আমাদের প্রথম ভারত ভ্রমণের পিছনে সুপ্ত ইচ্ছাই ছিল সিমলা-মানালি যাব। কিন্তু কোন রকম পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া কি এতো বড় ও দীর্ঘ ভ্রমণ সম্ভব? না সম্ভব না কিছুতেই। কারণ কলকাতা পৌঁছেই আমরা জানতে পারলাম যে সিমলা-মানালি যেতে হলে আগে দিল্লি যেতে হবে, সেথায় থেকে তারপরে সিমলা-মানালি সেও আরও অন্তত ৭ দিনের ভ্রমণ!

তাই সেবার অনভিজ্ঞতা-অজ্ঞতা আর অপারগতা মিলমিশে টিকেট রাজধানী যোধপুর এক্সপ্রেস এর টিকেট কেটে আগ্রার পথে রওনা হলাম, কলকাতায় আমাদের বন্ধু বনে যাওয়া মানি এক্সচেঞ্জ আর টিকেট সরবরাহকারী দুই দাদার পরামর্শে।

ঠিক আছে এবার নাহয় প্রিয় তাজমহলকেই দেখে যাই, সেভাবেই রাত ১১:৩০ এর যোধপুর এক্সপ্রেসের স্লিপিং কামরায় উঠে পড়লাম (এই ট্রেন ভ্রমণের গল্পটা অন্য একদিন বলবো) এবং মেইল ট্রেনের স্বাভাবিক লেট মেনে নিয়েই পরদিন বিকেল ৪ টার পরিবর্তে রাত প্রায় ১০ টায় আগ্রা পৌঁছলাম।

যেহেতু একেবারে আনকোরা বিদেশ ভ্রমণ সেহেতু উত্তেজনা তুঙ্গে আর স্বাভাবিকতাকে অনেক আগেই অসাভাবিকতায় বিলিন করে দিয়েছি আর তারই ফলাফল সরূপ আমার মত “চাল্লু মালও!” মোস্তাকিম নামক অধিক চাল্লু আর ফক্কর বাজের জালে ধরা পরে গেলাম। আর এই ধরা খেয়ে যাবার রম্য অভিজ্ঞতাটাই এবারের গল্পের মূল বিষয় বস্তু।

তো এবার সেই প্রথম ও শেষ ধরা খাওয়ার গল্পটা বলি।

আগ্রা স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার সাথে-সাথেই কয়েকজন আমাদেরকে জেকে ধরলেন। এবং ধরলেন তো ধরলেন সুপার গ্লু লাগিয়ে লেপটেই রইলেন আর আমরাও পতিত হলাম তাদের একজনের কথা-বার্তা আর কিছু অভিজ্ঞতার বর্ণনার কাছে। মোস্তাকিম! আমার ভ্রমণ জীবনের একমাত্র দাগ বা ক্ষত, ভ্রমন ক্ষত মোস্তাকিম!

মোস্তাকিম নিজ থেকেই আমাদের আগ্রা ভ্রমণ-থাকা-খাওয়া-কোথায় কখন আর কিভাবে যাব সব দায়িত্ব নিয়ে নিল সেই রাতেই। সকালেই আগ্রার সেই সুন্দরী তাজের দর্শনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলে তার পছন্দের হোটেলে রাত্রি বাসের ব্যাবস্থা করে চলে গেল। আর সাথে নিয়ে গেল আগামীকালকের তাজমহল দর্শনের জন্য তার সাথে চুক্তিবদ্ধ নির্ধারিত পরিমাণ রুপী।

চুক্তিটা ছিল এমন... 
সাধারণত ভারতীয়দের তাজমহলে ভ্রমণের জন্য ১০০ রুপী লাগে আর বিদেশী হলে ৭৫০ রুপী! (তথ্য ২০১২) তো মোস্তাকিমের সাথে চুক্তি হল আমরা জন প্রতি ওকে ২০০ রুপী করে দেব, ও আমাদের ভারতীয় টিকেট এনে দেবে। আমরা তাজমহলের গেট দিয়ে প্রবেশের সময় যেন বলি কলতাকা থেকে এসেছি (শুধু মাত্র জিজ্ঞাসা করলেই) অন্যথায় কথা বলার দরকারই নাই, সোজা ও স্বাভাবিক ভাবে প্রবেশ করবো। আর মোস্তাকিম ও তার সহচরেরা গেটের পাশেই থাকবে ম্যানেজ করার জন্য (যদি কোন সমস্যা হয়)।

গেটের পাশেগেটের পাশে

তো আমরা ছয়জন দুই ভাগে ভাগ হয়ে দুটো সাধারন ভারতীয়দের লাইনে দাঁড়ালাম, সাত সকালেই অনেক-অনেক ভিড়, বেশ ধীরে-ধীরে এগুচ্ছি... সর্ব প্রথম আমি ধরা খাওয়া “এই চাল্লু মাল!” তারপরে “লাল মোহন, সাদাটা” এর পরে সেই “মগা ফরম ঢাকা!” যার কারনেই আমাদের সবারই নাম হয়ে গেল “মগা’স ফরম ঢাকা’স!” এর পর সেই বিখ্যাত লোক, আমাদের টিম লিডার যিনি সিমলায় গিয়ে বলেন “সিমলায় দেখার কি আছে...!!” এবং সব শেষে আমাদের “স্লাম ডগ বা বস্তির কুত্তা...!!!” যার ঢাকা শহরে একাধিক ফ্ল্যাট-প্লট ও অন্যান্য বহু সম্মত্তি থাকা সত্ত্বেও একটি, হ্যাঁ মাত্র একটি পরিত্যাক্ত জিন্স পরেই ঢাকা থেকে কলকাতা-দিল্লি-সিমলা-মানালি-দিল্লি-কলকাতা-ঢাকা দীর্ঘ ১২ দিনের ভ্রমণ শেষ করে এসেছিলেন! যে কারনেই তার মান দিয়েছি “স্লাম ডগ বা বস্তির কুত্তা...!!” আমরা দুই নামেই ডাকি!

মগা’স ফরম ঢাকা’সমগা’স ফরম ঢাকা’স

এবার আমাদের ঢোকার পালা আমাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করলোনা, কোন বাঁধা ছাড়াই ঢুঁকে গেলাম। এরপর লাল মোহন, সাদাটা! তাকে জিজ্ঞাসা করতেই কলকাতা বলাতে ছেড়ে দিল। দুইজনে ঢুকেই দূরে চলে গেলাম, এতটুকু দূরে যেন অন্যদের প্রবেশটাও দেখতে পাই আর কেউ যেন হারিয়ে না যাই।

এবার সেই মূল মগা দেহ তল্লাশি ও চেকারদের সামনে আসতেই এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন! অথচ তাকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসাই করেনি! কিন্তু তার চোখ-মুখের দিকে তাকালে যে কেউ সহজেই বুঝে ফেলবে যে “There is Something Wrong Definitely..!” এবং-এবং-এবং...... স্বাভাবিক ও সাধারন তল্লাশির প্রাক্কালে তিনি ভঁয়ে ও আতঙ্কে মানসিক ভাবে দুর্বল হতে হতে বিমর্ষ হয়ে পড়লেন! 

এরপর তাকে স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞাসা করা হল “কাহা ছে আয়া?” এই কথা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি অন্য লাইনে দাঁড়ানো তার সহযাত্রীর দিকে তাকিয়ে ডাকতে শুরু করলেন...!

এরপর যা হবার তাই-ই হল, ওনাকে ধরে ফেললেন এবং অন্য লাইনে যারা দাঁড়ানো ছিল তাদেরকেও একে-একে ধরে লাইনের বাইরে বের করে দিল! আর আমরা যে দুজন ইতিমধ্যেই প্রবেশ করে ফেলেছি তারা এই অবস্থা দেখে আমাদেরকেও ধরে ফেলার শঙ্কায় তাজের ভিতরে ঢুঁকে গেলাম।

এই রম্যের শেষ এখানেই নয় আরও আছে... আর সেটা হল...... এরপর আমরা দুইজন আমাদের মত করে তাজের রূপ-রস-গন্ধ শুষে নিচ্ছি আবেগে-আবেশে আবরিত হয়ে তাজের রঙ-বেরঙের রেণুতে আর আহ্লাদিত হচ্ছিলাম তার আভায়। আর ধরেই নিয়েছিলাম যে আজ আর ওদের সাথে দেখা হবেনা, যাক হোটেলে গিয়েই না হয় দেখা হবে, তেমন ক্ষতিতো আর নেই।

তাজের রঙ-বেরঙের রেণুতে আর আহ্লাদিত হচ্ছিলামতাজের রঙ-বেরঙের রেণুতে আর আহ্লাদিত হচ্ছিলাম

এভাবে ঘুরতে-ঘুরতে বাম পাশ থেকে দেখতে-দেখতে তাজের মাঝে গিয়ে যেইনা পৌঁছেছি ওমনি ভূত দ্যাখার মত করে চমকে উঠলাম! কেন? কারণ, এযে দেখছি আমাদের হারিয়ে যাওয়া সঙ্গী-সাথীরা! বেশ ভালোই তো, আবার দেখা হল, রাত পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে হলনা।

কিন্তু একই তোদের পায়ে এসব কি মামা? এবার সেই আসল মগা সগর্বে ঘোষণা করলো বা জানালো যে তারা তো এখন ফরেনার! (বিদেশী বলার চেয়ে ফরেনার বলতেই বেশী আরাম হল!) তারা আমাদের মত চুরি করা লোকাল না! তারা সবাই ফরেন কোটায় ৭৫০ রুপী দিয়ে তাজমহলে প্রবেশ করেছে তাই এই অতিরিক্ত সন্মান! উহহহহহহ তাই না! তোমরা সব ৭৫০ রুপী দিয়ে ফরেনার হইছো আর তাই তোমাগো পায় এই পলিথিন বাইন্ধা দিছে!

সাজানো বাগানসাজানো বাগান

আসল ঘটনা হল তাজমহলে দেশীয় বা ভারতীয় যারা তাদের মূল বেদীতে উঠতে হয় পায়ের স্যান্ডেল বা জুতো খুলে কিন্তু বিদেশীদের ক্ষেত্রে সম্মান জানানোর নিমিত্তে জুতা না খুলে বরং দুই পায়ে দুটি পলিথিনের ব্যাগ বা ওই জাতীয় কিছু পরিয়ে দেয়া হয়, যেন জুতোর ময়লা মূল তাজের বেদীতে লেগে নোংরা না হয়।

তাই ওনারা, মানে আমাদের মামারা যেহেতু ৭৫০ রুপীর ফরেনার! সেহেতু ওনারাও এই সন্মানের অন্তর্ভুক্ত! স্বাভাবিক ভাবেই। আর এই কথা শোনা এবং বোঝা মাত্র আমার সাথের লোকাল সঙ্গী! ওদের থেকে আলাদা হয়ে যেতে চাইলো? ওদের সাথে একসাথে আর থাকবেনা বা হাটবেনা! কেন, কারণ কি?

কারণ ওর ধারনা ওকে এবং আমাকে যদি এই ফরেনারদের(!) সাথে দ্যাখে তো আমাদেরও ধরে ফেলবে! এবং ৭৫০ রুপী নেবে তো নেবেই উপরন্তু আরও পুলিশ-টুলিশের ঝামেলাও পোহাতে হতে পারে। সেই সঙ্কায় ও আর ফরেনারদের সাথে একসাথে ঘুরবেনা! কিন্তু অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে ওকে রাজী করানো হল যে এরপরেও যদি আমাদের দুইজনের ৭৫০ রুপী করে দিতে হয় তো সেটা ওরাই দিবে বা ওদের খরচের খাতায় উঠবে! আমাদের খরচ হিসেবে ওই ২০০ রুপী-ই ধরা হবে! এই বার সে আশ্বস্ত হয়ে একত্রিত হল।

তাই সেই তখনই সবাই একত্রিত হয়ে নিজেরাই নিজেদের এই নির্বুদ্ধিতা-অস্বাভাবিকতা-নার্ভাসনেস ও বোকা হয়ে পাকড়াও হবার কারণে সেবারের মত টিমের নাম দিয়ে ছিলাম....

“মগা’স ফরম ঢাকা’স!” বা “ঢাকার মগারা!”