বাসের অন্য যাত্রীরা আমাকে কৌতুহল ভরে দেখছে। দেখবেই না কেন ? আমাকে বাসে উঠিয়ে দিতে একদল তরুণ ছেলেমেয়ে এসেছে সাথে। তার সবাই আমার সাথেই বাসের ভেতরে। সবাই শুভকামনা জানিয়ে চলে গেলো। বাসের আর কেউ জানতে বাকি রইল না আমার কলকাতা যাত্রার উদ্দেশ্য। এখন সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলাম । একেক জনের একেক রকম মন্তব্য। কেউ বাহাবা দিচ্ছে আবার কেউ নিছক পাগলামী বলছে। কেউ আবার ভয়ও দেখাচ্ছে। এতটা পথ একা হাঁটা কিভাবে সম্ভব ? তাদের মধ্যে নানান প্রশ্ন খেলা করছে। তবে সবাই আমাকে অন্য রকম মূল্যায়ন করছে। যা আমাকে উৎসাহ জুগাচ্ছে। 
১০ তারিখ সকালে আমাদের নিয়ে গাড়ি ছুটে চলছে কোলকাতা প্রেসক্লাবের উদ্দেশ্যে। টি.কে.সেনগুপ্ত কমলেশ সেনকে বললেন, ছেলেটিকে একটু ঠাকুরের প্রসাদ খাওয়ে আনতে পারতে। এতো বড় একটি কাজ করবে। ঠাকুরের আশির্বাদ থাকতো। তার ব্যাগ থেকে এক কৌটা বের করে, এই নাও, কপালে চন্দনের ফোটা লাগিয়ে নাও। আমি কপালে চন্দনের ফোটা লাগিয়ে নিলাম। চন্দনের ফোটা লাগিয়ে নিজেকে সন্যাসী সন্যাসী লাগছে। যদিও আয়না না থাকাতে নিজের মুখ খানা দেখতে পারলাম না। 

পায়ে হেঁটে কোলকাতা থেকে ঢাকাপায়ে হেঁটে কোলকাতা থেকে ঢাকা


দেখতে দেখতে চলে এলাম কোলকাতা প্রেসক্লাব। সবুজ ছায়া ঘেরা ক্লাবচত্ত্বর। রোদ উঠবে উঠবে কওে অলসতার কারণে হয়তো উঠছে না। হল আগে থেকে বুকিং না দেয়ার কারণে ক্লাবের ভেতরে জায়গা হলো না আমাদের। তাই প্রেসক্লাবের বাইরে সবুজ ঘাসের মাঠেই ব্যানার টাঙিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে হলো। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ থেকে দ্যা ডেইলী স্টার পত্রিকার ম্যানেজিং ডিরেক্টও ড. সালাউদ্দিন, সভাপতিত্ব করেন টি.কে. সেনগুপ্ত। আরো উপস্থিত ছিলেন মিতালী ইন্দো-বাংলা কালচারাল সোসাইটির জয়েন সেক্রেটারী কমলেশ সেনগুপ্ত, গণমাধ্যম কর্মীসহ অনেকেই। সংবাদ সম্মেলন শেষে সাড়ে এগারোটার সময় আমার আনুষ্ঠানিক পদযাত্রা শুরু হলো। মনে হলো যুদ্ধে আছি। পেছনে ফেরার পথ নেই। সামনেই এগিয়ে যেতে হবে। তবে নিজের প্রতি বিশ্বাস আছে। আমি পারবই। 

পায়ে হেঁটে কোলকাতা থেকে ঢাকাপায়ে হেঁটে কোলকাতা থেকে ঢাকা


হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। এখনো নির্দ্দিষ্ট জায়গায় পৌছাই নাই। প্রথম দিন তাই শরীরটা একটু খারাপ হয়ে আসছে। পা টাও ব্যাথা করছে। হয়তো পায়ে বেশ কয়েকটা ফুসকাও পরেছে। একসময় মাইকের শব্দ শুনতে পেলাম। সেই মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের তরুণ ছাকিল (শাকিল) ভাই কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের মাঝে উপস্থিত হবেন.. .. .. .. ..। মাইকের আওয়াজে ভালো লাগতে শুরু করলো। কারণ ভাবলাম এইতো চলে এসেছি। আজকের মতো হাঁটা শেষ। কিন্তু হাঁটছি তো হাঁটছি। রাস্তুা শেষ হয়না। শুধু মাইকের শব্দই শুনছি। বারাসাত পৌছালাম সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময়। চৌরাস্তার মোড়ে মঞ্চ করা হয়েছে। হাজারো মানুষের ঢল। সেই মানুষের ভেতর দিয়ে আমাকে নিয়ে মঞ্চে গেলেন। আমি আনন্দে ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমি কল্পনাতেও কোনদিন ভাবিনি। তারা আমাকে এতো ভালোবাসবে। আমার চোখের কোণে অজান্তেই জল চলে এলো। আমি শুধু তাকিয়ে দেখছি। সারাদিন হাঁটার পর যে ক্লান্তি ছিলো এবং যে কষ্ট হয়েছিলো তা নিমিষেই চলে গেলো। এই এতো বড় সংবর্ধনার আয়োজন করেছে “ইচ্ছে হ’ল” নামক একটি সংগঠন। প্রথমে ভয়ে হাত-পা কাঁপছিলো। শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিলো। বুকের ভেতর উচ্চস্বরে ভয়াক ঘন্টা বাজছিলো। মনে হচ্ছিলো বুকের শব্দটা মঞ্চের সামনে বসা মানুষগুলো শুনতে পাচ্ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কি বলবো? কথাগুলো সব হারিয়ে ফেলেছি। তবে যখন নিজেকে বুঝাতে পারলাম যে, আমিই বাংলাদেশ। আমিই ষোল কোটি মানুষের ডাকনাম। আমিই দেশের প্রতিনিধি। আমার মাথায় লাল-সবুজের পতাকা। আমার কিসের ভয়? শরীরের ভেতর একটি তেজ আগ্নেয়গিরীর লাভার ন্যায় জ্বলতে শুরু করলো। সবাই ক্লাশের প্রথম সারিতে বসা বাধ্য ছাত্রের মতো আমার কথাগুলো শুনছিলো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা পাশ্চিম বঙ্গের রেড ক্রিসেন্ট এর প্রেসিডেন্ট আমর পিঠ চাপড়িয়ে বললেন- খুব ভালো বলেছো। এই বয়েসে সাহস করে এতো বড় কাজ করছো এবং তরুণদের উৎসাহিত করছো তাতে আমার মতো ঘরকুনো মানুষদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে এখনো আমরা অনেক কিছুর স্বাদ না নিয়েই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। মনে হচ্ছে এখন আবার নতুন করে শুরু করি। তোমকে দেখে আমি নিজেই উৎসাহিত বোধ করছি। আমি বিশ্বাস করি তরুণ প্রজন্মও উৎসাহিত হবে। 
একটি চায়ের দোকানে বসেছি। ভিড় ঠেলে কেউ একজন একটি পত্রিকা হাতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমার সাথে পত্রিকায় ছাপা আমার ছবির সাথে মিলিয়ে, একদম মিলে গেছে। মনে হলো তিনি শব্দজট খেলায় জয়ী হলেন। এমন আনন্দ পেলেন। তিনি বললেন, দাদা সকালে যখন এই খবরটি পরছিলাম তখন মনে হলো তোমাকে যদি একবার দেখতে পারতাম। এখন তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগছে। ভগবান আমার মনের আশা পূরণ করেছেন। এখানে যত টাকা বিল হয় সব আমি দেবো। কথাগুলো বলে উঠে চলে গেলেন। কিছু বলে গেলেন না। আমি মনেমনে ভাবলাম আজব মানুষ তো! এই মাত্র বললেন সব বিল তিনি দেবেন আর এখন না বলে কোথায় যেনো হারিয়ে গেলেন। কয়েক মিনিট পর তিনি আবার এলেন। এক হাতে কাটা ডাব আর এক হাতে একটা মিষ্টি। দাদা রোদের মধ্যে হাঁটছো, এই ডাবের পানি খেয়ে নাও ভালো লাগবে। আর এই মিষ্টি পুরোটা খাবে। দত্তপুকুরের সেরা মিষ্টি। আমাদের চায়ের দোকানের বিলটা তিনিই দিয়েছেন। 
যশোর রোড ধরে হাঁটছি। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় গাছ কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কত রকমের স্মৃতি তাদের জীবনে। যদি মানুষের মতো কথা বলতে পারতো! হয়তো তাদেরও কথা বলার ভাষা আছে। তারাও বলে সুখ-দুঃখ, অভিযোগের কথা। শুধু আমরা সে কথা শুনতে পাই না। বুঝতে চাই না। দিনের পর দিন কালো পিচঢালা পথিক চলা রাস্তা ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখছে। ক্লান্ত পথিককে বিশ্রাম দিচ্ছে। আমি আজ এই পথ ধরে হাঁটছি। আমার পায়ের চিহ্ন থেকে যাবে এই পথের বুকে। কতো রকমের পায়ের ছাপ এই পথ পুষে রাখছে। কতো পায়ে ছাপ পরবে এই পথে কেউ বলতে পারবে না। 

পায়ে হেঁটে কোলকাতা থেকে ঢাকাপায়ে হেঁটে কোলকাতা থেকে ঢাকা


হাঁটা থামিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার যখন হাঁটা শুরু করি তখন বুঝতে পারি যে শরীরের কোথায় কোথায় কি পরিমাণ ব্যাথা হয়েছে। আর পায়ের কথা কি বলবো, ফুসকা পরছে আবার সাথে সাথে সেগুলো ফেটে যাচ্ছে। যার ফলে সেগুলোর যন্ত্রণায় ভালো ভাবে হাঁটতেও পারছি না। সাথে ইচ্ছে হ’লো এর গাড়ি আছে, পুলিশের গাড়ি আছে। আমার সাথের মানুষগুলো কিছু সময় গাড়িতে, কিছু সময় হেঁটে আমাকে সঙ্গ দিচ্ছে। কখনো আমাকে একা রাখছে না। সাথে গাড়ি থাকা সত্ত্বেও আমার কাঁধে প্রায় পনের ষোল কেজি ওজনের রুকস্যাক। এর ভেতরেই আমার সকল প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এই রুকস্যাকটি কখনো গাড়িতে দেইনি। প্রথমে বেশ কষ্ট হয়েছে। পরে তা শরীরের সাথে মানিয়ে গেছে।  
“দেবদাস চায়ের দোকান”। মনে পরে গেলো শরৎচন্দ্রের দেবুদাকে “দেবদাসের আপাত-বৈরাগ্য দেখিয়া এবং কথাবার্তা শুনিয়া তাহার (পার্বতীর) চোখে জল আসিতেছিলো, কহিল, দেবদা, আমিও যাবো। কোথায় ? আমার সঙ্গে? দূর তা কি হয়? নিজের ভেতরে আর হাসিটা আটকিয়ে রাখতে পারলাম না। তবে হাসিটা নিজের মধ্যেই রাখলাম। হাসির কারণটা হলো, আমিও আজ বৈরাগ্য হয়েই পথে নেমেছি। দোকানদার আমাদের চা দিলেন। চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা, পার্বতী আছে তো? পান খাওয়া লাল মুখে মুচকি হাসি দিয়ে আর একটা পান মুখে গুঁজলেন। 
সাইরেন বাজিয়ে অনেকগুলো গাড়ী আসছে দেখে আমরা রাস্তার পাশে দাঁড়ালাম। কয়েকটি পুলিশের গাড়ি, প্রাইভেট গাড়ি। আমাদের দেখে গাড়িগুলো থামলো। কমলেশ সেন আমাকে একটি গাড়ির কাছে নিয়ে গেলেন। কাছে গিয়ে দেখি গাড়ির ভেতরে মুখ্যমন্ত্রি মমতা ব্যনার্জি। আমার চোখ তো কপালে। গাড়ির গ্লাস নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম যেনো কি? আমি বললাম, ইকরামুল হাসান শাকিল, ম্যাম। তিনি বললেন, এএনআই এর নিউজে দেখেছি তোমাকে। বাহ্! কি সাহস তোমার! ভালো থেকো। 

পায়ে হেঁটে কোলকাতা থেকে ঢাকাপায়ে হেঁটে কোলকাতা থেকে ঢাকা


বিকেল ৫.৩০মি. এর সময় আমরা পেট্্রাপোল পৌছালাম। আমাকে সোজা ইমিগ্রেশন অফিসার বিদাত্মা দত্ত’র রুমে নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনি আমাকে স্বাগত জানালেন। তারপর তিনি সহ আমরা সবাই নো-ম্যানস ল্যান্ডে এলাম। যশোর প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে আমাকে সংবর্ধনা জানান বেনাপোল প্রেসক্লাবের সভাপতি মহসিন মিলন, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতির নেতা সাজেদুর রহমানসহ আরো অনেকে। 
অনেক কথাই হলো। এখন আমার কোলকাতা থেকে ঢাকা এই দীর্ঘ পথ হাঁটার আসল উদ্দেশ্যটা বলি। হয়তো ভাবতে পারেন শুরুতে না বলে এখন বলছি কেন? ভেবেছিলাম একটু কৌতুহল নিয়েই পড়–ন। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি স্বাধীনতা। পেয়েছি একটি লাল-সবুজের পতাকা, পেয়েছি একটি মানচিত্র। এই দেশের জন্য মায়ের বুক খালি হয়েছে, বোন ভাই হারিয়েছে, পিতা হারিয়েছে সন্তান, সন্তান হারিয়েছে পিতা, স্ত্রী হারিয়েছে স্বামী। এই দেশেরে জন্যই ঘর ছেড়ে যুদ্ধে গিয়েছে বাংলা মায়ের সন্তানেরা। কেউ বিজয়ী পতাকা হতে ফিরে এসেছে, কেউ আবার আসেনি। হারিয়ে গেছে চিরদিনের জন্য। তারা যুদ্ধ সময়ে দেশেরে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পায়ে হেঁটে গিয়েছে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে। তারা জীবন দিয়েছে, জীবনের কঠিন ত্যাগ স্বীকার করেছে দেশকে ভালোবেসে। 
আজ আমরা তরুণ প্রজন্ম ২০১৩ সালে এসে দেখছি সেই রক্তে কেনা বাংলাদেশ। ৭১ কেমন ছিলো বাংলাদেশের আমরা জানি না। সেই হিং¯্রতা আমরা দেখিনি। সেই রক্তাত্ব শকুন উড়া লাশের গন্ধযুক্ত দেশ দেখিনি। শুধু বছরে কয়েকটি দিবসে বন্দি বাংলাদেশকে আমরা দেখি। সেই সব দিবস পালন করতে হয় তাই পালন করি। দেশের জন্য যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে তাদের আমরা কতটা মনে রাখতে পারছি? যারা আজও বেঁচে আছে তাদের কেমন দিন কাটছে সেই খবর আমরা কতটা রাখছি? এসব আমার মনে বেশ নাড়া দিতো। তাই সেইসব মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমার এই পদযাত্রা। এর ফলে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলতে পারবো। তাদের মুখে শুনতে পারবো যুদ্ধের সেই ভয়াল কাহিনী। যা আমাকে অনুপ্রাণিত করবে এবং সঠিক ইতিহাস জানতে আমাকে সহায়তা করবে। আরো একটি উদ্দেশ্য ছিলো। তা হলো, মাদক মুক্ত তরুণসমাজ। আমি চাই আমাকে দেখে তরুণ সমাজ মাদক ছেড়ে সুন্দর জীবনে ফিরে আসুক। তাই “মাদক ছেড়ে নিয়মিত হাঁটুন, ভাষা আন্দোলনের চেতনায় দেশ গরবো আমরা তরুণ” এই শ্লোগানে আমার এই পদযাত্রা।
একটি চায়ের দোকানে অনেক মানুষ বসা। সেখান থেকে কেউ একজন আমাকে ডাকলো। আমি কাছে গেলাম। সবাই হা করে তাকিয়ে আমাকে দেখছে। মনে হচ্ছে এরকম প্রাণী তারা আগে কখনো দেখেনি। একজন আমাকে বললেন, ভাতিজা, তুমি কি কানা? আমি বললাম, না, আমি অন্ধ না। তিনি বললেন, তাইলে এই লাঠি নিয়ে হাঁটছো ক্যানো? আর কানারা তো শাদা লাঠি ব্যবহার করে। 
পায়ের অবস্থা খুবই খারাপ। ফুসকা পরে ঘাঁ হয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে খুব কষ্ট হয়। একটি স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খুব আগ্রহ নিয়ে আমাকে দেখছে। আবার আমাকে দেখে অনেকে মুখ লুকিয়ে লুকিয়ে হাসছে। একটা ছোট মেয়ে কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, তোমার পাও বিষ করে না? আমি বললাম, হুম, করে। দেখবে আমার পায়ের কি অবস্থা? সে দেখতে চাইলো। আমিও আগ্রহ নিয়ে জুতা খুলে দেখালাম। আমার পায়ের অবস্থা দেখে সবাই অবাক হলো। তাদের প্রশ্ন ছিলো, পায়ে এত ফুসকা নিয়ে আমি হাটি কি ভাবে? 
সকালের খাবার না খেয়েই রওনা হয়েছি। তবে রওনা দেয়ার সময় ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার চা পানের নিমন্ত্রণ করলে না করিনি। ভদ্রলোক রাতের খাবার খাওয়ানোর কোন আগ্রহই দেখাননি। তাই রাতে আমিও তার সাথে তেমন ভাব করিনি। এখন যেহেতু চা পানের অফার করছেন তাই একটু যাবার বেলায় ভাব করে যাই। দোকানদার খুব আয়েশি ভাবে পা’দুটো ভাঁজ করে বসে চা বানাচ্ছে আর আড়চোখে আমাকে দেখছেন। বুঝতে পারলাম না তিনি ওভাবে দেখে আমাকে নিয়ে কি ভাবছেন। তবে এটুকু বুঝতে পারলাম, দোকানদারির সাথে সাথে সারাদিন তিনি পান মুখে তৃণভোজীর মতো জাবর কাটেন। পানখাওয়া লাল মুখে তিনি ভালো হেসে হেসে কথা বললেন। তবে যে পরিমাণ পানের রস আমাদের চায়ের কাপে এসে পড়ছে তাতে পানের কিছুটা পুষ্টি গুনাগুন চায়ের সাথে ফ্রি পেয়ে গেলাম। 
বৃষ্টি হবে হবে করে হচ্ছে না। মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি চলছে। এটা অবশ্য আমার জন্য ভালো। বেশি রোদে হাটতে কষ্ট হয় আবার বৃষ্টি হলে তো হাটাই মুসকিল হবে। নড়াইল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে আমাকে সংবর্ধনা জানান। শুরুতেই গণজাগরন মঞ্চের কর্মীরা মশাল মিছিলে নড়াইল শহর প্রদক্ষীণ করে। মিছিলের প্রথম সারিতে মশাল মিছিলে অংশগ্রহণ করি। খুব কাছ থেকে দেখছি সকল শ্রেণীর মানুষগুলো দেশের স্বার্থে কতটা একাগ্র। আজ আমিও তাদের একজন। যুদ্ধ দেখিনি। তবে মনে হলো আমিও আজ যুদ্ধে আছি। রক্তের মধ্যে কেমন যেনো একটা অনুভ’তি খেলা করছে। এখানে না এলে মনে হয় না, কখনো দেশকে এতটা অনুভব করতে পারতাম।
এগারো দিনের দীর্ঘ পথে পদচিহ্ন রেখে ফেব্রুয়ারীর ২০ তারিখ ঢাকায় এসে পৌছাই। শাহবাগ এসে আমার পদযাত্র শেষ হয়। এখানে পদাতিক বাংলাদেশ, আনন্দবিনোদন ও গণজাগরণ মঞ্চ সংবর্ধনা দেয়। বিশ্বাস হচ্ছিলো না। আমি কি সত্যিই কোলকাতা থেকে হেঁটে এসেছি? হ্যা, সত্যি! আনন্দে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। জানি না এভারেস্ট আরোহণের পর কেমন লাগে। তবে এটা বুঝতে পারছিলাম। এভারেস্ট জয়ের অনুভূতির থেকে কম ছিলো না। এখন অপেক্ষায় আছি সেই স্বপ্নের এভারেস্টসহ চৌদ্দটি আট হাজার মিটারের পর্বত আরোহণের স্বাদ নেয়ার।