ঝুপ করেই চারপাশে অন্ধকার নেমে এল। সেই সাথে কমে গেল তাপমাত্রা। জুন মাসের তীব্র গরমে একের পর এক চড়াই উৎরাই অতিক্রম করতে করতে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় শরীরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের হাওয়া খাওয়ার অনুভ’তি অনুভ’ত হলে তৃপ্ত লাগাই স্বাভাবিক। ভালো করে তাকিয়ে দেখি সরু একটা ঝিরিপথে হাজির হয়েছি। পাহাড় থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি আমাদের গোড়ালি ডুবিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা তরুবীথি কোমল ছায়ায় আবৃত করেছে অনাহূত আগন্তুকদের। নিঃসীম এই নীরবতা মাঝে মাঝেই ভেঙে যাচ্ছিল ঝিঁঝিঁপোকার আকস্মিক আর্তনাদে। এছাড়া সমগ্র বিশ্ব চরাচর যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল এক অদ্ভুত নীরব ব্যঞ্জনে। 
ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল এস্ট্রোনট হয়ে মঙ্গলগ্রহে যাব। কিছু বড় হওয়ার পরেই বুঝলাম ইহা সম্ভব নহে। এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম ফাইটার প্লেনের পাইলট হব। আরও কিছুদিন যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম ইহাও সম্ভব নহে। শেষ অবলম্বন হিসাবে সিদ্ধান্ত নিলাম ইবনে বতুতার মত পর্যটক হব। চাকরি জীবনে প্রবেশ করে বুঝতে পারলাম বাংলাদেশে প্রাইভেট চাকরি করে পর্যটক হওয়া এস্ট্রোনট কিংবা ফাইটার প্লেনের পাইলট হওয়া থেকেও কঠিন। কিন্তু আমার যে ঘুরবার খুব শখ। ইবনে বতুতা কিংবা হিউয়েন সাং হতে না পারি, নিদেনপক্ষে তারেক অণু হওয়া তো উচিৎ। চাকুরির সুবাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার সুযোগ হয়, কিন্তু যেই পাহাড় আর অরণ্য আমাকে ভীষণ টানে সেই পাহাড়ের সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য মনটা আকুলি বিকুলি করছিল। অবশেষে অনেক কষ্টে বসকে ম্যানেজ করে ছুটি নিয়ে চললাম বান্দরবনের উদ্দেশ্যে। মিশন আলিকদমের আলী সুড়ঙ্গ।
আলীকদম যাওয়ার রাস্তাটা চমৎকার। কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে বাসে রওনা হয়ে বুনো হাতির আবাসস্থল ফাঁসিয়াখালীর গভীর অরণ্য পাড়ি দিতে হয়। চারপাশের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলা রাস্তার সৌন্দর্য আপনাকে চোখ মুদতে দিবে না একবারের জন্যও। মিরিঞ্জা, লামা পার হয়ে ২ ঘণ্টা পর ছোট্ট পাহাড়ি উপত্যকা আলীকদম পৌঁছলাম। চারদিক পাহাড়ের মাঝে এক চিলতে সমতল জায়গা। থাকার জন্য ভাল কোন অতিথিশালা নেই। চাচাত ভাই আলীকদম ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত থাকায় কোথায় রাত কাটাব সেই নিয়ে কোন টেনশন ছিল না। টেনশন ছিল না পথপ্রদর্শক যোগাড় করা নিয়েও। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুজন সৈনিক চললেন গাইড হিসাবে। সাথে সিনিওর ওয়ারেন্ট অফিসার পদমর্যাদার একজন অফিসার। সাকুল্যে ৪ জন মিলে চললাম আলী সুড়ঙ্গ অভিযানে।

চললাম আলী সুড়ঙ্গ অভিযানেচললাম আলী সুড়ঙ্গ অভিযানে

আলী সুড়ঙ্গের অবস্থান আলীকদম ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১ কিলোমিটার পিছনে। চলার পথে অপূর্ব প্রকৃতি আপনাকে স্বাগত জানাবে। যেই পাহাড়ে এই সুড়ঙ্গ অবস্থিত সেই পাহাড়ে যাওয়ার পথে একটা খাল পাড়ি দিতে হয়। টোয়াইন নামক এই খালটিতে সাধারণ অবস্থায় পানি খুবই কম থাকে। হেঁটেই পার হওয়া যায়। তবে ভরা বর্ষায় সাঁতরে পার হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

চলার পথে অপূর্ব প্রকৃতিচলার পথে অপূর্ব প্রকৃতি

পাহাড়ি পায়ে চলা পথ ধরে এগিয়ে চলতে চলতে চোখে পড়ল কিছু লোক গাছ কাটছে ফার্নিচার তৈরির জন্য। এইদিকে নাকি কাঠ অনেক সস্তা। খারাপ লাগলো। এমনিতেই আমাদের বনাঞ্চল কম আর যেগুলো আছে সেগুলোও উজাড় করার তোড়জোড় চলছে। কাঠুরেদের অতিক্রম করে কিছুদূর যাওয়ার পর জঙ্গল ঘন হওয়া শুরু করল। এবং তখনই চমৎকার একটা কাঠের সেতু চোখে পড়ল। এত সুন্দর কাঠের সেতু আগে কখনও দেখি নি।

সুন্দর কাঠের সেতুসুন্দর কাঠের সেতু

জুন মাসের তীব্র গরমে সেদ্ধ হচ্ছিলাম। যতই উপরে উঠছি রোদের তীব্রতা ততই বাড়ছিল। একবার ভাবলাম একটু জিরিয়ে নেই। মেহেদী ভাই (আমাদের আর্মি গাইড) নিষেধ করলেন। কেন নিষেধ করেছিলেন সেটা বুঝতে পারলাম আরও কিছুদূর চলার পর। পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে নামতে হঠাত করেই ঝিরিপথটাতে প্রবেশ করি। এই রাস্তা দিয়ে হেঁটেই আলী সুরঙ্গে যেতে হবে। তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ব্যাপারটা মেহেদী ভাই জানতেন বলেই আমাদেরকে বিশ্রাম নিতে নিষেধ করেছিলেন।
রাস্তার সৌন্দর্য দেখে নিমেষেই সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। সকালে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তাটা পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল; তাই খুব দেখেশুনে পা ফেলতে হচ্ছিল। কেন খালি পায়ে রওনা দিয়েছি সেটা ভাবতে ভাবতে নিজের মুন্ডুপাত করছিলাম। বৃষ্টি হলেই এই ঝিরিপথে পানির স্রোত বয়ে যায়। সেই স্রোতে সাপও সাঁতার কাটে। এছাড়া জোঁক তো আছেই। ডুবে থাকা পাথর কিংবা নলখাগড়ায় পা কেটে যাওয়ার বিচিত্র নয়। শীতকালে কেডস এবং বর্ষাকালে স্যান্ডেল নেওয়াই উত্তম। 

ঝিরিপথেঝিরিপথে

সকালে বৃষ্টি হওয়ায় সরু পথের কিছু জায়গা পানিতে ডুবে গিয়েছিল। সেই পথগুলো অতিক্রম করতে হয়েছে এক্রোবেটদের মত কসরত করে। প্রায় আধা ঘন্টা র্ট্যাকিং এর পর একটা তেমাথায় পৌঁছালাম। ডানপাশের রাস্তায় একটু এগুতেই লোহার একটা সিঁড়ি চোখে পড়ল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে এক নাম্বার সুড়ঙ্গে পৌঁছানো যায়। আর সিঁড়ির পাশ দিয়ে যেই রাস্তা চলে গেছে সেটা দিয়ে আলীর দ্বিতীয় সুড়ঙ্গে যাওয়া যায়। আবার বাম পাশের রাস্তা দিয়েও দ্বিতীয় সুড়ঙ্গে পৌঁছানো যায়। পথটা অনেকটা ত্রিভুজাকৃতির। একদিক দিয়ে গিয়ে ২ নাম্বার সুড়ঙ্গের এক প্রান্ত দিয়ে ঢুঁকে অন্য প্রান্ত দিয়ে বের হয়ে আরেক রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা যায়। গুগল ম্যাপ থেকে ছবি তুলে দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। 

 গুগল ম্যাপ গুগল ম্যাপ

প্রথমে ১ নম্বর সুড়ঙ্গে প্রবেশ করব। বৃষ্টিতে ভিজে সিঁড়িগুলো পিচ্ছিল হয়ে আছে। সাবধানে উঠতে হবে। আছাড় খেলে আর দেখতে হবে না। যেই রাস্তা পার হয়ে এসেছি সেই রাস্তা দিয়ে একজন অসুস্থ মানুষকে বহন করে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। সিঁড়ির একদম উপরের ধাপটা একদমই ক্ষয়ে গেছে। সাথে গাইড থাকায় রক্ষা। টেনে তুললেন সুড়ঙ্গের ভিতর। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে। সাথে করে নিয়ে আসা ৭ ব্যাটারির টর্চটা খুব কাজে দিয়েছিল।
১ নম্বর সুড়ঙ্গটা খুবই ছোট। কিছুদূর এগুতেই দেখি রাস্তা শেষ। ছোট যেই রাস্তা সুড়ঙ্গের ভিতর ঢুঁকেছে সেগুলো দিয়ে বড়জোর একটা বিড়াল প্রবেশ করতে পারবে। এই সুড়ঙ্গ কোন পর্যন্ত চলে গেছে কে জানে। ১ নং সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুঁকেছিলাম ২ জন। ১ জন ছিলেন সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে আরেকজন নিচে। সুড়ঙ্গ যেখানে শেষ হয়েছিল সেখান থেকে সুড়ঙ্গের মুখটাকে দারুণ দেখাচ্ছিল। যেন আঁধারের প্রান্তবিন্দুতে একগুচ্ছ আলো।
সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়ার সময় আরেক ঝামেলা। কোনোমতে তো উঠেছিলাম এখন সিঁড়ি বেয়ে নামব কি করে? অনেক কসরত করে মেহেদী ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে নামলাম শেষ পর্যন্ত। এইবার গন্তব্য ২ নং সুড়ঙ্গ। তেমাথায় এসে বামপাশের রাস্তা ধরে যাত্রা শুরু করলাম। এই রাস্তা আগের রাস্তা থেকেও সরু এবং দুর্গম। কিছু কিছু জায়গায় রাস্তা এতটাই সরু ছিল যে খুব কষ্ট করে পার হতে হয়েছে। কয়েক জায়গায় এসে তো আটকেই গিয়েছিলাম সামনে যাওয়ার রাস্তা না পেয়ে। চিকন হওয়ার যে অনেক সুবিধা সেইটা এইবার বুঝতে পেরেছি। চিকন ছিলাম বলেই গাছ গাছালির মাঝখানের প্রায় অদৃশ্য ফাঁকা জায়গাটুকু পাড়ি দিতে পেরেছিলাম। ভাগ্যিস আছাড় খাই নি। তাহলে আর দেখতে হত না।

 সরু এবং দুর্গম সরু এবং দুর্গম

এইভাবে আরও আধা ঘণ্টা চলবার পর ২ নং সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে পৌঁছলাম। একি, ছোট্ট একটা গর্ত দেখা যাচ্ছে। এইখান দিয়ে ঢুকব কিভাবে? বৃষ্টি হলে এই গর্ত পানিতে ডুবে যায়। তাই সুড়ঙ্গে প্রবেশের পর বৃষ্টি হলে পানি নেমে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভিতরে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্ত দিয়ে বের হওয়া যায় কিন্তু সেটা বেশ বিপদজনক। বৃষ্টি হলে আরও একটা সমস্যা আছে। সেটা হচ্ছে সাপেরা এই সুড়ঙ্গের ভিতর এসে আশ্রয় নেয়। আমরা খুব উত্তেজিত ছিলাম বলেই হয়ত এইসব ভয়কে পাত্তা দেই নি। মেহেদী ভাই আগেই ভিতরে ঢুঁকে টর্চলাইট ধরেছিলেন। তাই ভিতরে প্রবেশ করতে খুব একটা সমস্যা হয় নি।

 সরু এবং দুর্গম সরু এবং দুর্গম

সুড়ঙ্গ প্রথমে সরুই ছিল। যতই এগুচ্ছিলাম ততই সুড়ঙ্গ প্রশস্ত হচ্ছিল। কেমন একটা বোটকা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারছিল। গন্ধটা কিসের সেটা কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম যখন ডানা ঝাপটানোর শব্দ পেলাম। এই গুহায় প্রচুর বাদুড় আর চামচিকা থাকে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভ্যামপায়ার গল্প পড়ে বাদুড়কে রক্তচোষা মনে হলেও আদতে এটি অত্যন্ত নিরীহ প্রাণী।

২ নম্বর সুড়ঙ্গে যেই পরিমান আছাড় খেয়েছি আমার ধারণা হাঁটতে শিখবার সময়েও সেই পরিমান আছাড় খাই নি। আছাড় খেতে খেতেই সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় পৌঁছুলাম। শেষ প্রান্তটা বিশাল এবং মাটি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু। এখান দিয়ে নেমে ১ নং সুড়ঙ্গের মুখের সিঁড়ির কাছে চলে যাওয়া যায়। ছোটবেলায় স্কুলের বাথরুমে আর টেবিলের উপর প্রেমিক প্রেমিকাদের অমুক+অমুক সম্বলিত লেখা, লাভ চিহ্ন কিংবা পুরুষ ও নারীদেহের বিভিন্ন অঙ্গের স্কেচ ইত্যাদি দেখতাম। পাহাড়ের গুহায়ও যে এইসব দেখব ভাবি নি। এইসব রেখাচিত্র দেখলে প্রাচীনকালের গুহামানবেরাও মনে হয় লজ্জা পেতেন। প্রতিভা দেখানোর তো অনেক জায়গা আছে, প্রাকৃতিক এই সম্পদগুলোকে কি ছাড় দেওয়া যায় না? ও হ্যাঁ, চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের বাক্স, ব্যবহৃত কনডম (বিশ্বাস করুন আর নাই করুন) ইত্যাদিও সদর্পে ঘোষণা করছিল যে বীরপুরুষেরা এইখানে বীরত্ব দেখিয়ে গেছেন।

গুহায়গুহায়

আমরা ৪ জন দুইভাগে ভাগ হয়ে গেলাম। দুইজন ফিরে গেলেন যেদিক দিয়ে এসেছি সেদিকে। আমি আর মেহেদী ভাই ঠিক করলাম এই পথেই ফেরত যাব। অনেক কষ্টে নিচে নামলাম। একবার যদি খালি হাত ফসকে যেত তাহলে আর উপায় ছিল না। হাত কিংবা পা তো ভাঙতই তার উপর উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার উপায়ও ছিল না।
ফিরবার পথে একটা জায়গায় এসে একদম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সরু পথটা এক জায়গায় হঠাত করেই প্রশস্ত এবং সমতল হয়ে গেছে। চারপাশে অদ্ভুত নির্জনতা। নাম না জানা পাখিদের ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। দুইপাশের পাহাড় খাড়া উঠে গেছে অনেকদূর পর্যন্ত। অনেক উপরে গাছপালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো খুব কষ্ট করে আলিঙ্গনের চেষ্টা করছিল। মনে হচ্ছিল এখানেই বসে থাকি, অনন্তকাল।

ত্রিভুজ যাত্রা অবশেষে সম্পন্নত্রিভুজ যাত্রা অবশেষে সম্পন্ন

চলতে চলতে একসময় দূর থেকে লোহার সিঁড়িটা চোখে পড়ল। তারমানে আমাদের ত্রিভুজ যাত্রা অবশেষে সম্পন্ন হয়েছে। ফিরবার পথে সাইনবোর্ডটা চোখে পড়ল। উল্টো হয়ে পড়েছিল। আমরা সোজা করে গাছে ঠেস দিয়ে রেখে এসেছি। কোন এককালে উপজেলা প্রশাসন টোয়াইন খালের উপর ব্রীজ তৈরি করবে সেই ছবি সাইনবোর্ডে দেওয়া আছে। আমরা বাঙ্গালীরা প্রকৃতিকে সন্মান করতে জানি না। তাই প্রকৃতি সংরক্ষণের কোন ঝোঁকও আমাদের নেই। সবাই চিন্তা করে কিভাবে একটা দর্শনীয় স্থানে রিসোর্ট বানিয়ে ব্যবসা করা যায়। জায়গাগুলো যতই দুর্গম থাকবে, সেগুলোর সৌন্দর্যও ততই কম নষ্ট হবে। আলী সুরুঙ্গও দুর্গম থাকুক।