সেই অনেকদিন আগের কথা। ইউনিভার্সিটির এক বড় ভাই থাকেন অস্ট্রেলিয়াতে। খুব ঘুরে বেড়ান। একদিন তার ফেসবুকে দেখি এক আজব ছবি। খোলা আকাশের নিচে এক বিরাট স্ফটিক এর মত লেকে দাড়িয়ে আছেন আর তার ছায়া পড়ছে খুব পরিস্কার। পুরা উল্টা প্রতিবিম্ব। মনে হচ্ছে বিরাট এক আয়নার উপর দাড়িয়ে আছে আশেপাশের সবকিছু। খুব ম্যাজিকাল লাগলো।

আবার কিছু ছবি দেখলাম অনেকটা লিলিপুট আর গালিভার এর মত। বুঝা যাচ্ছে তারা সবাই এক সাথে ঘুরছেন কিন্তু ছবি তোলার এঙ্গেলের কারনে একজন কে মনে হচ্ছে লিলিপুট আরেকজন কে মনে হচ্ছিল গালিভার। যাইহোক সেইসব মজার ছবি দেখে ভাই কে জিজ্ঞেস করলাম কই এসব অদ্ভুত জায়গা? জানতে পারলাম দেশটার নাম বলিভিয়া। সেই বলিভিয়ার বিভিন্ন শহর এর ছবি।

লিলিপুট ছবি লিলিপুট ছবি

সেইদিন থেকে মাথায় গেথে ছিলো যদি কখনো সাউথ আমেরিকা যাই তাহলে অবশ্যই বলিভিয়ার ওই শহরগুলোতে তে যাব। এইবার এসে গেল সেই সুযোগ। ব্যাক্তিগত কারনে আমেরিকা গেলাম। যাওয়ার ঠিক পরদিন এ ফেসবুকে এক বন্ধুর শেয়ার করা লিঙ্ক এ গিয়ে দেখি বলিভিয়াতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট হোল্ডার দের জন্য অন আরাইভাল ভিসা সুবিধা আছে। সাথে সাথে ডিসিশান নিয়ে নিলাম। বলিভিয়া যাব। হয় এখন নাইলে কখনোই না।

সম্পূর্ণ পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া ট্যুর। আমি অবশ্য কখনোই অনেক আগে থেকে প্ল্যান করে ট্যুর করতে পারিনা। আমার মতে নো প্ল্যান ইজ দ্যা বেস্ট প্ল্যান। কই যাবো, কই থাকবো, কি দেখবো, কি খাবো এসব আগে থেকে গবেষণা করতে পারিনা আমি। ঘুরতে গেলে যা কিছু ভাল লাগে তাই করি। নট নেসেসারিলি আমার কোনো টুরিস্টিক প্লেস এ যেতে হবে অথবা কোনো মাস্ট ডু থিং করতে হবে। ভাল লাগলে আমি সারাদিন কোন একটা লেকের পাড়ে অথবা পার্কে শুয়ে বসে কাটিয়ে দিতে পারি।

যাইহোক, ফ্লাইট বুকিং এর বিভিন্ন সাইট ঘুরে মোটামুটি ভালো একটা ফেয়ার ডিল পেলাম আমেরিকান এয়ারলাইন্স এ। পরেরদিন ফ্লাইট। লম্বা রুট প্ল্যান। পথে একটা স্টপ। গন্তব্য বলিভিয়ার রাজধানি লা পায।

লা পায এর রাস্তায় লা পায এর রাস্তায়


যত সহজে বিমানের টিকেট করলাম ততটা সহজ যাত্রা না এয়ারপোর্ট এ গিয়ে বুঝতে পারলাম। আমার ফ্লাইট ডিপারচার এর মাত্র এক দেড় ঘন্টা আছে তখন আমি আমেরিকান এয়ারলাইন্স এর বোর্ডিং কাউন্টার এর এর সামনে দাড়িয়ে। উদ্দেশ্য বোর্ডিং পাস নেওয়া। আমার সামনে এক বিরাট লম্বা তালগাছ টাইপ আপা বসে আছেন, হাই বলা মাত্র তালগাছ আপা বলিভিয়ার ভিসা দেখতে চাইলো!

যখন বললাম অন এরাইভাল ভিসা তখন তালগাছ আপা এমন একটা লুক দিলেন যার মানে তিনি বুঝতে পারছেন না আমি আসলে কি বলতে চাইছি। আবারো যখন তাকে বুঝায়ে বললাম তখন তিনি বুঝলেন কিন্তু তারপর ও তাকে ভ্যালিড ভিসা দেখাতে হবে বোর্ডিং পাস ইস্যু করতে। কারন হিসেবে বললেন তাদের ডাটাবেইসে এমন কোনো ইনফো নাই যে বাংলাদেশের জন্য অন আরাইভাল ভিসা সুবিধা আছে বলিভিয়া তে। সো আই নীড টু হেভ এ ভিসা ফর বোর্ডিং। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো! বলে কি এই তালগাছ।

খুব ঠান্ডা গলায় বললাম আপনি কস্ট করে গুগল করেন আর বলিভিয়ার ইমিগ্রেশনের সরকারি ওয়েবসাইট দেখেন। কিন্তু তার সেই এক কথা ভিসা ছাড়া বোর্ডিং হবেনা। পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে বিদেশে এসব সার্ভিস লাইনে যারা প্রথমেই ডিল করেন তারা নরমাল লেভেল ওয়ান এমপ্লয়ি। এদের সামনে একটা ম্যানুয়াল থাকবে আর খুব নিশ্চিত ভাবে এরা ম্যানুয়াল এর বাহিরে কিছু ভাবতে পারবেনা। এর থেকে বড় সমস্যা হলো অন্যরকম কোন কিছু দেখলে অথবা অন্য কোনো সিচুয়েসন এরাইস করলে এদের মাথা কাজ করেনা এবং খুব নার্ভাস হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় কোনো উপায় খুজে বের করা অথবা যুক্তি দিয়ে কোনো কিছু বিচার করা এদের সাধ্যের বাহিরে।

এর মধ্যে ৩০ মিনিটের মতো গেছে। আমি তখন তারে বললাম তুমি এক কাজ কর, তোমার সুপারভাইজরকে ডেকে দাও আমি তার সাথে কথা বলতে চাই। এই কাজটা আবার তালগাছ আপা খুব ঝটপট করলো। এইবার আসলো এক বয়স্কা খালা। খালা রে বললাম খালা দেখেন আমি লা পায এর টিকেট করসি কিন্তু তোমার এয়ারলাইন্স কোম্পানি এর ডাটাবেইসে এ আমার দেশের নাগরিকদের জন্য অন এরাইভাল ভিসা সুবিধা আছে এই কথাটা আপডেট নাই। তুমি লেটেস্ট ইনফরমেশনের জন্য একটু গুগল করে দেখো।

খালা কথা শুনলো। দুই মিনিট সময় নিলো খালা। এর মধ্যে বলল ঠিক আছে, আমি দেখতে পাচ্ছি অন এরাইভাল ভিসা আছে বাংলাদেশিদের জন্য। কিন্তু তোমার হোটেল বুকিং আর ফ্লাইট সিডিউল এর ফটোকপি লাগবে আর অনলাইনে এই ফর্ম পুরন করে দাও। এই বলে খালা একটা লিঙ্ক কাগজে লিখে দিলো। লিঙ্কে গিয়ে কোনরকম পুরন করলাম কিন্তু সাবমিট করতে পারিনা কারন ওই লিঙ্ক একটা নির্দিস্ট রেজুলেশন এর ছবি চায়।

খালারে বললাম দেখ সবই ফিলাপ করসি কিন্তু ছবি আপ্লোড করতে পারতেছিনা। তুমি আমারে বিমানে উঠতে দাও আর মাত্র ৪০ মিনিট বাকি আছে। আমার টি.এস.এ পার হতে হবে। এই ভিসা এপ্লিকেশন ফর্মের বাদবাকি যা লাগে আমি লা পায গিয়ে বুঝবো। যদি ভিসা না পাই তাইলে সব আমার রিস্ক। খালা দুই সেকেন্ড কি যেন ভেবে আমাকে বোর্ডিং পাস ইস্যু করলেন আর আমি দিলাম দৌড়। সোজা টি.এস.এ। সেখান থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে বোর্ডিং এর গেট এ। লাস্ট পেসেঞ্জার হিসেবে উঠে পড়লাম লা পায এর ফ্লাইট এ। আদিওস ইউএসএ।


লম্বা ভ্রমন শেষে যখন এল আল্টো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট নামলাম তখন ভোর রাত। ফ্লাইটে বসে থাকতে থাকতে পায়ে খিল ধরে গেছে। প্লেন থেকে নেমে গিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসার রে পাসপোর্ট দিলাম। তখন চারদিকের অন্ধকার একটু একটু কাটতে শুরু করসে। বেচারা ইমিগ্রেশন অফিসার কিছুক্ষণ তাকাই থাকলো পাসপোর্ট এর দিকে। এরপর তার সামনের কম্পিউটারে এ কী কী যেনো পড়লো।

এইবার আমার দিকে ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে আমার পাসপোর্টের ছবির সাথে মিলানোর জন্য কয়েকবার তাকালো। যখন দেখলো ছবি মিলে তখন আমাকে বললো তোমার হোটেল রিজারভেশন কপি আর রিটার্ন ফ্লাইট এর টিকেট দেখাও। আমি তো হোটেল মোটেল ঠিক করি নাই, এইটা বললাম তারে। শহরে গিয়ে আমি দেখেশুনে হোটেল নিবো। কিন্তু সে এইটা বুঝতে নারাজ। তার কথা হলো তার সামনে ম্যানুয়ালে লেখা আছে রিজারভেশন লাগবে।

হাবভাব এ বুঝলাম এই ভোর রাতে ভাইজান এর সাথে তর্ক করে লাভ নাই। একটু সময় নিলাম তার কাছে রিজারভেশনের জন্য। এয়ারপোর্ট এর ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে ফ্রি ক্যানসেলশন ওয়ালা একটা হোটেল বুক দিলাম। তারে দেখালাম হোটেল রিজারভেশন এর কপি। ভাই এইবার বলে কাগজের কপি লাগবে। কই যে যাই এখন! তারে বললাম আমিএখন প্রিন্ট কেমনে করি। উপায় বলে দিলো। বললো তুমি তোমার পাসপোর্ট আমার কাছে দিয়ে ইমিগ্রেশন পার হয়ে এয়ারপোর্ট এর ভিতরে চলে যাও। সেখানে একটা প্রিন্ট করার এর দোকান আছে।

তার কথামতো করলাম কাজ। ভেতরে গিয়ে রিজারভেশন প্রিন্ট করে প্রিন্ট কপি জমা দিলাম আর ভাই দ্রুত আমার ছবি তুলে ভিসা পেপারে প্রিন্ট করে পাসপোর্ট এ সুন্দরমতো লাগিয়ে দিলো। ভিসা লাগানোর আগে অবশ্য ভিসা বাবদ টাকাপয়সা নিয়ে নিলো। ৯০ ডলার এর মতো ভিসা ফী। আর কোনোরকম বড় ঝামেলা ছাড়াই চলে আসলাম লা পা্য, বলিভিয়ার রাজধানী। 

বলিভিয়া বলিভিয়া


ইমিগ্রেশনে যখন এসব করতেসিলাম তখন আমার পিছনে এক ব্রিটিশ ছেলে দাড়ায়ে ছিলো। দুই এক কথায় পরিচয়। নাম হলো পিটার। সে ও বলিভিয়া আসছে ঘুরতে। ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ হওয়ার পর ভাবতেসিলাম কই থাকবো, হোটেল নাকি হোস্টেল। এয়ারপোর্ট এর ফ্রী ওয়াইফাই দিয়ে হাল্কা নেট রিসার্চ করে দেখলাম শহরের মধ্যে একটা হোস্টেল আছে নাম হল লকি হোস্টেল। ভালো রিভিউ, লোকেশন ভালো আর খরচ ও কম। সলো ট্রাভেলার দের জন্য এম্নিতেই হোস্টেল বেস্ট (ব্যক্তিগত মত)।

এয়ারপোর্ট থেকে খানিকটা দূরে লকি তে যেতে টেক্সি ভাড়া লাগবে ভালোই। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অথবা শেয়ারড কোনো কিছু পেতে হলে অপেক্ষা করতে হবে অনেকক্ষণ। তাছাড়া এই ভোর রাতে একা একা যেতেও চাচ্ছিনা। তখন ওই পিটার কে জিজ্ঞাস করলাম কই থাকবে। দেখলাম তারও কোনো প্লান নাই। ওরে বললাম লকি হোস্টেল এর কথা। এক কথায় রাজি হয়ে গেলো। দুইজন মিলে শেয়ারে ট্যাক্সি নিয়ে চলে আসলাম লকি হোস্টেল। পার হেড ৩০ বলিভিয়ানো লাগসে। (১ বলিভিয়ানো = ১৩ টাকা)

থাকার একটা ব্যাবস্থা করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। অপেক্ষা করছি কখন নাস্তার সময় হবে হোস্টেল এর ডাইনিং এ। সকাল সাতটায় নাস্তা শুরু হয়। ভরপেট ইয়োগারট দিয়ে গ্রানোলা খেয়ে দিলাম একটা ঘুম। প্ল্যান হলো বিকাল বেলা শহরে ঘুরতে বের হবো আর অন্য শহরগুলোতে যাওয়ার ব্যাপারে খোজ খবর নিবো।


ঘুম ভাঙ্গলো সন্ধ্যার সময়। লম্বা জার্নির ধকল শেষে সন্ধ্যায় হোস্টেল এর গেম জোনে বসে শহরের ম্যাপ আর আদার ইনফরমেশন যেমন লোকাল ট্রান্সপোর্ট, সেফটি ইন্সট্রাকশন, লোকাল কালচার, খাওয়া দাওয়া, অন্যান্য টুরিস্ট ইনফরমেশন পড়ে নিলাম। কিছু কিছু ট্র্যাভেল ব্লগ ও পড়লাম। যেহেতু কোনোরকম পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া ট্যুর তাই যথা সম্ভব প্রয়োজনীয় ইনফরমেশন গুলার স্ক্রিনশট সেইভ করে রাখলাম পরে লাজে লাগবে ভেবে। আপাতত আশেপাশে একটু ঘুরে ডিনার করে একটা লম্বা ঘুম দিবো। সকাল থেকে শুরু হবে আমার লা পায এর ঘুরাঘুরি।

লা পায এর রাস্তায় লা পায এর রাস্তায়

 
যেই ভাবা সেই কাজ। কিন্তু বিপত্তি শুরু হলো রাতে আরলি ডিনার করে হোস্টেলে ফেরার পর। বিকাল বেলা যখন নেট এ একটু পড়ছিলাম লা পায এর ব্যাপারে তখন বেশ কিছু জায়গায় অল্টিচুড সিকনেস এর কথা লিখসে অনেকেই। আমার এ নিয়ে কোন ধারনাই ছিলোনা। রাতে হোস্টেলে ফেরার পর একটু খারাপ লাগা শুরু করলো, ওনেক মাথা ব্যাথা ও জ্বর সাথে শর্ট ব্রেদিং, বমি বমি ভাব। প্রথমে খুব একটা পাত্তা দেই নাই কিন্তু প্রচন্ড মাথা ব্যাথার জন্য পাত্তা দিতে হলো।

ইন্টারনেট ঘাটলাম একটু আর ফেলো ট্রাভেলার দের জিজ্ঞেস করলাম এসব সিম্পটম দেখে। সবাই নিশ্চিত আমার অল্টিচুড সিকনেস হইসে। অবশ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারন লা পায হলো সর্বচ্চো রাজধানি, সি লেভেল থেকে মাত্র ১২০০০ ফুট উপরে। রাত টা কোনমতে কাটিয়ে সকালে ডাক্তারের কাছে যাবো ঠিক করলাম। কিন্তু রাত আর কাটেনা। ঘুম আসেনা প্রচণ্ড মাথা ব্যাথার জন্য। শুরু হলো আমার আয়ুর্বেদিক ট্রিটমেন্ট।

অভিজ্ঞ হোস্টেল ক্রূ আর ফেলো ট্রাভেলারদের পরামর্শে কোকা কেন্ডি আর কোকা চা খাওয়া শুরু করলাম। একজন একটা বিশাল সাইজের ট্যাবলেট দিলো, এসিটাজোলামাইড গ্রূপের। একটু নেট এ সার্চ করে খেয়ে নিলাম সেই ট্যাবলেট। কিন্তু তেমন একটা কাজ হচ্ছেনা। মাথা ব্যাথা কিছুতেই কমছেনা। হোস্টেল এর সামনে ওয়াকিং স্ট্রিট এ বসে আছি আর এক লোকাল ছেলের সাথে টুকটাক আলাপ করতেসি। ছেলেটার নাম সেরগিও। আলাপের বিষয় বলিভিয়ানদের লাংস নিয়ে। নিশ্চয় খুব শক্তিশালী লাংস নাইলে এই লো কন্সেন্ট্রেসনের অক্সিজেনে কিভাবে বেচে আছে।

রাস্তার অইপাশে দেখতেসি এক ইনকা ড্রেস পরা মহিলা কি যেন লতাপাতার ভর্তা করতেসে আর আরেকটা সসপ্যান এ লতাপাতা সিদ্ধ করতেসে। সেরগিওর কাছে শুনলাম এইসব লতাপাতায় আছে সিকনেস থেকে মুক্তি। গেলাম ইনকা খালার কাছে। খালা নাকি একজন ইয়াতিরি। সোজা বাংলায় হারবাল ডাক্তার। সিদ্ধ লতাপাতার স্যুপ বিক্রি করতেসে খালা। খেলে নাকি মাথা ব্যাথা সহ যাবতীয় সকল রোগ ভালো হয়ে যাবে। একবাটি স্যুপ নিলাম। মহা উৎসাহি সেরগিও খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে আমি কখন স্যুপটা খাই। কিন্তু খেতে গিয়ে বিপত্তি। ভয়াবহ ঝাজালো গন্ধ। খাওয়া ঠিক হবেনা। আমি নতুন করে পেটের সমস্যায় পড়তে চাইনা। খুব সেন্সেটিভ আমার ডাইজেশন সিস্টেম।

পরে ওই ইনকা খালার কাছ থেকে কোকা পাতা কিনলাম এক পোটলা। ডাইরেক্ট কোকা পাতা না চাবাইলে নাকি মাথা ব্যাথা ভাল হবেনা, সেরগিওর মূল্যবান মতামত। আমার ভাজি ভর্তা আর ঝাল দেওয়া গরুর মাংস খাওয়া মুখে কি আর কোকা পাতা সহ্য হয়? খুবই বাজে স্বাদ। পরে গরম পানিতে কোকা পাতা সিদ্ধ করে সেই পানি খেলাম। কিছুটা কমলো মাথা ব্যাথা।


কোকা পাতা সিদ্ধ পানি, কোকা চা, কোকা ক্যান্ডি সহ নানা রকম কোকা মিশ্রিত জিনিস খেয়ে আমার ঘুমের বারোটা বাজছে। সকালে গেলাম ডাক্তারের কাছে। অক্সিমিটার দিয়ে দেখলো আমার ব্লাডে অক্সিজেন মাত্র ৬৫%। সাথে সাথে একটা বেড এ শুইয়ে আমাকে অক্সিজেন দেওয়া শুরু করলো আর আমার সিচুয়েশন বুঝায়ে বললো। মোটামুটি ৪/৫ ঘন্টা অক্সিজেন দেয়ার পর একটা ইঞ্জেকশান দিলো আর কিছু ট্যাবলেট দিয়ে দিলো পরবর্তী কয়েকদিনের জন্য। আমি এসব নিয়ে চলে আসলাম হোস্টেলে।

সেইদিন সারাদিন সারারাত বিশ্রাম নিলাম। রুম থেকে বের হইনাই। জাস্ট খাওয়া আর ঘুমানোর চেস্টা। পরেরদিন আমি মোটামুটি সুস্থ। সময় নস্ট না করে তিনদিনের জন্য লা পায ট্যুরের একটা প্ল্যান করলাম।

শহর জুড়ে কেবল কার এর ছড়াছড়ি শহর জুড়ে কেবল কার এর ছড়াছড়ি


প্রথম দুই দিন শহরটা ঘুরলাম। উঁচুনিচু এই শহরে চলাচলের জন্য আছে ছোট ছোট মাইক্রোবাস। বাসের সামনে রূট লেখা থাকে। আমার অবশ্য রুট দেখে উঠার কিছু নাই। সামনে যেইটা পাইসি ওইটায় উঠে পড়সি। পরে একসময় মানুষজনরে জিজ্ঞাস করে আবার হোস্টেলে ফেরত আসা কোনো ব্যাপার না।

লা পায এর আরেকটা ইউনিক ট্রান্সপোর্টেশন হলো কেবল কার। পুরা শহরে মাকড়সার জালের মতো কেবল কার। তিন টা আলাদা রঙের কেবল কার ডিফারেন্ট রুট ধরে চলে। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো স্টেশন আছে চাইলে নেমে গিয়ে আবার আরেকটায় উঠে পড়া যায়। এজন্য অবশ্য টিকেট করতে হয়। ৬ বলিভিয়ানো প্রত্তেক রুটের টিকেটের দাম। কেবল কারে করে শহর দেখার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। চারপাশে সুউচ্চ পাহাড়ের মাঝে এই উঁচুনিচু শহরের প্রায় পুরটাই দেখা যাবে কেবল কার থেকে।

এক স্টেশনে কেবল থেকে নেমে কিছুটা হেটে গেলাম একটা মার্কেটে। নাম হলো উইচ মার্কেট। বিভিন্ন রকম জন্তু জানয়ারের শুকনা ফিটাস আর নানা রকম গাছ গাছালি, লতাপাতা, শুকনা হাড়গোড়, আইমারাদের বিভিন্ন মূর্তি সহ জিবনে দেখি নাই এরকম অনেক কিছু ঝুলতেসে দোকানে দোকানে। এই মার্কেট চালায় উইচ ডাক্তার রা। তাদেরকে বলে ইয়াতিরি। খুব আগ্রহ নিয়ে এসব দেখতেসিলাম উইচ মার্কেটের দোকানে।

হটাত চোখ পড়লো এক ড্রাইড লামা ফিটাসের উপর। একজন খুব একটা ভক্তি শ্রদ্ধা করে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে ইয়াতিরিদের নৃশংসতা নিয়ে ভাবলাম। একটা প্রেগনেন্ট লামা থেকে ফিটাস বের করে শুকাচ্ছে বিক্রি করার জন্য! পরে অবশ্য ভুল ভেঙ্গেছে আমার। সেরগিও থেকে সুনলাম এইগুলা নাকি ন্যাচারালি মিস্ ক্যারিড লামা ফিটাস। এই জিনিশের ব্যাপক ডিমান্ড কারন অনেক বলিভিয়ান ঘরবাড়িতে ফাউন্ডেশনের নিচে লামা ফিটাস দেওয়া হয় বলিভিয়ান রিচুয়াল হিসেবে।

উইচ মার্কেট এ ঝোলানো শুকনো লামা উইচ মার্কেট এ ঝোলানো শুকনো লামা

এরপর গেলাম লা পাযের ফুটবল স্টেডিয়াম দেখতে। এই অল্টিচুডে কেমনে ফুটবল খেলে সেইটা দেখতে আসলাম। এদের লাংস মনে হয় লোহা দিয়ে তৈরি। আর ফুটবল নিয়ে লা পায বাসির অনেক আগ্রহ। খেলায় জিতলে ব্যাপক পটকা বাজি ফুটানো শুরু করে। চারপাশের পাহাড়ে যখন এই বাজি ফুটানোর শব্দ প্রতিধ্বনিত হয় তখন আসলেই মনে হয় সাম্থিং ক্রেইজি ইজ হেপেনিং ইন দিস সিটি।


তৃতীয় দিন গেলাম বিখ্যাত ডেথ রোড। একটা ট্যুর কোম্পানি থেকে ডেথ রোড ট্যুর কিনলাম। এইখানে অনেক দামাদামি চলে। আমার লোকেশন হলো লাস আমেরিকাস আভিনিউ, তার থেকে ১০০ মিটার দূরে মুরিল্লো স্কয়ারের চারপাশে আর জিঊস মার্কেটের ভিতরে অনেকগুলা ট্যুরের দোকান আছে। সেখানে খুব সহজেই দামাদামি করে ট্যুর কেনা যাবে। মোটামুটি ৪০-৫০ ডলারের মতো লাগবে ভালো দামাদামি করতে পারলে। সকাল ৭টায় হোস্টেল থেকে তারা পিক করবে আর সন্ধায় হোস্টেলে নামায়ে দিবে। এরমাঝে খাওয়া দাওয়া সহ সব কিছু তাদের। ডেথ রোডে কিছুক্ষন বাইক চালানোর অপশন আছে। আমি আমার জন্য বাইক চালানোর ব্যাপারটা বাদ দিসি ইচ্ছা করেই। পুরা ডেথ রোডটা ৫০ কিলোমিটার এর মতো লম্বা। লা পায থেকে ডেথ রোডের মুখে পৌছাতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘন্টার মতো।

ডেথ রোড ডেথ রোড

এই ডেথ রোড কে বলা হয় ‘ওয়ার্ল্ড মোস্ট ডেঞ্জারাস রোড’। বছরে অনুমানিক ২০০-৩০০ মানুষ মারা যায় এই রোডে। সেই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। পুরা রাস্তাটা আমাদের বান্দরবন থেকে রুমা অথবা থাঞ্চি যাওয়ার রাস্তার মতো কিন্তু পার্থক্য হলো ডেথ রোডের রাস্তাগুলা অনেক উচুতে আর অনেক শার্প টারনিং। ডেথ রোডের মেক্সিমাম ইলিভেসন ১৫০০০ ফুটের ও বেশি। সবসময় মেঘের আস্তরন থাকায় ভিসিবিলিটিও খুব একটা ভালোনা। আরো আছে পাহাড় থেকে পাথর ধস। কিছু কিছু জায়গায় আবার রেইন ফরেস্টের মতো গাছপালা। এক লেনের এই রাস্তায় গাড়িতে চললে রাস্তার অবস্থা দেখে নার্ভ ঠান্ডা হয়ে আশে। এই অনুভুতি লিখে বুঝানোর মতো না।

প্রতিবছর অনেক মাউন্টেন বাইকার আক্সিডেন্ট করে এই ডেথ রোডে। এক জায়গায় সবাই গাড়ি থেকে নেমে সাইকেল চালাতে গেলো পাহাড়ের গায়ে। আমি তখন আলাপ জুড়ে দিলাম ট্যুর কোম্পানির এক স্টাফের সাথে। নাম হলো জুয়ান পাবলো। পাবলো এক বিরাট ওস্তাদ ড্রাইভার। তার রক্ত ঠান্ডা করা ডেথ রোড ড্রাইভিং এর গল্প আর নানারকম মিথ শুনতে শুনতে কেটে গেলো তিন ঘণ্টা। কিছুক্ষন পরেই ফেলো ট্রাভেলার রা ফিরে আসছে তাদের বাইকিং শেষে। এরপর আমরা লাঞ্চ করে কিছুক্ষন রেস্ট নিয়ে আরো কিছু পথ গেলাম। তারপর আবার ফেরার পথ। এক রোমাঞ্চকর বাস জার্নি দিয়ে শেষ হলো আমার ডেথ রোড ট্যুর। 

মেঘে ঢাকা মরণ-পথ মেঘে ঢাকা মরণ-পথ


এর পরদিন চলে গেলাম ইয়ুনি শহরে, সালার দে ইউনি দেখতে। ওয়ার্ল্ড লারজেস্ট সল্ট ফ্লাট। সেই গল্প আরেকদিন।

বলিভিয়া যাওয়ার উপায়ঃ

খুব সোজা, ভিসার ঝামেলা নাই। টিকেট কেটে প্লেনে উঠলেই হবে। বাংলাদেশ থেকে সাউথ আমেরিকার যেকোনো ডেস্টিনেশনের টিকেটের দাম অনেক বেশি। কিন্তু আমেরিকা থেকে অনেক ভালো ভালো ফেয়ার ডিল পাওয়া যায়।

থাকা খাওয়াঃ

হোস্টেলে মোটামুটি ৯-১০ ডলারের মধ্যে থাকা যাবে আর হোটেল হলে ৩০-৫০ ডলার লাগবে। খাওয়া দাওয়া মোটামুটি সস্তাই আছে। প্রচুর তাজা ফল পাওয়া যায়। খেতে বেশ ভালো।