দার্জিলিং শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরত্বে ৬০ ফুট বাই ৪০ ফুট আয়তনের এক মালভূমির কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি। পায়ের ঠিক নিচ থেকে ৪৫ ডিগ্রী কোণ করে খাড়া ঢাল নেমে গেছে অনেকদূর অবধি। ঢাল জুড়ে পাইনের ঘন অরণ্য। অরণ্যের মাঝ দিয়ে চলে গেছে এক পায়ে চলা পথ। পায়ে চলা পথ ধরে এগিয়ে গেলে যেখানে ঢাল আবার উঁচু হওয়া শুরু করেছে সেখানেই ভারতের সীমানা শেষ। সীমানা অতিক্রম করে উপরে উঠতে থাকলে একসময় পৌঁছানো যাবে ছোট্ট এক গ্রাম মানেভঞ্জনে। ভারত-নেপাল সীমান্তের গ্রামটি একটি বিশেষ কারণে সুপরিচিত পর্যটকদের কাছে। ভূমি থেকে ৬৬০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই গ্রামটি সান্দাকফুতে ট্র্যাকিং করতে আগ্রহী অভিযাত্রীদের কাছে বেইজ ক্যাম্প হিসাবে কাজ করে। যারা সান্দাকফুর নাম শুনেন নি তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই, সান্দাকফু পশ্চিমবঙ্গ অঙ্গরাজ্যের উচ্চতম স্থান। দার্জিলিং জেলার আওতাধীন ভারত-নেপাল সিমান্ত লাগোয়া ভূমি থেকে ১১৯৪১ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই স্থান থেকে পৃথিবীর উচ্চতম প্রথম ৫ টি পর্বতশৃঙ্গের ৪ টিই (এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোতসে এবং মাকালু) দেখা যায়। সান্দাকফু তাই শৌখিন পর্বতপ্রেমীদের কাছে অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেই জায়গাটির নাম সীমানা। এখান থেকে মানেভঞ্জন গ্রামটি স্পষ্ট দেখা যায়। শুধু তাই নয়, মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু যাওয়ার ট্রেইলটিও পরিষ্কার চোখে পড়ে। চাইল এক দৌড়ে নেপাল চলে যাওয়া যাবে। কিন্তু বিধি বাম, ভারতীয়রা যখন তখন সীমান্ত অতিক্রম করতে পারলেও বাংলাদেশীদের সেই অনুমতি নেই। নেপালের ভিসা থাকলেই কেবল সীমানা অতিক্রম সম্ভব। সেটি ছিল না বিধায় মানেভঞ্জনের ওপারে উঁচু উঁচু পাহাড় দেখেই দৃষ্টিকে সান্ত্বনা দিতে বাধ্য হলাম।

সান্দাকফুসান্দাকফু

আমাদের দার্জিলিং যাত্রার যবনিকাপাত আজই ঘটতে যাচ্ছে। শেষ দিনে আমাদের পরিকল্পনা দার্জিলিং হয়ে বিকল্প রাস্তায় শিলিগুড়ি পৌঁছানোর পথে মিরিক লেক ঘুরে দেখব। নেপালের সীমানা কিংবা পশুপতি মার্কেট ভ্রমণটা বোনাস। শেষ দিনে পুষ্করকে পাই নি। সে আরেকজন গাড়িচালক বন্দোবস্ত করে দিয়েছে যে কি না আমাদেরকে শিলিগুড়ি পৌঁছে দিবে। নতুন গাড়িচালকের চেহারা যথেষ্ট আকর্ষণীয়। অনিন্দ্য আর সাইমুম অনেকক্ষণ গবেষণা করেও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে নি এই ছেলে বলিউডে (নিদেনপক্ষে টলিউডে) ভাগ্য পরীক্ষা না করে কেন গাড়ি চালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমার এতসব গবেষণার সময় ছিল না। রাস্তার সৌন্দর্যে আমি তন্ময় হয়েছিলাম পুরোটা পথ। এখন পর্যন্ত আমার দেখা সুন্দরতম যাত্রাপথ দার্জিলিং থেকে মিরিক যাওয়ার রাস্তা। দুইপাশে পাইনের মেলা বসেছে। শুধু পাইন বনে একটু হাঁটার লোভে বার দুয়েক গাড়ি থামিয়েছি। সরু আঁকাবাঁকা পিচঢালা রাস্তা কখনও উপরে উঠছে আবার কখনও বা নিচে নামছে। রৌদ্রস্নাত প্রকৃতি অল্প সময়ের জন্য তাঁর অবগুণ্ঠন উন্মোচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলেই হয়ত চারপাশ ঝলমল করছিল। যদিও নেপালের সীমানায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে আবারও হালকা কুয়াশার চাদর আমাদের আদৃত করতে কার্পণ্য করে নি মোটেও।

রৌদ্রস্নাত প্রকৃতিরৌদ্রস্নাত প্রকৃতি

সীমানা থেকে একটু নিচে নামলেই পশুপতি মার্কেট। আসল পশুপতি মার্কেট না বলে অবশ্য পশুপতি মার্কেটের ক্ষুদ্র সংস্করণ বলাই ভাল হবে। এই ক্ষুদ্র সংস্করণটি নেপাল-ভারতের সীমান্তে অবস্থিত। এইখানে নেপালে প্রবেশের একটি স্থলবন্দর রয়েছে। ভারতীয় এবং নেপালীগণ এই বন্দর দিয়ে আইডি কার্ড দেখিয়ে যখন তখন যাওয়া আসা করতে পারেন। দুইদেশের অধিবাসীদের বাইরে স্থলবন্দরটির সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার করেন বাংলাদেশীগণ। স্থলপথে যারা বাংলাদেশ থেকে ভারত হয়ে নেপাল যেতে চান তাঁরা এইখান দিয়েই যান। জায়গাটার নাম পশুপতি হলেও আসল পশুপতি মার্কেটের অবস্থান ১ কিলোমিটার ভিতরের নেপাল অংশে। মার্কেট দেখার ইচ্ছে না থাকলেও নেপাল দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ভিসা তো নেই। কি আর করা, চেকপোস্টের কাছ থেকে একটা চক্কর দিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানোর অপচেষ্টা চালালাম। এক জায়গায় জটলা দেখে এগিয়ে দেখি আয়োজন করে জুয়া খেলা হচ্ছে। জুয়া খেলতে যে এইরকম যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় জানতাম না। দুর্জনেরা বলেন ক্যাসিনোতে নাকি এইরকম অনেক জুয়ার সামগ্রী আছে। নাউজুবিল্লাহ-আস্তাগফিরুল্লাহ বলে ভাগলাম সেখান থেকে। সাইমুমের দেখা গেল খেলার প্রতি বিশেষ আগ্রহ। এক দান খেলবে কি না চিন্তা করছিল কিন্তু অনিন্দ্যর ছোটখাটো ঝাড়ি খেয়ে সেই ইচ্ছে উবে যেতে বেচারার সময় লাগে নি।

পশুপতি মার্কেটপশুপতি মার্কেট

জুয়া খেলা হচ্ছেজুয়া খেলা হচ্ছে

পশুপতি থেকে মিরিকের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। এই ১২ কিলোমিটার রাস্তার সৌন্দর্য দমবন্ধ মুগ্ধতায় পরিপূর্ণ। মখমলের মত চা-বাগানের বিছানার ফাঁক গলে গাড়ি নিয়ে ছুটতে হয়। ঘন সবুজ টিলা, টিলার উপর চা-বাগান, চা-বাগানের উপর ছায়া দানকারী পাইন গাছ; সব মিলিয়ে এক অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ। মেঘের আনাগোনার কথা না হয় বাদই দিলাম। সম্ভবত এমন কোন পথে চলতে গিয়েই গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লিখেছিলেন ,”এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত তুমি বল তো?”

মিরিক শহরের গড় উচ্চতা ৫০০০ ফুট। পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে যে হ্রদটি রয়েছে সেটির নাম সুমেন্দু হ্রদ। যদিও এই নামে অনেকেই হ্রদটিকে চিনেন না, চিনেন মিরিক হ্রদ নামে। শেক্সপিয়ারের ভাষায় বলতে হয়, নামে কি আসে যায়, সৌন্দর্যটাই মুখ্য। প্রায় সোয়া কিলোমিটার লম্বা হ্রদটির চারপাশে রয়েছে সাড়ে তিন কিলোমিটার দৈর্ঘের বৃত্তাকার পায়ে চলা পথ। হ্রদের একপাশে ধুপি আর পাইন গাছের ঘন অরণ্য, অন্যপাশ মোটামোটি ফাঁকাই বলা যায়। কিছু বাগান, অল্প কিছু দোকানপাট, বেশ কিছু আবাসিক হোটেল এবং ফুটপাতে কিছু খাবারের দোকান ছাড়া বেশি কিছু নেই। হ্রদের এপাশ থেকে ওপাশে যাওয়ার জন্য ইন্দ্রাণী পুল (রংধনু সেতু) নামে এক ছোট্ট সেতু আছে। সেতু পার হলে ঘোড়ায় চড়ার আমন্ত্রণ পাবেন, সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করার দায়িত্ব একান্তই আপনার। ঘোড়ায় চড়ার চার্জ একশ রুপি থেকে শুরু হয়ে ৭০০ রুপিতে গিয়ে ঠেকেছে। ধুপি অরণ্যের ভিতর দিয়ে বেশ কিছুদূর গেলে একটা মন্দির এবং তারও কিছু দূরে বৌদ্ধ উপাসনালয়ের দেখা পাওয়া যায়। গত কয়দিনে মন্দির-প্যাগোডা তো আর কম ঘুরিনি। তাই সেদিকে আর পা বাড়াই নি। তারচেয়ে বরং হ্রদে নৌকা ভাড়া করে ঘুরলে ভাল লাগতো। সেটাও কেন জানি আর করা হয়ে উঠে নি। ফেরার তারা ছিল বলেই হয়ত কোনকিছুতে আর আগ্রহ আসে নি।

মিরিকের হ্রদটি সুন্দর; কিন্তু রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের সৌন্দর্যে পাগল হওয়া এই দু’চোখ কি আর মিরিকের সৌন্দর্যে তৃপ্তি খুঁজে পাবে? জানি অনেকেই দ্বিমত পোষণ করবেন এই কথায় তারপরেও বলছি, মিরিক হ্রদের সৌন্দর্য অনেকখানিই বাড়িয়ে বলা হয় বলেই আমার মনে হয়েছে।

মিরিকের হ্রদমিরিকের হ্রদ

মিরিকের হ্রদমিরিকের হ্রদ

মিরিকের হ্রদমিরিকের হ্রদ

ঘোড়ায় চড়ার আমন্ত্রণঘোড়ায় চড়ার আমন্ত্রণ

ফুটপাতে কিছু খাবারের দোকানফুটপাতে কিছু খাবারের দোকান

অতঃপর, ফেরার পালা। দ্রুতগতিতে আমাদের ট্যাক্সি ছুটে চলছিল মিরিক থেকে ৪৯ কিলোমিটার দূরের শিলিগুড়ির পথে যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ অভিমুখী বাস। গত তিনদিনের স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো চিরদিন মনের অলিন্দে দোলা দিয়ে যাবে নিশ্চিত। দার্জিলিঙে আমরা অনেক কিছুই দেখেছি, কিন্তু দেখি নি তারচেয়েও বেশি কিছু। খুব ইচ্ছে ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখব, মেঘের আধিপত্য আমাদের সেই ইচ্ছেয় বাঁধ সেধেছে বারংবার। সমরেশ মজুমদারের গর্ভধারিণী উপন্যাসের নায়িকা জয়িতা বন্ধুদের নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল কালিম্পং এর লাভা হয়ে আরও উপরে হিমালয়ের কোন এক কন্দরে। সেখানেও যাওয়া হয় নি। সান্দাকফুর শীর্ষ থেকে এভারেস্ট দর্শন করা হয় নি। হয় নি হিমালয় মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে রক ক্লাইম্বিং এর প্রশিক্ষণ নেওয়া। চিড়িয়াখানায় লাল পান্ডা দেখা হয় নি। তিস্তা নদীর ঠাণ্ডা জলে র্যাষফটিং করার ইচ্ছেটাও অপূর্ণ থেকে গেছে। এইতো জীবন, আশা-নিরাশা-হতাশা এবং আকাঙ্ক্ষার যুগলবন্দী।

সারা পৃথিবী ঘুরে দেখতে চাই। জানি সেটা সম্ভব নয়। চাইলেই সবাই ইবনে বতুতা কিংবা হিউয়েং সাং হতে পারে না। কেউ কেউ হয়ত তারেক অণু হতে পারে। ক্ষতি কি? ছোট্ট এই জীবনে যতটুকু দেখে যেতে পারি ততটুকুই মঙ্গল। অপূর্ণতা মানুষকে পূর্ণ হতে শেখায়। নিজেকে কেন জানি পথের পাচালির ছোট্ট অপুর মত মনে হচ্ছিল যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল প্রিয় সেই কথাগুলো,

পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন – মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়? তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে… দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সুর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গন্ডি এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশ্যে…

দিনরাত্রি পার হয়ে, জন্ম মরণ পার হয়ে, মাস, বর্ষ, মনন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায়… তোমাদের মর্মর জীবন-সপ্ন শেওলা-ছাতার দলে ভরে আসে, পথ আমার তখনো ফুরোয় না… চলে… চলে… চলে… এগিয়েই চলে…

অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ…

সে পথের বিচিত্র আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমাকে ঘরছাড়া করে এনেছি!…

চল এগিয়ে যাই।

একদিন আবারও আসব দার্জিলিং অপূর্ণ শখগুলোকে পূর্ণতা দিতে। সেই পর্যন্ত, বিদায় দার্জিলিং।

 

দার্জিলিং জমজমাট # ১০ পর্ব

দার্জিলিং জমজমাট # ৯ম পর্ব

দার্জিলিং জমজমাট # ৮ম পর্ব

দার্জিলিং জমজমাট # ৭ম পর্ব

দার্জিলিং জমজমাট # ৬ষ্ঠ পর্ব

দার্জিলিং জমজমাট # ৫ম পর্ব

দার্জিলিং জমজমাট # ৪র্থ পর্ব

দার্জিলিং জমজমাট # ৩য় পর্ব

দার্জিলিং জমজমাট # ২য় পর্ব

দার্জিলিং জমজমাট # ১ম পর্ব