পৃথিবী রহস্যময়। সমুদ্রের তলদেশে রহস্য, আকাশের ওপারে রহস্য, ছোট্ট একটা কীটের ভেতর রহস্য, আরো কতকিছু ! মানুষের হয়েছে যন্ত্রণা। আবিষ্কারের নেশায় এসব রহস্যের জাল কাটতে কাটতে আবার নতুন করে সামনে আসে আরেকটি রহস্য। তবু কিছু কিছু রহস্য ছোট্টবেলায় ছোট্ট চোখে দেখা বায়োস্কোপের ভেতর ছুটে চলে রঙ্গিন চিত্রের মতো রয়ে যায়, সব দেখছি, জানছি কিন্তু মাথার ভেতর একটাই ভাবনা, এরা এলো কোত্থেকে !
 

লী বার্জার। ফটো ক্রেডিট - ন্যাসন জাল্ক , দ্যা নিউ ইউর্ক টাইমসলী বার্জার। ফটো ক্রেডিট - ন্যাসন জাল্ক , দ্যা নিউ ইউর্ক টাইমস

রাইসিং স্টার কেভ; দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের খুব কাছেই ব্লোউব্যাঙ্ক নদী-উপত্যকায় একটি অতি পুরানো গুহা। গুহা আবিষ্কার করতে করতে খুব সরু কিছু পথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ রূপকথার রাজ্যের মতো একটা ছোট্ট ঘর সামনে আসে, ঘর ভর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য হাড়-গোড়। প্রায় তিন বছরের গবেষণা শেষে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, হাড়গুলো Homo naledi প্রজাতির, আমাদের পূর্বপুরুষ ! সর্বপ্রথম ২০১৩ সালে গুহা অভিযান করেছিলেন অভিযাত্রী স্টিভেন টাকার এবং রিক হান্টার। তারপর সেখানে পাওয়া হাড়-গোড় নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। বহু চড়াই-উৎরাই পেড়িয়ে গবেষক দলের প্রধান; জীবাশ্মবিদ লী বার্জার নিশ্চিতভাবে ঘোষণা দেন এই নতুন আবিষ্কারের। সম্প্রতি রাইসিং স্টার কেভ থেকে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত হন লী বার্জার দল। শোনা যায় আরো নানান অজানা কথা।

সর্বপ্রথম ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে রাইসিং স্টার কেভ অভিযানে ডাইন্যালেডি চেম্বার আবিষ্কার করা হয়। অভিযাত্রীদেরর ভাষ্যমতে, সুপারম্যান ক্রল এবং ড্রাগন ব্যাক চেম্বার অতিক্রম করার পর দুম করে একটা আবদ্ধ চেম্বার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। কে জানতো এক পৃথিবী রহস্য নিয়ে মাটির নিচে এই চেম্বারটি আধুনিক মানুষের পদচিহ্নের অপেক্ষায় ছিলো ! রহস্যেঘেরা সেই গুরুত্বপূর্ণ ডাইন্যালেডি চেম্বারে প্রবেশ করে তাঁরা দেখতে পান অসংখ্য হাড়-গোড় স্তুপ হয়ে আছে সেখানে। সুড়ঙ্গপথের ধাপে ধাপে জীবন-ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছুবার পর ডাইন্যালেডির এই দৃশ্য নতুন করে আলো দেখায় এক অন্য আবিষ্কার যাত্রার।

 

লী বার্জার এবং আলিয়া গুর্তভ। ফটো ক্রেডিট- জন হক্সলী বার্জার এবং আলিয়া গুর্তভ। ফটো ক্রেডিট- জন হক্স

স্তূপকৃত জীবাশ্ম নমুনাগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন লী বার্জারের দল। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের হাড় পাশাপাশি রেখে শেষ পর্যন্ত যে আকৃতি দাঁড়ায়, তা অবাক হবার মতো। তাঁরা লক্ষ্য করেন, এগুলো মনুষ্য গোত্রের কোনো এক প্রজাতির জীবাশ্ম। হতে পারে আমাদেরই অজানা কোনো এক পূর্বপুরুষদের ! কয়েক দফায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৭৫৪টি নমুনা সংগ্রহ করা হয় এই ছোট্ট ডাইন্যালেডি চেম্বার থেকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের শরীরের ২০৬ টি হাড়ের ১৮৬ টিই সেখানে পাওয়া যায়, কিন্তু হদিস মেলেনি বাকি ২০ টির। রহস্যের জাল বোনা শুরু হতে থাকে তখন থেকেই। যাই হোক, আপাতত এটুক বলে রাখি, ডাইন্যালেডির সাথে মিলিয়েই এই মনুষ্য প্রজাতির নাম দেয়া হয় Homo naledi. দক্ষিণ আফ্রিকার সেসোথো ভাষার ডাইন্যালেডি; যার অর্থ হচ্ছে নক্ষত্র।
 

ফটো ক্রেডিট - রবার্ট ক্লার্ক, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকফটো ক্রেডিট - রবার্ট ক্লার্ক, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

মানুষের কংকাল যে পরিপূর্ণ হচ্ছে না ! এর কিছুদিন পরেই অন্ধকারে আলো ছড়িয়ে ধরা দেয় লেসেডি চেম্বার। সেসোথো লেসেডি অর্থ আলো। সেখানে পাওয়া যায় Homo naledi –এর প্রায় ১৩০ টির মতোন জীবাশ্ম। অবশেষে লেসেডি এবং ডাইন্যালেডি চেম্বারের হাড়-গুলো জড়ো করে মোটামুটি আলাদা ৩ জন Homo naledi এর কংকাল তৈরি হয়ে যায়। প্রথম পরিপূর্ণ যে কংকালটি তৈরি হয়, তা পুরুষের। বাকি ২ টির মধ্যে একজন নারী এবং অন্যজন শিশু। সেসোথো ভাষায় সেই প্রথম Homo naledi পুরুষের নাম দেয়া হয় নিও; অর্থ উপহার !

এতোটুকু নাহয় নিশ্চিত হওয়া গেলো, এরা মানুষের পূর্বপুরুষ, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। হিউম্যান ফ্যামিলি ট্রি তে এদের অবস্থান কোথায় হবে? অর্থাৎ এরা ঠিক কতদিনের পুরনো? বিলুপ্ত হবার আগে কতদিন টিকে ছিলো এরা? এরও আগে গবেষকদের চিন্তায় ফেলে দেয় আর একটি রহস্য। ডাইন্যালেডিতে এতো ছোট সুড়ঙ্গ পথে এদের প্রশস্ত শরীর কেমন করে প্রবেশ করলো !
 

২০১৪ সালে লেসেডি চেম্বারে পরিপূর্ণতা পাওয়া প্রথম Homo naledi পুরুষ- নিও ( ফটো ক্রেডিট - লী বার্জার )২০১৪ সালে লেসেডি চেম্বারে পরিপূর্ণতা পাওয়া প্রথম Homo naledi পুরুষ- নিও ( ফটো ক্রেডিট - লী বার্জার )

সুড়ঙ্গ পথটি ছিলো ৭.৫ ইঞ্চির মতো প্রশস্ত এবং ৪০ কদম পা ফেলা দূরত্ব অতিক্রম করেই তবে ডাইন্যালেডি চেম্বার। কিন্তু Homo naledi দের পা ঠিক আধুনিক মানুষের মত হলেও কাঁধ এবং ধড় অনেকটা বানরের মতো প্রশস্ত। তাছাড়া আধুনিক মানুষের মতো অতো বুদ্ধিমানও তারা ছিলো না যারা কিনা ধীরে-সুস্থে বিভিন্ন কায়দা অবলম্বন করে এই সুড়ঙ্গ পথ অতিক্রম করতে পারে। ২০১৫ সালে ক্ষুদ্র মস্তিষ্কধারী Homo naledi  সম্পর্কে লী বার্জার এমন একটি আবছা ধারণা প্রকাশ করেন। কিন্তু অন্য কোনো উপায়ে কি এরা ডাইন্যালেডিতে প্রবেশ করতে পারে না?

একটা সময় ভাবেন, আদিকালে শিকারী স্বভাব অনেক প্রবল ছিলো, হয়তো তারা কোনো পাথরের অস্ত্র নিয়ে এই পথে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু চেম্বারের মধ্যে হাড়গোড় ছাড়া আর কোনো পাথরের অস্ত্রের নিদর্শন মেলেনি। কিন্তু বার্জারের দল নিশ্চিত করেই বলেন, এরা এই সুড়ঙ্গ পথেই চেম্বারে প্রবেশ করেছে। তবে কি এদের কেউ কেউ মৃত অবস্থায় এখানে রয়ে গেছে !

 

A 'Neo' skull of Homo naledi from the Lesedi Chamber_ Credit Wits University_John HawksA 'Neo' skull of Homo naledi from the Lesedi Chamber_ Credit Wits University_John Hawks

হতে পারে, তাদের মৃত দেহ টুকরো টুকরো করে এখানে উপর থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। তবে এরকমটিও হয়নি, কেননা এটি হয়ে থাকলে এই সরু সুড়ঙ্গ পথের শেষপ্রান্তে সব হাড়ের অংশই ডাইন্যালেডির সুড়ঙ্গ মুখে স্তূপ হবার কথা, সেরকমভাবে জীবাশ্মগুলো ছিলোনা, সেগুলো গোছালোভাবে নিচে ছড়ানো ছিলো আর কিছু জীবাশ্ম ছিলো নুড়ি-পাথরের তলানির নিচে চাপা অবস্থায়। নিশ্চিত করে বলা যায় এদেরই কেউ কেউ তাদের দলভুক্ত অন্য সদস্যদের মাটিচাপা দিয়েছে। তারমানে জীবিত কেউ কেউ অবশ্যই এখানে এসেছে, কিন্তু কিভাবে ? সম্ভাব্য সকল উপায় নিয়েই গবেষকগণ ভেবেছেন। চেম্বারে Homo naledi এর সাথে একটি মাত্র পেঁচার জীবাশ্ম ছাড়া আর কোনো শিকারীর নিদর্শন পাওয়া যায় নি। পানির স্রোতের সাথে ভেসে আসতে পারে এই সন্দেহে পানির কোনো উপস্থিতিরও প্রমাণ পাওয়া যায়নি, উপর থেকে ছুড়ে ফেলা বড় পাথর কিংবা নুড়ির নিদর্শন পাওয়া যায়নি যার ধাক্কায় এসব মৃত দেহের হাড়-গোড় চেম্বারে ছড়িয়ে যেতে পারে। এরকম অস্থিতিশীল অবস্থায় ক’জন পন্ডিতজ্ঞ সমালোচনা করে বলেন, এতো রহস্যের তো কিছু নেই, নিশ্চয়ই ওখানে অন্য কোনো সুড়ঙ্গ পথ ছিলো, হয়তো সময়ের পালাক্রমে তা বন্ধ হয়ে গেছে ! লী বার্জার কিন্তু তা একেবারেই মনে করেন না, সেই অদৃশ্য সুড়ঙ্গের মুখে কোনো হাড়ের স্তূপ নেই। অন্য কোনো সুড়ঙ্গ –পথের কোনো নিদর্শনও নেই ! সমালোচকদের ভাবনায় ভস্ম উড়িয়ে অন্যদিকে লী বার্জার বেশ রোমাঞ্চিত শেষ পর্যন্ত ঐ একটা কারণেই ! নিদর্শন যা বলে, Homo naledi  দের কেউ কেউ তাদেরই কারো কারো কারো মৃতদেহ নিয়ে এই একমাত্র সরু সুড়ঙ্গ পথেই  ডাইন্যালেডি চেম্বারে একটা সময় প্রবেশ করতো ! আর লী বার্জার মনে করেন, জীবাশ্মবিদ্যার ইতিহাসে এই আবিষ্কারটি একটি বিশাল অর্জন !

 

Homo naledi এর দাঁতের জীবাশ্ম, ( ফটো ক্রেডিট- এলিয়ট রস, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক )Homo naledi এর দাঁতের জীবাশ্ম, ( ফটো ক্রেডিট- এলিয়ট রস, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক )

Homo naledi  দের আবির্ভাব ঠিক কোন সময়ে, এই নিয়ে বহু গবেষণা, আলোচনা- সমালোচনা- নাটকীয়তা ঘটে গেছে। প্রাথমিকভাবে এদেরকে হিউম্যান ফ্যামিলি ট্রি তে স্থান দেবার পর বহু গবেষক এদের বিস্তার-কাল নিয়ে নতুন নতুন তথ্য দিচ্ছিলেন। কেউ কেউ বলছিলেন, এরা প্রায় ২০ লক্ষ বছরের পুরনো প্রজাতি, আবার অন্যদিকে কেউ কেউ সংখ্যাটা অর্ধেকে কমিয়ে এনে বললেন, নাহ, এরা  ৯ লক্ষ ১২ হাজার বছরের পুরনো, এর বেশি নয় ! তখন লী বার্জার এর গবেষক দল Homo naledi  এর দাঁত, গুহার ভেতরকার ফ্লো-স্টোন, পলি ইত্যাদির সাহায্যে বিভিন্ন ডেটিং পদ্ধতী ব্যবহার করে নিশ্চিত হলেন, এদেরকে ঠিক যতটা বৃদ্ধ ভাবা হচ্ছে, এরা তার থেকেও অনেক বেশি কম বয়সী ! ঠিক ২ লক্ষ ২৬ হাজার বছর থেকে ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার বছরের কোন এক সময়ে এরা জীবিত ছিলো। আধুনিক মানুষ আর প্রাচীন মানুষের সংকর এক রহস্যময়ী প্রজাতি হয়ে তারা তাদের অস্ত্বিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছে এই ডাইন্যালেডি চেম্বারে।

PHOTOGRAPH BY PASCAL GOETGHELUCK, SCIENCE SOURCEPHOTOGRAPH BY PASCAL GOETGHELUCK, SCIENCE SOURCE

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭। রাইসিং স্টার কেভ থেকে সরাসরি কথা বলছিলেন লী বার্জার গবেষক দল। তখনও তাঁদের গবেষণার কাজ চলছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকেই ভীষণ উচ্ছ্বসিত কিছু মুখ জানাচ্ছিলেন তাঁদের এই অভিযানের কথা। এই দলেরই একজন জীবাশ্মবিদ জন হকস হাসিমুখে বলেন, “আমরা বহু বছরের পুরনো পলির নিচ থেকে শুরু করে উপর পর্যন্ত লুকিয়ে থাকা জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা করে মনুষ্য প্রজাতির এই নতুন Homo naledi দের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি, আমরা এখন বেশ নিশ্চিত হয়েই বলতে পারি ২০১৩ সালে স্টিভেন টাকার এবং রিক হান্টারের এই ডাইন্যালেডি চেম্বার অভিযানের মূল উদ্দেশ্য  হয়তো এতোদিনে সার্থক হয়ে গেছে !”

তথ্যসূত্র ঃ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, উইকিপিডিয়া।