ঝর্ণা, পাথর আর গাছে ঘেরা ফ্র্যাংক লয়েড রাইটের ‘ফলিং ওয়াটার’ ছিল হাজার সমস্যার সম্মুখীন হওয়া এক কালজয়ী স্থাপত্য। জোনাথন গ্ল্যান্সে বলছেন সে গল্প।

শিকাগো, ১৬ অক্টোবর, ১৯৫৬। ফ্র্যাংক লয়েড রাইট, যুক্তরাষ্ট্রের তদকালীন সবচেয়ে বিখ্যাত স্থপতি, এক সংবাদ সম্মেলন করে উন্মোচন করলেন ‘দ্য ইলিনোয়র’ স্থাপত্যটির পরিকল্পনা। মাইলখানেক উচ্চতার এই গগনচুম্বী ভবন এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এর চেয়েও চারগুণ লম্বা। আজ থেকে দেড়শ বছর আগে জন্ম নেয়া, সর্বদা উত্তেজনায় টগবগ করা এক প্রগতিশীল মানুষ রাইটের বয়স তখন ৮৯, ম্যানহাটনের ফিফথ অ্যাভিনিউতে অবস্থিত তার বিখ্যাত সলোমন আর. গাগেনহাম জাদুঘর তখন নির্মানাধীন।

আকার আকৃতি নিয়ে সমালোচনার খপ্পরে পড়েও গাগেনহাম জাদুঘরই রাইটকে নিউ ইয়র্কের মিডিয়ার প্রিয়পাত্র করে তুলেছিল। ‘৫৬র জুনে জনপ্রিয় কুইজ শো ‘ওয়াটস মাই লাইন’ এ তার উপস্থিতি ছিল, মাইক ওয়ালেসের ধোঁয়া ধূসরিত সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানের বিষয় ছিলেন তিনি দুই দুইবার। এই সাক্ষাৎকারগুলো আজও দেখতে পাবেন ইউটিউবে। আকর্ষণীয় দর্শনের রাইটের কথায় আর কুঁচকানো চোখের ভাঁজে প্রকাশ পেত ক্ষুরধার বুদ্ধি। সবচেয়ে অসাধারণ লাগবে দেড়শ বছর আগে জন্ম নেয়া এক মানুষের বাক্যে একবিংশ শতাব্দীর সামঞ্জস্য; রাজনীতি, নৈতিকতা আর স্থাপত্যের বিশাল পরিধি জুড়ে।

ফলিং ওয়াটার Credit: Alamyফলিং ওয়াটার Credit: Alamy

রাইট ছিলেন উপস্থিত বিদ্রুপে সিদ্ধহস্ত। যে মক্কেল ফোন করে বলেছিল খাবার টেবিলে তার বসার জায়গাতে ছাদ চুয়ে পানি পড়ছে, তাকে তিনি বলেছিলেন চেয়ার সরিয়ে বসতে। নিজের বানানো অপেক্ষাকৃত নিচু ছাদের এক বাসার ভেতরে ঢুকে তার বেঢপ লম্বা সহকারীকে বলেছিলেন চটজলদি বসে পড়তে, বেচারা তার স্থাপত্যের আকার অনুপাতে গোলমাল লাগিয়ে দিচ্ছিল বলে। আর যখন আদালতে একদিন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তার পেশা কি, তিনি এক কথায় উত্তর দিয়েছিলেন- পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থপতি। তার স্ত্রী প্রতিবাদ করায় জবাব দিয়েছিলেন, তিনি মিথ্যা বলতে পারবেন না, আদালতে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে।

বসার ঘরে আসবাব Credit: Alamyবসার ঘরে আসবাব Credit: Alamy

শিকাগো আর নিউ ইয়র্কে সাহসীকতার সাথে সব শহর-উন্নয়নমূলক স্থাপত্য করে পরিচিতি পেলেও, রাইটের আসল ভালোবাসা ছিল শহর নয়, প্রকৃতি। ‘দ্য ইলিনোয়র’ এ প্রায় এক লক্ষ লোকের বাসস্থান করে দিয়ে তিনি প্রকৃতির উপর থেকে শহরের অধিকতর আগ্রাসন রুখতে চেয়েছিলেন।

‘দ্য ইলিনোয়র’ শেষ পর্যন্ত নিমার্ন হয়নি। আর রাইট তার এক শতাব্দীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জুড়ে বিস্তৃত পেশাজীবনে মাত্র একটি বহুতল ভবন বানিয়ে যেতে পেরেছিলেন, ওকলাহোমার বার্টেলসভীলে উনিশ তলা ভবন ‘প্রাইস টাওয়ার’, যা ‘৫৬র ফেব্রুয়ারীতে চালু হয়।

দ্য ইলিনোয়র, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এর চার গুন, বুর্জ দুবাই এর চারগুন উচ্চতার এক স্থাপত্যদ্য ইলিনোয়র, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এর চার গুন, বুর্জ দুবাই এর চারগুন উচ্চতার এক স্থাপত্য

কল্পনা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও রাইটের খ্যাতির মাত্রা স্থির ছিল সর্বদা, এবং উল্লেখযোগ্যভাবে তা ছিল তার নকশায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে বানানো প্রায় শ’খানেক বাংলোবাড়ির জন্য। মাঝে মধ্যে দোষত্রুটি থাকা সত্ত্বেও নৈপুণ্যের সাথে নকশা করা বাড়িগুলো আবেদনময়ীর সংজ্ঞা লাভ করেছিল। তেমনি এক বাড়ি ছিল ‘ফলিং ওয়াটার’। উনিশশ ত্রিশের মধ্যভাগে, বিশ্বজুড়ে তখন ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ এর যুগ চলে। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে শিকড় গেড়ে বসেছিলেন লী কর্বুশীয়র, মিস ভ্যান ডার রোহে আর বাউহাউসের স্থপতিরা, তাদের ইউরোপীয় ‘মর্ডানিজম’ নিয়ে। রাইটের কাজ তখন সমালোচিত হচ্ছিল প্রাচীনপন্থি নামে। ঠিক তখনই ‘ফলিং ওয়াটার’ তাকে স্থপতি হিসেবে পুনর্জন্ম দান করেছিল।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই অসাধারণ স্থাপনাকে বলা হয় মাটি আর প্রকৃতির সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা এক স্থাপত্য। ঝর্ণার ওপর বসে নিচের প্রস্তরখন্ড থেকে নোঙর করে আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠে যাওয়া বাড়িটা প্রথম দর্শনেই বলত চারপাশের অ্যাপালেশিয়ান ভূমির সাথে তার হৃদ্যতার গল্প। ১৯৬৩ তে ওয়েস্টার্ণ পেনসেল্ভানিয়া কনজারভেটরিকে এই স্থাপনার দায়িত্ব দেবার এক বছর পর এটি দর্শনীর স্থান হিসেবে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। রাইটের পেশাজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া এই অদ্ভুত সৃষ্টি দেখার জন্য প্রায় পঞ্চাশ লক্ষাধিক দর্শক পিটসবার্গের এই প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে এসেছেন এরপর থেকে। 

নৈসর্গিক এই স্থাপনার শুরুটা করতে চেয়েছিলেন এডগার জে. কফম্যান। পিটসবার্গের এক ডিপার্টমেন্ট স্টোরের এই বিত্তশালী মালিক আর তার স্ত্রী লিলিয়ান কফম্যানের ইচ্ছা ছিল নিজেদের বাংলোয় বসে ঝর্ণা দেখবেন। কিন্তু রাইট বলেছিলেন, শুধু বাংলোয় বসে ঝর্ণা দেখা নয়, বাংলোটাই বসে থাকবে ঝর্ণার ওপরে।

প্রাইস টাওয়ারপ্রাইস টাওয়ার

প্রায় মাসখানেক এর চিন্তাভাবনা আর কফম্যানের তাড়ার ফলে রাইট প্রায় রেকর্ড সময়ে অসাধারণ কিছু অংকনচিত্র তৈরি করলেন তার নকশার। ধাপে ধাপে ঝর্ণার উপর দিয়ে বের হয়ে আসা তিন তলা বাংলো জুড়ে ছিল কংক্রীট, ইস্পাত, কাচ আর স্থানীয় সহজলভ্য পাথরের সাহসী সংমিশ্রণ। বাড়িটি যেন তৈরীই হচ্ছিল গাছ, পাথর, নদী আর ঝর্ণার মাঝে স্থান করে নেবার জন্য।

রাইট এর নকশা করা বাড়ীরাইট এর নকশা করা বাড়ী

সাহসের সাথে ক্যান্টিলিভার (কলামবিহীনভাবে ঝুলে থাকা বাড়তি অংশ) বাড়ির নকশা করে মক্কেলের সাথে খানিকটা বিপদ বাড়িয়েই ফেলেছিলেন রাইট। ভেঙ্গে পড়ার আশংকায় বাড়তি কাঠামো বানাচ্ছিলেন কফম্যান, আর রাইট হুমকি দিয়েছিলেন মাঝপথে কাজ ত্যাগ করে যাওয়ার। এবং প্রকৃতপক্ষেই কনক্রীটের ছাঁচ খোলার পর দেখা গেল সামনের নদীর পানি নেমে গেছে, ক্রমাগত দ্রুতগতিতে পানি পড়তে থাকায় স্যাঁতস্যাতে হয়ে কনক্রীটের স্থানে স্থানে ছিদ্র দেখা দিচ্ছিল, ছাদের কাচের জানালা ভেদ করেও ঢুকছিল পানি।

লিলিয়ান, যিনি কিনা শুরু থেকেই সন্দেহপ্রবণ ছিলেন বাড়ির নকশা নিয়ে তিনিও শেষ পর্যন্ত প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছিলেন ফলিং ওয়াটার আর তার চারপাশকে। জানালা জুড়ে থাকা পাতাবিহীন গাছের দৃশ্য জানালার পর্দা দেখার চেয়ে অনেক বেশি সন্তোষজনক, রাইটকে এক চিঠিতে জানিয়েছিলেন তিনি।
পিটসবার্গে কফম্যানদের ‘নিও-নরম্যান’ ঘরানার প্রাসাদের চেয়ে অবশ্যই ফলিং ওয়াটার সবক্ষেত্রে এক ভিন্নধর্মী স্থাপত্য ছিল। ফলিং ওয়াটারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশেরও নিজ হাতে নকশা করে দিয়েছিলেন রাইট, এমনকি আসবাবপত্র বানিয়েছিলেন বাড়ির দেয়ালের অংশ হিসেবে। তার বিশ্বাস ছিল, এতে করে মক্কেল পরবর্তীতে নিজ পছন্দমত আসবাব এনে তার স্থাপনার সৌন্দর্যে ব্যাঘাত ঘটাতে পারবেনা। আজ রাইট আর কফম্যানরা হারিয়ে যাবার এত বছর পরেও বাড়ির ভেতরের প্রতিটা নকশা রাইট যেমনটি করে গিয়েছিলেন তেমনটিই আছে।

নিজের নকশা করা খামারবাড়ীনিজের নকশা করা খামারবাড়ী

১৯৩৮ সালে শেষ হবার পর, সে বছরের টাইম ম্যাগাজিনের কভার পৃষ্ঠা জুড়ে শোভা পাচ্ছিল ফলিং ওয়াটার আর অবশ্যই ফ্র্যাংক লয়েড রাইট। টাইমের সেদিনের ভাষ্যমতে, এই স্থপতির সুন্দরতম কাজ ফলিং ওয়াটার। বাড়ির নির্মান খরচ যদিও হিসাব ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছিল- এক লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার ডলার (যা কিনা এখনকার আড়াই মিলিয়নের সমতূল্য ছিল তখন) এবং রাইট ফী হিসেবে পেয়েছিলেন আট হাজার ডলার। পরবর্তীকালে এই শতাব্দীর শুরুর দিকে বাড়িটি ভেঙ্গে পড়ার আশংকায় পুনরায় সংরক্ষণে খরচ হয় আরো সাড়ে এগারো মিলিয়ন ডলার।

ফ্লোরিডা সাউদার্ন কলেজের ডানফোর্থ চ্যাপেলফ্লোরিডা সাউদার্ন কলেজের ডানফোর্থ চ্যাপেল

বাড়ির কাছাকাছি পেনসিলভানিয়ার রুট ৩৮১ এর এক ক্যাফের দেয়ালে লেখা আছে ছন্দ মেলানো দুই লাইন- “ফ্র্যাংক লয়েড রাইট বানিয়েছিল এক বাড়ি ‘ফলিং ওয়াটার’ এর উপরে, যা তার আসলে বানানোই উচিত হয়নি”। তবে সবচেয়ে কৃপণ সমালোচকরাই একমাত্র বলবেন যে এই বাড়ি রক্ষার্থে খরচ করা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আসলে অপচয়। ফলিং ওয়াটার হতে পারে ত্রুটিপূর্ণ, কিন্তু এর সৌন্দর্‍য অপার্থিব। আজ ফলিং ওয়াটার অমূল্য।

১৯৫২ তে লিলিয়ান ফলিং ওয়াটারে আত্নহত্যা করেন। এডগার মারা যান তার তিন বছর পরে। তাদের সন্তান এডগার জুনিয়র, যিনি কিনা ’৩০ এর শুরুতে রাইটের শিক্ষানবিশ ছিলেন, এই বাড়ির উত্তরাধিকার পান। তিনি বসবাস করতেন তার জীবনসঙ্গী এবং স্প্যানিশ স্থপতি পল মেয়েন এর সাথে। পল মেয়েন পরবর্তীকালে ১৯৮১ থেকে চালু হওয়া এখানকার দর্শনার্থী কেন্দ্র, ক্যাফে এবং স্যুভেনিরের দোকানের নকশা করেন। এডগার জুনিয়রই ফলিং ওয়াটার, তার সাথের সাড়ে সতেরশ একর জমি এবং পাঁচ লক্ষ ডলার রোজগারের ব্যবসা ওয়েস্টার্ণ পেন্সিল্ভানিয়া কনজারভেনসিতে দান করেন।

ফলিং ওয়াটের ইংরাজী বানানে রাইটের নামের প্রথম অক্ষরগুলা লুকিয়ে আছে। এই স্থাপনা তার পুনরুজ্জীবিত হবার স্ফুলিংগ এবং এই স্থাপনা দিয়েই সে সময়ে নতুন দানা বেঁধে ওঠা ‘ইউরোপীয়ান মর্ডানিজম’ প্রায় বছর বিশেকের জন্য পিছিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন ভীষণরকমের ব্যক্তিত্যবাদী, তাই প্রতিবার প্রত্যাখান করেছিলেন আমেরিকান ইন্সটিউট অফ আর্কিটেক্টস এ যোগদানের আহবান।

এক সহকর্মী স্থপতি তাকে ‘বৃদ্ধ কিন্তু অপেশাদার’ অ্যাখ্যা দেয়ার পর একানব্বই বছর বয়স পর্যন্ত অক্লান্তভাবে কাজ করে যাওয়া রাইট উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি বৃদ্ধতম’।

তথ্যসূত্র ও ছবি - BBC