হিমালয়ের পাদদেশের অভ্যন্তরে প্রতিপালিত নাগাল্যান্ড ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সবচেয়ে সুন্দর রাজ্য।

উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রেক্ষাপটে নাগারাই প্রথম বিদ্রোহ করে। তারা ভারতীয় রাষ্ট্রে অঙ্গীভূত হতে অস্বীকার করে এবং ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এরই আগে ১৯৪৭ সালের জুন মাসে নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল (এনএনসি) গঠিত হয়। এ সংগঠনটি নাগা জনগোষ্ঠীর একমাত্র প্রতিনিধি রুপেনাগা হিলে একটি গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য ভারতের প্রতি দাবি জানায়। নিজেদের রাজনৈতিক ভাগ্য গণতান্ত্রিকভাবে বেছে নেয়ার লক্ষ্যে নাগাদের মতোই কাশ্মীরিরাও কাশ্মীর-উপত্যকায় গণভোটের দাবি জানিয়েছিল। জনগণের পক্ষ থেকে উত্থাপিত উভয় দাবিই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অগ্রাহ্য করে। নাগা প্রসঙ্গে লক্ষণীয় যে, যখন ভারত এ দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন এনএনসি-এর উদ্যোগে ১৯৫১ সালের মে মাসে নাগা জনপদে একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ গণভোটের মাধ্যমে নাগা স্বাধীনতার পক্ষে সম্পূর্ণ সমর্থন প্রকাশিত হয়। এখনও নাগারা সেই গণরায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

জুকৌ উপত্যকাজুকৌ উপত্যকা

ভারতবর্ষ বৃটিশ শাসনে থাকলেও নাগারা প্রথম সভ্য জগতের খবর পেয়েছিল আমেরিকান-খৃস্টান মিশনারিদের কাছ থেকে। সেটা প্রায় দু'শ বছর আগের কথা। তারপর আলাদা অঙ্গরাজ্যরূপে ভারত ও পৃথিবীর বুকে নাগা অস্তিত্ব ঘোষিত হয়, নাগারা বিদ্রোহ করে সেটাও প্রায় ৪৫ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু সাধারণ নাগারা এখনও তাদের চিরায়ত সমাজের কোটর ছেড়ে বেশি দূর এগিয়ে আসতে পারেনি। নাগারা নাগাল্যান্ডের বাইরে সহজে যেতে চায় না। বাইরের মানুষকেও সহজে গ্রহণ করতে চায় না। অতীতে এমনও দেখা গেছে যে, সর্বভারতীয় চাকরিতে (যেমন রেল, ডাক ও তার, আয়কর, জীবনবীমা ইত্যাদি) নিযুক্ত কোন নাগা নাগরিক নাগাল্যান্ডের বাইরে বদলি হলে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। ভারতের বা বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বাঙালি, শিখ, গুজরাতি, তামিল, মারাঠিদের যেভাবে বসতি গড়ে তুলতে দেখা যায়-নাগা বা উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতবোন রাজ্যগুলোর কোন জনগোষ্ঠীর নাগরিকদের সেই তুলনায় দশমিক ভাগও সক্রিয় দেখা যায় না।

জুকৌ উপত্যকাজুকৌ উপত্যকা

ইতিহাসও নাগাদের জন্য এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে। মানুষের মাথা শিকার করার বিশেষণটা যে নাগাদের পেছন ছাড়ছে না তারও একটি ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। নাগারা অর্ধশতাব্দী আগেও মানুষের মাথা শিকার করত এবং বীরত্ব প্রদর্শনের নিদর্শনস্বরূপ ‘ট্রফি' হিসাবে সেগুলোকে তাদের বসত-ঘরে টাঙিয়ে রাখত। এই বীরত্বব্যঞ্জক মস্তক শিকার এমন ব্যাপক ও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, প্রতিটি গ্রাম বাধ্য হয়েছিল নিশ্চিদ্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। খাড়া পর্বতশৃঙ্গে বসতি গড়ে, সেই বসতির চারপাশে উঁচু উঁচু পাথর সাজিয়ে প্রাচীর তুলে, সমস্ত লোকের আসা-যাওয়ার একটি মাত্র দরজা বানিয়ে, প্রতিটি গ্রাম হয়ে উঠেছিল এক-একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। আর তার থেকেই জন্ম নিয়েছিল বিচ্ছিন্নতা। নাগারা মূলত একটাই উপজাতি এবং একই ভাষাগোষ্ঠীর লোক হওয়া সত্ত্বেও এই গ্রামবিচ্ছিন্নতার জন্যই বর্তমানে ৩০/৩৫টি উপজাতি এবং ভাষাগোষ্ঠীতে বিভক্ত। বিচ্ছিন্নতা এমনই স্তরে পৌঁছে গেছে যে, এক উপজাতি আরেক উপজাতির ভাষা পর্যন্ত বোঝে না। নাগাল্যান্ডের সরকারি ভাষা ইংরেজি। হিন্দি নয় ইংরেজি শেখাতেই সিংহভাগ নাগাদের আগ্রহ। হিন্দিশিখতে চাওয়া নাগার সংখ্যা নগণ্য-মুষ্টিমেয়-আঙুলে গোনা যায়।

জুকৌ উপত্যকাজুকৌ উপত্যকা

 

এই নাগাল্যান্ডের অন্যতম সুন্দর দর্শনীয় স্থান জুকৌ উপত্যকা। 

জুকৌ উপত্যকা:-

জুকৌ বা নাগাল্যান্ডের জুকৌ উপত্যকা ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত একটি চিত্রানুগ অঞ্চল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৪৩৮ মিটার বা ৭৯৯৮ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই সুন্দর উপত্যকা রাজ্যের রাজধানী কোহিমা থেকে দক্ষিণে ৩০ কিমি দূরে অবস্থিত। উদ্ভিদকুল ও প্রাণিকুলের একটি গুপ্তধন জুকৌ, একে অনেকেই ভালবেসে ফুলের উপত্যকা বলে অভিহিত করেছেন। এই শৈল শহরের বিস্ময়কর প্রাকৃতিক কাব্য বর্ষাকালে একটি চিত্তাকর্ষক দৃশ্য প্রদান করে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস নিঃসন্দেহে জুকৌ উপত্যকা পরিদর্শনের সেরা সময়।

জুকৌ ট্রেকজুকৌ ট্রেক

জুকৌ উপত্যকার পাহাড়ি আঁকা বাঁকা পথ ট্রেকারদের একটি স্বর্গোদ্যান। রডোডেনড্রন, ইউফোরবিয়া, অ্যাকোনিটাম এবং লিলি গ্রীষ্মের প্রারম্ভে জুকৌ ভ্যালিকে রঙে ভরিয়ে তোলে। বন্য ফুলের স্পন্দনশীল রং এই সম্মোহিত উপত্যকাকে একটি স্বর্গীয় চেহারা প্রদান করে।

জুকৌ উপত্যকা কোহিমা থেকে ৩০ কিমি দূরে অবস্হিত।৭৯৯৮ ফুট উচ্চতার জুকৌ ট্রেকিং এর জন্য আদর্শ।রাতে জুকৌতে আপনি টেন্ট করে থাকতে পারবেন।সেক্ষেত্রে টেন্ট এবং খাওয়ার ব্যবস্হা আপনাকে করতে হবে।

টেন্ট... জুকৌ ট্রেকটেন্ট... জুকৌ ট্রেক

নাগাল্যান্ড পৌঁছানোর উপায় এবং বিদেশীদের জন্য FRO:-

নাগাল্যান্ড আপনি শিলং থেকেও যেতে পারেন আবার গুয়াহাটি থেকেও যেতে পারেন।প্রথমে ডাউকি বর্ডার পার হয়ে ডাউকি থেকে ট্যাক্সি রিজার্ভ করে অথবা শেয়ার করে শিলং যেতে হবে।শিলং পর্যন্ত ট্যাক্সি রিজার্ভ করলে ভাড়া পড়বে ১৫০০-১৮০০ রুপি।আর শেয়ারে গেলে জনপ্রতি ১৫০ রুপি।শিলং থেকে নাগাল্যান্ড যাওয়া যায় দুইভাবে।সরাসরি বাস সার্ভিস আছে শিলং থেকে নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমা পর্যন্ত।ভাড়া জনপ্রতি ৭০০ রুপি।আবার ৭ সিটের ইনোভা গাড়ীতেও যেতে পারেন।জনপ্রতি ১২০০ রুপি।

এছাড়াও গুয়াহাটি থেকেও নাগাল্যান্ড যাওয়া যায়।সেক্ষেত্রে আপনাকে শিলং থেকে ট্যাক্সি করে যেতে হবে গুয়াহাটি।ভাড়া জনপ্রতি ২৫০ রুপি।গুয়াহাটি থেকে নাগাল্যান্ড এক্সপ্রেস ট্রেনে যেতে পারেন ডিমাপুর।নাগাল্যান্ড এক্সপ্রেস প্রতিদিন রাত ১১.৩৫ মিনিটে ছাড়ে।ভাড়া ১৫০-৮৫০ পর্যন্ত।ভোর ৫টায় ট্রেন আপনাকে ডিমাপুর নামিয়ে দেবে।ডিমাপুর থেকে ট্যাক্সি করে কোহিমা।ভাড়া জনপ্রতি ৪০০-৫০০ রুপি।৪ ঘন্টার মত লাগবে কোহিমা পৌঁছাতে।রাস্তা খুবই বাজে।

জুকৌ ট্রেকজুকৌ ট্রেক

বিদেশীদের জন্য নাগাল্যান্ডে ঢোকার নিয়ম হচ্ছে নাগাল্যান্ডে পৌঁছানোর পর লোকাল থানা থেকে FRO এন্ট্রি করে নেওয়া আর ইন্ডিয়ানদের ক্ষেত্রে ILP (Inner Line Permit) নেওয়া।বিদেশীরা যদি লোকাল থানা থেকে FRO না নেয় তাহলে চেক পোস্টে আটকে দেয়।নাগাল্যান্ড ঢুকতে হলে অবশ্যই আপনাকে লোকাল থানা থেকে পারমিশন নিয়ে ঢুকতে হবে।খুবই সোজা ব্যাপার।যে কোন লোকাল থানায় গিয়ে পাসপোর্ট দিলেই ওরা এন্ট্রি করে নেবে।