কত বিচিত্রই না আমাদের এই ধরণী। অসংখ্য বিচিত্র ও বিস্ময়কর স্থান আছে এই পৃথিবী নামক গ্রহে। যার অনেক কিছুই আজও মানুষের কাছে অজানা। তেমনি এক বিস্ময়কর স্থান পামুক্কেলে। গত সেপ্টেম্বর মাসের ২৩ তারিখে পিএইচডি কোর্সের অংশ হিসাবে ইউরোপীয়ন স্কলারশীপে তুরস্কে এসেছি ৪ মাসের জন্যে। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে এই আজব দেশটি ঘুরতে ও দেখতে ভুল করিনি।

অস্তগামী সূর্যের আলোয় পামুক্কেলে অস্তগামী সূর্যের আলোয় পামুক্কেলে

আজব দেশ বলছি এই কারনে- প্রথমত তুরস্কই একমাত্র দেশ যা কিনা দুই মহাদেশে অবস্হিত। দ্বিতীয়ত এর অধিকাংশ( ৯৭%) ভুখন্ড এশিয়া মহাদেশে হওয়া সত্ত্বেও এটি ইউরোপ মহাদেশের অন্তর্গত। তৃতীয়ত তুরস্ক হচ্ছে মিশ্র সংস্কৃতির দেশ। এক সময় মনে হবে আপনি ইউরোপে আছেন। আবার পরক্ষনেই মনে হবে আপনি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে আছেন।

দেখতে ঠিক তুলার প্রাসাদের সিংহদ্বার এর মত এটা!দেখতে ঠিক তুলার প্রাসাদের সিংহদ্বার এর মত এটা!

 

যাহোক আসল কথায় আসি। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ তুরস্কের একটি আজব জায়গা পামুক্কেলে। বলা হয়ে থাকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের পর বিস্ময়কর স্থানের জায়গাটি দখল করে আছে এই পামুক্কেলে।  তুর্কী ভাষায় যার অর্থ তুলার প্রাসাদ বা ‘কটন ক্যাসল’। তুলার মত সাদা হওয়ার কারনে সম্ভবত এমন নামকরন হয়ে থাকবে। এত সাদা যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মনে হয় যেন তুষারাবৃত পর্বত। কিন্তু পা ফেলার সাথে সাথে সমস্ত ভুল ভেংগে চুরমার হয়ে যায়। যখন শীতল পানির পরিবর্তে উষ্ণ পানির ছোঁয়া লাগে।

 তুলার মত দেখতে জমে থাকা ক্যালসিয়াম কার্বনেট তুলার মত দেখতে জমে থাকা ক্যালসিয়াম কার্বনেট

পাললিক শিলা বেস্টিত এখানকার ছোট ছোট লেক গুলি যেন একেকটি  প্রাকৃতিক বাথটাব।  আর এর স্বচ্ছ জল দেখে যে কারোরই ইচ্ছে করবে শরীরটা একটু ভিজিয়ে নিই। আমিও তার ব্যতিক্রম না। কিন্তু বিধিবাম, তুরস্ক সরকার পরিবেশ রক্ষার জন্য এখন গোসল করা নিষিদ্ধ করেছে। আগে এখানে পর্যটকরা গোসল করতো এবং এখানে গোসল করাটা শরীরের জন্য ভাল বলেই বিশ্বাস করা হত। এখনও এই বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

এত অসাধারণ জলাধার দেখলে যে কারোরই নামতে ইচ্ছে হবে! এত অসাধারণ জলাধার দেখলে যে কারোরই নামতে ইচ্ছে হবে!

এই তুলার প্রাসাদ তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দেনিজলি প্রদেশে মেন্দেরেস নদীর উপত্যকায় অবস্হিত গরম পানির ঝর্নাধারা।  এখানে ১৭টি উষ্ণ জলধারা রয়েছে যেগুলোতে তাপমাত্রা ৩৫°সে. থেকে ১০০°সে. পর্যন্ত বিরাজ করে। ২৭০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৬০০ মিটার প্রস্থ  ও ১৬০ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট পামুক্কালের বিস্তীর্ণ ভূমি ট্র্যাভারটাইন দ্বারা নির্মিত। ট্র্যাভারটাইন একটি পাললিক শিলা যা উষ্ণ জলধারার পানি জমা হয়ে তৈরি করে।

তুলার রাজ্যে লেখক তুলার রাজ্যে লেখক

এই অসম্ভব সুন্দর অদ্ভুত জায়গাটি কখন কিভাবে তৈরী হয়েছে তা সঠিকভাবে না জানা গেলেও ধারনা করা হয় ২০ লক্ষ বছর আগে ভুমিকম্পের ফলে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট জমা হয়ে তৈরী হয়েছে। এটি তুরস্কের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। ১৯৮৮ সালে ইউনেস্কো এই তুলার প্রাসাদকে  বিশ্বঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

জমে থাকা প্রস্রবণ জমে থাকা প্রস্রবণ

কিছু কথাঃ

১। এখানকার বেশ কিছু স্থাপনা পামুক্কেলের পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সরিয়ে নিয়েছে।

২। এখানকার ছোট ছোট লেকে এক সময় পর্যটকেরা শরীরের জন্য স্বাস্থ্যকর ভেবে গোসল করতো। কিন্তু দূষন থেকে মুক্ত রাখার জন্য এখন গোসল করা নিষিদ্ধ করেছে।

৩। পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে জুতা পরে প্রবেশ নিষিদ্ধ।

৪। এখানে প্রবেশ ফি ২৫ লিরা যা বাংলাদেশী টাকায় ৫৫০/- টাকা তবে আপনার মিউজিয়াম কার্ড থাকলে নতুন করে টিকেট কাটতে হবে না।