বাচ্চা বেলায় যখন না বুঝেই কেবলমাত্র বিচিত্র আকিবুকি আঁকা কিছু ছবির মাধ্যমে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সপ্তাশ্চর্যের নামগুলো আত্নস্থ করার অবিরাম প্রচেষ্টা চলেছে কচি মনের উপরে বেদম অত্যাচারের ষ্টীম রোলার চালিয়ে, তখন নিজের অজান্তে আর কিছুই না হোক মাথার ভিতরে গেথে গিয়ে ছিল সেই অনন্য স্থাপনার নামগুলো, আর কল্পনার শাখা-প্রশাখা ঘিরে ধরেছিল তার প্রতিটিকে, কেমন তাদের গঠন, কেমন আকার যা তাদের পরিণত করেছে বিশ্বের বিস্ময়ে।

সুউচ্চ মিনারসুউচ্চ মিনার

মধ্যযুগের বিস্ময় সাতটির তালিকার শেষটি ছিল সেইন্ট সোফিয়ার মসজিদ, কেমন অবাক করা নাম ! সেইন্ট মানে তো সন্ত(সাধু) , খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের সাথে জড়িত শব্দ, তাহলে মসজিদ এসে জুড়ল কিভাবে। আবার ধোয়াটে সে অঙ্কনে মনে হত বড় গম্বুজওয়ালা এক স্থাপত্য কে ঘিরে কতগুলো সুউচ্চ মিনার, তাহলে সেইন্ট এল কোথা থেকে!

হাগিয়া সোফিয়াহাগিয়া সোফিয়া

প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলে না, কিন্তু সময় বয়ে যায়, নিজেকে অবাক হয়ে আবিষ্কার করি পৃথিবীর পথে, ইতিহাসের খোজে, মধ্যযুগের সপ্তাশ্চর্যগুলো বিস্ময় উদ্রেককারী স্থাপনাগুলোর মূঢ় অবলোকনকারী হিসেবে, আগ্রার তাজমহল, রোমের কলোসিয়াম, পিসার হেলানো টাওয়ার, ইংল্যান্ডের স্টোনহেঞ্জ হয়ে সে তালিকা সর্বশেষ সংযোজন ঘুরে আসা রোম স্রামাজ্যের সাবেক রাজধানী ইস্তাম্বুলের প্রানকেন্দ্রে অবস্থিত সেইন্ট সোফিয়ার গির্জা বা মসজিদ, যা সমগ্র বিশ্বের কাছে পরিচিত হাগিয়া সোফিয়া বলে।

হাগিয়া সোফিয়াহাগিয়া সোফিয়া

শীতের ইস্তাম্বুলের মজাই আলাদা, চারিদিকে বিভিন্ন সাগর ঘেরা,শহরের মাঝখান দিয়ে চলেগেছে ইতিহাসবিধৌত বসফরাস প্রণালী,কাজেই মাঝে মাঝে কাঁপন দেওয়া নোনা বাতাসের ঝলক অনুভব করলেও হাড়কাঁপানো শীতের আগমন ঘটেই না এই চির বসন্তের আস্তানায়। যদিও পত্রশূন্য রিক্ত গাছের সারি আর কুড়িহীন গোলাপঝাড়ের যত্রতত্র উপস্থিতি কেবল মনে করিয়ে দেয়- বসন্ত ঢের দূর, বন্ধু!

তখন ডিসেম্বরের পয়লা সপ্তাহ, বসফরাসের বুনো নোনা বাতাসকে সাথী করে এক মেঘলা দিনে সদলবলে আমরা চলেছি হাগিয়া সোফিয়া দর্শনে, আমরা তখন কোথায়? ইউরোপে? নাকি এশিয়ায়? তা তো জানি না, কেবল জানি সেই জলধারার দুই পাশে দুই মহাদেশ, সংযোগ রক্ষা করেছে দুই সেতু, যা দিয়ে কিনা এককালে খুব চলাচল করতেন মানসলোকের সেরা নায়ক আদি ও অকৃত্রিম মাসুদ রানা। থেকে থেকেই দেখা দিচ্ছে সুউচ্চ মিনার, যেন উঠে এসেছে প্রিয় লেখক ওরহান পামুকের স্মৃতিকথা ইস্তাম্বুল থেকে, তেমনই প্রাচীনতা এবং নির্জনতার ছোঁয়া। ইতিহাস গায়ে জড়িয়ে অতীত ও বর্তমানকে একই সাথে নিয়ে কনস্ট্যান্টিনোপল পরিণত হয় ইস্তাম্বুলে, ভূমধ্যসাগরের জলস্রোত অব্যাহত থাকে মর্মর সাগরের দিকে, কালের খেলায় রোমান সাম্র্যাজ্য একদিন হয়ে দাঁড়ায় বাইজেন্টাইন সাম্র্যাজ্যে, তারপর এলো অটোমান সাম্র্যাজ্যে, আরও পরে যা পরিণত হয় গণতান্ত্রিক তুরস্কে। কিন্ত থেকে যায় হাজার বছরের প্রাচীন জনপদের সুখ, দুঃখ, রঙ, উল্লাস। মুসাফিরের কাছে তিলোত্তমা নগরীর আবেদন থাকে চির অটুট।

এবড়ো থেবড়ো পাথরের রাস্তা পাড়ি দিয়ে যখন পিচ ঢালা চত্বরের ওপর পাশে ইস্তাবুলের প্রতীক নীল মসজিদের দেখা মিলল, তখনই বাঁধ ভাঙ্গা আনন্দ দিয়ে আবিস্কার করি আসলে আমরা দাড়িয়ে আছি হাগিয়া সোফিয়ার মূল ফটকের সামনে, চমকে দেবার জন্যই তুর্কিশ বন্ধুরা আগে থেকে বলে নি! দেখা গেল সেই লালচে পাথরের ভবনের বিশাল গম্বুজ, চার দিকের মিনার আর টিকেটের জন্য অপেক্ষারত বিশাল লাইন!

হাগিয়া সোফিয়াহাগিয়া সোফিয়া

সেই ঝামেলাগুলো এড়িয়ে ঢোকা হল হাগিয়া সোফিয়ার চত্বরে, বিশ্বাস করা যায় কি যে সামনের নন্দিত স্থাপত্যটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ৩৬০ খ্রিষ্টাব্দে! যদিও সেই প্রাচীন উপাসনালয়ের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই, একাধিকবার সেই ভিত্তির উপরেই রচিত হয়েছে নব নব ইতিহাস। হাগিয়া সোফিয়া মানে Holy Wisdom, এটি মূলত অর্থোডক্স গির্জা হিসেবেই মহাকালের বুকে যাত্রা শুরু করেছিল ৫৬২ সালে, দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী সেই ভূমিকা পালনের পর ১২০৪ সালে এটিকে রূপান্তরিত করা হয় ক্যাথলিক গির্জাতে, কিন্তু তখন ভাগ্যদেবী সবার অলক্ষ্যে মুচকি হেসেছিলেন এর ভবিতব্য নিয়ে, মাত্র কয়েক দশক পরেই ১২৬১ সালে আবার উড়ল এখানে অর্থোডক্সদের নিশান, কিন্তু দুশ বছর পেরোবার আগেই এবার তুর্কিশরা ঘোড়ায় চড়ে হা রে রে রে রে রে করে তেড়ে এসে দখল করে নিল রোমানদের রাজধানী, পতন ঘটল বাইজেন্টিয়ান সাম্রাজ্যের, শুরু হল অটোমান শাসন। সেখানে হাগিয়া সোফিয়ার ভূমিকা ছিল রাজকীয় মসজিদের দায়িত্ব পালন করা, এর তুর্কিশ নামকরণ করা হল আয়াসোফিয়া, যা চলল ১৯৩১ পর্যন্ত, এরপর সারা বিশ্বকে অবাক করে মুস্তফা কামাল নামের এক তরুণ তুর্কি আধুনিকতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তুললেন সারা জাতিকে, পতন ঘটল অটোমানদের, সেই তরুণের কাজে উৎসাহ দেবার জন্য প্রবল উচ্ছাসে প্রিয় কবি কাজী নজরুল লিখলেন- কামাল, তুনে কামাল কিয়া ভাই! সেই মুস্তফা কামাল যাকে আজো সারা তুরস্ক চেনে আতাতুর্ক বা তুরস্কের পিতা নামে, পরিণত করলেন হাজিয়া সোফিয়াকে অসাধারণ এক জাদুঘরে, জনগণের জন্য উম্মুক্ত করে দেওয়া হল যেন জ্যান্ত ইতিহাসকে, কঠোর ভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল মুসলিম এবং খ্রিষ্টানদের উপরে সেই স্থাপনার ভিতরে উপাসনার উপরে, সারা বিশ্ব থেকে মানুষ আসা শুরু করল ইতিহাসের সাক্ষীকে দেখার জন্য, সেই দলে আজ আপনিও ভিড়েছেন আমাদের পাল্লায় পড়ে!

হাগিয়া সোফিয়াহাগিয়া সোফিয়া

সুপ্রাচীন ভবনের বাহিরের কিছু প্রাচীন অংশ সবার আগে নজর কেড়ে নেয়, বিশেষ করে ধ্বংসপ্রাপ্ত জায়গাগুলো, যেখানে দেখা মিলল দেড় হাজার বছর আগের কিছু ভেড়ার! মানে পাথরের স্তম্ভে খোদাই করা ভেড়ার, জানা গেল মোট ভেড়া ছিল এক ডজন, যা খৃস্টান মতে যীশুর ১২ মুরিদের প্রতীক। এই প্রাচীন অংশটি ৫৩২ সালে এক বিশাল অগ্নিকান্ডে ভস্মীভূত হয়।

ধ্বংসপ্রাপ্ত জায়গাগুলোধ্বংসপ্রাপ্ত জায়গাগুলো

ধ্বংসপ্রাপ্ত জায়গাগুলোধ্বংসপ্রাপ্ত জায়গাগুলো

এর পরপরই সম্রাট ১ম জুসতিনিয়ান বিশাল মাস্টারপ্ল্যান করে নব উদ্যমে নির্মাণ কাজে হাত লাগান, সারা সাম্রাজ্য থেকে বাছাই করে আনা হয় সেরা নির্মাণ সামগ্রী- বিখ্যাত আর্তমিসের মন্দির থেকে আনা হল গ্রীক স্তম্ভ, মিশর থেকে পাথর, সিরিয়া থেকে হলদে শিলা, বসফরাস থেকে কালো পাথর- কিচ্ছু বাদ রয়ল না, সম্রাটের সাধ বলে কথা!