একাকী ভ্রমণের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। আমেরিকান দার্শনিক ও কবি হেনরি ডেভিড থোরাও বলেছিলেন, “যে মানুষ একাকী যাবেন, তিনি আজই যাত্রা শুরু করতে পারেন। আর যিনি অন্য কারো সঙ্গে ভ্রমণ করেন, তাকে অপরের প্রস্তুতির অপেক্ষায় থাকতে হবে”।

তাই একাকী ভ্রমণ এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি এনে দেবে। আপনি ঠিক যা করতে চাইছেন, তাই করতে পারবেন। এর চেয়ে মজার ঘোরাঘুরি আসলে আর হয় না। কোনো ধরনের বাধা আর আপনার ওপর কাজ করবে না। নিজের পছন্দমতো স্থানে, পছন্দসই উপায়ে থেকে-খেয়ে আপনি দিব্যি ভ্রমণ করে আসতে পারবেন। একাকী ভ্রমণই সবচেয় বেশি রোমাঞ্চকর, উত্তেজনাপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। তাই একাকী ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বিশেষ কিছু পরামর্শ দরকার। এখানে তাই তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

কী কী কারণে একা ভ্রমণ করবেন তা জেনে নিন।

১। আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়

অনেক সময় সম্পর্ক বিচ্ছেদের কারণে অনেকেই মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময় নিজেকেই দোষী বলে মনে করেন অনেকে। ফলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। একা ভ্রমণের কারণে যাবতীয় কাজ আপনাকে একা করতে হয় বিধায় আপনার হারানো আত্মবিশ্বাস পুনরায় ফিরে আসবে।

২। পরিচিত মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকা

আপনার আশপাশে থাকা পরিবারের সদস্যরা, বন্ধু কিংবা সহকর্মী যারা আপনার সম্পর্কের বিষয়ে জানে তারা বিচ্ছেদের কারণসহ নানা বিষয়ে কথা বলবে। এমতাবস্থায় সাবেক সঙ্গীকে ভুলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কষ্টকর। তাই কিছুদিনের জন্য একা ভ্রমণ করুন কোথাও। নতুন মানুষ, নতুন স্থানের সঙ্গে পরিচিত হলে পুরোনো স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।

৩। নতুন বন্ধু পাওয়ার সুযোগ

নতুন জায়গায় ভ্রমণ করলে অনেক ধরনের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকে। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের গল্প শুনলে আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন আপনার কষ্ট তাদের তুলনায় অনেক কম। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সাহস সঞ্চার করতে পারবেন।

বন্ধুবন্ধু

৪। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার সময় পাবেন

একা ভ্রমণ করলে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন। নিজের প্রতি মনোনিবেশ করার সুযোগ পাবেন। একা ভ্রমণের মাধ্যমে নিজের অনেক গুণ আবিষ্কার করতে পারেন যা আপনার কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে দেবে বহুগুণে। নতুন অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনের কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।

৫। আপনার পছন্দমতো কাজ করতে পারবেন

 সম্পর্কে জড়িত থাকার সময় অনেক কাজ হয়তো আপনি এককভাবে করতে পারতেন না। কিন্তু একা থাকার কারণে আপনার পছন্দ অনুযায়ী অনেক কাজ করতে পারবেন। একা ভ্রমণ আপনাকে শিক্ষা দেবে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়। এ ছাড়া নিজেকে ভালোবাসার মতো শিক্ষা পাবেন একা ভ্রমণের মাধ্যমে।

 

একাকী ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বিশেষ কিছু পরামর্শ

১. ঠিক করুন কোথায় যাবেন?

নিজের ভেতরটাকে শান্তিতে পূর্ণ করে তোলার প্রধান উপায় সম্ভবত একাকী ভ্রমণ। ব্যক্তিত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় দেখার এটাই সুযোগ। নতুন স্থান আবিষ্কারের মতোই নিজেকে আবিষ্কারের সুযোগ মিলবে এখানেই। তাই এমন একটি স্থান নির্বাচন করুন যেখানে খুব কম মানুষ যায়। প্রকৃতির মাঝে নিজেকে একা করে ফেলুন। জনপ্রিয় পর্যটকপূর্ণ অঞ্চলে না যাওয়াই ভালো।

২. গাইড বুক সঙ্গে নিন

যেখানে যাচ্ছেন সেখানে আপনার কোনো সঙ্গী নেই। কাজেই সবকিছু একাই করতে হবে। ওই স্থান সম্পকে যাবতীয় তথ্য আগে থেকেই সংগ্রহ করুন। একটি মানচিত্র নিন। ইন্টারনেট ঘাঁটুন আর ওই স্থান সম্পর্কে বিভিন্ন ব্লগ পড়ুন। পরিষ্কার ধারণা নিয়ে নিন।

৩. পরিবারকে বোঝান

আমাদের অঞ্চলে একাকী ভ্রমণ খুব বেশি জনপ্রিয় নয়। সবাই পরিবার বা বন্ধুদের নিয়েই ঘুরতে যান। তাই আপনার পরিবার হয়তো একাকী যেতে দিতে চাইবে না আপনাকে। এ ক্ষেত্রে তাদের রাজি করান। গোটা পরিকল্পনা আর নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করুন তাদের কাছে। নয়তো তাদের দুশ্চিন্তা যাবে না। এ অবস্থায় আপনিও ভ্রমণ করে মজা পাবেন না।

৪. যোগাযোগ রাখুন

যেখানেই যান না কেন, পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। তাহলে তারা আপনাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকবেন না।

৫. অগ্রিম থাকার ব্যবস্থা করুন

যেখানে যাবেন সেখানে থাকার ব্যবস্থা আগে থেকেই করুন। কোন হোটেলে থাকবেন এবং কী ধরনের কক্ষে থাকবেন তার হিসাব আগে থেকেই করুন। বিভিন্ন ভ্রমণ বিষয়ক সাইটের মাধ্যমে অগ্রিম কক্ষ ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এ সেবা নিন। আগে থেকেই থাকার স্থানটা ঠিকঠাক করে ফেলুন। তাহলে আর কোনো ধরনের বিড়ম্বনায় পড়বেন না।

৬. সহনীয় ব্যাকপ্যাক

আপনি যে কয়দিনের জন্য যাচ্ছেন তার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস অবশ্যই সঙ্গে নিতে হবে। তবে তা যেন নূন্যতম ওজনদার হয়ে ওঠে সেদিকে খেয়াল রাখবেন। সহজে বহনযোগ্য হতে হবে আপনার ব্যাকপ্যাকটি। অপ্রয়োজনীয় জিনিসে পূর্ণ করে নেবেন না। একঘেয়ে সময় কাটানোর জন্য কোনো বই নিতে পারেন। ভ্রমণের রেকর্ড রাখার জন্য কোনো জার্নাল সঙ্গে নিন।

৭. চলাচলে গণপরিবহন

চলাফেরার জন্য ওই স্থানের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করুন। কিংবা অন্যদের সঙ্গে কোনো বাহন শেয়ার করুন। এতে যেমন নিরাপত্তা মিলবে, তেমনই কম খরচে ভ্রমণ করতে পারবেন। তা ছাড়া এই উপায়ে ভ্রমণের আলাদা অভিজ্ঞতাও লাভ হবে।

গণপরিবহনগণপরিবহন

৮. নতুন মুখের সঙ্গে কথা বলুন

স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলুন। অনেক কিছু জানতে পারবেন। আপনার জ্ঞান বাড়বে। নতুন স্থান সম্পর্কেও অনেক তথ্য জানতে পারবেন। সবার সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করুন। তাদের সঙ্গে মিশে যান।

৯. সকাল সকাল শুরু করুন

সেখানে যাওয়ার পর বিশ্রাম নিন। পরদিন সকাল সকাল আপনার অভিযান শুরু করুন। এতে করে গোটা দিন পাবেন ভ্রমণের জন্য। সকাল নাস্তার পেছনে অলস সময় দিন। সকাল সকাল শুরু করলে সব কাজই আরাম-আয়েশের সঙ্গে সারতে পারবেন।

১০. সবার আগে নিরাপত্তা

কী ধরনের বিপদ আসতে পারে তা বুঝতে মনের অনুভূতির ওপর বিশ্বাস রাখুন। আবহাওয়া বা অন্যান্য বিপদ সম্পর্কে এমনিতেই তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। সবার আগে ভ্রমণে নিজের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দুঃখ প্রকাশ করার আগে তাই সাবধান হওয়া উত্তম।

 

একাকী ভ্রমণের ১০ টি সতর্কতা

১। আগেভাগেই বুকিং করে রাখা

বিশেষ করে যদি আপনার পৌছাতে পৌছাতে মধ্যরাত হয়ে যায় তখন পছন্দসই থাকার জায়গা পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে, তাই আগে ভাগে বুকিং করে রাখাই ভালো।

২। ট্যাক্সির নাম্বারপ্লেটের ছবি তুলে রাখা

বিষয়টা যখন নিরাপত্তার, তখন কোন কিছুই লজ্জার না। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বুঝিয়ে দেন যে আপনি ছবি তুলে রেখেছেন, সেও তখন সতর্ক হয়ে যাবে।

৩। একটি বিয়ের আংটি পড়ে থাকুন

অনেক ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আপনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ঘটনা এড়িয়ে যেতে সহায়তা করবে।

৪। সতর্ক থাকবেন

কানে হেডফোন লাগিয়ে, নিচের দিকে তাকিয়ে হাটবেন না। চারিদিকে তাকিয়ে হাটুন, যদি মনে করেন কেউ আপনাকে অনুসরণ করছে , তাকে জানিয়ে দিন আপনি সেটা বুঝে ফেলেছেন।

৫। রাতে একাকী হাঁটা নয়

অপরিচিত স্থানে রাতে একা হাঁটা খুব ভালো চিন্তা না। চেষ্টা করুন রাতে কোন প্ল্যান না রাখতে, আর থাকলেও সাথে বিশ্বস্ত কাউকে রাখুন যে আপনাকে হোটেল পর্যন্ত পৌছে দিবে।

৬। মাতাল হবেন না

একা ভ্রমণে কখনই মাতাল হবেন না। আশেপাশের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হোন। কেউ কিছু পান করতে দিলে কৌশলে এড়িয়ে যান।

 মাতাল মাতাল

৭। কিছু টাকা লুকিয়ে রাখুন

সব টাকা একসাথে রাখবেন না, কিছু টাকা এদিক সেদিক লুকিয়ে রাখুন। ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন বেশি করার চেষ্টা করুন।

৮। সবকিছুর ফটোকপি সাথে রাখুন

নিজের পাসপোর্ট, ভিসা, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কাগজ, বুকিং এর কাগজ টিকেট, ক্রেডিট কার্ডের ফটোকপি সাথে রাখুন।

৯। রাস্তায় চালাক-চতুর হোন

সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো, রাস্তায় এমন কিছুর সাথে যুক্ত না হওয়া যেটাতে আপনার কোন সম্পর্ক নাই। যদি কেউ বলে তাঁর ব্যাগটা দেখতে বা কোন মহিলা তাঁর বাচ্চাকে রাখতে বলে কৌশলে এড়িয়ে যান, মাঝে  মাঝে এগুলো বিপদ ডেকে আনে।

১০। পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবকে অবগত রাখুন

কখন, কোথায় আছেন পরিবারকে জানান । কোনো ঘটনা ঘটলে তা সাথে সাথেই পরিবারকে জানিয়ে রাখবেন।

তথ্যসূত্রঃ হ্যাপী ট্রিপ্স , কালের কন্ঠ , নিউজ জি

ছবিঃ গুগল