২৫.০৯.২০১৭

রাত ১০:৩০

হোটেল সিংগে

থিম্পু, ভুটান

একটা সময় প্রচুর ডায়রি লিখতাম। সেই অভ্যেস বহু আগেই পটল তুলেছে। শেষ ডায়রি লিখেছি সেও তো প্রায় বছর দশেক হয়ে গেল। অনেকদিন পর ডায়রি লিখতে বসে তাই কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি। লিখতে সবসময়ই ভাল লাগে। গত ১০ বছরে কত কিছুই না বদলে গেছে। বদলে গেছে রুচি, বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে মানসিকতা। সময়ের চোরাস্রোতে ভাসতে ভাসতে নিজেকে ভেঙে আবার গড়েছি। ১০ বছর আগের আমার সাথে বর্তমান আমার তাই আকাশ পাতাল পার্থক্য। তবে দুটো ব্যাপার এখনও বদলায়নি। বই পড়ার তীব্র নেশা এবং পৃথিবী ঘুরে দেখার মাত্রাতিরিক্ত আকাঙ্খা। সেই আকাঙ্খার টানেই ভুটান ঘুরতে আসা।

অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম আবারও ডায়রি লেখা শুরু করব। কেন জানি হয়ে উঠছিল না। আমাদের বাঙালিদের এই এক সমস্যা। আমরা প্রচুর পরিকল্পনা করি, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় এলেই পিছুটান দেই। কার সাধ্যি সেই পিছুটান ঠেকায়? এবারের ভুটান ভ্রমণ এই কারণেই আমার কাছে বেশি কিছু। অন্তত এর উসিলায় তো ডায়রি লেখা আবারও শুরু করতে পারলাম। আশা করছি কলম এখন থেকে নিয়মিতই চলবে। যদিও কলম না বলে কি-বোর্ড বলাই মনে হয় ভাল। কম্পিউটারে লিখতে লিখতে এমন অবস্থা হয়েছে যে হাতে লেখার অভ্যেসটাই মরে গেছে। লেখাগুলোও জঘন্য লাগছে দেখতে। আমার মায়ের ভাষায় অক্ষরগুলো “কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং” এর মত দেখাচ্ছে। ভাবা যায়, এই আমি ছোটবেলায় কি না সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতায় পুরষ্কার জিতেছিলাম! কি নিদারুণ অধঃপতন। যাই হোক, লিখতে পারছি এই তো বেশি।

ভুটান যাত্রা আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা নয়। গত দু’বছরে ভারতের দার্জিলিং এবং শিলং ঘুরে এসেছি। দার্জিলিং ভ্রমণ নিয়ে তো এই বছরের অমর একুশে বইমেলায় “আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিনি” নামে জম্পেশ এক বই লিখে প্রকাশও করা হয়ে গেছে। যদিও বইয়ের কাটতি একদমই ভাল নয়। বাঙালি বই পড়তে ভালবাসে কিন্তু কিনতে নয়। পাঠককে এককভাবে দোষ দিয়েই বা কি লাভ। কাগজ এবং প্রকাশনা সামগ্রীর ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি প্রকাশককে ঝানু ব্যবসায়িতে পরিণত করেছে। আজকালকার যুগে ই-বুক সহজলভ্য হওয়ায় তো পোয়াবোর। বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না জাতীয় প্রবাদ তাই বর্তমানে অচল। আমরা যারা প্লেটোনিক যুগে পড়ে আছি তাঁদের ব্যাপার অবশ্য আলাদা। আমরা বই কিনেছিলাম, এখনও কিনছি, ভবিষ্যতেও কিনতে থাকব এবং প্রিয়জনদের উপহার দিয়ে যাব। কেন জানি ই-বুক পড়তে আমার ভাল লাগে না। বিছানায় আধশোয়া হয়ে পাতা উল্টিয়ে বই পড়ার যে আনন্দ সে কি আর ই-বুকে পাওয়া যায়?

ভুটান যাত্রায় ফিরে আসি। ভুটান সম্ভবত একমাত্র দেশ যারা চায় না তাদের দেশে অধিক পর্যটক ভ্রমণ করুক। উত্তর কোরিয়াকে হিসাবের বাইরে রাখছি কারণ সেখানকার শাসক একটা মাথাপাগলা ছাড়া আর কিছুই না। ঠিক যেন আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যমজ ভাই। দু’জন কেবল দুই দেশে জন্মেছে এই যা। আশির দশকের বাংলা সিনেমার কাহিনীর মত সাজানো গেলে বলতে হয়, দু’জন মেলায় বাবা-মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। একজন গেছে আমেরিকায়, আরেকজন উত্তর কোরিয়ায়। এই যাহ, আবারও ফালতু প্যাচাল শুরু করলাম। যা লিখছিলাম, ভুটানের অর্থ উপার্জনের একটা বড় মাধ্যম পর্যটন হওয়া সত্ত্বেও ভুটান পর্যটনকে এতটা গুরুত্ব দেয় না যতটা না পার্শ্ববর্তী নেপাল দিয়ে থাকে। এর কারণ ভুটানবাসীর ধারণা তাঁদের দেশে অধিক হারে পর্যটকের আগমন ঘটলে দেশের সৌন্দর্যের বারোটা বাজবে (ধারণা মিথ্যে নয়)। সেই জন্য কঠিন এক নিয়ম করে রেখেছে ভুটানের সরকার। বিদেশী যেই ভুটানে ঘুরতে আসবে, প্রতিদিন ২৫০ ডলার করে ফি দিতে হবে সরকারকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই ফি থাকা-খাওয়া এবং অন্যান্য খরচের বাইরে দিতে হবে। শুধু তাই নয়, কোন পর্যটক নিজে থেকে ভুটানে ঘুরতে আসতে পারবেন না। অবশ্যই ভুটানের কোন ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে ভিসা করিয়ে আসতে হবে।

খুশির ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত আর মালদ্বীপের লোকজনের এই ভিসা ফি দিতে হয় না। উপরন্তু অন এরাইভাল ভিসাও মিলে। এমনকি ট্যুর অপারেটর ভাড়া করার ঝামেলাও মাথায় নিতে হয় না। এই সুযোগ হারানো সমীচীন হবে না ভেবেই সেপ্টেম্বর মাসের এক রৌদ্রজ্জ্বল সকালে বাক্সপেটরা নিয়ে হাজির হলাম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিমানে আগেও ভ্রমণ করেছি কিন্তু সেটা দেশের ভিতরে। দেশের বাইরে বিমান ভ্রমণ এই প্রথম। ভ্রমণসঙ্গী হিসাবে আছে পুরাতন পাপী অনিন্দ্য আর নতুন পাপী অনিন্দ্যর বন্ধু পিটার। অনিন্দ্যর ভাষ্যমতে পিটার জমিদারের সন্তান। তাই সাবধানে কথা বলতে হবে ওর সাথে। আমার অবশ্য পিটারকে মন্দ লাগে নি। এত নিষ্পাপ হাসি যেই ছেলের মুখে সে সিরিয়াল কিলার হতে পারে, কিন্তু খারাপ হতে পারে না। দুজনের কাছে দুটো DSLR ক্যামেরা। ভালই হয়েছে, ছবি তোলা নিয়ে আর টেনশন নাই। ওরা ছবি তুলবে আর আমি প্রাণভরে শুধু দেখব।

যাত্রা শুরুর আগের রাতে ব্যাগ গোছানো চলছেযাত্রা শুরুর আগের রাতে ব্যাগ গোছানো চলছে

 

আমি আর অনিন্দ্য একসাথে এসেছিলাম। পিটার আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। তিনজন মিলে ছুটলাম দ্রুক এয়ারের (ভুটানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা) কাউন্টারে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করার জন্য। মোটাসোটা আন্টি টাইপের এক বাংলাদেশী মহিলা বোর্ডিং পাস ইস্যু করছিলেন। আমাদের তিনজনেরই সাধারণ দাবী ছিল যেন জানালার পাশের আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়। আবদার শুনে ভদ্রমহিলা এমনভাবে তাকাচ্ছিলেন মনে হচ্ছিল যেন আমরা উনার কিডনি দাবী করছি। শেষ পর্যন্ত দিলেন কিন্ত পরোক্ষভাবে কথা শুনাতে ছাড়লেন না। আমাদেরকে শুনিয়েই পাশের কাউন্টারে ভদ্রলোককে বললেন, “ধামরা পোলাপাইন বাচ্চাদের মত জানালার পাশে টিকেট চায়।“ অনিন্দ্য আর আমি একে অন্যের দিকে তাকালাম। “ভাই, অফিসের আপুরা এখনও বলে আমারে নাকি ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের পোলাপাইনের মত লাগে আর এই মহিলা কি না কয় আমরা ধামরা। সহ্য হইতাসে না কিন্তু”; অনিন্দ্যর এমন তেজোদ্দীপ্ত বয়ানের পরও ওকে চুপ থাকতে ইশারা করে থ্রি ইডিয়টস এর আমির খানের মত ডায়লগ মারলাম, “ব্যাপার না, ইগনোর কর।“

ইমিগ্রেশন পার হয়ে দ্রুক এয়ারের ওয়েটিং লাউঞ্জইমিগ্রেশন পার হয়ে দ্রুক এয়ারের ওয়েটিং লাউঞ্জ

 

ইমিগ্রেশন পার হয়ে দ্রুক এয়ারের ওয়েটিং লাউঞ্জে চলে আসলাম। কাঁচের এপাশ থেকে ওপাশের বিমানটা সূর্যকিরণে চকচক করছে।

কাঁচের জানালা দিয়ে দেখা দ্রুক এয়ারের বিমানকাঁচের জানালা দিয়ে দেখা দ্রুক এয়ারের বিমান

 

অনিন্দ্য বলে উঠল এমন সময়,

“ভাই, আমি আমাদের দলের একটা নাম ঠিক করেছি। আপনাদের মতামত চাই।“

“বলে ফেল।“

“Team Dragon Hunter.”

“ড্রাগন শিকারি। চমৎকার নাম। তাহলে আমরা যাচ্ছি ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের দেশে। ড্রাগন না পেলেও দুই একটা ড্রাগনের বাচ্চা পাওয়া গেলে অবশ্য মন্দ হবে না।“

...... চলবে

Team Dragon Hunter এর সদস্যবৃন্দ। বাম থেকে অনিন্দ্য, পিটার এবং অধম লেখকTeam Dragon Hunter এর সদস্যবৃন্দ। বাম থেকে অনিন্দ্য, পিটার এবং অধম লেখক