এক ঢিলে দুই পাখি মারার কথা সবাই জানি। কিন্তু যদি বলি- এক ঢিলে দশ পাখি। তাহলেও চমকে ওঠার কিছু নেই। দিল্লী ঘুরে দেখার শখ আপনার? আজ, কাল কিংবা পরশু দেখতে যাবেন দিল্লীর সৌন্দর্য? তবে আপনিও মারতে পারেন, এক ঢিলে দশ পাখি। দিল্লীর আকর্ষণীয় দশটি স্থান ও স্থাপত্য সম্পর্কে আপনার যদি পূর্ব ধারণা থাকে তাহলেই সম্ভব এটি। এজন্য দিল্লীর আকর্ষণীয় দশটি স্থান ও স্থাপত্য নিয়ে ধারণা পাবেন এখানে, যার একটি মিস করলেই অপূর্ণ মনে হতে পারে আপনার দিল্লী দর্শন।

 

রেড ফোর্ট বা লাল কেল্লা:

HindiKiDuniya.comHindiKiDuniya.com

ভারতের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য নাম রেড ফোর্ট। শত বছর ধরে এটি মুঘলদের বাসস্থান ছিলো। ১৬৩৮ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট শাহজাহান মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী আগ্রা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তর করেন। তখন রাজকীয় এই ভবনটি নির্মান কাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে।

স্মৃতিস্তম্ভটির নাম রোড ফোর্ট বা লাল কেল্লা রাখা হয়েছে তার সুবিশাল লাল বেলেপাথরের দেয়ালের কারণে। লাল কেল্লায় মোট ১৪ টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান দুটি প্রবেশদ্বার হচ্ছে দিল্লী গেট এবং লাহোরি গেট।

লাহোরি গেটের সামনেই রয়েছে এই শহরের সবচেয়ে জনবহুল ও বৈচিত্র্যময় রাস্তা বা বাজার- চাঁদনী চক। কেল্লাটির উচ্চতা নদীতীরের দিকে ১৮ মিটার ও শহরের দিকে ৩৩ মিটার এবং এটি প্রায় ২.৪১ কিলোমিটার জুড়ে প্রসারিত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ এই কেল্লা থেকেই দিয়ে থাকেন।

wikimdia commonswikimdia commons

অবস্থান: চাঁদনী চকের বিপরীতে

প্রবেশমূল্য: বিদেশীদের জন্য ৫০০ রুপি, ভারতীয়দের জন্য ৩০ রুপি, ১৫ বছরের কম বয়স্কদের জন্য ফ্রি।

দর্শনের সময়সীমা: সকাল ৯:৩০ টা. থেকে বিকেল ৪:৩০ টা. পর্যন্ত। সোমবার ব্যতীত সপ্তাহের প্রতিদিনই এই কেল্লাটি খোলা থাকে।

 

জামা মসজিদ:

wikimedia commonswikimedia commons

দিল্লীর অন্যতম একটি নান্দনিক স্থাপত্য সম্পদ হচ্ছে জামা মসজিদ। এটি ভারতের সবচেয়ে বড় মসজিদ। এটিও সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে নির্মিত স্থাপত্যের একটি সেরা নিদর্শন। মসজিদটিতে একসঙ্গে ২৫ হাজার ভক্তমন্ডলীর জমায়েতের ব্যবস্থা রয়েছে।

মসজিদটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৬৫০ খ্রীষ্টাব্দে এবং পাঁচ হাজার শ্রমিকদের টানা ছয় বছর সময় লেগেছিল এর নির্মাণকাজ শেষ করতে। মসজিদটির প্রাঙ্গনের তিনদিক থেকেই উন্মুক্ত দ্বার রয়েছে, যথা: উত্তরীয় দ্বার, দক্ষিণী দ্বার ও পূর্বীয় দ্বার। পূর্বীয় দ্বারটিকে রাজকীয় দ্বার বলা হয়।

প্রতিটি দ্বার বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণীর মানুষের প্রবেশপথ চিহ্নিত করত। সম্রাট এবং তাঁর পরিবার পূর্বদিকের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করতেন যেটিতে ৩৫টি ধাপ রয়েছে। উচ্চবংশীয় বা উচ্চপদস্থরা উত্তরীয় দ্বার দিয়ে প্রবেশ করতেন আর সাধারণ মানুষেরা প্রবেশ করতেন দক্ষিণী দ্বার দিয়ে । মসজিদটি দর্শণের সময় আপনাকে অবশ্যই মানসম্মত পোশাক পড়েই ঢুকতে হবে নয়তো আপনাকে এর ভেতরে ঢুকতে দেয়া হবেনা। অর্থাৎ, আপনাকে এমন পোশাক পড়তে হবে যাতে আপনার মাথা, পা এবং কাধ কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকে।

kelly-williams.comkelly-williams.com

অবস্থান: চাঁদনী চকের বিপরীতে, লাল কেল্লার কাছাকাছি।

প্রবেশমূল্য: এটি দর্শনের জন্য কোনো ফি দিতে হবেনা। তবে ক্যামেরার জন্য ৩০০ রুপি পরিশোধ করতে হবে। মিনারে উঠার জন্যও আলাদা করে পরিশোধ করতে হবে।

দর্শনের সময়সীমা: সপ্তাহে সাত দিনই খোলা থাকে। তবে জোহরের নামাজের জন্য নামাজের সময় থেকে দুপুর ১.৩০ টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। সূর্যাস্তের পর এটি আর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে না।

 

চাঁদনী চক:

EyeEmEyeEm

দিল্লী শহরের সবচেয়ে জনবহুল ও বৈচিত্র্যময় রাস্তা বা বাজার হচ্ছে চাঁদনী চক। এটিও বাদশা শাহজাহানের দ্বারা নির্মিত। ওল্ড সিটির বাজারটি লাল কেল্লা থেকে জামা মসজিদ পর্যন্ত বিস্তৃত। শহরের এই রাস্তাটিতে গাড়ি, সাইকেল, রিক্সা, পথচারী এবং অন্যান্য প্রাণী যেনো এক অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে চলে।

যদিও এটি অনেকটা বিশৃঙ্খল এবং যানজটপূর্ণ তবু এসবের মধ্যেই যেনো রয়েছে আনন্দ। রাস্তার দুপাশের বাহারী কাপড় আর গয়না আপনার নজর এড়াতে দিবেনা কখনোই। সেই সাথে রাস্তার দুপাশের লোভনীয় খাবার জিভে জল এনে দিবে নিমিষেই। দিল্লীর বিখ্যাত করিম হোটেল এখানেই অবস্থিত।

Shutterstock / saiko3pShutterstock / saiko3p

অবস্থান: লাল কেল্লা এবং জামা মসজিদের কাছাকাছি, পুরাতন দিল্লী। 

 

স্বামী নারায়ণ অক্ষরধাম:

akshardham.comakshardham.com

নামেই বুঝা যাচ্ছে এটি একটি মন্দির। তবে অপেক্ষাকৃত নতুন স্থাপত্য। ভারতীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য স্বামী নারায়ণ সংস্থা নামে একটি স্পিরিচুয়াল অর্গানাইজেশন ২০০৫ সালে এটি নির্মাণ করে।

মন্দিরের ভেতরে রয়েছে আঁকাবাকা বাগান, মূর্তি এবং নৌকা। সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে এতে ব্যবহার করা হয়েছে গোলাপী পাথর এবং সাদা মার্বেল। মন্দিরের ভেতরে মোবাইল এবং ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ।

Wikimedia CommonsWikimedia Commons

অবস্থান: N.H-২৪ । নদীয়া মোড়ের কাছে, নয়া দিল্লী। 

প্রবেশমূল্য: ফ্রি, তবে বিশেষ প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে টিকেট লাগবে।

দর্শনের সময়সীমা: মঙ্গলবার থেকে রবিবার সকাল ৯.৩০ থেকে সন্ধ্যা ৬.৩০ পর্যন্ত। সোমবার বন্ধ।

 

বাদশা হুমায়ূনের কবর :

pinterestpinterest

এটি হুমায়ুনস টুম্ব নামে বিখ্যাত। বাদশা হুমায়ুনের এই কবরটিকে তাজমহলের মতো মনে হতে পারে। কারন এটি তাজমহলের অনুপ্রেরণাতেই বানানো। ১৫৭০ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় বাদশা হুমায়ুন মারা গেলে তার পত্নী হামিদা বানু বেগম এটি নির্মাণ করেন।

ভারতবর্ষে এটিই প্রথম এ ধরণের উদ্যান সমাধিক্ষেত্র। এরপর সারা ভারত জুড়ে মুঘলরা এরকম আরো অনেক স্থাপত্য নির্মাণ করেছেন। বাদশা হুমায়ূনের কবরটি ভবনের বিশাল কমপ্লেক্স জুড়ে করা হয়েছে এবং এর ভেতরে খুব সুন্দর একটি বাগান রয়েছে।

 Zé Eduardo. Zé Eduardo.

অবস্থান: মাথুরা রোডের নিজামউদ্দিন রেল স্টেশনের পূর্বে, নতুন দিল্লী।

প্রবেশমূল্য: বিদেশী পর্যটকদের জন্য ৫০০ রুপী, ভারতীয় পর্যটকদের জন্য ৩০ রুপী, ১৫ বছরের কম বয়স্কদের জন্য ফ্রি।

দর্শনের সময়সীমা: প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। তবে বাগানের সেরা সৌন্দর্য বিকেল বেলাতেই ভালো উপভোগ করা যায়।

 

লোদী গার্ডেন:

Lonely PlanetLonely Planet

একসময় লেডী উইলিংটন পার্ক নামে অভিহিত করা হতো। এটি তৃণভূমি ও গাছপালাসহ মুবারক শাহ, ইব্রাহিম লোদি ও শিকন্দর লোদির সমাধির সমন্বয়ে গঠিত। যান্ত্রিক জীবনে যারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন, একটু প্রশান্তি দরকার তাদের জন্য এই বাগানটি একটি বিশেষ জায়গা।

বিশাল এ বাগানটি ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ করা হয়েছিলো। যারা জগিং করেন, ইয়োগা চর্চা করেন কিংবা কাপল, তাদের জন্য এই বাগানটির জুড়ি মেলা ভার।

অবস্থান: হুমায়ুনের কবরের পাশেই, লোদী রোডে।

প্রবেশমূল্য: ফ্রি।

দর্শনের সময়সীমা: সূর্যোদয় থেকে সন্ধ্যা ৮ টা পর্যন্ত। বিশেষ করে রোববার একটু বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠে স্থানটি।

 

কুতুব মিনার:

PixabayPixabay

দিল্লীতে অবস্থিত কুতুব মিনার ইঁটের তৈরী বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা মিনার। এটি ৭২.৫ মিটার উচ্চতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লীর প্রথম মুসলিম শাসক কুতুব-উদ-দীন-আঈবক-এর অনুমতিতে এটি স্থাপিত হয়, তবে সেইসময় এটির কেবলমাত্র একটি ভিত ছিল। পরবর্তীকালে ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে এর পূর্ণরুপ নির্মিত হয়।

কুতুব মিনার ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। এর চারপাশে আরো কিছু প্রাচীন স্থাপত্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এটি কুতুব কমপ্লেক্স নামে পরিচিত।

অবস্থান: মেহেরাউলী, দক্ষিণ দিল্লী।

প্রবেশ মূল্য: বিদেশী পর্যটকদের জন্য ৫০০ রুপী, ভারতীয় পর্যটকদের জন্য ৩০ রুপী, ১৫ বছরের কম বয়স্কদের জন্য ফ্রি।

দর্শনের সময়সীমা: প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

 

গান্ধী স্মৃতি এবং রাজঘাট:

pinterestpinterest

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নিহত হন ভারতের জাতীর পিতা মহাত্মা গান্ধী। তাকে যেখানে আততায়ীরা হত্যা করেছিলো সেখানে নির্মিত হয়েছে গান্ধী স্মৃতি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ১৪৪ দিন তিনি এই বাড়িতে অবস্থান করেছেন।

তার ঘরটি ঠিক একই রকম রাখা হয়েছে যেমন তিনি ছেড়ে গিয়েছিলেন। তার স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন পেইন্টিং, ছবি, আসবাব এখানে রাখা আছে প্রদর্শনের জন্য। এখানেই রয়েছে রাজঘাট যেখানে মহাত্মা গান্ধীকে দাহ করা হয়েছিল। যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত রাজ ঘাট মহাত্মা গান্ধির স্মৃতিসৌধের নির্মাণের জন্য এক শ্রেষ্ঠ স্থান রূপে বিবেচিত হয়।

তাঁর সমাধিটি একটি কালো মার্বেলের মঞ্চ দিয়ে গঠিত, সম আকৃতির একটি ইঁটের মঞ্চও রয়েছে যেখানে গান্ধিজীর শবদেহকে দাহ করা হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধীকে উৎসর্গ করে এর নিকটবর্তী এলাকায় দুটি মিউজিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও রাজ ঘাটের উত্তরদিকে শান্তি বনে জওহরলাল নেহেরুর সমাধিও নির্মাণ করা হয়েছে।

অবস্থান: ৫ টিস জানুয়ারি মার্গ, মধ্য দিল্লী।

প্রবেশ মূল্য: ফ্রি।

দর্শনের সময়সীমা: মঙ্গলবার থেকে রবিবার সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত।

 

ইন্ডিয়া গেট:

pinterestpinterest

ইন্ডিয়া গেট হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে সমস্ত ভারতীয় সৈন্যরা লড়াই করেছিল ও প্রাণ ত্যাগ করেছিল, তাদের উৎসর্গে নির্মিত একটি প্রস্তর স্মৃতিস্তম্ভ। এটি দিল্লীর প্রাথমিক আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে এক অন্যতম মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে।

ইন্ডিয়া গেট এডওয়ার্ড লিডটাইনস-এর দ্বারা সু-পরিকল্পিত ছিল এবং এটির নির্মাণ সম্পূর্ণ হতে দীর্ঘ ১০ বছর সময় লেগেছিল। ইন্ডিয়া গেটের গঠন একটি বিজয়ী ধনুকের মতো, যেটির উচ্চতা ৪২ মিটার। রাতের আলোতে এর দৃশ্য একটু বেশিই মনোমুগ্ধকর।

MakeMyTripMakeMyTrip

অবস্থান: রাজপাঠ, মধ্য দিল্লী।

প্রবেশমূল্য: ফ্রি।

দর্শনের সময়সীমা: সবসময় খোলা।

 

বাহাই বা লোটাস মন্দির:

pinterest'pinterest

এটি দেখতে ফুলের মতো। ১৯৮৬ সালে ইরানিয়ান-কানাডিয়ান স্থপতি ফরিবুর্জ সাহেবার পরিকল্পনায় এটি নির্মিত হয়েছিল। এটিতে মোট ২৭ টি সাদা পাপড়ি রয়েছে।

মন্দিরটির ভেতরের প্রশান্ত বাগান এবং পুকুর বিশ্রামের জন্য এক অপূর্ব জায়গা। লোটাস টেম্পল-এ ভ্রমণের সেরা সময় হল অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়।

 Amos Chapple Amos Chapple

অবস্থান: নেহেরেু প্লেসের কাছে, দক্ষিণ দিল্লী।

প্রবেশমূল্য: ফ্রি।

দর্শনের সময়সীমা: প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত।