ক্যাম্পিং কথাটা শুনলে সবার আগে আমাদের সবারই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গভীর জঙ্গলে কয়েকটি তাবু,পাশে ক্যাম্প ফায়ার হচ্ছে। অনেকটা নিজের মত করে থাকার একটি ব্যবস্থা। আমাদের দেশে ক্যাম্পিং ট্রেন্ডটা এখনও খুব  ভালমত শুরু হয়নাই। ক্যাম্পিং সম্পর্কে সবার আগ্রহ থাকলেও কেমনে ক্যাম্পিং করতে হয়,কি কি ব্যাপার খেয়াল রাখতে হয় সেই ব্যাপারে আইডিয়া কম। আজকে আমি আমার করা প্রথম ক্যাম্পিং অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। আসুন আমার সাথে ভার্চুয়াল এক ক্যাম্পিং এর অভিজ্ঞতা নিয়ে নিন।

সময়টা ২০১৩। কুমিল্লার এক গ্রুপের সাথে চট্রগ্রামের সীতাকুন্ডে একটি ক্যাম্পিং প্ল্যান করা হলো।এর আগে ক্যাম্পিং এর কোন অভিজ্ঞতা নাই।তাই বেশ উত্তেজনা কাজ করছিলো। আমরা ঢাকা থেকে তিনজন রওনা দিলাম কুমিল্লার উদ্দেশ্যে।পথিমধ্যে বাধা মেঘনা গোমতি সেতুতে।সেতুর সংস্কারের কাজ চলছে। নৌকা এবং ট্রলার দিয়ে হাজার হাজার মানুষ সেতুর নিচ দিয়ে পার হচ্ছে।পার হবার পথেই ট্রলার নৌকার সংঘর্ষে টপাটপ কয়েকজনকে নদীতে পরে যেতে দেখলাম। খুব নির্বিকার ভঙ্গিতেই তারা আবার নৌকায় চড়ে বসলো।যাইহোক,কুমিল্লা পৌছাতে পৌছাতে দুপুর।সারাদিন প্রানের কুমিল্লা শহর ঘুরে জম্পেস এক বৌকালিক আড্ডা মারলাম ধর্ম সাগর পাড়ে।সাথে চলতে থাকলো প্ল্যানিং এবং ক্যাম্পিং এর জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করার লিস্ট তৈরির কাজ।তাবু রেডি।এখন শুধু দুইদিন থাকার জন্য দরকারী জিনিশপত্র কেনার কাজ।সন্ধার পর পরই বাজারে চলে গেলাম আমরা।বেশ সৌখিন গ্রুপ আমরা।চলতে থাকলো ভরপুর বাজার সদাই।কি নাই সেখানে।চাল,ডাল,লবন,কেরোসিন,টি-ব্যাগ,চিনি,নানান ধরনের মশলা,রশি,রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় সকল উপকরন।পরদিন ভোরবেলা রওনা হবো।শুধু নরমাল ট্রেকিং হলে কথা ছিল।দুইদিন জঙ্গলে থাকবো।দারুন এক উত্তেজনা নিয়ে রাতে ঘুমাতে গেলাম।পরদিন সকালে কুমিল্লা থেকে বাসে করে রওনা দিলাম সীতাকুন্ডের পন্থিছিলার উদ্দেশ্যে।আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন সীতাকুন্ড সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত।পথে জ্যামের মাঝে থাকা সবজির গাড়িগুলোও আমাদের থেকে রেহাই পায়নি।দুইদিনের রসদের জন্য সামনে যা পাচ্ছিলাম সবই কিনে নিচ্ছিলাম আমরা।সকাল সকাল পৌছে গেলাম সীতাকুন্ড।আরও কিছু কেনাকাটা শেষে ভরপেট খেয়ে রওনা দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।ঠিক সেই সময়ই একটি কাকতালীয় ব্যাপার ঘটে গেলো।দূর থেকে দেখলাম একদম আপদামস্তক ট্রেকিং বেশে একজন হেটে আসছে।বুঝতে কষ্ট হলোনা আমাদের সবার প্রিয় কালপুরুষ অপু ভাই উনি।উনিও এদিকে আসছিলেন একটা টিমের সাথে জয়েন করতে।কিন্তু কিছু ঝামেলার কারনে তারা আসতে পারেনি।এই সুযোগে অপু ভাইকে আমাদের সাথে যেতে অফার করতেই উনি রাজি।অনেকদিনের পরিচয়,ট্রেকিং এর সুত্র ধরেই পরিচয়।কিন্তু এবার একসাথে ট্রেক করার সুযোগ পেলাম।

বিশাল লটবহর আর খাবার নিয়ে রওনা দিলাম আমরা ঝরঝরি ঝর্নার উদ্দেশ্যে। কিন্তু আমাদের জন্য যে তার থেকে আরও বেশি কিছু অপেক্ষা করছে তা তখন পর্যন্ত বুঝিনাই। যাইহোক কিছুক্ষনের মধ্যেই ঢুকে পরলাম ট্রেইলে।পুরা পাহাড় জুড়ে নানান ফুলের সমারোহ।আর রাজ্যের পাখির ডাক একটি অন্যরকম পরিবেশের। কিন্তু এরই মাঝে দেখলাম স্থানীয় কিছু টুরিস্ট ঝিরির পাশে নোংরা করে রেখে গেছে।পলিথিন,খাবারের প্যাকেট।আমরা কিছুক্ষনের জন্য হাটায় ইস্তফা দিলাম।সব ময়লাগুলো একসাথে জড়ো করে আগুন দিয়ে দিলাম।এরপর আবার নেমে পরলাম ঝিরিতে।খুব দ্রুতই ঝরঝরি ঝর্নায় চলে গেলাম।ঝর্নায় তেমন পানি ছিলনা। আমাদের প্ল্যান ছিল এটার সামনে ক্যাম্পিং করার। কিন্তু অপু ভাই আছে আমাদের সাথে।তাই ঝরঝরি ক্রস করে আবার হাটা ধরলাম উনার সাথে। আস্তে আস্তে একের পর এক প্রকৃতির অসাধারণ রুপ উন্মোচন হতে থাকলো আমাদের সামনে।

চলছে কথাবার্তা।বক্তা অপু ভাইচলছে কথাবার্তা।বক্তা অপু ভাই

ট্রেইলে ঢোকার মুহুর্তেট্রেইলে ঢোকার মুহুর্তে

চলছে ময়লা আবর্জনা পোড়ানোর কাজচলছে ময়লা আবর্জনা পোড়ানোর কাজ

 

মেঠো পথ,নিয়ে যাও আমাকে,পাহাড়ি সেই দেশে, যেখানে আমার জীবন মেঠোপথমেঠো পথ,নিয়ে যাও আমাকে,পাহাড়ি সেই দেশে, যেখানে আমার জীবন মেঠোপথ

এই ট্রেইলটাতে এমনিতেই তেমন মানুষ ঢুকেনা,তাই এটাকেই বেছে নেওয়া।তার উপর মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মত একের পর এক লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য্য।পৃথিবীর সব থেকে আনন্দময় একটা অনুভুতি হচ্ছে ঝিরিপথ দিয়ে হাটা।ঝরঝরি ক্রস করে কিছুদূর যাবার পর একটা বিশাল ক্যাসকেড পেলাম।পেলাম কিছু স্থানীয় লোকজন যারা বাশ সংগ্রহ করতে এই গহীন জঙ্গলে ঢোকে।আমরা এগিয়ে যেতে থাকলাম।কোথায় ক্যাম্প সেট করবো তা তখনও জানিনা।হাটতে হাটতে একটা সময় আমরা একটা সরু টানালের মত অন্ধকার একটা ঝিরিতে ঢুকে পরলাম।যেখানে দিনের আলো ঢুকতেও হিমশিম খায়।জায়গাটা বেশ গা ছমছমে।কিছুদূর এগোতেই মাথায় হাত।বেশ গভীর একটা জায়গা।এরপর পাথুরে একটা খাজ পাশ দিয়ে উঠে গেছে।অপু ভাইর থেকে জানলাম জায়গাটার নাম ‘ডেভিল ফলস (শয়তানের ঝর্না)’।আমরা একে একে ব্যাগ মাথায় নিয়ে রশির সাহায্যে এই জায়গা উঠলাম।কিন্তু তখনও আসল কাজ বাকী।ডেভিল ফলস পার হতে পাথুরে একটা খাজের মত জায়গা আছে।সেটা আরও রিস্কি।প্রচন্ড পিচ্ছিল এবং এটা কোন রাস্তাও না।শুধুমাত্র দুইপাশের পিচ্ছিল পাথরে পা  দিয়ে ব্যালেন্স করে এগোতে হবে।আমরা এত জিনিশপত্র নিয়ে কোনরকম দূর্ঘটনা ছাড়াই জায়গাটা পার হলাম।আমাদের জন্য তখন অপেক্ষা করছিলো আরও সুন্দর একটা কিছু।আমাদের ক্যাম্পিং প্লেস।ডেভিল ফলস পার হতেই এই ছোট ঝর্নাটি।আমাদের টিমের সবাই ততক্ষনে ব্যাগ রেখে দে ঝাপ পানিতে।কেও কেও গোসল করতে নেমে গেলো।আমি এবং অপু ভাই লেগে গেলাম ক্যাম্পিং এর অন্যতম মুল উপাদান লাকড়ির সংগ্রহের কাজে।কিছুক্ষন পর আমাদের সাথে জয়েন করলো আরও কয়েকজন।সারারাতের  লাকড়ি সাথে রান্নাবান্নার জন্যেও।লাকড়ি সংগ্রহ করা শেষ করে আমরা আমাদের তাবু সেট করতে লাগলাম।আমাদের সাথে পপআপ তাবু ছিল।খুলে দিলেই কোন ঝামেলা ছাড়া অটো সেট হয়ে যায়।আমরা গিয়েছিলাম ফেব্রুয়ারি মাসে।শীতের প্রায় শেষ।কিন্ত সেই সময়ও পাহাড়ে কি পরিমান ঠান্ডা থাকে তা চিন্তাও করতে পারিনাই।আমরা চুলা বানায় ফেললাম।পাহাড়ে রাত খুব তারাতারি নেমে আসে।আমাদের চারপাশ পাহাড় দিয়ে ঘেরা,তাই হয়তো আরও তারাতারি নেমে আসছে।রাতের খাবারের জন্য বেশ আলিশান আয়োজন আমাদের।পাহাড়ি মুরগি সাথে সবজি,ভাত,সালাদ।ক্যাম্পিং এ আগুন জ্বালানো বেশ চ্যালেঞ্জিং একটা কাজ।ভালমত আগুন ধরাতে বেশ বেগ পেতে হয় আমাদের।অবশেষে আগুন জ্বললো।ক্রমেই ঠান্ডা বাড়তে থাকলো।আমরা শীতের কাপড় আনলেও সেগুলা এই ঠান্ডার কাছে বারবার হার মেনে যাচ্ছিল।এদিক দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ চলছে।অন্যদিক দিয়ে কেও হেড়ে গলায় গেয়ে যাচ্ছে একটার পর একটা গান।আমরা কয়েকজন ঝর্নার সাইড ধরে উপরে চলে গেলাম।আকাশে ভরা জোৎস্না।উপর থেকে আমাদের ক্যাম্প সাইটটা তখন অসাধারন লাগছিলো।চারপাশে ঝিঝি পোকার ডাক।এদিক সেদিক নিজ আলো জ্বেলে জোনাকি পোকা জানান দিচ্ছে তারাও আমাদের সাথে আছে।আমরা একটা সময় পাহাড়ের এই নিস্তব্ধতার সাথে মিশে গেলাম।পাশ দিয়ে ঝিরির পানির শব্দ,চাঁদের আলোয় জায়গাটিকে অপার্থিব লাগছিলো।

প্রকৃতি যেন তার রুপ মেলে ধরেছে এখানেপ্রকৃতি যেন তার রুপ মেলে ধরেছে এখানে

সাথে থাকা এত রসদ নিয়ে এই জায়গাটা পার হতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিলোসাথে থাকা এত রসদ নিয়ে এই জায়গাটা পার হতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিলো

রান্না শেষ হলো।খিদায় ততক্ষনে সবার অবস্থা খারাপ।সিরিয়াল ধরে বসে গেলাম।দেখলাম আমাদের ভাত দেওয়া হচ্ছে সিমেন্টের বস্তা থেকে।কারন আমরা রান্নার জন্য একটি ডেকচি এনেছিলাম।তাই ভাত রান্নার পর সেটার ঠাই হয় সিমেন্টের বস্তায়।যদিও পুরা বস্তা ঝর্নার পানিতে বেশ ভালমত ধুয়ে নেওয়া হয়েছিল।প্রয়োজনের সময় মাথা থেকে যে কত আইডিয়া বের হয় তার বড় একটা উদাহরন বোধহয় এটা।পাহাড়ি মুরগি,সবজি সাথে সালাদ দিয়ে জম্পেশ খানাদানা হলো।ততক্ষনে ঠান্ডা আরও ভালমত জেকে বসেছে পাহাড় জুড়ে।ব্যাগে করে আনা কাথাটা বের করে ফেললাম ঠান্ডায়।খাওয়ার পর শুরু হলো আড্ডা।জীবনের এই পর্যন্ত আসতে অনেক আড্ডাই মারা হয়েছে।কিন্তু সেদিনের সেই আড্ডার কথা কখনও ভুলবো না।কি প্রানবন্ত সেই আড্ডা।অবস্থা এমন দাড়ালো যে হাসতে হাসতে আমাদের একজন ঝর্নার পানিতে পরে গেলো।আস্তে আস্তে আড্ডার জায়গা খালি হতে থাকলো।সারাদিনের ধকলে সবাই তাবুর ভেতর ঢুকে ঘুমের প্রস্তুতি নিল।আপনাদের এরই মাঝে আরেকটি ব্যাপার জানিয়ে রাখি।আমাদের তাবুর পিচ করার জায়গাটা সমান ছিলনা।পুরোটা ছিল খাজকাটা টাইপ,যেখানে পিঠ লাগানো দায়।আমরা তাই প্রথমেই আশপাশ থেকে বড় পলিথিন ভর্তি করে শুকনো পাতা নিয়ে আসলাম।এরপর সেই খাজগুলো শুকনো পাতা দিয়ে ঢেকে তারপর তাবু পিচ করলাম।রাত গভীর হলো।আমরা একে একে তাবুর ভেতর ঢুকে গেলাম।সারাদিনের এত ধকলের পরও ঘুম আসছিলোনা।চারপাশ থেকে ভেসে আসা নানান শব্দ শুনতে শুনতে একটা সময় ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলাম।

আমাদের বসতবাড়িআমাদের বসতবাড়ি

ঝিরি ধরে এগিয়ে চলাঝিরি ধরে এগিয়ে চলা

ডেভিল ফলসে ঢোকার আগ মুহুর্তেডেভিল ফলসে ঢোকার আগ মুহুর্তে

 

এই সেই ডেভিল ফলস,যদিও পানি কম ছিল।রাতের আধারে জায়গাতা বেশ ভয়ংকর লাগেএই সেই ডেভিল ফলস,যদিও পানি কম ছিল।রাতের আধারে জায়গাতা বেশ ভয়ংকর লাগে

পার হচ্ছি ডেভিল ফলসপার হচ্ছি ডেভিল ফলস

 

বেশ রিস্ক নিয়েই পার হতে হচ্ছিলো কিছু জায়গাবেশ রিস্ক নিয়েই পার হতে হচ্ছিলো কিছু জায়গা

আর অন্যান্য দিনের মত ছিলনা সেদিনের ঘুম ভাঙ্গাটা।ঘুমের ঘোরেই ঝর্নার শব্দ আর পাখির ডাক শুনছিলাম।এই শব্দগুলোই আমাকে ঘুমের জগত থেকে বের করে আনলো।মাথার কাছে থাকা তাবুর জানালা টা খুলে দিলাম।ভোরের কুয়াশায় ঝর্নাটা দেখতে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিলো।কতক্ষন ধরে তাকিয়ে ছিলাম ঠিক মনেও নাই।আস্তে আস্তে সবাই ঘুম থেকে ওঠা শুরু করলো।ক্যাম্পের দ্বিতীয় দিন আজকে।উঠেই ঝর্নার পানিতে হাতমুখ ধুয়ে সকালে নাস্তার আয়োজনে লেগে পরলাম সবাই।আগেই বলেছিলাম এটা একটা আলিশান ক্যাম্পিং।তাই খাবারদাবারে কোন কার্পন্য নেই আমাদের।আবার চুলা জ্বালানো হলো।খিচুরি রান্না করা শুরু হলো বিভিন্ন রকমের সবজি দিয়ে।খিদেয় পেটে তখন ছুচো নাচছে।এরই মাঝে আমরা কয়েকজন মিলে ঝর্নার উপরের ঝিরি ধরে বেশ কিছুক্ষন ঘুরে আসলাম।আশপাশটা বেশ বুনো।সীতাকুনন্ডের যে কোন ট্রেইলেই আপনে প্রচুর লতা-পাতা পাবেন।এগুলো বেশ সাপোর্ট দিবে আপনাকে।আশপাশটা ঘুরে এসে নাস্তা করতে বসে গেলাম সবাই।অনেকে ঝর্নার পানিতে বসেই নাস্তা সারলাম।সেই খিচুরির স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে।যাইহোক,নাস্তার পর চায়ের ব্যবস্থা হলো।ঝর্না থেকে পানি নিয়ে গরম করে টি-ব্যাগ দিলাম।চিনি দেবার পর গাছের কাঠি দিয়ে নাড়িয়ে বানিয়ে ফেললাম একদম ন্যাচারেল মিনারেল চা।খাবার পর্ব শেষে আমরা আস্তে ধিরে প্রস্তুতি নিতে থাকলাম আরও দূর এগিয়ে যাবার।কারন উপরের ঝিরি ধরে গেলেই আরও একটি ঝর্না।অপু ভাই আমাদের ঝর্না এবং ঝর্না পার হবার সিস্টেম দেখিয়ে আজকেই বিদায় নিবে।আমরা জিনিশপত্র সব রেখে রওনা দিলাম নতুন ঝর্না দেখার উদ্দেশ্যে।ঝিরিটা অসাধারন।প্রচুর লতা ঝুলে আছে গাছগুলো জুড়ে।একদম বন্য একটা পরিবেশ।হাটতে হাটতে একটা সময় পৌছে গেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত ঝর্নায়।মনে হচ্ছিলো এই জায়গায় অনেকদিন কারো পা পরেনা।আসলেই তাই।খুব কম মানুষেরই যাতায়াত এই ঝর্নায়।এখন ঝর্না পার হতে হবে।ঝামেলাটা এখানেই।ঝর্নার সাইড দিয়ে যাওয়া রাস্তা বেয়ে উঠলে বের হবার রাস্তা পরেনা।তাই এই ঝর্না ক্রস করতে আমরা ৩-৪ জন একদম খাড়া পাখুরে একটা দেয়াল অনেকটা রিস্ক নিয়েই পার হলাম।পুরাটাই লতাপাতা ধরে।কোন কারনে নিচে পরলে খুব ভালমতই আহত হতে হতো।সাইড দিয়ে উঠে আমরা ঠিক ঝর্নার পানি যেখান দিয়ে পরে সেখানে পৌছে গেলাম।আমাদের সাথে দড়ি ছিল।ততক্ষনে সবাই ঝর্নার নিচে এসে উপস্থিত।ট্রেনিং হবে রশি দিয়ে ঝর্না উঠার।নিচে আমাদের বেশ অভিজ্ঞ একজনকে রাখলাম আমরা।রশি ফালানো হলো।একে একে সবাই বেশ সাহসের সাথেই উঠে আসলো।এরই মাঝে ঘটলো একটা মজার ঘটনা।একজনকে উঠাতে গিয়ে লতা মনে করে বিষকাটা গাছে হাত দিয়ে পুরোটা ধরে বসলাম।একটু পরেই শুরু হলো বিষের জলুনি।যাইহোক,সবাইকে উঠাবার পর আমরা একদম সাথের পাহাড়ের উপর চলে যাই এবং আমাদের বের হবার পথ দেখে নেই।বেশ মন খারাপ করেই বিদায় দিতে হয় অপু ভাইকে।আবার আমরা ফিরে আসলাম আমাদের ক্যাম্প সাইটে।পুরা জায়গাটাকেই তখন বেশ আপন মনে হচ্ছিলো।মনে হচ্ছিলো একদম নিজেদের জায়গা।ঝর্নাতে বেশ হই হুল্লুর করতে করতে গোসল পর্ব শেষ করলাম।এরই মাঝে চলছিলো দুপুর আর রাতের খাবার রান্নার কাজ।খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই বসলাম বিশাল আড্ডার।আড্ডা চলতেই থাকলো।সন্ধ্যা হতেই শুরু হলো নানান প্রস্তুতি।এদিক দিয়ে সন্ধার নাস্তা বানানো হচ্ছে,বিভিন্ন ধরনের জিনিশ দিয়ে মুড়ি মাখানো সাথে চা কফি।আর রাতে ক্যাম্প ফায়ারের জন্য বানানো হচ্ছে মশাল।আজকেই শেষ রাত।তাই শেষ রাতের উপভোগটাও স্বরনীয় করে রাখতে চাইছিলাম সবাই।

ভোরের বেলা।অনেকেই তখনও গভীর ঘুমেভোরের বেলা।অনেকেই তখনও গভীর ঘুমে

 চলছে খাবার বিতরনের কাজ।সবাই কাঙ্গালের মত হয়ে ছিলাম খিদায় চলছে খাবার বিতরনের কাজ।সবাই কাঙ্গালের মত হয়ে ছিলাম খিদায়

ঠান্ডায় কাপতে কাপতে চলছে খানাদানাঠান্ডায় কাপতে কাপতে চলছে খানাদানা

ঝর্নার উপরের অংশেঝর্নার উপরের অংশে

 

আজকে আর খাবারের ঝামেলা নেই।দুপুরেই রাতের খাবার রাধা হয়েছিল।শুধু গরম করা।আমরা কয়েকজন মিলে চলে গেলাম ডেভিল ফলসের দিকে।গাড় অন্ধকারে যে কি ভয়ঙ্কর লাগছিলো শয়তানের ঝর্নাটাকে তা যে নিজ চোখে যারা দেখেনি বুঝবেনা।আমরা চাঁদের আলোয় হাটা শুরু করলাম ঝিরি দিয়ে।উদ্দেশ্যহীনভাবে হাটা।আপনারা হয়তো অনেকেই বলবেন ব্যাপারটা অনেক রিস্কি।রাতে বেলা বন জঙ্গলে অনেক কিছুই থাকতে পারে।কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের মাথায় এই ব্যাপারটা তখন কাজই করেনি।আমাদের মধ্যে থাকা একজন পাশের পাহাড়ে উঠে গেলো মোবাইলের নেটওয়ার্কের জন্য।কয়েকজন এই রাতের বেলায়ই ঝর্নার মুখের কাছে ধ্যানের ভঙ্গিতে বসে ছিল।মনে হচ্ছিলো এই জায়গাটা আমাদের।আমাদের জন্যই তৈরি।রাতের খাবারটা সেরে ফেললাম আমরা।এরপর ঝর্নার আশপাশ জুড়ে মশাল সেট করে জ্বালিয়ে দিলাম।চলতে থাকলো আড্ডা,গান।চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিলো আমাদের ক্যাম্পসাইট।হুট করে মনটা খারাপ হয়ে গেলো আজকেই শেষ রাত চিন্তা করে।দুইটা দিন এভাবে জনবিচ্ছিন্ন থেকে মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার সকল সুখ এই পাহাড়েই। ঢাকায় তখন বলে কার্ফু চলে।আমাদের কোন কার্ফুর ভয় নেই।কোন মানুষের ভয় নেই।জানজট,ব্যাপক হর্নেরও ভয় নেই।মশাল জ্বলতে থাকলো।চলতে থাকলো আড্ডা সাথে মিনারেল চা।কেও কেও নিজেকে নতুন করে চিনতে চলে গেলো ঝর্নার উপরের অংশে।একা একা বসে জীবনের মানে খোজার চেষ্টা করছিলো।কয়েকজন জেগে ছিল সারাটা রাত।এক অপার্থিব সময় ছিল সেটি।আস্তে আস্তে আগুনের তেজ কমতে থাকলো।কুয়াশায় তাবু ভিজে যেতে থাকলো।সারাদিনের ক্লান্ত আমরা শেষবারের মত তাবুতে ঢুকে গেলাম।ভোরে উঠতে হবে।শোবার পরও কারও চোখে ঘুম নেই।প্রত্যেকটা তাবু থেকেই কথা শোনা যাচ্ছে।একটু পরে তাবু থেকে তাবুতে আড্ডা শুরু হলো।এই রাতের বেলাও হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ।আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পরলো সবাই।জেগে থাকলো কয়েকজন।পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম আমরা।চলে যাবার প্রস্তুতি।সব কিছু গুছগাছ করতে লাগলাম।আশপাশের সব ময়লা একসাথে জড়ো করে আগুনে পুড়িয়ে দিলাম।সবকিছু শেষে রওনা দিলাম।মনটা খারাপ হয়ে ছিল সবার।মাত্র দুইটা দিনেই জায়গাটা কতটা আপন হয়ে গেছে।কিন্তু কি আর করার,শুরু করলাম হাটা।চলে গেলাম সেই ঝর্নায়।আজকে ঝামেলা বেশি।আমাদের সাথে থাকা সকল জিনিশপত্র উঠাতে হবে।আমরা কয়েকজন উঠে রশি ফালালাম।আমাদের সাথে থাকা ব্যাগ,আর সকল জিনিশপত্র উঠালাম এক এক করে।এরপর আগেরদিন করা ট্রেনিং এর সদ্বব্যবহার করলাম।সবাইকে একে একে উঠিয়ে হাটা ধরলাম।পাহাড় ধরে হাটতে হাটকে উঠে গেলাম একদম উচুতে।পুরা পাহাড় নানান রঙ্গে সেজেছে নানান ফুলে।চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।এক্সিট পয়েন্ট দেখে এবার শুরু করলাম নামা।বেশ অনেক্ষন হাটার পর চলে আসলাম লোকালয়ে।সেখানে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিলাম।সামান্য বিশ্রাম নিয়ে রওনা দিলাম সীতাকুন্ড বাজারের উদ্দেশ্যে।

ঝিরি ধরে এগিয়ে চলাঝিরি ধরে এগিয়ে চলা

চলছে রশি দিয়ে জিনিশপত্র ওঠানোর কাজচলছে রশি দিয়ে জিনিশপত্র ওঠানোর কাজ

চলছে প্রথমদিনের ট্রেনিংচলছে প্রথমদিনের ট্রেনিং

চলছে রশি ফেলে সবাইকে উঠানোর কাজচলছে রশি ফেলে সবাইকে উঠানোর কাজ

অনেকের কলিজা নাই হয়ে গেসিলো :pঅনেকের কলিজা নাই হয়ে গেসিলো :p

 

শেষের ঝর্নায় উঠতে এই ভার্টিক্যাল দেয়াল পার হতে হবে আপনাকে।বেশ রিস্কি একটা কাজশেষের ঝর্নায় উঠতে এই ভার্টিক্যাল দেয়াল পার হতে হবে আপনাকে।বেশ রিস্কি একটা কাজ

 

ভোরবেলা।তখনও ঘুমাচ্ছে অনেকেভোরবেলা।তখনও ঘুমাচ্ছে অনেকে

চলে যাবার আগে সব পরিষ্কার করা হচ্ছে।চলে যাবার আগে সব পরিষ্কার করা হচ্ছে।

 

ঝিরিপথঝিরিপথ

 

ফিরে যাচ্ছি লোকালয়েফিরে যাচ্ছি লোকালয়ে

চলে যেতে হবে আবার সেই ঘুনে ধরা নগরীতে।যেখানে শান্তিতে নিঃশ্বাস নেবারও জো নেই।বাসে চড়ে বসলাম বিষাক্ত নগরীর উদ্দেশ্যে।কিন্তু আমাদের চোখ,আমাদের মনটা পরে ছিল পাহাড়ে।বাস চলছে।আস্তে আস্তে চোখের আড়াল হচ্ছে পাহাড়গুলো।মনে হচ্ছিলো কি যেন ফেলে যাচ্ছি।পাহাড় আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়,আমরা কতটা ক্ষুদ্র প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য্যের কাছে তা বুঝতে শেখায়।প্রতিবার পাহাড়ে এসে মানুষিক শক্তি নিয়ে ফিরি আমরা।এই শক্তিই আমাদের পথ চলার গতিকে আরও ত্বরান্বিত করে।এই ক্ষমতা শুধু পাহাড়েরই আছে।

 

নেস্টর