একটা কথা প্রচলিত আছে "সবাই স্বর্গে যেতে চায়, কিন্তু কেউ মরতে চায় না"। তবে না মরেও স্বর্গে যাওয়া সম্ভব এবং তা আপনার আমার জন্য খুবই সহজ। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, আমি ভূস্বর্গ কাশ্মীরের কথাই বলছি। কাশ্মীর হলো হিমালয় পর্বতমালার সবচেয়ে বড় ভ্যালী। কাশ্মীর দুইটি দেশের মধ্যে অবস্হিত। তবে বেশীর ভাগ অংশই ভারতের মধ্যে যা জম্মু ও কাশ্মীর নামে এবং বাকী অংশ পাকিস্তানের মধ্যে যা আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিত। এছাড়া চীনের মধ্যেও অল্প কিছু অংশ আছে যাকে আকসাই চীন বলা হয়।

লিদার নদী, পেহেলগামলিদার নদী, পেহেলগাম

মোগল বাদশাহ জাহাঙ্গীর কাশ্মীরকে প্রথম তুলনা করেছিলেন স্বর্গের সঙ্গে। তাঁর আকুল আকাঙ্ক্ষা ছিল কাশ্মীরের তৃণভূমিতে মৃত্যুবরণ করার। তিনি ফার্সি ভাষায় বলেছিলেন, ‘আগার ফেরদৌস বে-রোহী যামীন আস্ত্। হামীন আস্ত্, হামীন আস্ত্, হামীন আস্ত্’ অর্থাৎ পৃথিবীতে কোনো বেহেশত থেকে থাকে, তাহলে তা এখানে, এখানে, এখানে।

যাহোক ইতিহাস বাদ দিয়ে আমরা ভারতের কাশ্মীর থেকে ঘুরে আসি। স্কুলে পড়াকালীন সময় থেকে শুনে ও পড়ে আসছি ভূস্বর্গ বা পৃথিবীর স্বর্গ হলো কাশ্মীর। এছাড়া কাশ্মীরের রাজনৈতিক উত্তাপের কারনেও কাশ্মীরের প্রতি আকর্ষন দীর্ঘদিনের। আমি পেশায় একজন চিকিৎসক হলেও ঘোরাঘুরি এবং নতুনকে দেখা ও জানার আগ্রহটা বলতে গেলে নেশার পর্যায়ে। তাই প্রতি বছর অন্ততপক্ষে ২/৪ বার কোথাও না কোথাও যাবই। এবারের পালা ভারত ভ্রমন। ভারত পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ার কারনে বেশ কয়েকবার সেখানে যাওয়া হয়েছে এবং বেশ কিছু জায়গা দেখার সৌভাগ্যও হয়েছে। প্রথমে সিদ্ধান্ত নিলাম দক্ষিন ভারতের তামিলনাড়ু, কেরালা ও কর্নাটক যাব। কিন্তু হঠাৎ করেই ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে তা উত্তর ভারতের কাশ্মীর হয়ে গেল।

ঘোড়ায় ট্রেকিং, পেহেলগাম, কাশ্মীরঘোড়ায় ট্রেকিং, পেহেলগাম, কাশ্মীর

ভূস্বর্গে পা দিব ভাবতেই ভাল লাগছে এবং প্রতি নিয়ত শিহরিত হচ্ছি। কিন্তু প্লান করতে গিয়ে এবং খোঁজ খবর নিতে গিয়ে পড়লাম মহা বিপদে। কাশ্মীর সম্পর্কে নেটে তথ্য খুব কমই পাচ্ছি। তবে আমার এ সমস্যার সমাধান হলো রাজশাহী মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত আমার কিছু ছাত্রছাত্রীর সহায়তায়, যাদের বাড়ী কাশ্মীরে। ট্যুর প্লান ও খোজ খবর নেওয়ার পাশাপাশি প্রস্তুতিও চললো সমানতালে। ফেব্রুয়ারি মাসে বিমানের টিকিটও কেটে ফেললাম। আমাদের যাত্রার তারিখ ঠিক হলো প্রায় দুইমাস পর ৮ এপ্রিল। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু টিকেট কাটার পর শুনছি কাশ্মীর ভ্রমনের অনুমতি নাই এবং সেখানে ভ্রমনটাও খুব ঝুঁকিপূর্ণ। পড়লাম মহা দুশ্চিন্তায়। এর আগে এমন অভিজ্ঞতার শিকার একবার হয়েছিও। দার্জিলিং ভ্রমনের সময় অনুমতি না থাকার কারনে সিকিম যেতে পারি নাই।

মিনি সুইজারল্যান্ড খ্যাত বাইসারান, কাশ্মীরমিনি সুইজারল্যান্ড খ্যাত বাইসারান, কাশ্মীর

শেষ পর্যন্ত সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নির্দিষ্ট সময়েই ৮ এপ্রিল কলকাতার উদ্দেশ্য রওনা দিয়ে ৯ এপ্রিল সকাল ৬:৩০ টায় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বিমানবন্দর (দমদম বিমানবন্দর) থেকে দিল্লী ও জম্মু হয়ে পৌঁছালাম কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে। বিমানবন্দরে নেমে পড়লাম আরেক বিপদে। এখানে ভারতের কোনো মোবাইল সীম কাজ করছে না। অগত্যা বিমানবন্দরের টেলিফোন বুথ থেকে আমাদের ড্রাইভার ইজাজের সহিত যোগাযোগ করলাম। যাহোক গাড়ীতে উঠে হোটেলের পরিবর্তে চলে গেলাম এশিয়ার বৃহত্তম টিউলিপ গার্ডেন দেখতে। নানা রং ও বাহারের টিউলিপ ফুল দেখে মুগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি স্মৃতিময় করে রাখতে ছবিও তুললাম অসংখ্য। সত্যিই অবাক করা এই সৌন্দর্য।

শিকারা, ডাল লেক, শ্রীনগর, কাশ্মীরশিকারা, ডাল লেক, শ্রীনগর, কাশ্মীর

এরপর নিশাতবাগ ও শালিমার বাগ দেখে ছুটলাম শ্রীনগর তথা কাশ্মীরের প্রানকেন্দ্র ডাল লেকে শিকারা রাইড করতে। ডাল লেকে এক বিশেষ ধরনের নৌকা চলে এগুলোকে শিকারা বলে। অসম্ভব সুন্দর এই ডাল লেক যেন একটি বানিজ্যিক কেন্দ্র। এই ডাল লেকেই আছে অসংখ্য ভাসমান আবাসিক হোটেল যেগুলো হাউজ বোট নামে পরিচিত। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের মার্কেট। শপিং মল থেকে শুরু করে কাচাবাজার ও ফেরিওয়ালা সবই পাবেন ডাল লেকের মধ্যে। যাহোক চারিদিকে পাহাড় বেস্টিত অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভুমি ডাল লেকে সুসজ্জিত শিকারায় ভ্রমন শেষ করতে করতে সন্ধ্যে হয়ে আসলো। আর তার সাথে বাড়তে থাকলো শীতের তীব্রতা।

গুলমার্গ, কাশ্মীরগুলমার্গ, কাশ্মীর

এরপর হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ডিনার করতে গেলাম শ্রীনগরের বিখ্যাত মোঘল দরবার হোটেলে। হোটেলে যেতেই নামের যথার্থতা অনুধাবন করলাম। যেমন সুন্দর পরিবেশ তেমনি তার বাহারী খাবার। যদিও আমরা খেতে পারলাম না খাবারে পনীর দেওয়ার কারনে। পরদিন সকাল ৬ টায় হাড় কাঁপুনি শীত উপেক্ষা করে ঝিলাম ও লিদার নদীর পাশ দিয়ে তুষারাবৃত পর্বতমালার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম শ্রীনগর থেকে ৮৭ কিঃমিঃ দুরের পেহেলগামে। এখানে ঘোড়ায় করে ৪ ঘন্টা ট্রেকিং করে মিনি সুইজারল্যান্ড নামে পরিচিত বাইসারানসহ ৬ টি দর্শনীয় স্থান ভ্রমন ছিল অসাধারন।

আপেল বাগানআপেল বাগান

এরপর একে একে হিন্দি বেতাব সিনেমার শ্যুটিং স্পট বেতাবভ্যালী, চন্দনবাড়ীর স্নো ব্রীজ ও আরু ভ্যালী ঘুরে সেদিনের মত স্বর্গ দর্শনের ইতি টানলাম। পরের দিন গেলাম গন্ডোলা বা ক্যাবলকার এবং বিশ্বের অন্যতম গলফ কোর্স ও স্কি সেন্টারের জন্য বিখ্যাত গুলমার্গ।

আবহাওয়া খারাপ ও বৃস্টি হওয়ার কারনে ক্যাবলকার বন্ধ। সবারই মন খারাপ। কিন্তু মেঘের আড়ালে যে সূর্য হাসে আবারো তা প্রমানিত হলো তুষারপাতের মাধ্যমে। এপ্রিলের ১২ তারিখে স্নোফল বা তুষারপাত হতে পারে কারও কল্পনার মধ্যেও ছিল না। যাহোক স্নোফলে গোসল করে স্নোর মধ্যে লাফালাফি ও স্নো দিয়ে বল বানিয়ে মারামারি করে অসম্ভব সুন্দর একটি দিন পার করলাম।

আপেল ফুলআপেল ফুল

১৩ এপ্রিল আজ আমাদের কাশ্মীর ভ্রমনের শেষ দিন। খুব ভোরে ছুটলাম জীবনে প্রথমবারের মত কোনো গ্লাসিয়ার বা হিমবাহ দেখতে সোনমার্গে। থাজিওয়াস গ্লাসিয়ার দেখে সবাই অভিভূত। রাস্তায় কয়েক ফিট পর্যন্ত বরফের স্তুপ। উপরে নীল আকাশ আর নীচে শ্বেত শুভ্র তুষারের গালিচা। এক কথায় অসাধারন। একবার গেলে যেখানে বারবার যেতে ইচ্ছে করবে।

এরপর বাজরাঙ্গী ভাইজান ও রাম তেরে গঙ্গা মেরে ছবির শ্যুটিং স্পট দেখে শ্রীনগরে এসে হজরত বাল মসজিদ দেখে চলে আসলাম কাশ্মীরের আভিজাত্যের প্রতীক ডাল লেকের হাউজ বোটে। হাউজ বোট সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় অসম্ভব তার নির্মান শৈলী ও কারুকাজ। আর তার সাথে দরজা জানালায় পাশমিনা কাপড়ের পর্দা, মেঝেতে লাল গালিচা ও কারুকাজ করা কাঠের আসবাব পত্র আপনাকে চমকে দেবার জন্য যথেষ্ঠ। কি নাই এখানে? লিভিং রুম, ডাইনিংরুম, বেডরুম সাথে বাথটাব সবই পাবেন। এক কথায় অসাধারন। রাতে হাউজ বোটে রাত্রিযাপন করার মাধ্যমে আমাদের ভূস্বর্গের মধুর দিনগুলি সোনালী স্মৃতিতে রুপান্তরিত হলো।

পেহেলগামপেহেলগাম

কখন যাবেনঃ কাশ্মীর ঘোরার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তবে যে সময়ই যান সবসময়ই কম হোক বেশি হোক কাশ্মীরের রুপ আপনাকে মুগ্ধ করবেই । তবে কাশ্মীরের পুরো রুপ দেখতে চাইলে আপনাকে অন্তত তিনবার যেতে হবে। এপ্রিল থেকে মে বসন্তকালঃ এই সময় ফুলে ভরা ভ্যালী। টিউলিপ ফুলও দেখতে পারবেন। আর শীতের পরপরই তাই তুষারও অনেক। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর শরৎকালঃ এই সময়ে তুষার কিছুটা কম থাকবে। তবে উপরের দিকে পাওয়া যাবে। যেমন, গুলমার্গ গন্ডোলার ২য় ফেজে, সোনামার্গের থাজিওয়াস হিমবাহে। এই সময় ফল পাওয়া যাবে। গাছে গাছে আপেল ঝুলে থাকবে। আর তার সাথে চিনার গাছের রঙ্গিন রুপ। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি শীতকালঃ এই সময়ে দেখবেন সাদা শুভ্র পাহাড়। চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ আর তুষারপাত তো আছেই। তবে শীতকালে অসুবিধাও অনেক। শীতের অনেক প্রস্তুতি নিতে হবে, রাস্তা-ঘাট বন্ধ থাকে ফলে অনেক জায়গায় যেতেই পারবেন না। এমন কি আপনার আটকে পড়ার চান্স অনেক বেশী। তাই সবদিক বিবেচনা করলে এবং আপনি যদি একবার যেতে চান, তাহলে এপ্রিল-মে উপযুক্ত সময়।

লিদার নদী, বেতাবভ্যালী, পেহেলগামলিদার নদী, বেতাবভ্যালী, পেহেলগাম

কোথায় কোথায় ঘুরবেন কি কি দেখবেনঃ

কাশ্মীর পুরোটাই ভ্রমণপিপাসুদের জন্য স্বর্গ। তারপরও ভিন্ন ভিন্ন লোকেশনে বেশ কিছু টুরিস্ট স্পটের তালিকা দিলাম-

১। শ্রীনগরেঃ মোঘল গার্ডেন, টিউলিপ গার্ডেন, ডাল লেক ও নাগিন লেকে শিকারা রাইড, হযরত বাল মসজিদ।

২। গুলমার্গঃ গন্ডোলা (ক্যাবল কার), গলফ কোর্স, আফারওয়াত পিক, সেন্ট ম্যারী চার্চ।

৩। পেহেলগামঃ লিদার নদী, বেতাব ভ্যালী, আরু ভ্যালী, চন্দন বাড়ী এবং ঘোড়ায় ট্রেকিং করে পেহেলগাম ভিউপয়েন্ট, মিনি সুইজারল্যান্ড খ্যাত বাইসারান, ধাবিয়ান, কাশ্মীর ভ্যালী ভিউপয়েন্ট, কানিমার্গ, জলপ্রপাত, তুলিয়ান ভ্যালী ইত্যাদি। পায়ে হেঁটেও যাওয়া যায়। তবে বৃষ্টি হলে রাস্তা অনেক পিচ্ছিল থাকে। আর তাছাড়া ঘোড়ায় চড়লে একটু রোমাঞ্চ ও হয়।

৪। সোনমার্গঃ প্রধানত থাজিওয়াস হিমবাহ। এছাড়া সিন্ধ নদী, জলপ্রপাত, বাজরাঙ্গী ভাইজান ও রাম তেরে গঙ্গা মেরে ছবির স্যুটিং স্পট।

খাজিওয়াস হিমবাহখাজিওয়াস হিমবাহ

এবার আমরা দেখি এই প্রধান স্পটগুলো ঘুরে দেখার জন্য কিভাবে প্লান করা যেতে পারে-

দিন-১: শ্রীনগর

দিন-২: পেহেলগাম (পেহেলগামে রাতে থাকবেন)

দিন-৩: পেহেলগাম (পেহেলগাম দেখা শেষ করে শ্রীনগরে আবারও ফিরে আসবেন

দিন-৪: গুলমার্গ (গুলমার্গ দেখে শ্রীনগরে ফিরে আসবেন)

দিন-৫: সোনামার্গ (রাতে হাউজ বোট ডাললেক ,শ্রীনগর থাকবেন থাকবেন)

এশিয়ার বৃহত্তম টিউলিপ গার্ডেন, শ্রীনগর, কাশ্মীরএশিয়ার বৃহত্তম টিউলিপ গার্ডেন, শ্রীনগর, কাশ্মীর

প্রয়োজনীয় টিপসঃ

১।কাশ্মীর পর্যটন এলাকা। এখানে সবকিছুর দাম বেশী চাইবে। তাই যাই করুন না কেনো, দরদাম করতে ভুলবেন না। তবে ভদ্রভাবে কথা বলবেন অবশ্যই।

২। এখানকার খাবারে মসলা বেশী থাকায় বাংলাদেশীদের খেতে সমস্যা হয়। ভাতের দামও অনেক বেশী । তাই রুটি খেলে খরচ কম হবে এবং খাওয়াও যাবে।

৩। সন্ধ্যা ৮টার পর হোটেলের বাইরে অযথা ঘোরাফেরা করবেন না। আর হ্যাঁ, কেনাকাটা করতে চাইলে রাত ৮ টার মধ্যেই সারুন। কারন রাত ৮ টার পর দোকান বন্ধ হয়ে যায়।

খাজিওয়াসখাজিওয়াস

৪। যেখানেই যান পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন।

৫। কাশ্মীর মুসলিম প্রধান (৯৯%)। তাই মুসলিম হলে পরিচয় দিলে সুবিধা পাবেন। আর একটি কথা কাশ্মীরীরা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে খুব পছন্দ করে এবং সাকিব আল হাসানের খুবই ভক্ত। তাই বাংলাদেশী পরিচয় দিন নির্দিধায়।

৬। প্রয়োজনে আপনি সাহায্য নিতে পারেন ইজাজ আহমেদ, কাশ্মীরের একজন গাড়ীর ড্রাইভার মোবাইল নং- +৯১৯৬২২৮২৩৩৯৫