দিল্লি থেকে আগ্রা মাত্র ২০০ কি.মি.।চাইলে আপনি ট্যাক্সি ভাড়া করে দিল্লি থেকে আগ্রা যেতে পারেন।৭ সিটের জাইলো গাড়ী পেয়ে যাবেন ২৫০০-৩০০০ রুপির মধ্যে।চাইলে বাস/ট্রেনেও যেতে পারেন।কলকাতা থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসে দিল্লি।ভাড়া এসি থ্রী-টায়ার ৩০০০ রুপি।(তৎকাল)।দিল্লি থেকে জাইলোতে আগ্রা।আগ্রাতে প্রচুর দালাল আপনার পেছনে লাগবে।কাউকে পাত্তা দিবেন না।আগ্রা পৌঁছে নিজে হোটেল ঠিক করুন এবং ঘোরার জন্য গাড়ীও নিজে ঠিক করুন।

ফতেপুর সিক্রিঃ

আগ্রার ৩৭ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে ১৫৬৯ সালে আকবর এখানেই তাঁর রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিলেন। সম্ভবত জলাভাবের কারনে বছর পনেরো বাদে এই নতুন রাজধানী পরিত্যক্ত হয়। জনশ্রুতি এই যে সন্তানহীন আকবর ফতেপুরের ফকির সেলিম চিস্তির শরণাপন্ন হয়ে পুত্রসন্তান লাভ করেন। ফকিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ফতেপুরের শৈল্যশিখরে হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর সমম্বয়ে গড়ে তোলেন দুর্গ ও একাধিক প্রাসাদ। আকবরের গুজরাত বিজয়ের স্মৃতিতে ১৫৭৫ সালের এপ্রিলে সমাপ্ত হয় ১৭৬ ফুট (৫৪ মিটার) উঁচু এশিয়ার উচ্চতম প্রবেশদ্বার ‘বুলন্দ দরওয়াজা’।

ফতেপুর সিক্রি নিয়ে একটা গল্প প্রচলিত আছে।ধারনা করা হয় নর্তকী জরিনার জন্যই ফতেপুর সিক্রি ধ্বংস হয়।সম্রাট আকবরের প্রাসাদে নাচার স্বপ্ন ছিল নর্তকী জরিনার। একদিন সেই সুযোগও পেল জরিনা। আকবরের প্রাসাদে নাচলো সে। আকবর খুশি হয়ে তাকে প্রাসাদেই রেখে দিলেন। সম্রাটের প্রিয় হয়ে উঠায় রানির দাসী মাধবীর হিংসার কারণ হলো জরিনা।এরপরই ধ্বংস হয় ফতেহপুর সিক্রি।

 

দেওয়ান-ই-খাস... ফতেপুর সিক্রি... এইখানে সম্রাট আকবরের সভার নবরত্নদের বসার জন্য ৯টি আসন আছে...দেওয়ান-ই-খাস... ফতেপুর সিক্রি... এইখানে সম্রাট আকবরের সভার নবরত্নদের বসার জন্য ৯টি আসন আছে...

 

সম্রাট আকবরের ছেলে সন্তান ছিলনা। তিনি দরবেশ সেলিম চিশতির দরবারে গিয়ে ছেলে সন্তান চাইলেন। সেলিম চিশতি সম্রাট আকবরকে বললেন, খুব শিগগিরই তিনি ছেলে সন্তানের বাবা হবেন। একবছর পর রানির কোলজুড়ে আসলো ছেলে সন্তান। আকবর তার নাম রাখলেন সেলিম। আকবর খুব খুশি হলেন। তিনি দরবেশ চিশতিকে সম্মান জানিয়ে একটি শহর গড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৫৬৯ সালে আকবর সিক্রি নামে এক গ্রামের কাছে সুন্দর সুরক্ষিত একটি শহর বানালেন। তার নাম দিলেন ফতেহপুর সিক্রি।

ফতেহপুর সিক্রিতে সেলিম চিশতির মাজার।
শহরটি আগ্রা থেকে খুব দূরে ছিল না। ফতেহপুর সিক্রি এখনো আছে। গ্রামের কাছে সম্রাটের শহর হওয়ায় সিক্রির লোকেরা খুব খুশি হলেন। আকবরের সব রানির জন্য শহরের ভেতর আলাদা প্রাসাদ ছিল। সেসব প্রাসাদে কাজের জন্য সিক্রি গ্রাম থেকে অনেক মানুষ ফতেহপুর শহরে যেতেন।

সিক্রিতে জরিনা নামে এক নর্তকী ছিল। তার স্বপ্ন ছিল বান্ধবীদের মত প্রাসাদে কাজ করবে। কিন্তু তার বাবা রাজি ছিলেন না।

একদিন সম্রাট আকবর তার কাছে অতিথিদের জন্য এক অনুষ্ঠান আয়োজন করলেন। তিনি গায়ক তানসেনকে ডাকলেন সেই অনুষ্ঠানে গান গাইতে।সম্রাট তানসেনকে বললেন, আপনার গানের সঙ্গে সেখানে কাউকে নাচতে হবে। তানসেন বললেন, আচ্ছা। আমি চেষ্টা করব নর্তকী রাখতে, কিন্তু আমি এখানে কোন নর্তকীকে চিনি না।

দাসীদের মধ্য থেকে কেউ একজন সম্রাট আর তানসেনের এ আলাপ শুনেছিলেন। সম্রাট চলে গেলে সেই দাসী তানসেনকে জরিনার কথা বললেন। পরামর্শ দিলেন তানসেন যেন জরিনাকে নাচার প্রস্তাব দেন।

তানসেন এই জায়গায় বসে গান গাইতেন...তানসেন এই জায়গায় বসে গান গাইতেন...

 

তানসেনের মত বিখ্যাত গায়ক জরিনাকে সম্রাট আকবরের জন্য নাচার প্রস্তাব দিলে জরিনার বাবা আর না করতে পারলেন না। জরিনা ফতেহপুর শহরে যাওয়ার আগে বাবার কাছে থেকে বিদায় নেয়।বাবার জরিনাকে পরামর্শ দিলেন, একটা ব্যাপার মাথায় রাখবে, যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে বিপদও আছে। সাবধানে থাকবে, আর মনে রাখবে তোমার জন্য আমি সবসময়ই আছি।

জরিনা প্রাসাদে গিয়ে আকবর ও তার সভাসদদের সামনে সারারাত নাচলো। জরিনার কাছে এটা ছিল স্বপ্ন সত্যি হওয়ার ব্যাপার। সম্রাট জরিনাকে পছন্দ করলেন। তিনি জরিনাকে প্রাসাদে রেখে দিলেন। প্রয়োজন হলেই সম্রাট তাকে ডাকেন।

প্রাসাদের সবাই জরিনাকে পছন্দ করলেন। কিন্তু রানি যোধা বাঈয়ের দাসী মাধবী জরিনাকে পছন্দ করল না। সম্রাটের কাছ থেকে জরিনা বেশি মনোযোগ পাওয়ার কারণে মাধবী জরিনার প্রতি ঈর্ষাকাতর ছিল। জরিনাকে সম্রাটের চোখে অপরাধী বানাতে চাইল সে। রানি যোধা বাঈ গোসল করছিলেন। ওই সময় মাধবী তার গয়নার বাক্স থেকে একটি সোনার বালা চুরি করে জরিনার জিনিসপত্রের মধ্যে লুকিয়ে রাখল।

যোধা বাঈ যখন দেখল যে তার একটি বালা নেই তখন তিনি মারাত্মক রাগান্বিত হলেন। পুরো প্রাসাদ তল্লাশির নির্দেশ দিলেন।

মাধবী তখন রানি যোধা বাঈকে বলল, আমি জরিনার ঘরে সেই বালাটি দেখেছি। বালাটি যখন জরিনার ঘরে পাওয়া গেল। যোধা বাঈ তখন রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি সম্রাট আকবরের কাছে গেলেন।সম্রাট আকবরের কাছে গিয়ে যোধা বাঈ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আপনার আদরের নর্তকী একটা চোর। এ ব্যাপারে আপনি কী করবেন?

জরিনা আকবরের সামনে কাঁদতে কাঁদতে বললো, হুজুর, আমি বালা চুরি করিনি। আমি নাচার সময়ে এর চেয়ে সুন্দর বালা পরি, আমি কেন বালা চুরি করব।এর জবাবে রানি যোধা বাঈ বললেন, তুমি বলতে চাও আমার গয়না সুন্দর না?

সম্রাট আকবর তখন বললেন, তোমার ঘরে বালা কিভাবে পাওয়া গেল সেই ব্যাখ্যা কি তুমি দিতে পারবে?

স্বাভাবিকভাবেই জরিনার তখন বলার কিছু ছিল না। সে জানত না বালা কিভাবে তার ঘরে গেল।সম্রাট খুব দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বললেন, প্রমাণ যেহেতু দেখাই যাচ্ছে,চুরি করার শাস্তি তুমি জানো।জরিনা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তখন চুরির শাস্তি হিসেবে চোরের হাত কেটে দেওয়া হত।

জরিনা তখন বলল, কিন্তু হুজুর, আমি একজন নর্তকী। আমার হাত কেটে ফেললে আমি নাচব কিভাবে? আর তাছাড়া আমি চুরি করিনি।

সম্রাট আকবর চিৎকার করে উঠলেন,চুপ সবাই।আগামীকাল সকালে তোমাকে শাস্তি দেওয়াই হবে প্রথম কাজ।

সম্রাট আকবর এরপর দরবার ত্যাগ করলেন। তিনি রাগে ও দুঃখে হতাশ হয়ে পড়লেন। তার কাছে জরিনাকে খুবই ভাল একটি মেয়ে মনে হয়েছিল। আর মাধবী চুপ করে সব দেখছিল ও খুশি হয়েছিল।জরিনা সারাদিন কাঁদলেন। রাতে জরিনা অন্যান্য দিনের মতই সম্রাটের সামনে নাচলেন। কিন্তু এটা আনন্দের নাচ ছিল না, এটা ছিল খুবই ধীরগতির দুঃখের একটি নাচ।আকবরের সভাসদদের কেউই এত সুন্দর নাচ জীবনে দেখে নি। তার নাচ আর দেখতে পারবেন না ভেবে আকবরও খুব দুঃখ পেলেন।

পরের দিন সকালে আকবর তার সকল সভাসদদের ডাকলেন। তিনি একজন রক্ষীকে পাঠালেন জরিনাকে নিয়ে আসার জন্য। সারা প্রাসাদ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই রক্ষী কোথাও জরিনাকে পেল না। সে এসে সম্রাটকে এ কথা জানালো।

সম্রাট আকবর জিজ্ঞাসা করলেন, কেউ কি জরিনাকে দেখেছে? সভায় উপস্থিত সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তখন সভায় এক বৃদ্ধ লোক প্রবেশ করলেন।

সিংহাসনে বসা সম্রাট আকবরের সামনে গিয়ে তিনি বললেন, হুজুর, কোন প্রমাণ ছাড়াই জরিনাকে অভিযুক্ত করে আপনি ভুল করেছেন।

আকবর জরিনার বাবাকে চিনতে পারলেন। তিনি বললেন, জরিনা কোথায় আমাকে বলুন, আমি দেখব তার সঙ্গে যেন ন্যায়বিচার ঘটে।

জরিনার বাবা মাথা নেড়ে বললেন, অনেক দেরি করে ফেলেছেন। আর কিছুই করা যাবে না। আপনি আমার মেয়ের জীবনে অনেক দুঃখ এনে দিয়েছেন, আর ফতেহপুর সিক্রি অবশ্যই এ বেঈমানির শাস্তি পাবে।

বৃদ্ধ লোকটির কথার অর্থ কী, আকবর জিজ্ঞাসা করার আগেই লোকটি ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
দুই সপ্তাহ পরে ফতেহপুর সিক্রির কুয়াগুলো শুকিয়ে গেল। সম্রাটের উট ও ঘোড়ার এবং মানুষের জন্য কোন পানি কুয়াগুলোতে অবশিষ্ট ছিল না। সম্রাট আকবর তার স্ত্রীদের ও সন্তানদের নিয়ে আগ্রার দুর্গে গিয়ে উঠলেন। তারা আর কখনোই ফতেহপুরে ফিরে আসেননি।

সিক্রি গ্রামে এই গল্প এখনো প্রচলিত আছে। গ্রামের কেউ কেউ বলে যে পূর্নিমা রাতে ফতেহপুর সিক্রির প্রধান ফটক, বুলন্দ দরজাতে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তারা বলে যে এটা আসলে মাধবী, সে জরিনার জন্য অপেক্ষা করে যাতে তার কাছে ক্ষমা চাইতে পারে।

মাজার... ফতেপুর সিক্রি...মাজার... ফতেপুর সিক্রি...

 

সম্রাট আকবরের খুব প্রিয় ছিলেন বীরবল।মহেশ দাস থেকে বীরবল হয়ে ওঠার কাহিনীটা অসাধারন।বীরবল সম্রাট আকবরের এতটাই প্রিয় ছিলেন যে ফতেপুর সিক্রিতে সম্রাট আকবর বীরবলের জন্য একটা বাড়ী বানিয়েছিলেন।

বীরবল ও ফতেপুর সিক্রি:-

এক গ্রামে বাস করতো দুই পালোয়ান। কে বড় পালোয়ান তা যাচাই করার জন্য একদিন আয়োজন করা হলো মল্লযুদ্ধের। বাজি হলো যে জিতবে সে পরাজিত জনের শরীর থেকে কেটে নেবে এক কেজি মাংস। শুরু হলো লড়াই। অনেকক্ষণ লড়াই চলার পর একজন পালোয়ান পরাজয় স্বীকার করে নিলো। বিজয়ী পালোয়ান দেরি না করে তীক্ষ্ন ধারওয়ালা ছুরি হাতে এগিয়ে এলো পরাজিত পালোয়ানের দেহ থেকে মাংস কেটে নিতে।

পরাজিত পালোয়ান বললো, তুমি আমার পিঠ থেকে এক কেজি মাংস কেটে নাও। কিন্তু বিজয়ী পালোয়ান বললো, তা হবে না। বাজিতে তো এমন কথা ছিল না। আমার যেখান থেকে ইচ্ছা মাংস কেটে নিবো। আমি তোমার বুক থেকেই মাংস নিতে চাই। শুরু হলো দু’জনের মধ্যে তর্কযুদ্ধ। তখন তারা বাধ্য হয়ে গেলো বীরবলের কাছে। বীরবল সব শুনে বিজয়ী পালোয়ানকে বললো, বাজি অনুযায়ী তোমার দাবি ন্যয়সঙ্গত। তুমি পরাজিত পালোয়ানের বুক থেকেই এক কেজি মাংস কেটে নেবে। তবে একটা কথা। এক কেজির এক তিল কম বা বেশি মাংস যেন না নেওয়া হয়। যদি এই নির্দেশ লঙ্ঘন করো তবে তোমাকে কিন্তু কঠিন শাস্তি পেতে হবে। আর একটা কথা। বাজি অনুযায়ী তুমি কেবল মাংসই পাবে।দেখো, একফোঁটাও রক্ত যেন না পড়ে। এবার আমাদের সামনেই তুমি মাংস কেটে নাও।

বিচারের রায় শুনে বিজয়ী পালোয়ানের হাত থেকে পড়ে গেলো ছুরি। সে আর মাংস কাটতে এগিয়ে এলো না। পালিয়ে বাঁচলো। এমনই বুদ্ধিমান আর যুক্তিবাদী ছিলেন বীরবল। উপস্থিত বুদ্ধি, তীক্ষ্ন রসবোধসম্পন্ন এবং হাস্যরসিক সেই বীরবল এবং তার প্রাসাদসম বাড়ির কথা সিক্রির সবার মুখে মুখে ছিল।

বুলন্দ দরজা... মাজার... ফতেপুর সিক্রি...বুলন্দ দরজা... মাজার... ফতেপুর সিক্রি...

 

দিল্লির বদলে আগ্রায় তখন সম্রাট আকবরের রাজধানী। একদিন আগ্রার পাশের জঙ্গলে শিকার করতে বেরিয়ে দলছুট হয়ে যান আকবর। হারিয়ে ফেলেন ফিরে যাওয়ার পথ। এমন সময় পথের মাঝে দেখা হলো এক কিশোরের সঙ্গে। নাম তার মহেশ দাস। সম্রাট তাকে জিজ্ঞেস করেন, কোন পথটি আগ্রার দিকে গেছে? প্রশ্নের জবাবে মহেশ বললো, পথতো কোথাও যায় না। মানুষই পথ মাড়িয়ে যায়। এরপর ঐ কিশোরটি সঠিক পথের হদিস দিয়ে দেয়। বুদ্ধিমত্তা আর রসবোধের পরিচয় পেয়ে সম্রাট নিজের আঙুল থেকে একটি বাদশাহী আংটি খুলে উপহার দেন মহেশকে।

এরপর কেটে যায় কয়েক বছর। মহেশ তখন যুবক। আগ্রার কাছে যমুনার তীরে তিকোয়ানপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান মহেশ ঘর ছাড়লো অর্থ উপার্জনের আশায়। সঙ্গে পুঁটলিতে বাঁধা কিছু শুকনো খাবার আর ছেড়া শতরঞ্জি। অবশ্য সম্রাটের দেওয়া আংটিটাও সঙ্গে ছিল তার। অনেক পথ কষ্ট স্বীকার করে মহেশ হাজির হলো আগ্রা থেকে আরও ৩৬ কিলোমিটার দূরে সম্রাটের নতুন রাজধানী শহর ফতেপুর সিক্রিতে।

প্রহরীকে বাদশার দেওয়া আংটিটি দেখিয়ে মহেশ পৌঁছাল দরবার কক্ষে। বাদশা আকবর ঠিক সেসময় সভাসদদের কাছে জানতে চাইলেন, পৃথিবীতে সুন্দর ফুল কী? সভাসদদের কারও উত্তর পছন্দ হলো না সম্রাটের।

সবার বলা শেষ হয়ে গেলে মহেশ সাহস করে বলে উঠলো, কাপাস ফুল জাহাপনা। উত্তর শুনে সভাসদরাতো হেসে কুটি কুটি। সম্রাট সবাইকে থামতে বলে জানতে চাইলেন, কাপাস ফুল কেন সুন্দর? মহেশ বললো, এই ফুলের গুটি থেকে যে তন্তু পাওয়া যায় তা থেকে সূক্ষ মসৃণ কাপড় তৈরি হয়। মসলিন আর মেয়েদের অতি প্রিয় ওড়না এই তন্তু থেকেই তৈরি হয়। সাদা ময়ূয়ের ছড়ানো পেখমের মতো ঐ কাপাস ফুলই মানুষকে আনন্দ দেয় অনেক বেশি। উত্তর শুনে বিস্মিত আকবর যুবকের পরিচয় জানাতে চাইলেন। যুবক তখন সম্রাটের দেওয়া আংটিটি দেখিয়ে এখানে আসার কারণটি জানলো। আকবর খুশি হয়ে বললেন, ঠিক আছে তুমি আমার কাছেই থাকবে। তুমি হবে আমার অন্যতম সভাসদ। আর আজ থেকে তোমার নতুন নাম দিলাম-বীরবল। এই নামের অর্থ কি জানো? যুবক বললো, জানি জাহাপনা। সেই থেকে মহেশ হয়ে গেলো বীরবল।

দূরদৃষ্টি, বুদ্ধি, মেধা, জ্ঞান সর্বোপরি অসামান্য রসবোধের কারণে বীরবল শিগগির হয়ে উঠলেন সম্রাট আকবরের একান্ত বিশ্বাসভাজন বন্ধু ও পরামর্শদাতা। আপনগুণে বীরবল হয়ে উঠলেন সম্রাটের প্রধান মন্ত্রণাদাতা-উজির বীরবল।

মুঘল সাম্রাজ্যের পুরো প্রশাসন এবং রাজস্ব সংগ্রহের বিষয়টি দেখাশোনার ভার পড়লো তার ওপর। সম্রাটের সঙ্গে তার বন্ধুসুলভ সুসম্পর্কের কারণে সব নিয়ম ভেঙে আকবর তার প্রাসাদ চত্বরের মধ্যে একমাত্র বীরবলের জন্য ছোট্ট এক সুন্দর প্রাসাদ তৈরি করে দেন। যে প্রাসাদ আজে অটুট আছে আগ্রার ফতেপুর সিক্রিতে।

আগ্রা থেকে সম্রাট আকবরের নতুন রাজধানী ফতেপুর সিক্রির দূরত্ব ছিল ৩৬ কিলোমিটার। সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা পরিত্যক্ত নগরীটি যেন স্থাপত্য ও শিল্পকর্মের অনন্য সংগ্রহশালা। এখানের দুর্গ ও প্রাসাদগুলো লাল রঙের বেলেপাথরে তৈরি। প্রধান তোরণদ্বার ৫৪ মিটার উঁচু। পাথুরে উঠানের চারপাশে আছে পরিখা। ভিতরে জলাধার, অট্টালিকা, উদ্যান, গোসলখানা, মসজিদ, স্মৃতিসৌধ আরো কতো কী! এখানে আছে দেওয়ান-ই-আম, সম্রাটের সিংহাসন এবং সবচেয়ে কারুকার্য খচিত তুরস্ক সুলতানের বাসগৃহ। বৌদ্ধ অনুকরণে নির্মিত পাঁচতলা ভবন। ফতেপুর সিক্রির সবচেয়ে বড় প্রাসাদের নাম যোধাবাঈ প্রাসাদ এবং বীরবল প্রাসাদ। এসব প্রাসাদের জলাশয়ের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ১৮ মিটার উঁচু ‘হিরণ মিনার’। এই মিনারে বসেই সম্রাট শিকার করতেন।

সম্রাট কোনো যুদ্ধে গেলে বীরবলকে সব সময় সঙ্গে নিয়ে যেতেন। প্রাসাদ চত্বর থেকে দুজন বেরুতেন একসঙ্গে। একবার উত্তর-পশ্চিম ভারতে বিদ্রোহ দমনে সম্রাটের সঙ্গী হয়ে সেখানে যান বীরবল। সৈন্যদল নিয়ে পেশোয়ারের কাছে পৌঁছে তিনি নিজেও নেমে পড়েন যুদ্ধ ক্ষেত্রে। ঐ যুদ্ধে আকবর জয়ী হলেও শেষ রক্ষা হয় না বীরবলের। ১৫৮৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হন যুক্তিবাদী এবং রসিক এই মানুষটি। তবে তাঁর মৃত্যুসাল পাওয়া গেলেও ভারতের মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ডে জন্মানো এই কবির জন্মসাল ও তারিখ সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে অনুমান করা হয় তার জন্ম ১৫২৮ সালে।

পঞ্চমহল... ফতেপুর সিক্রি...পঞ্চমহল... ফতেপুর সিক্রি...

 

বীরবল একজন বড় সভাকবিও ছিলেন। আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬-১৬০৫) প্রতিভাবান নয় জন কবি, শিল্পী ও চিত্রকরদের অন্তর্ভুক্ত করে ‘নবরত্ন’ নামে যে বিশেষ সভা গড়ে তুলেছিলেন বীরবল ছিলেন তার অন্যতম রত্ন।

এছাড়াও ফতেপুর সিক্রিতে রয়েছে:-

১) সেলিম চিস্তির শ্বেতপ্রাসাদের সমাধি সৌধ

২) দেওয়ান-ই-আম

৩) দেওয়ান-ই-খাস

৪) যোধাবাই প্রাসাদ

৫) মারিয়ামের প্রাসাদ

৬) পচিশি কোট

৭) হাওয়ামহল

৮) বীরবলের প্রাসাদ

৯) পঞ্চমহল

১০) জামা মসজিদ

১১) কারাভানসরাই

১২) হাতি পোল

১৩) হামাম

১৪) হিরণ মিনার

১৫) আকবরের প্রাসাদ (Tomb of Akbar the Great)

আসুন ভ্রমণে গিয়ে আমরা যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা না ফেলি, পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব, সম্ভব হলে পড়ে থাকা চিপস, বিস্কুট এর প্যাকেট সাথে করে নিয়ে আসবো এবং নিজে ফেলবো না।