড়া এতটাই স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে যে ভেবাচেকা খেয়ে যায় বুঝতে এগুলো কি সত্যিকারের ঘোড়া নাকি স্ট্যাচু। ফটোগ্রাফারদের জন্য আইসল্যান্ড অবশ্যই একটা স্বর্গরাজ্য। প্রতিটা দৃশ্য যেন দেয়ালে ঝুলানো শিল্পীর এক একটি স্থিরচিত্র। এই দৃশ্য বর্ণনাতীত। এভাবে চার ঘন্টা পার করে এসে পৌছালাম ওকুলসআরলোন।

ওকুলসআরলোন গ্লেসিয়ার্স ল্যাগুনওকুলসআরলোন গ্লেসিয়ার্স ল্যাগুন

চারপাশের Ice-berg এর বড়ো বড়ো টুকরো একদম চোখ জুড়ানো। চোখ স্বাভাবিক হতে কিছু সময় লাগলো। টাইটানিক , আইস - এইজ মুভি গুলোর কথা মনে পরে গেলো। আইস বার্গের এই জলাশয়টির বয়েস খুব বেশি না। মাত্র ৮০ বছর। কিন্তু জলাশয়ে কিছু বড়ো বড়ো হীরার টুকরার মতো বরফ ভেসে বেড়াচ্ছে যেগুলোর বয়েস ১০০০ বছর পুরোনো।

ডায়মন্ড বীচডায়মন্ড বীচ

মজার বেপার হলো পানির উপরে ভাসমান গ্লেসিয়ার এমনিতেই অনেক বড়ো, তার চেয়ে বেশি অংশ প্রায় ৯০% কিন্তু পানির নিচে থাকে। তাহলে ভেবে দেখুন কত বিশাল এই গ্লাসিয়ার্সের টুকরা। এই লেগুনের এর পাশে, রাস্তার বিপরীতে রয়েছে আটলান্টিক মহাসাগর।

part of an ice-bergpart of an ice-berg

গ্লাসিয়ার্স থেকে ভেঙে ভেঙে বরফ টুকরো গুলো আল্টান্টিক মহাসাগরের জলধারায় এসে পরে। এবং এই হাজার বছরের পুরোনো আইস টুকরোগুলো দেখতে একেবারে হীরার টুকরার মতো, এবং আটলান্টিক মহাসাগরের কুচকুচে কালো সমুদ্র সৈকতে এবড়োথেবড়ো পরে আছে এবং তার জন্য বীচটার নাম দেয়া হয়েছে ডায়মন্ড বীচ এবং কালো বীচের উপরে এই হীরকের মতো বরফ টুকরোগুলো ঝকঝক করছে। সমুদ্রের ঢেউ এই বরফ টুকরোগুলো কূলের অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে আসে । সমুদ্রে বেশ অনেক আইস-বার্গের টুকরো ভেসে বেড়াচ্ছে।

some serious photographersome serious photographer

সমূদ্রের সৈকতের সৌন্দর্য্য অবাক করার মতো, কিন্তু এর চেয়ে বেশি অবাক হলাম একেবারে প্রফেশনাল Diver - দের মতো পোশাক পরিহিত চীন দেশের ফোটোগ্রাফেরদের দেখে। ছবি তুলার জন্য সবাই খুব অস্থির এবং পানির মধ্যে হাঁটুজল ডুববে ট্রাইপড বসিয়ে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে ছবি তুলছে আইস বার্গের। চৈনিক চিত্রশিল্পীদের শিল্পী-দৃষ্টি আমার বোধগম্য নয়। এবং এই অভিজ্ঞতার স্মুখীন হতে হয় প্রায় প্রতিটি জায়গায়। এবং গত পরশু দিন দেখলাম দুই প্রবীণ ব্ল্যাক বীচে শুয়ে শুয়ে আর এক প্রবীনের উদ্ভট পোজের ছবি তুলছে তাদের ফোন দিয়ে। শুয়ে ছবি তোলার কারণটা আমি এখনো উদ্ধার করতে পারি নাই। উনাদের ছবি তুলার ধরণটা আমার কাছে খুব একটা পরিষ্কার না। 
সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এসেছে , এবার যাবার পালা। পৃথিবীর সব রং দিগন্তে যেয়ে মিশেছে। সবুজ খোলা প্রান্তর , দূরের আবছা ধোঁয়াটে পাহাড় শিপ্লীর তুলির কারুকার্য্যে আকাশের ক্যানভাসে অপূর্ব এক জাদুকরি সৃষ্টি। এরই মাঝে গাড়িতে বেজে চলছে Pinkfloyd এর Stay গানটি

গ্লেসিয়ার্স মাউন্টেনগ্লেসিয়ার্স মাউন্টেন

Stay and help me to end the day
And if you don’t mind
We’ll break a bottle of wine
Stick around and maybe we’ll put one down
Because I wanna find what lies behind those eyes