কি হাস্যকর নারকেলের অরণ্য হয় কখনো বা নারকেল গাছের অরণ্য? অদ্ভুত তো!

আসলেই অদ্ভুত, আমি নিজেই অবাক হয়ে গেছি দেখে, যে নারকেলের অরণ্য আছে কোথাও তাই দেখে। আপনি যদি গোয়া থেকে ট্রেনে করে কখনো কেরালা যান, তাহলে আপনাকে শত শত বা হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ নারকেল গাছের অরণ্যর মাঝ দিয়ে ছুটে যেতে হবে। হ্যাঁ সত্যি তাই, গোয়া থেকে কেরালা যেতে প্রায় পুরো পথই যেন নারিকেলের অরণ্য দিয়ে সাজানো। আমি এতটাই অভিভূত হয়েছি এই অবাক করা, মুগ্ধতা মাখানো আর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া নারকেলের অরণ্য দেখে কিভাবে বোঝাই? এই নারকেলের অরণ্যের গল্পটা লিখেই না হয় বোঝানোর চেষ্টা করি।

গোয়া থেকে আমাদের কেরালা যাবার ট্রেন ছিল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। যেটা কেরালার ইরনাকুলাম স্টেশনে পৌছাবে পরদিন সকাল ১০:১৫ তে। ভ্রমণে যারা অল্প সময় নিয়ে বের হয়, ১০:৩০ কোন গন্ত্যব্যে পৌছানো তাদের জন্য একটু অড বৈকি। আমাদের উপায় ছিলোনা, কারন শুধু গোয়ার পরিকল্পনা করে টিকেট করে ফেলার পরে কেরালা যুক্ত হয়েছিল হুট করেই। তাই গোয়া থেকে কেরালা যাবার জন্য পছন্দের ট্রেন টিকেট কাটতে পারিনি। অগত্যা সন্ধ্যা ৭:৩০ এর টিকেটই কাটতে হয়েছিল।

 

নারকেল অরণ্য নারকেল অরণ্য

 

ট্রেনে যখন গোয়া, কর্ণাটক আর কিছুটা তামিলনাড়ু হয়ে কেরালা যাচ্ছিলাম রাতে তো আর কিছু চোখে পরেনি, এক ম্যাঙ্গালুরু স্টেশন ছাড়া। কারন সেখানে ট্রেন বেশ অনেকটা সময় দাঁড়িয়েছিল বলে নিচে নেমে গভীর রাতের ম্যাঙ্গালুরু দেখছিলাম আর ভাবছিলাম ধুর বাইরের প্রকৃতির কিছুই দেখা হলনা এদিকটার। যে কারনে ঘুমের কাছে আকুল আবেদন ছিল, দেরি করে ঘুমোলেও সে যেন একটু রাতারাতি ভেঙে যায়।

ঘুম কখন ভেঙেছিল সেই প্রসঙ্গ না হয় থাক। কিন্তু সূর্যের নানা রকম স্পর্শে চোখ মেলে দেখি আমাদের লাক্ষ্যাদ্বীপ এক্সপ্রেস ছুটে চলেছে স্বচ্ছ টলটলে নদী, সবুজ অরণ্য, আর নারিকেল গাছের এক অপূর্ব জগতের মধ্য দিয়ে। জীবনে নারিকেল গাছ তো অনেক অনেক দেখেছি। কিন্তু নারকেল গাছের যে আলাদা একটা সৌন্দর্য থাকতে পারে কোনদিন চোখে পরেনি আর ভেবেও দেখিনি।

এমন চোখ জুড়ানো আর প্রান পাগল করা নারকেল গাছের সারি কোনদিন দেখিনি। যেদিকে তাকাই শুধু সারি সারি নারকেল বাগান। এ যেন বাগান নয় নারকেল গাছের অরণ্য চারদিকে। মাঠে ঘাঁটে, নদী, পুকুর, জলাশয়, বাড়ির চারপাশ বা খোলা কোন প্রান্তর যেদিকে তাকাই শুধু নারকেল আর নারকেল গাছ। সবকিছু যেন শুধু নারকেল গাছ দিয়েই সাজানো। অন্যান্য সবুজের মাঝেও সারি সারি আর উঁচু উঁচু নারকেলের গাছ গুলো আলাদা করে নজর কাড়বে যে কারো। 
যখন ট্রেন কোন নদী পার হবে, সেখানে নদীর দুই ধারে শুধু নারকেল আর নারকেল গাছের সারি ঠায় দাড়িয়ে, উচুতে ঝুলে থাকা লম্বা লম্বা সবুজ পাতা নাড়িয়ে স্বাগত জানাবে। আর সেইসব নদীর পানি এতটাই স্বচ্ছ আর টলটলে যে ট্রেন থেকে নেমে একটা ডুব দিতে ইচ্ছা করবে যে কারো। একই সাথে এমন নদী আর সবুজ অরণ্য পেলে যা হয় আর কি? সেদিক থেকে চোখ ফেরাতে ইচ্ছাই করবেনা।

কলাবনের পেছনেই ঘন সবুজ নারকেল বিথী কলাবনের পেছনেই ঘন সবুজ নারকেল বিথী

 

কিন্তু নদী পেরিয়ে ট্রেন যখন খোলা প্রান্তর ধরে ছুটে যাবে, তখনও কাছে দূরে চোখে পরবে সারি সারি নারকেলের অরণ্য। যেন দুলে দুলে, সবুজ পাতার হাত নেড়ে টা টা জানাচ্ছে আপনার ছুটে যাওয়াকে আর সামনের গুলো জানাচ্ছে স্বাগত। এতোই অপরূপ তাদের একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা, আন্তরিকতা আর সবুজের আহবান। সেই সকাল থেকে ইরনাকুলার (কেরালার রেল স্টেশন) পৌঁছান পর্যন্ত পুরোটা পথই এমন সবুজ আর অনিন্দ সুন্দর নারকেল গাছের অরণ্যে শোভিত। আর যেসব স্টেশনে মাঝে মাঝে ট্রেন থেমেছে, প্রতিটা স্টেশন এতোটা, এতটাই পরিচ্ছন্ন আর ঝকঝকে যে নিজ থেকেই চমকে উঠেছি দেখে। স্টেশনও যে এতো পরিপাটি আর ঝকঝকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

এসব দেখতে দেখতে মনের মাঝে আফসোস আরও বেড়েছে, হায় তাহলে সারারাত যে পথে এলাম সেই পথও না যেন আরও কত সুন্দর ছিল, আরও কত সবুজ ছিল, না যেন আরও কতশত অপরূপ অরণ্য দেখতে পাইনি রাতের আঁধারে, কত শত, পাহাড়, পর্বত, ঢেউ খেলানো সবুজের সমুদ্র রয়ে গেছে রাতের অন্ধকারের মাঝে।

 

নারকেল বিথী নারকেল বিথী

 

তবে মনে মনে সান্ত্বনা, এমন নারকেলের অরণ্যের দেখা পাওয়া, প্রান ভরে উপভোগ করাও তো কম ভাগ্যের কথা নয়। যা পেয়েছি তাই নিয়েই নাহয় আপাতত সুখে থাকি, সৃতিতে সুখের ছবি আঁকি, আর ভালোবেসে গল্প লিখি। 
কিন্তু আমাকে আরও অবাক করে দেয়ার জন্য সামনেই যে ছুটে আসছিল আজকের বা এই ট্রেনের গন্তব্য ইরনাকুলাম স্টেশন সে কি জানতাম? মোটেই জানতামনা। যে কেরালার শুরুটাই হবে এমন আতিথিয়তা দিয়ে! ইরনাকুলাম, স্টেশনেই আতিথিয়তা...