"১৭৭৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই ঘরে একটি মাত্র জিনিসের পরিবর্তন ঘটেছে, বাকী সব একই আছে! সেটা কী বলতে পারো?" - দুষ্টু হেসে গমগমে কন্ঠে প্রশ্ন করলেন মার্কিন ট্যুর গাইড।

আদালত কক্ষের মতো এক সুবিশাল কামরা, চেয়ার-টেবিল-বইপত্র-পালকের কলম সবকিছুই জায়গামতো, শুধু মানুষগুলো যেন কর্মবিরতিতে গেছে, যে কোনো সময় জজ সাহেব এসে বসবেন এজলাসে। এর মাঝে কোন একটা মাত্র জিনিসের পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে গত ২৫০ বছরে?

Onu TareqOnu Tareq

গাইড সাহেবই উত্তর দিলেন, " মূল আসনের পিছনে ঝুলত ইংল্যান্ডের রাজা জর্জ দ্য থার্ডের প্রতীক, (যেটা গাইড হাতে করে এনে দেখাচ্ছেন), স্বাধীনতার ঘোষণার পর সেখানে ঝুলতে থাকলো স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের জনকদের নির্বাচিত করে দেওয়া প্রতীক!

বিকেল চারটায় আমরা পৌছালাম ফিলাডেলফিয়ায়, এই ইতিহাসমোড়া জমজমাট মহানগরীর নাম প্রথম শুনেছিলাম টম হ্যাঙ্কসের প্রথম অস্কার জয়ী চলচ্চিত্র 'ফিলাডেলফিয়া'র কল্যাণে ( তাঁর সাথে ছিলেন আন্তোনিও ব্যান্দেরাস), পরে আরো একাধিক সিনেমার নাম শুনেছি যেখানে এক নগরীর নাম আছে।

কিন্তু মার্কিনীদের কাছে এই নগরীর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত একটি দ্বীপ যে তাদের ভাগ্যের নিয়ন্তা হতে পারে না সেই বৈপ্লবিক ধারণা তাদের মনে আসন গেড়ে বসলেও তার শেষ ও চূড়ান্ত রূপরেখা হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সংবিধান রচনা হয়েছিল এখানেই। তাই আশরাফ ভাইয়া আমাদের নিয়ে এসেছেন মার্কিনমুলুকে যাত্রার।প্রারম্ভেই।

যে কোন বড় শহরেই প্রথম চিন্তা থাকে গাড়ী নিরাপদ জায়গায় পার্ক করা নিয়ে, সেই ঝামেলা চুকিয়ে প্রথমেই দেখতে গেলাম স্বাধীনতার ঘন্টা, Liberty Bell, কিংবদন্তী বলে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠের পরপরই এই ঘন্টাধ্বনির আওয়াজে দ্রোহের মন্ত্র ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা মহাদেশে ইংরেজ শাসন থেকে মুক্ত হবার। তবে ইতিহাস বলে এই ঘন্টা সেদিন বাজানো হয় নি, হয়েছিল ৮ জুলাই! কিন্তু নানা কারণে, গল্পে, প্রোপাগান্ডায় চালু হয়ে গেছে ৪ জুলাইয়ের কথা।

Independence National Historical Park এর The Liberty Bell Center এ এই ধ্বনিময় ইতিহাসের অবস্থান। কয়েকটা ছাদখোলা দেয়ালে দারুণ সব ম্যুরাল আঁকা, কালো মানুষের মুক্তির গানের সুর সেখানে বেশ সরব, এর মাঝে লাইন ধরে ঘন্টা দেখে সেই স্বাধীনতা ইতিহাসের সাক্ষী হতে।

Onu TareqOnu Tareq

মাঝারি আকারের ঘন্টা, মস্কোর জার ঘন্টার মতো সুবিশাল নয়, বেশ স্পষ্ট একটা ফাটল দেখা যাচ্ছে। ১৭৫২ সালে লন্ডনে তৈরী হয় ৯০০ কিলোগ্রামের এই ঘন্টা, এবং ফিলাডেলফিয়া আসার পরপরই সেখানে ফাটল দেখা দেয়, একাধিক বার মেরামতের পর এখন এই অবস্থায় এসেছে স্বাধীনতার এই প্রতীক। ডাকটিকেট, পোষ্টার, বই সবখানেই এর সরব উপস্থিতি।

ঘন্টা দেখার পর মূল আকর্ষণ Independence Hall দেখার জন্য টিকেট কাটতে যেয়ে মজার জিনিস জানা গেল, বিকেল ৫টা-৭টা এখানে টিকেট কাটতে হয় না! বিনামূল্যেই গাইডেড ট্যুর দিবে এখন শুধু ধৈর্য ধরে অপেক্ষার পালা-

Onu TareqOnu Tareq

ইনডিপেন্ডেস হল এর সামনে জর্জ ওয়াশিংটন এর প্রমাণ আকারের ভাস্কর্য, নিচে কোন পাথরে আব্রাহাম লিংকন দাঁড়িয়ে পতাকা উড়িয়েছিলেন, কোথায় জন এফ কেনেডি ভাষণ দিয়েছিলেন ইত্যাদি খোদাই করে লেখা।

বেশ দীর্ঘ লাইন দর্শকের, প্রতি দল ভিতরে যেয়ে ১০/১৫ মিনিট সময় পাচ্ছে। অবশেষে আমাদের পালা, দুইটি কক্ষ, প্রথমটির কথা তো শুরুতেই পড়লেন- কী দারুণ রোমাঞ্চকর এক জায়গা, যেন দেখতে পাচ্ছি জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসন, বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন, জন অ্যাডামস সদলবলে আলোচনা করে যাচ্ছেন মুক্তির মন্ত্রে উজ্জিবীত হয়ে, রচিত হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, চলছে বিট্রিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্ততি।

গাইড বলে যাচ্ছে সেই ঝঞ্জাময় সময়ের কথা, কেউই আসলে জানে না যে কী ঘটবে ভবিষ্যৎকালে, কিন্তু মুক্ত হতে চায় সবাই দূরদেশের শাসন থেকে, সাহসী পদক্ষেপ দিয়ে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অযুত অপরাধ, মানবতাবিরোধী ইতিহাসের সাথে তারা জড়িত, কিন্তু একটা দারুণ ব্যাপার কি লক্ষ্য করেছেন, প্রায় ২৫০ বছর আগে উপনিবেশ শাসন থেকে মুক্ত হবার সময়ই তারা ছিল বেশ শক্তিশালী একটা রাষ্ট্র, কিন্তু তারা সরাসরি কাউকে উপনিবেশ বানায় নি। বিশেষ করে গত ৬০ বছরে কত যুদ্ধ বাধালো তারা, কোন কোন দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে গুম খুন করে ফেলল, তাবেদার বানালো দেশে দেশে, কিন্তু হয়তো তাদের স্বাধীনতার নায়কদের কথা মনে রেখেই, অতীত ইতিহাসের কথা মনে রেখেই কোন ভূখন্ড দখল করে কলোনি বানায় নি তারা।