অনেক আগের কথা। তখন আমি স্কুলে পড়ি। সে সময় বাংলা ছায়াছবির রমরমা অবস্হা ছিল এবং তা সিনেমা হলে গিয়ে দেখার দেখার একটা রেওয়াজও চালু ছিল। ঠিক এই সময়ে আমার দেশের বাড়ী বিরামপুরের পল্লবী সিনেমা হলে আসলো সে সময়ের সুপার হিট ছবি ইলিয়াছ কাঞ্চন অভিনীত ভেজা চোখ। দেখার জন্য মন উসখুস করছে। কিন্তু পকেটতো গড়ের মাঠ। এমন সময় আমার বন্ধু রফিকুলের মাধ্যমে মহিতুল্লাহ চাচাকে বলে বিনে পয়সায় ছবি দেখার ব্যবস্থাও হলো। ও হ্যা মহিতুল্লাহ চাচা ছিলেন সেই সিনেমা হলের ম্যানেজার।

যাহোক মহিতুল্লাহ চাচার কল্যানে সিনেমা দেখে ফেললাম। কিন্তু ভাল লাগার পরিবর্তে আফসোস হতে লাগলো বেশী। কারণ ছবির কিছু অংশ আগ্রার তাজমহলে শ্যুটিং করা হয়েছে। ভাবছি ইলিয়াছ কাঞ্চনের কি সৌভাগ্য? তাজমহল দেখে ফেললো। তাজমহল সম্পর্কে তখন বেশী কিছু জানতাম না। শুধু এটুকু শুনেছি, তাজমহল সপ্তম আশ্চর্য। আর এই আশ্চর্য শব্দটার মধ্যেই একটি বড় আশ্চর্য লুকিয়ে ছিল। তাজমহল কোনোদিন দেখবো বা দেখতে পারবো এমন স্বপ্ন দেখার দুঃসাহসও ছিলনা। তখন তো আশুড়ার বিল ( আমার বাড়ী থেকে ১০ কিঃমিঃ দুরে) দেখাটায় আমার কাছে ছিল বড় স্বপ্ন। তবে মজার ব্যাপার হলো আমার সেই আশুড়ার বিল দেখা হয়েছিল তাজমহল দেখার পরই।

ইফিসাসইফিসাস

যাহোক এবার আসল কথায় আসি। গত সেপ্টেম্বরে ৪ মাসের একটা স্কলারশীপে তুরস্কে এসেছি পড়াশুনার জন্য। তবে একটা কথা যেমন আছে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। তেমনি আমিও যেখানেই যে কাজেই যাই না কেন? ঘোরাঘুরির বিষয়টা থাকবেই। আর সেটা যদি হয় তুরস্কের মতো সুন্দর একটা দেশ তাহলে তো কথায় নেই। এমন সময় আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ESN ( Erusmus student network) গ্রুপ তুরস্কের সপ্তাশ্চার্য দেখতে যাবার ঘোষণা দিল। যাবার সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দেরী করলাম না। সপ্তাশ্চার্য বলে কথা। অবশ্য অন্য কোথাও হলে যে যেতাম না, ব্যাপারটা সেরকমও নয়। 
অবশেষে রওনা দিলাম তুরস্কের প্রাচীন যুগের সপ্তাশ্চর্য এফিসাস দেখতে ESN গ্রুপের সাথে।

সেলসিয়াসের লাইব্রেরী, ইফিসাসসেলসিয়াসের লাইব্রেরী, ইফিসাস

রাতে রওনা দিয়ে প্রথমে গেলাম ইস্তান্বুল ও আংকারার পর তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ও বন্দর নগরী ইজমির। এজিয়ান সাগর পাড়ে অবস্থিত ইজমির প্রায় ৪ হাজার বছর আগের শহর। আর এখানে মানুষের বসতি শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে, সেই ব্রোঞ্জ যুগে। 

ক্লক টাওয়ারক্লক টাওয়ার

দুপুরের কিছু আগে পৌঁছে এজিয়েন সাগরে নৌকা ভ্রমণ ও ক্লক টাওয়ার দেখলাম। ইজমিরের এই ক্লক টাওয়ার অনেক বিখ্যাত। ১৯০১ সালে নির্মিত এই টাওয়ারটি ফরাসী স্থপিত নকশায় অটোমান আমলে তৈরী। ইজমির দর্শন সেরে পরেরদিন সকালে আমরা পৌঁছালাম আমাদের স্বপ্নের সপ্তাশ্চর্য এফিসাসে। ইফিসাস বর্তমানে তুরস্কের ইজমির প্রদেশের সেলকুক জেলা শহর থেকে ২ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। ইফিসাস অনেক প্রাচীন শহর। প্রায় ৮ হাজার বছর আগে থেকে এখানে লোকবসতী ছিল।

পাথরে খোদায়কৃত দেবীর মুর্তি, ইফিসাসপাথরে খোদায়কৃত দেবীর মুর্তি, ইফিসাস

মন্দির, ইফিসাসমন্দির, ইফিসাস

এটি একটি দর্শনীয় স্থান। আর এখানেই প্রাচীন মন্দির 'আর্টেমিসের মন্দির, প্রাচীন লাইব্রেরী (Library of Celsus), ২০,০০০ জনের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন থিয়েটার, পাহাড়ের ওপর ঈসা বে মসজিদ, অটোমান এস্টেট, গ্রান্ড দুর্গ, ভার্জিন মেরির ভবন সহ অনেক ঐতিহাসিক ভবন রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রধান আকর্ষণ,

আর্টেমিস মন্দির'ঃ

প্রাচীন যুগে গ্রিক ও রোমানরা বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করার জন্য তৈরি করতো মন্দির। গ্রিক পৌরণিক মতে আর্টেমিস ছিলেন গ্রিকদের দেবী। রোমানরা আবার তাকে বলতো 'দেবী ডায়না'। দেবী ডায়না বা দেবী আর্টেমিস ছিলেন শিকারের দেবী। ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দে গ্রিকরা লম্বায় ৩৭৭ ফুট ও প্রস্থে ১৫১ ফুটেরর মন্দিরটি নির্মাণ করে। এটিই গ্রিকদের প্রথম মন্দির যেটি পুরোটা মার্কেল পাথর দিয়ে তৈরি। এ মন্দিরটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল ১২০ বছর।

এজিয়ন সাগর, ইজমিরএজিয়ন সাগর, ইজমির

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে এক ভয়াবহ বন্যায় মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে এর পুনঃনির্মাণ কাজ শুরু হয় স্থপতি Chersiphson এবং তার ছেলে Metagenes-এর অধীনে। নির্মাণ কাজ শেষ হতে সময় লাগে ১০ বছর। Herostratus নামে এক ব্যক্তি বিখ্যাত হবার অভিপ্রায়ে খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ অব্দে মন্দিরটিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। কিন্তু বিখ্যাত হতে যেয়ে উল্টো তিনি প্রাণ হারান। বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড হয় এবং তার নাম প্রকাশে বা উচ্চারণ করলে মৃত্যুদণ্ড ছিল অবধারিত। এজন্য একটি কথা প্রচলিত আছে 'herostratic fame'।

ক্লক টাওয়ার, ইজমিরক্লক টাওয়ার, ইজমির

২৬৮ সালে পূর্ব জার্মানির গোথ (Goths) উপজাতি আক্রমণ করলে মন্দিরটি পুনরায় ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। ধারণা করা হয়, প্রাকৃতিক কারণে ৪০১ সালে মন্দিরটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় বা হারিয়ে যায়। প্রায় ৬০ বছর খোঁজাখুঁজির পর ১৮৬৯ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অনুসন্ধানী দলের উদ্যোগে এ মন্দিরটি আবিষ্কৃত হয়। এর পরে ১৯৮৭-৮৮ সালে পুনঃখনন করা হলে প্রাপ্ত মন্দিরের অংশবিশেষ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায় ব্রোঞ্জ যুগে বা খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এটির অস্তিত্ব ছিল। বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এ মন্দিরের যাবতীয় তথ্য ও নমুনা 'Ephesus Room' এ প্রদর্শিত হচ্ছে।

এজিয়েন সাগর পাড়, ইজমিরএজিয়েন সাগর পাড়, ইজমির

সেলসাসের লাইব্রেরী বা Library of Celsusঃ 

প্রাচীন যুগের তৃতীয় বৃহত্তম লাইব্রেরী এবং রোমান সম্রাজের একটি অন্যতম স্থাপনা। রোমান সিনেটর Tiberius Julius Celsus এর নামানুসারে তার ছেলে Polimaeanus ১১৪-১১৭ সালে এই লাইব্রেরী নির্মাণ করেন। এখানে ১২০০০ scrolls বা প্রাচীন পুঁথি সংরক্ষণ করা হয়। ২৬২ খুস্টাব্দে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে এই লাইব্রেরীটি ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।

অ্যাসপেন্সের থিয়েটার বা Aspendos Theatreঃ 

অ্যাসপেন্সের থিয়েটারঅ্যাসপেন্সের থিয়েটার

প্রাচীন যুগের থিয়েটার গুলোর মধ্যে অন্যতম। ২০ হাজারের অধিক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই থিয়েটার রোমান সম্রাট Marcus Aurelius এর শাসনামলে ১৫৫ খৃস্টাব্দে তৈরী করা হয়। বিভিন্ন সময়ে এটি সংস্কার করায় এটি আজও অক্ষত অবস্থায় আছে।

অ্যাসপেন্ডসের থিয়েটার, ইফিসাসঅ্যাসপেন্ডসের থিয়েটার, ইফিসাস

বিঃদ্রঃ

তুরস্কে ২ টি সপ্তাশ্চর্য - একটি প্রাচীন যুগের সপ্তাশ্চর্য ইফিসাস ও অন্যটি মধ্যযুগের সপ্তাশ্চর্য ইস্তান্বুলের Aya Sophia ( Hagia Sophia)।