কয়েক মাইল হাঁটা হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই ব্রিটিশ জাদুঘরের মধ্যে, এই করতে যেয়ে দুপুরে খাওয়া তো দূরে থাকা গলা ভেজাবারও সময় পেলাম না, ভাবলাম একদিন কম খেলে ক্ষতি নেই, বরং সেই পনের মিনিটে বেশ কিছু মাস্টারপিস দেখা যেতে পারে। এই করতে যেয়েই বিকেল পাঁচটে বেজে গেল, বিলেতবাসী কৌস্তভদা এসে হাজির হলেন এক্কেবারে সময় মত আর ফিনল্যান্ড থেকে লন্ডন ঘুরতে আসা বিপু ভাই সপরিবারে। প্ল্যান হল বেকার স্ট্রিটে শার্লক হোমসকে পাকড়াও করে তার কাঁধে রহস্য চাপিয়ে তারপর এখানকার চায়না টাউনে যেয়ে ভূরিভোজন করা হবে। কিন্তু মনে মনে পরিকল্পনা করা ছিল অল্প সময়ের জন্য হলেও ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে যেয়ে একটি বিশেষ বই চাক্ষুষ করার, সেটি কি তাহলে বাদ? কারণ পরের দুই দিনের পরিকল্পনা ঠাসা আছে, কোন বাড়তি জায়গা ঘোরার সুযোগ নেই, কি করা যায়!

 

সাহায্য করলেন কৌস্তভদা, বললেন যেহেতু ব্রিটিশ লাইব্রেরী কাছেই তাই হেঁটেই যাওয়া যেতে পারে,এই ফাঁকে নেট থেকে জানা গেল আজ এই বিখ্যাত গ্রন্থাগার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত খোলা, কাজেই হাতে সময় আছে বটে কিন্তু অল্প। তাই শেষমেশ রফা হল ভো দৌড় দিয়ে ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সেই বিশেষ বইখানা দেখার ব্যবস্থা করতে হবে, কিন্তু কেউই জানতাম না এই শেষ মুহূর্তে তারা দর্শনার্থীদের ভিতরে প্রবেশ করতে দেয় নাকি দেয় না!

 

যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ! যখন ব্রিটিশ লাইব্রেরীর মূল ফটকে পৌঁছালাম তখন বাজে পাঁচটা চল্লিশ! গেটের নিরাপত্তা রক্ষী মৃদু হাসি মুখে ঝুলিয়ে কপট রাগের ভঙ্গীতে বলে উঠল- টু লেট! হাতে সময় আছে মাত্র বিশ মিনিট! এর মধ্যে সেই বিশেষ বইখানা দেখতে পারব তো? সে ঘাড় দুলিয়ে বলল- পারবে! সোজা স্যার জন রিটব্লাট গ্যালারীতে ঢুঁকে যাও, নিচ তলাতেই। আর হ্যাঁ, টিকেট কাটতে হবে না, মুফতেই প্রবেশাধিকার সবার সবসময়ই!

১৫ কোটি বস্ত নিয়ে ইহার বিশ্বের বৃহত্তম গ্রন্থাগার, সেই সাথে ১৪ মিলিয়ন পুস্তক নিয়ে বই সংগ্রহের দিক দিয়ে এর অবস্থান সাড়া বিশ্বে ২য় ( কেবল যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরী অফ কংগ্রেসের পুস্তকসংখ্যা এর চেয়ে বেশী) , ফি বছর এর সংগ্রহে ৩০ লক্ষ আইটেম যোগ হওয়ায় নতুন সেলফের আয়তন বাড়ে ৯,৬ কিলোমিটার! বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম নিচতালার বিশেষ কক্ষে বাংলাদেশের ১৯৫২ থেকে শুরু করে ১৯৭২ পর্যন্ত মূল্যবান সব খবরের কাগজ আছে, কিন্তু হাতে সময় সেই ২০ মিনিট!

ব্রিটিশ লাইব্রেরীতেব্রিটিশ লাইব্রেরীতে

কি আর করা দুইতলার এক রিডিং রুমে খামোখায় উঁকি মেরে সোজা সেধোলাম জন রিটব্লাট গ্যালারীতে, যেখানে আছে বইপ্রেমীদের আরাধ্য বেশ কিছু অমূল্য বিশ্বসম্পদ। প্রথমেই চোখে পড়ল এক কাঁচের শোকেসের সামনে কয়েক হাজার জাপানীর ভিড় ( হাজার না, ঐ মুহূর্তে কয়েকজনকেই মেজাজ খারাপ করে কয়েক হাজার ভেবেছি), ভাবলাম সেই খানেই আছে সেই বিশেষ গ্রন্থখানা, দিলাম ত্রস্ত পায়ে হাঁটা, কাছে যেতেই দেখি কে বা কাহারা কানে হেড ফোন লাগিয়ে আবার গান শুনছে আর শোকেসের ভিতরে নানা জিনিসপত্রের মাঝে পরিচিত চারখানা মুখ উঁকি মারছে- দ্য বিটলস!

সেখানে আছে তাদের সর্বাধিক জনপ্রিয় গানগুলোর একটি ইয়েসটার ডে-র হাতে লেখা ম্যানুস্ক্রিপ্ট, যা দেখার জন্য এত বেশী জাপানীদের ভিড়, অন্য জাতিও আছে কিন্তু চোখে পড়ে না, সমস্ত জাপানিজই জন লেননকে জামাই মনে করে কিনা! আর সেই জন্যই সামনে হেড ফোন, আরামে গান শুনতে শুনতে গুণগুণ করা যাবে বিশ্বের সেরা গানগুলোর একটি--

 

Yesterday, all my troubles seemed so far away.

Now it looks as though they're here to stay.

Oh, I believe in yesterday.

 

Suddenly,

I'm not half the man I used to be,

There's a shadow hanging over me,

Oh, yesterday came suddenly.

 

Why she had to go

I don't know she wouldn't say.

I said something wrong,

Now I long for yesterday.

 

Yesterday, love was such an easy game to play.

Now I need a place to hide away.

Oh, I believe in yesterday.

 

Why'd she had to go

I don't know she wouldn't say.

I said something wrong,

Now I long for yesterday.

 

Yesterday, love was such an easy game to play.

Now I need a place to hide away.

Oh, I believe in yesterday.

 

এর পরপরই চোখ পড়ল একটা আলাদা আঁধার কক্ষের দিকে, ছুটলাম আরাধ্য বইয়ের সন্ধানে, সেখানে দেখি আছে ইতিহাসখ্যাত ম্যাগনাকার্টা! ১২১৫ সালে ল্যাটিনে লেখা এই ডকুমেন্টই ছিল ইংল্যান্ডের কোন রাজার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রনের পক্ষে রচিত প্রথম দলিল( রাজা জনের বিপক্ষে), এক অর্থে গণতন্ত্রে উত্তরণের বুনিয়াদ ছিল এই ম্যাগনাকার্টা! বেশ তাড়াহুড়ো করে চোখ বুলিয়ে আবার ছুটলাম বাহিরের মূল প্রদর্শনী কক্ষে ।

যেখানে ঢুকতেই প্রথমেই সামনের তাকে নজর কাড়ল প্রথম সার্থক ইংরেজ কবি খ্যাত জিওফ্রে চসার রচিত ক্যান্টরবেরি টেলসের পাণ্ডুলিপি! সেই সাথে ১৬২৩ সালে ছাপা শেক্সপীয়ারের প্রথম ফোলিও, জেন অস্টেন, শার্লট ব্রন্টি, লুই ক্যারল, রুডইয়ার্ড কিপলিং, চালর্স ডিকেন্স, জর্জ ইলিয়ট, টমাস হার্ডি, ভার্জিনিয়া উলফ প্রমুখ সাহিত্যিকের নানা রচনার পাণ্ডুলিপি! লুই ক্যারলের বইটা কিন্তু ছিল ছোট্ট মেয়ে এলিসকে নিয়েই!

এক কোনায় সেলফের ভেতরে চোখে পড়ল একটি হাতে লেখা কোরান, যা হাজার বছর আগের, সাদা কাগজে কালো কালিতে লিখে যাওয়া সাদামাটা ভাবে কোন অঙ্গসজ্জা ছাড়া। সেই সাথে অটোম্যানদের সময়কার কারুকার্যশোভিত কোরান।

নানা যুগের বাইবেল এবং গসপেলের ছড়াছড়ি ছিল সবদিকেই, ১৭০০ বছর আগের বিখ্যাত কোডেক্সের আলতো নজর বুলিয়ে গেলাম , যা ছিল গ্রীকে লেখা নিউ টেস্টামেন্টের প্রথম সম্পূর্ণ রূপ!

অভিযাত্রীদের কর্নারটিতে ক্যাপ্টেন কুকের জার্নাল দেখে সমুদ্রযাত্রার আহ্বান শুনতে পেলাম বটে কিন্তু সত্যিকারের রোমাঞ্চ বোধ হল প্রিয় অভিযাত্রী রবার্ট ফ্যালকন স্কটের দিনপঞ্জি দেখতে পেয়ে, জীবনের শেষ দিনগুলোতে দক্ষিণ মেরু জয়ী বীর লিপিবদ্ধ করে গেছেন সেই বরফ প্রান্তরের নির্মমতা আর সহযাত্রীদের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বার মর্মস্পর্শী বর্ণনা। কি অসাধারণ, অকুতোভয় মানুষ ছিলেন তারা! স্যালুট ক্যাপ্টেন স্কট! সেই সাথে ছিল চার্লস ডারউইনের চিঠি। এবং সবচেয়ে অবিশ্বাস্য – লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নোটবুকের একাধিক পাতা, তাতে স্কেচসহ তার বিখ্যাত উল্টো করে লেখা !

এদিকে লাইব্রেরী বন্ধের সময় হয়ে এসেছে কিন্তু আমার আকাঙ্ক্ষিত বইখানার সন্ধান এখনো মেলে নি, ভেবেছিলাম নিজে নিজেই খুঁজে নিজে পারব তাই গাইডের সাহায্য নেয়া হয় নি। তীরে এসে তরী ডুবল মনে হচ্ছে! এই সময় কৌস্তভদার সাথে দেখা, সে আবার সন্ধান দিল বিটোভেন, মোজার্টের আসল সুরলিপির! সেটা একনজর দেখেই শেষমেশ এক নিরাপত্তা কর্মীকে যেয়ে হাফাতে হাফাতে প্রশ্ন করলাম- গুটেনবার্গের বাইবেলখানা কোথায়?

বুঝলেন তো কোন বইখানার তল্লাস করে ফিরছিলাম ক্ষ্যাপার মত? বিশ্বের প্রথম ছাপা বই, ১৪৫০ সালের জার্মানির মেইনে জনার গুটেনবার্গের ছাপাখানায় মুদ্রিত বাইবেলের জোটে এই বিরল সন্মান, ধারণা করা হয় সারা বিশ্বে মাত্র ৪৮ খানা টিকে আছে যা এটিকে পরিণত করেছে বিরলতম বইগুলোর একটিতে, এবং অবশ্যই সেই সাথে সবচেয়ে দামী বইয়ে। দাম- আপাতত জানার দরকার নাই, কিন্তু নিলামে উঠলে বাংলাদেশের টাকায় দশ কোটি ছাড়িয়ে যাবে প্রথম ডাকেই!

সেই কর্মীই দিক নির্দেশনা দিলেন- ঐ যে, ঐ তাকেই মাঝখানে! তাকের মাঝখানে? মানে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান বইটির আলাদা একটা কক্ষ দূরে থাক একটি নিজস্ব শোকেস পর্যন্ত জোটে নি! অবশ্য কাছে যেয়ে কিছুটা বুঝলাম কেন, এটি যেমন প্রথম ছাপা বই, তার পাশেই আছে ব্রিটেনে ছাপা প্রথম বই, এমন কিছু ইতিহাসের সাক্ষী একসাথে রাখা হয়েছে আর কি! বিমুগ্ধ নয়ন আনন্দিত চিত্তে দেখে গেলাম অপূর্ব কারুকার্য করা স্বপ্নগ্রন্থখানি! কত শুনেছি এর কথা, ছবি দেখেছি নানা পত্রিকায়, সুনীল গাঙ্গুলির কাকাবাবু হেরে গেলেন উপন্যাসে বর্ণনা পর্যন্ত পড়েছি ( সত্যি কথা বলি, উপন্যাসটি বাস্তবঘেঁষা নয়, গুটেনবার্গের বাইবেল নিয়ে সুনীল যেভাবে দুষ্কৃতিকারীদের চলাচলের বর্ণনা দিয়েছেন মনে হয় না বাস্তবে এটা সম্ভব হত), আর আজ দেখছি সেই বইটাকে। এটি নিছক একটি বই নয়, একটি সভ্যতার প্রতীক, এর ছাপার মাধ্যমেই তো শুরু হয়েছিল মানবজাতির নবঅগ্রযাত্রা।

গুটেনবার্গের বাইবেল!গুটেনবার্গের বাইবেল!

ছবি তোলা নিষেধ কিন্তু এই ছবি না তুলে থাকি কি করে!

আমাদের ২০ মিনিট কাটায় কাটায় পূর্ণ হতে সদল বলে বুক ভর্তি ফুরফুরে আনন্দ নিয়ে বেরিয়ে চললাম বেকার স্ট্রিটের দিকে, তখনও বিশ্বাস হচ্ছে না চাক্ষুষ দেখা পেলাম গুটেনবার্গের বাইবেলের!