প্রথম প্রথম উত্তরের দেশে গেলে যা হয়, অবাক হয়ে প্রকৃতি- মানুষ- যন্ত্র দেখি! পরিযায়ী হাঁসের ডানার কাঁপন বুকে মাঝে গিয়ে বাজে। নীল হ্রদের মাছেরা নিয়ে যায় কোন অজানা দেশে। সবচেয়ে বেশী অভিভূত হই সূর্যের কাজ কারবারে, গ্রীষ্মে সে ২২ ঘণ্টা দর্শন দেয়, কিন্তু শীত আসলে কোন অজানা গুহায় শেয়ালের মত সেধোয় কে জানে! তখন আঁধারের রাজ্য, আর রাজত্ব তুষার শুভ্রতার, কনকনে বাতাসের, হিম স্পর্শের। আর অপার্থিব মেরুজ্যোতির, যদি সে দর্শন দেয়।

মেরুজ্যোতি সাধারণত Northen Light বা Ploar Light নামেই পরিচিত, উত্তরের মেরুজ্যোতিকে Aurora borealis আর দক্ষিণের মেরুজ্যোতিকে Aurora Australis বলা হয়, যদিও বাংলায় হয়ত মেরুজ্যোতির চেয়ে অরোরা বললেই মানুষ বেশী চিনবেন। মেরিজ্যোতি কী , কেন ঘটে, কোথায় ঘটে ইত্যাদি নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা মিলিয়ে চমৎকার এক নোট লিখেছিলেন ফিনল্যান্ডের বসবাসরত হাচল ইয়াসীন, সেটি এই লেখার শেষ জুক্ত করে দিলাম, আজ মূলত শোনাব সেটি প্রথম দেখার অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা, অরোরার গানের কথা!


Aurora Australis

বিশ হাজার লোকের নিরিবিলি শহর ভারকাউসে থাকি, ২০০২ এর শেষদিকে যেয়েই প্রথমে সেই শহরের তারা দেখে আর পাখি পেছনে দৌড়ায় এমন মানুষদের সাথে সখ্য হয়ে গেছে, বিশেষ কিছু দেখা যাবার সম্ভাবনা থাকলে তারাই ফোন করে ডেকে নিয়ে যায়। মুশকিল হচ্ছে বছরের যে সময়টা আবহাওয়া অতি চমৎকার থাকে, স্রেফ নেংটি পড়েই কয়েক মাস কাটিয়ে দেওয়া যায় সেই সময় আকাশে থাকে সদা প্রহরামান সূর্যদেব, তার উপস্থিতিতে রাতের সব তারা দিনের আলোর গভীরে লুকোয়, কাজেই নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের জন্য একমাত্র শীতকালই ভরসা, যখন ঘন আঁধার ছড়িয়ে থাকে অমোচনীয় কালীর মত উত্তুরে আকাশে। কিন্তু তখন সমস্যা হচ্ছে ঠাণ্ডা, মোলায়েম শীতের বাতাস নয়, নিষ্ঠুর করাল হিম যাতে মানবজীবন হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। সেই ঠাণ্ডার মাঝে কিছু নিশিতে পাওয়া মানুষের সাথে সাথী হয়ে যেতাম অনন্ত নক্ষত্র বীথি দেখতে HärkäMäki (ষাঁড়ের পাহাড়) নামের এক পাহাড়ি বনে, ভারকাউস থেকে ৩৫ কিমি দূরে অবস্থিত, মূল কারণ ছিল অবশ্যই শহরের আলোক দূষণ এবং ধুলো দূষণ এড়ানো। সাথে থাকত পেল্লাই এক টেলিস্কোপ ( দশ হাজার ইউরো দাম ছিল তার দশ বছর আগেই!) আর ছবি তোলার ক্যামেরা। সেটা দিয়েই প্রথম অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি দেখার অসহনীয় আনন্দ অনুভব করি, চেনা- অচেনা তারা, নীহারিকা, গ্যালাক্সি দেখি। সাধারণত রাত আটটার দিকে আমাদের যাত্রা শুরু হত, তবে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে সেদিন সমস্ত কিছু বাতিল করতে হত, ওত বেশী ঠাণ্ডায় টেলিস্কোপ পরিচালনা করা যায় না।

এমন এক রাতে যখন একরত্তি কিন্তু আলো ঝলমলে শহর ছাড়িয়ে তুষারশুভ্র আঁধারকালো বনে ঢুকেছি তখনি সহযাত্রী মারক্কু নিসসিনেন বলে উঠল, ”আহহা আজ মনে হয় অরোরা দেখা যাবে, ধুর! কেঁচে গেল আমাদের সমস্ত আয়োজন”!মনে মনে তো আমি খুশীতে বাগবাগ, আজ পর্যন্ত অরোরা কেবল ছবি আর ভিডিওতেই দেখেছি, বাস্তবজীবনে তাঁকে দেখার জন্য কত লক্ষ মানুষ এই উত্তরের দেশে আসে ফি বছর, আর সেখানে নিজে থেকেই এসে ধরা দেবে সেই অশরীরী সৌন্দর্য, এর চেয়ে ভাল আর কী হতে পারে। আস্তে করে মারক্কুকে বললাম, অরোরা দেখা গেল কী সমস্যা! সে মহা চটে বলল,”আরেহ , সারা আকাশ তো অরোরা দখল করে নেবে, তারা দেখব কীভাবে!”


(ছবি - নাবিল আশরাফ)

পুরো পথ পাড়ি দেবার আগেই আকাশে বেশ একটা ঝলমলে পান্না সবুজ আভা ফুটে উঠল, আমরা পাহাড় চুড়োয় যেতে যেতে তা হয়ে গেল মহাবিশ্বব্যাপী। সে এক বর্ণনার অতীত বিষয়। আলগোছে আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে যাচ্ছে সবুজ রশ্মির ঝালর, ইচ্ছে মত বাক নিচ্ছে, এলোমেলো চলছে, কখনো উপর দিকে ধাইছে কখনও দিগন্ত পানে ! মনে হচ্ছে জীবন আছে সেগুলোর।

সত্যি কথা বলতে সেই নির্জন হিম অরণ্যে বরফের গাদায় দাঁড়িয়ে মাথার উপর ছুটন্ত মেরুজ্যোতি দেখে গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল সেদিন। কেমন যেন হাহাকার করা অশরীরী একটা ব্যাপার, অতৃপ্ত কিছু যেন ছুটে বেড়াচ্ছে মহাকাশে অজানা আক্রোশে , লেলিহান সবুজ শিখায় যেন পুড়ে যাচ্ছে ব্রহ্মাণ্ড। কিন্তু তার সদা পরিবর্তনশীল সৌন্দর্য পুরোই মাতাল করে দেয়, একটা স্বপ্ন স্বপ্ন আমেজ তৈরি করে, জেগে আছি নাকি কোন স্বর্গের সুধাকাননে দাঁড়িয়ে ভেলকিবাজি দেখছি তা নিয়ে দ্বিধা তৈরি নয় আপন মনে।

আর দেখা গেছিল দিগন্তে সৃষ্ট আধাবলয়, যা বেশ বিরল মনে শুনলাম ফিনিশ বন্ধুদের কাছে।

কিন্তু প্রকৃতির খাম খেয়ালীপনার তখনও বাকী, সবুজ বিশ্বের মাঝে ফুঁটি ফুঁটি বেগুনী বিন্দু দেখা দিতে থাকল, একসময় সেগুলো দখল করে অন্য বিশ্বের লাল রশ্মির দল। লাল অরোরা দেখা বিশাল সৌভাগ্যের বিষয়, অরোরা অবলোকনকারীদের শতকরা ৯৫জনই ঘুরে ফিরে সবুজ রঙাটাই দেখে থাকে।

তখন যে কি আনন্দ হল, মনে হল বিশাল কিছু একটা জয় করে ফেলেছি একই রাতে এত সব দুর্লভকে প্রত্যক্ষ করে। তখন ক্যামেরা ছিল না, একটু খচখচ করছিলাম বটে , আবার এও ঠিক যে ছবি তোলার দিয়ে মনোযোগ না দেওয়ায় আকণ্ঠ ও আশরীর ঊপভোগ করেছিলাম সেই সাররিয়েল সূক্ষ সৌন্দর্য, ভাল লাগায় ও ভালবাসায়। নিজেকে মনে হচ্ছিল কোন নিঃসঙ্গ গ্রহচারী যে মুগ্ধ সদ্য ল্যান্ড করা কোন অজানা গ্রহের প্রাকৃতিক বিস্ময়ের ঝলকানিতে।

এরপর আরও অসংখ্যবার অরোরা দেখেছি, লাল- বেগুনী- সবুজ আলোর স্নিগ্ধ হয়েছি এমনকি বিশ্বের উত্তরতম জনবসতি স্পিটসবের্গেনে যেয়ে শুনলাম শীতের সেখানের অরোরা এতই তীব্র হয় যে তাতে বই পড়ার কাজ দিব্যি চলে যায়! কিন্তু প্রথমবার সে অসীমকে ছোঁয়ার যে অব্যক্ত অনুভূতি , তার তুলনা আর কোথাও পাই নি।


(হারকামাকিতে আমাদের টেলিস্কোপ ও অরোরা)

অরোরা নিয়ে নিচের তথ্যগুলো হাচল ইয়াসীনের নোট থেকে নেওয়া-

সূর্যেও অগ্ন্যুৎপাত ঘটে, ঘটে বিস্ফোরণ এবং সূর্যের গায়েও আছে কালো কালো দাগ, যার নাম ‘সৌর কলঙ্ক’; অর্থাৎ কলঙ্ক কেবল চন্দ্রের একক সম্পদ নয়। খালি চোখে আমরা সূর্যের দিকে তাকাতে পারিনা বিধায় সৌর কলঙ্কের এই দাগগুলো আমরা দেখতে পাই না। এই সৌর কলঙ্কে রয়েছে তীব্র শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র। সুর্যের বিস্ফোরণ সাধারণতঃ ঘটে সৌরকলঙ্কের কাছাকাছি, কেননা এই বিস্ফোরণের সঙ্গে চৌম্বকক্ষেত্রের সম্পর্ক রয়েছে নিবিড়। বিস্ফোরণ ব্যাপক হলে সূর্যের পৃষ্ঠদেশ থেকে বেরিয়ে আসে রঞ্জনরশ্মি এবং প্রোটন, ইলেকট্রন ইত্যাদি পারমানবিক আয়নিত (তড়িৎ পরিবাহীকৃত) কণিকা। ধাবমান এই কণিকাগুলো যখন পৃথিবীর উপরিস্থিত বায়ুমন্ডলে চলে আসে, তখন তা পৃথিবীর দুই মেরুর চৌম্বকক্ষেত্রে আকর্ষিত হয় এবং সেখানকার বায়ুস্থিত গ্যাসীয় কণাগুলোকে প্রবল ঘর্ষণের দ্বারা জ্বালিয়ে দেয়। সেই থেকে সৃষ্ট হয় জাজ্বল্যমান আলোকের এই প্রভা।

উত্তর মেরুর কাছাকাছি থাকি বলে যে রঙের খেলা দেখি তা- নর্দান লাইট। তবে দক্ষিন মেরুর আকাশেও আলোর এমন আকস্মিক ক্রীড়া দৃশ্যমান। অরোরা-র বাংলা নামটি হচ্ছে মেরুজ্যোতি। এই মেরুজ্যোতি বা অরোরা দু’ধরণের হয়- অরোরা বোরেয়ালিস (Aurora Borealis) যা দৃশ্যমান ৫০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে; সহজ করে বলতে গেলে বিষুববৃত্ত হতে ৫০ ডিগ্রি উত্তর কৌণিক দূরত্বের অঞ্চলব্যপী (উত্তর মেরু সংলগ্ন) এবং অরোরা অস্ট্রালিস (Aurora Australis) দেখতে পাওয়া যায় ৫০ ডিগ্রি দক্ষিন কৌণিক দূরত্বের অঞ্চলে (দক্ষিন মেরু সংলগ্ন); বিষুববৃত্ত হচ্ছে নিরক্ষবৃত্তের সমান্তরাল আকাশস্থ কাল্পনিক বৃত্ত; আর নিরক্ষবৃত্ত পৃথিবীর দুই মেরু থেকে সমদূরত্বে অবস্থিত পৃথিবীকে বেষ্টনকারী কাল্পনিক বৃত্তরেখা। আরেকটু পরিস্কার করে বলতে গেলে অরোরা বোরেয়ালিস (Aurora Borealis) বা নর্দান লাইট দেখা যায় সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা, কানাডার পশ্চিমাংশ, স্কটল্যান্ড, স্ক্যান্ডিনেভিয়্যান কয়েকটি দেশ অর্থাৎ ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে এছাড়াও রাশিয়ার উত্তরাংশ- এই অঞ্চলগুলোতে। অন্যদিকে দক্ষিন আমেরিকার দক্ষিনাংশ, অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিনে তাসমানিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে অরোরা অস্ট্রালিস (Aurora Australis) বা সাউদার্ন লাইট দৃশ্যমান। মেরুজ্যোতি কবে ও কখন আকাশ রাঙাতে পারে তার পূর্বাভাস দেয়া দূরুহ। সাধারণতঃ নির্জন, নাগরিক কৃত্রিম আলো বর্জিত, মেঘমুক্ত আকাশে এই জ্যোতি দেখতে পাওয়া যায়। সাউদার্ন এর তুলনায় নর্দান লাইট অধিক দেখা যায়। উল্লেখিত স্থানগুলো ছাড়াও হঠাৎ হঠাৎ অন্য কোথাও মেরুজ্যোতি দেখা যেতে পারে। কিছুদিন আগে সুইটজারল্যান্ডেও দেখা গেছে। মূলতঃ সৌর উদ্গীরণের বৃদ্ধি, সৌর কলঙ্কের বৃদ্ধি এবং সৌরবায়ুর গতিবৃদ্ধি ঘটলে মেরুজ্যোতির বিচরণ ক্ষেত্রও ব্যাপকতর হয়।

বর্ণময় এই আলোকবন্যায় যেসব রঙ উদ্ভাসিত হয়, সেগুলো হচ্ছে- লাল, গোলাপী, সবুজ আর নীল। বর্ণের এই তারতম্য অরোরার উচ্চতা এবং পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বিন্যাসের উপর নির্ভরশীল। ভূপৃষ্ঠ হতে ৯০ থেকে ১৫০ কিঃমিঃ উপরের বায়ুস্থিত অক্সিজেনের কারণে সবুজ ও হলুদাভ মিশ্রণের জ্যোতি দেখা যায় এবং ১২০ কিঃমিঃ উচ্চতার বায়ুস্তিত হাইড্রোজেন ও ১৫০ কিঃমিঃ এর উপরে অক্সিজেন লালাভ মেরুজ্যোতির হেতু।

মহাকাশে ঘটমান অনেক কর্মকান্ডই পৃথিবীর উপর বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। অরোরা-র ক্ষেত্রে তা সর্বদা নিশ্চিত নয়। ১৮৪৩ অব্দে জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরিশ শোয়াবে আবিস্কার করেছিলেন যে ১১ বছর পরপর সৌরকলঙ্ক সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে, যাকে বলে সৌরকলঙ্ক চক্র। যখন সৌরকলঙ্কের সংখ্যা বেয়ারা ধারায় বাড়তে থাকে, তখন মেরুজ্যোতির আবির্ভাবও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে অর্থাৎ মেরুজ্যোতি অতিদীর্ঘকালীন এবং অতিমাত্রায় আবির্ভূত হলে কিছু কিছু বিক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ার প্রমান পাওয়া গেছে; যেমন- রেডিও ও বিদ্যুৎ ট্রান্সমিশনে ব্যাঘাত, কৃত্রিম উপগ্রহের কক্ষপথ বিচ্যুতি ইত্যাদি; তবে প্রতিক্রিয়ার হার খুব একটা বেশী আদৌ নয়।

দূর অতীতে মানুষের চেতনাশক্তির দৌড় ছিল চোখের দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, জ্ঞানের পরশে চেতনার বৃদ্ধি তখন ঘটে ওঠেনি। আকাশ ছিল সবার কাছে অলৌকিকতায় পূর্ণ এক মহাবিস্ময়। আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ে, রোদের তাপ ও আলো আসে, আকাশে চাঁদ-তারা-সূর্য ওঠে, আকাশ কখনও ফরসা আবার কখনও অন্ধকার; এইসব দেখে তাদের বিশ্বাস ছিল আকাশই সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রক কিংবা সবকিছু যিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁর বাস ঐ চির অধরা গগনদেশে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়কে অলৌকিকতার স্নো-পাউডার মেখে সমাজপতিরা সাধারণ মানুষের ’পরে চাপিয়ে দিত; প্রতিষ্ঠিত হতো সমাজপতিদের অধিকার, তৈরী হতো সৃষ্টি ও স্রষ্টা তত্বের ভ্রান্ত যত ধারণা। অগনিত সেসব অলৌকিক ও পৌরাণিক ঘটনার মাঝে অরোরা নিয়েও আছে অদ্ভূতুড়ে তবে মজাদার নানান গপ্পো। অরোরা বা মেরুজ্যোতি এখন যেমন দেখা যায়, হাজার-লক্ষ বছর আগেও, পুরাণগর্ভা যুগেও দেখা যেত। এখন বিজ্ঞানের কল্যানে মেরুজ্যোতির বাস্তব চিত্র আমাদের জ্ঞাত। সে উপায় কি তখন ছিল? তাই প্রযুক্তিহীন সেই যুগের কাল্পনিক তত্ত্বগুলোকে স্বীকার না করলেও অবজ্ঞা করাও উচিৎ নয়।

অরোরা-র আদিতম বর্ণনা পাওয়া যায় মেডিটেরেনিয়্যান অঞ্চল এবং প্রাচীন চৈনিক মতবাদগুলো থেকে। ভৌগলিক অবস্থানুযায়ী যদিও তারা হয়তো এক কি দুই বার অরোরা প্রত্যক্ষ করেছেন। অনেকেই মনে করেন চীন ও ইয়োরোপের প্রাগৈতিহাসিক ড্রাগন-কিংবদন্তী মেরুজ্যোতির বিন্যাস হতেই উদ্ভূত। প্রখ্যাত গ্রীক দার্শনিক নমস্য এরিস্টটল এই আলোকের বর্ণনায় অবশ্য কোনো অলৌকিকতার দ্বারস্থ হননি; পৃথিবীরই কোনো উৎস হতে উৎসারিত আলোক শিখার সঙ্গেই তিনি এর তুলনা করেছেন। রোমান-রা মেরুজ্যোতির নাম দিয়েছিলেন ‘চাশমাতা’ বা স্বর্গ-গুহার মুখ। বৃটিশ ক্ষুদ্র-দ্বীপপুঞ্জীয় অঞ্চলে এর নাম ছিল ’Nimble men’ এবং ’Merry dancers’- এগুলো স্থানীয় রুপকথার চরিত্রসকল; সেখানকার মাঝি ও জেলেরা ভাবতো ’Merry dancers’ অধিক গতিময় হলে আবহাওয়া বৈরী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রাচীন এস্তোনিয়্যানরা এই আলোকজ্যোতিকে ভাবতো ক্রীড়ারত তিমি, কখনওবা কুমির। অস্ট্রেলিয়্যান আদিবাসীরা মনে করতো এই আলোর ভেল্কি আকাশে দেবতাদের নৃত্যের দৃশ্য। স্ক্যান্ডিনেভিয়্যান আদিবাসী অর্থাৎ ‘সামি’-গণ মেরুজ্যোতিকে স্থান দিয়েছিলেন সমীহ এবং শ্রদ্ধার আসনে; তারা একে ভাবতেন দ্বন্দ নিরসনের শক্তি স্বরুপ। নর্স (উচ্চারণান্তরে ‘নর্সে’) পুরাণ মতে ‘এসগার্ড’ অর্থাৎ দেবতাদের বাসস্থান এবং পৃথিবীর মধ্যে সংযোগ রক্ষার্থে একটি সেতু আছে, যার নাম- ‘বিফ্রস্ট’; আর স্বয়ং দেবতারাই এই সেতুর রক্ষক ও প্রহরী। পুরাণ লেখক অরোরা নতুবা রঙধনু দর্শনোত্তরই হয়তো এই কাল্পনিক সেতুর ধারনায় উপনীত হয়েছিলেন।

আবার নর্স পুরাণে এমনও দেখা যায়, দেবেশ্বর ওডিন-এর কিছু সহায়তাকারী মহিলা যোদ্ধা ছিল, যাদের বলা হয়- ভালকারি; এই ভালকারিদের উপর দায়িত্ব ছিল যুদ্ধ শেষে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সেইসব মৃতযোদ্ধাদের সনাক্তকরণ যাদের গন্তব্য হবে ‘ভালহাল্লা’; একচক্ষু দেবরাজ ওডিনের বাসস্থান হলো ভালহাল্লা, যাকে অনেকে স্বর্গ বলেও অভিহিত করেন। এই ভালকারিগন যখন কর্ম সম্পাদনে যুদ্ধক্ষেত্রে আসতেন তখন তাদের ঢাল হতে আলোক কিরণ প্রতিফলিত হতো, আর প্রতিফলিত সেই কিরণই অরোরা। স্ক্যান্ডিনেভিয়্যান পুরাণ মতে এও জানা যায়, অরোরার জ্যোতি মূলতঃ ভাইকিং দেবী ফ্রেইয়া হতে উদ্গীরিত বিভা। ফিনিশ ( ফিনল্যান্ড ভিত্তিক) পুরাণ বিশ্বাসে পৌরাণিক অগ্নি-শৃগালের উল্লেখ আছে, যার বিচরণ ছিল উত্তর ফিনল্যান্ডের ল্যাপল্যান্ড-এ। এই অগ্নি শৃগাল তার লেজের পুচ্ছ দ্বারা আকাশের জলীয় বুদবুদ ঝেড়ে নিত, আর তখন অগ্নি সেই বুদবুদের উপর প্রতিফলিত হয়ে তৈরী হতো মেরুজ্যোতি। এই শিয়াল সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দু’তিন জায়াগায় দু’তিন রকমের পাওয়া যায়। আরে বাবা, পৌরাণিক ব্যাখ্যায় মতবিরোধতো থাকেই। মহাদেব ঔরসে দূর্গাগর্ভজাত পুত্র গনেশ-এর মস্তক হাতির মস্তকের মত কেন হলো, সে নিয়েও অনেক মতবাদ আছে। যাইহোক এ যাত্রায় প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে ফের প্রতীচ্যে যাই। তৎকালীন স্থানীয় আদি আমেরিকানগন বিশ্বাস করতো অরোরার শ্রবনশক্তি কার্যকর। কেউ অরোরাকে উদ্দেশ্য করে শিস বাজালে তাকে আকাশে উড়িয়ে নিতে অরোরা নীচে চলে আসতো, আবার নিম্নমূখী অরোরার প্রতি হাত তালি দিলে তা আকাশে ফিরে যেত।

অনেকে আবার এও মনে করেন, মেরুজ্যোতির বিকাশ কালে সো-সো শব্দ হয়। বিজ্ঞান এখনও তার প্রমান পায়নি। তবে আমার ধারনা, যেহেতু অরোরা সাধারনতঃ অপেক্ষাকৃত নির্জন এবং গাছপালায় ঘেরা অঞ্চল থেকে বেশী দেখা যায়, তাই সেইসব গাছপালা বাতাসে দুলতে দুলতে যে শব্দ তৈরী করে তা থেকেই এমনতর বিশ্বাসের জন্ম। এমনি আরো অসংখ্য ভ্রান্ত বিশ্বাস আছে অরোরা কে ঘিরে। এসব বিশ্বাসের মাঝে পারস্পরিক বিরোধিতাও বিদ্যমান। আমি আবারো এ বিষয়ে আমার মত জানাচ্ছি, সে যুগে প্রযুক্তি নির্ভর বিজ্ঞান ছিল না, তাই তাদের ধারণাগুলো নিয়ে হাস্য পরিহাসের কোনো কারণ নেই। তারা একদিন ভাবনার পালে হাওয়া লাগিয়েছিল বলেই ভাবতে ভাবতে আজ আমরা এতদূর পৌঁছুতে পেরেছি।

ফিনল্যান্ডস্থিত ‘নর্দান লাইট রিসার্চ সেন্টার’ থেকে প্রকাশিত একটি সংকলন পড়ে জানলাম, প্রতিবছর এই উত্তরী আলোকজ্যোতি দর্শনে প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটে এই দেশটিতে। সৌভাগ্যক্রমে অনেকে দেখতে পায় আর অনেকে গুচ্ছের কড়ি জলে ফেলে বিনাদর্শনেই ফিরে যায়; কেননা অরোরা-র আবির্ভাব সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব নয়। এই সমস্যা নিরসনে বিজ্ঞানীরা জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পুরাণগর্ভা যুগকে মূর্খ, অজ্ঞান আখ্যা দিয়ে আমরা অনেকেই হেয় করি। বলতে বাঁধা নেই প্রত্যেহ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত এবং সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয়াবধি আপাদমস্তক বিজ্ঞানের নির্মল জলে স্নান করেও এখনও আমরা অনেকেই পৌরাণিকতার জালেই আবদ্ধ। উদাহরণ স্বরুপ- জ্যোতিশ বিশ্বাস; একটু পড়ালেখা করলেই জানা যায় যে ‘কসমিক রে’ বা মহাজগতিক রশ্মির কোনো রঙ নেই, তবু সেইসব ভ্রান্ত ধারণার রঙ থেকে বাঁচতে কিংবা রঙগুলোকে কাজে লাগাতে গোটা বিশ্বের অনেকেই অঙ্গুলিতে বিভিন্ন পাথরের আংটি পরিধান করেন, আর জ্যোতিশিদের পকেট ও খ্যাতি তর তর করে ফুলে ফেপে ওঠে।

আমেরিকার কিছু প্রাচীনপন্থী মানুষ বিশ্বাস করেন অরোরা কুকর্মেরই একটি ফল, আর কুকর্মটি হচ্ছে জাপান কতৃক পার্ল হারবারে বোমা বিস্ফোরণ। পূর্বোল্লিখিত সংকলনটি পড়ে এও জানলাম অনেক পর্যটক শুধুমাত্র মেরুপ্রভা দর্শনার্থেই ফিনল্যান্ডে আসেনা, কারো কারো মনে এমনও কুসংস্কার বিরাজমান- মেরুজ্যোতির আবির্ভাবকালে নারী-পুরুষের সংগমের ফলে নারী গর্ভবতী হলে নির্ঘাত পুত্র সন্তান জন্মাবে। এই বিশেষ কারণে আগত পর্যটকদের বিশেষ একটি সংখ্যা বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত দম্পতি; তাদের উদ্দেশ্য মেরুজ্যোতির আশীর্বাদপুষ্ট মধুচন্দ্রিমা। আহ! শুধু প্রাচ্যে নয়, প্রতীচ্যেও এখনও পুত্র সন্তানদের কদর রয়ে গেল। এ প্রসঙ্গে সংকলন রচয়িতা যা লিখেছেন, তা পড়ে যা বুঝলাম, তা হচ্ছে- পুত্র বা কন্যা জন্মাবার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের শারীরিক কিংবা আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে পুরুষের শুক্রানু এবং নারীর ডিম্বকোষের যে মিলন, অর্থাৎ xx এবং xy ক্রোমোজমের যে আনপ্রেডিক্টেবল বিক্রিয়া, তার উপর সংগমকরণ স্থান কখনই কোনো প্রভাব ফেলতে পরে না, তা সে ফুলশয্যা মেরুজ্যোতিতে জ্যোতির্ময় ফিনল্যান্ডই হোক আর অমাবস্যার আধারময় কামরূপ কামাখ্যা। সর্বক্ষেত্রে পুত্র বা কন্যা জন্মাবার সম্ভাবনা একই, অর্থাৎ ফিফটি-ফিফটি।

সবকিছুর অন্তে যা বুঝলাম এবং জানলাম, তা হলো অরোরা বা মেরুজ্যোতি প্রকৃতির নিছক একটি ঘটনা, মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক একটি উপলক্ষ্য মাত্র। ।। আর এটি শুধু পৃথিবীতেই নয়, মঙ্গল ও শনি গ্রহেও দেখা গেছে।


(শনির অরোরা)

( পোস্টে ব্যবহৃত দুইটি সবুজ অরোরার ছবি ফিনল্যান্ডে বসবাসকারী তরুণ আলোকচিত্রগ্রাহক নাবিল আশরাফের তোলা। ভিনগ্রহের অরোরারগুলোসহ কয়েকটি ছবি নাসার ওয়েবপেজ থেকে নেওয়া। বাকী গুলো মহাকাশ বিষয়ক ওয়েব বিশেষ করে ভারকাউসের সেই আকাশ দেখার ক্লাব Warkauden Kassiopea থেকে নেওয়া, এখন পর্যন্ত অরোরার ছবি তোলা হয় নাই আমার , আশা করি তাঁকে ফ্রেমবন্দী করতে পারব নিকট ভবিষ্যতে।)