ক্যাম্পং ফ্লোটিং ভিলেজ

টোনল স্যাপ লেক, সীয়েম রিপ, কম্বোডিয়া।

 

যেকোন দেশের যেখানে যাই দেখতে পাই না কেন, স্থানীয়রা সবাই বলে সেটাই নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড়। ঔদিনও তাই শুনলাম, কোথাও একবার পড়ছিলামও মনে হয় এবিষয়ে।  

একমাস আগে ঘুরতে গিয়েছিলাম কম্বোডিয়ার সীয়েম রিপের পাশে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির লেক ‘টোনল স্যাপ’ এ। এই লেকের তীরেই অবস্থিত ৪৫-৫০ হাজার মানুষ নিয়ে গঠিত এক ফ্লোটিং ভিলেজ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হোক বা না হোক, ৫০ হাজার লোকের বসতি নিতান্তই কম কথা নয়!

ভাসমান গ্রামের একাংশ ভাসমান গ্রামের একাংশ

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেল এই গ্রামে ৬ মাস তারা পানি বন্দী থাকে, তখন তারা মাছ ধরে জীবিকা চালায়। আর বাকি ৬ মাস যখন শুষ্ক মৌসুম থাকে, তখন তারা ফসল ফলায়।

এই ভাসমান গ্রামে নার্সারি থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। এবং একটি ফ্রী ইংলিশ শিক্ষা কেন্দ্রও দেখা গেছে যা স্থানীয় একজন শিক্ষক চালান।

এছাড়া আরো রয়েছে একটি ভাসমান বাস্কেটবল কোর্ট,  তিনটি প্যাগোডা,  একটি হাসপাতাল, কয়েকটি ভাসমান দোকান, কম্বোডিয়ানদের মধ্যে জনপ্রিয় কারাওকে, বার, সবজি বাগান, গবাদিপশুর (ছাগল, শূকর, মুরগী) খামার,  ভাসমান কুমিরের খামার ও কুমিরের চামড়া দিয়ে তৈরী ব্যাগ-জুতা-বেল্ট সহ বিভিন্ন জিনিসের দোকান, এবং ত্বকের যত্নের প্রসাধনী পণ্য বা মেডিসিন যা কুমির থেকে তৈরী। বিভিন্ন বাসায় কুকুর দেখা গিয়েছে, আল্লাহ যানে এই কুকুর গুলো কেমনে দৌড়াদৌড়ি করে, তবে কয়েকটিকে পানিতে সাঁতার কাটতে দেখা গিয়েছে।

ভাসমান কুমীরের খামারভাসমান কুমীরের খামার

বিভিন্ন কম্বোডিয়ানদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম তারা এই ভাসমান গ্রামবাসীদের খুব একটা ভাল চোখে দেখে না। কারণ তারা নাকি শরণার্থী। মানে ভিয়েতনামের বিভিন্ন যুদ্ধে তারা ভিয়েতনাম থেকে পালিয়ে এসে এই লেকে বসতি গড়েছে। এমনও শুনেছি তারা আমাদের দেশের রোহিঙ্গাদের মতই, তাদের কম্বোডিয়ার নাগরিকত্ব নাই, তাই তারা কোন জায়গা জমি কিনে স্থলভাগে বসবাস করতে পারছে না। এজন্যই তাদের স্থান এই লেকের জলে। এটার কোন সত্যতা আমার জানা নেই, তবে এটা জেনেছি যে বর্তমানেও কোন ভিয়েতনাম নাগরিকের কম্বোডিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার বিধান নেই।

একটু গুগল ম্যাপ দেখলে বুঝা যায় ‘টোনল স্যাপ’ লেকটির উৎপত্তি ‘মেকং’ নদী থেকে, যা দক্ষিন ভিয়েতনাম থেকে শুরু হয়েছে। সে হিসেবে কম্বোডিয়ান দের ওই কথাটা ফেলে দেয়ার মতো নয়। মানে ভিয়েতনাম যুদ্ধে ভিয়েতনামিরা পালিয়ে এই নদী ধরে ‘টোনল স্যাপ’ লেকে এসে বসতি গড়েছে।

ভাসমান শিক্ষাকেন্দ্র ভাসমান শিক্ষাকেন্দ্র

এই লেকের একটি সুনাম রয়েছে, তা হলো এটি পৃথিবীর অন্যতম বড় মিঠা পানির মাছের আশ্রয়স্থল। এখান থেকে প্রায় ২০০+ প্রজাতীর মাছ পাওয়া যায়। যা দিয়ে লেকবাসীর জীবিকা চলে। আমাদের গাইড বললেন, ভাসমান গ্রামবাসীর প্রধান খাবারই মাছ, মাছ থেকেই তারা ৬৫% প্রোটিন পেয়ে থাকে। শাক সবজি এর অভাবে তারা বাচ্চাদের সুষম খাদ্য দিতে পারেনা। ১-৫ বছর পর্যন্ত তাদের বাচ্চাদের মৃত্যুহার খুব বেশী, কারন প্রতিকূল পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবার অভাব, আর সুষম খাদ্যের অভাবে অপুষ্টিতে বিভিন্ন রোগে মারা যায়।

যাই হোক, এসবই তাদের জীবনকথা, তারা তাদের ভাগ্য নিজেরাই তৈরী করে। তাদের গ্রামের ঠিক পাশেই আমাদের রাতারগুলের মতোই একটি বিশাল সোয়াম ফরেস্ট বা জলাবন রয়েছে। সেখানে ছোট ডিংগি নৌকা নিয়ে ঘুরার ব্যবস্থা আছে। ১জন ৫ ডলার করে দিতে হয়, একনৌকায় চারজন বসা যায়, চারজনে ২০ ডলার। মজার ব্যাপার হলো এই জলাবনটি মহিলাদের দখলে, মানে সোয়াম ফরেস্টে ডিংগি নৌকার সব মাঝিই মহিলা। আমাদের গাইডের ভাষায় এটা নাকি এখানকার ঐতিহ্য। মহিলারা ঘরের কাজকর্মের পাশাপাশি এই কাজ করে সংসারের আয় রোজগার বাড়ায়। পুরুষরা ক্ষেতে অথবা মাছ ধরার কাজ করে থাকে।

জলাবনে তরুণীর তরণী জলাবনে তরুণীর তরণী

সিয়েম রীপ ঘুরতে গেলে ‘অ্যাংকর ভাট’ এর পরেই রয়েছে এই ভাসমান গ্রামের স্থান। সিয়েম রীপ সিটি থেকে আধাবেলার প্যাকেজ ট্যুর হয়ে থাকে। প্যাকেজ মূল্য ২০ ডলার চাইবে। আমি দরদাম করে ১২ ডলারে কিনেছি। শহর থেকে ৪০-৫০ মিনিটের রাস্তা, তারা হোটেল থেকে এসি ভ্যান/বাসে করে নিয়ে যাবে, আবার হোটেলে রেখে আসবে, সাথে খাওয়ার পানি ও ইংলিশ স্পিকিং গাইড। স্পটে গিয়ে বড় নৌকাতে করে পুরা ভিলেজ ঘুরে দেখাবে। সাথে কিছু খাবার নিয়ে যাবেন।

এখানে ঘোরার সেরা সময় নভেম্বর থেকে জানুয়ারী অর্থাৎ শীতের সময়। অন্যসময়ে হয় অতিরিক্ত গরম থাকে, না হয় বর্ষা। আমি ২ জানুয়ারী গিয়েছি, তাতেই যা গরম পেয়েছি বলার মত নয়!