গাড়ী চলছে তো চলছেই সারা রাত ধরে, ফিনল্যান্ড থেকে জাহাজে চেপে এস্তোনিয়ার রাজধানী তাল্লিনে পৌঁছে গাড়ী চাপা হয়েছিল, ভ্রমণ সঙ্গী হিসেবে সাথে আছে অন্য অনেক সময়ের মতই বড় ভাই অপু, এনামুল হক শিপু এবং নতুন সঙ্গী হামিদুল, উদ্দেশ্য বাল্টিক সাগর তীরের তিন ক্ষুদে দেশ ঘুরতে ঘুরতে ভাজা ভাজা করে ফেলার সাথে সাথে বিশেষ করে স্থান পরিদর্শন করা, সেই সাথে আমার বিশেষ ব্যক্তিগত আগ্রহ সাধারণ মানুষের কথা শোনা, তাদের জীবনযাত্রা দেখে বুঝতে চাওয়া তারা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় ভাল ছিল না এখন ভাল আছে। যাক সে কথা, যাত্রা শুরু পরে এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া পার হয়ে গাড়ী প্রায় পোল্যান্ডের সীমান্তে চলে এসেছে, এই সময় গোত্তা মেরে ডান দিকে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পৌঁছালাম বন্দর শহর ক্ল্যাপিডার ফেরী ঘাটে। বেশী সকাল বিধায় ফেরীর দেরী ছিল, সেই ফাঁকে স্থানীয় অ্যাম্বার বাজারে ঢুঁ মেরে, নয়ন সার্থক করে আবার ফেরী ঘাটে, এবার ফেরী চেপে পাড়ি দিলাম সেই ক্ষুদে ল্যাগুন, অপর প্রান্তে পৌঁছে আরও কিছুদূর চলে আস্তানা গাড়া হল নিদা নামের ছিমছাম এক গ্রামে। অতিরিক্ত ভ্রমণে ক্লান্ত সবাই, দুইজনের মধ্যে ইতিমধ্যেই নাসিকা গর্জনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে, আচ্ছা ওরা বিশ্রাম নিক, সেই ফাঁকে চলুন জেনে আসি নিদা গ্রাম এবং বিশ্বের বিস্ময় এই স্থানটি নিয়ে—

কুরোনিয়ার বালিয়াড়িকুরোনিয়ার বালিয়াড়ি

লিথুয়ানিয়া এবং ক্ষুদে রাশিয়া ( কালিলিনগ্রাদ, যার সাথে মূল রাশিয়ার কোন স্থল পথে যোগাযোগ নেই) মাঝে যখন এই দেশগুলোর জন্ম হয় নি, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে নেমে যাওয়া হিমবাহের গ্রাবরেখার উপরে সমুদ্রস্রোত, জোয়ার-ভাঁটা এবং বালুর সঞ্চয়ের ফলে প্রকৃতির খেয়ালে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল এক ঠুনকো বালিয়াড়ি, বিশাল বালির স্তূপ জায়গায় জায়গায় নিয়ে ক্ষুদে মরুভূমি রূপ নিয়ে দাড়িয়ে থাকল মাত্র ৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৪০০ মিটার চওড়া এই বালুচরা।

curonian spitcuronian spit

উপরের ছবিটি সম্ভবত নাসার স্যাটেলাইট থেকে তোলা, এখানে দেখতে পাচ্ছেন সরু এই সংযোগরেখা, আর যেখানে যেখানে বেশী সাদা দেখছেন, সেগুলো সুউচ্চ বালিয়াড়ি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কি পরিমাণ ভঙ্গুর এই স্থানটি, যে কোন সময় বালির সঞ্চয় বাঁধাগ্রস্ত হলে, সমুদ্রস্রোতের দিক পরিবর্তন হলে, শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে হয়ত এর অস্তিত্বই থাকবে না বাল্টিকের বুকে।

কুরোনিয়ার বালিয়াড়িকুরোনিয়ার বালিয়াড়ি

সেই হিসেবে এটি ইউরোপের নবতম ভূখণ্ড এবং এখানেই আছে মহাদেশের সবচেয়ে উঁচু চলমান বালুচড়াগুলো ( drifting sand dunes ) যাদের গড় উচ্চতা ৩৫ মিটার হলেও কিছু কিছু স্থানে তা ৬০ মিটার ছাড়িয়ে যায়! সেই সাথে গাইড বইতে জানা গেল, যেহেতু ধীরে ধীরে বালি জমা হয়ে ভিতরের ল্যাগুনের সাথে বাহিরের সাগরের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে, ইতিমধ্যেই বিবর্তনের অমোঘ নিয়ম অনুসারে ল্যাগুনের জীব বৈচিত্র, বিশেষত একাধিক মাছের দৈহিক পরিবর্তন গবেষণায় ধরা পড়েছে!)

গাইডগাইড

এই বালুচড়ার উপরে মানববসতির ইতিহাসও বেশ পুরনো, এর মাঝে মধ্যযুগে কিছু রক্ষণদুর্গও নির্মাণ করেছিল নাইটরা এবং বরাবরের মতই মানুষের অদক্ষতা এবং পরিবেশ ধবংসের কারণে বালুচড়া ধ্বসে, বন্যা প্লাবিত হয়ে ১৮০০ সালের দিকে সমগ্র এলাকার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যায়, অবশেষে সেই সময়ের প্রুসিয়ান সরকারের তত্ত্বাবধানে ১৮২৫ সাল থেকে শুরু হয় বালিয়াড়িকে রক্ষার কাজ, আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয় বন, সবুজ বেষ্টনীতে বাঁধার চেষ্টা করা হয় উপকূলকে। অতি লাজুক এই প্রাকৃতিক বাঁধ, যথেচ্ছ অপব্যবহার করলে, এমনকি প্রচুর মানুষ দিনের পর দিনে আসতে থাকলে তাদের পায়ের চাপেও ব্যপক ক্ষতি হতে পারে এই বালিয়াড়ির।