চা বাগান বলতে আমরা শুধু সিলেট, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজারকেই বুঝে থাকি সাধারণত। অথচ আমাদের উত্তর বঙ্গে, পঞ্চগড়ের তেতুলিয়ার সমতলেই আছে দৃষ্টি নন্দন আর মনকাড়া এক সবুজের সমুদ্র! চা বাগান। হ্যাঁ চা বাগানকে আমার সবুজের কেন যেন সমুদ্রই মনে হয় সব সময়। যেখানে হেটে বেড়াতে, সময় কাটাতে, পাহাড়ের চড়ার মত দুরূহ আর পরিশ্রমের কাজ করতে হয়না, যেখানে হাটতে গিয়ে আপনি হাপিয়ে উঠবেননা একটুও। আরামে, আয়েশে, ধীরে-ধীরে, হেটে-বসে উপভোগ করতে পারবেন দিগন্ত বিসৃত সবুজের সমুদ্র, চা বাগান।

মিহি পিচ ঢালা পথমিহি পিচ ঢালা পথ

দুইপাশে সবুজ সমুদ্রের মাঝ দিয়ে চলে গেছে মিহি পিচ ঢালা পথ, ছোট-ছোট নদীর বয়ে চলা, সারি সারি ইউক্লিপটাস গাছ, মেহগনি, জলপাই আর আমলকির আয়োজন ছোট ছোট, চা গাছের ফাঁকে-ফাঁকে, ছায়া দিতে ওদের, কড়া রোদ থেকে বাঁচাতে। পাবেন বিসৃত সবুজ মাঠ, তেতুলিয়া ডাকবাংলোর সাথে পাবেন মহানন্দা নদীর উপরি আনন্দ। কাজী এন্ড কাজী টি ষ্টেটের আনন্দ ধারার মত নান্দনিক সব যায়গা।

যেখানে আসছে অবসরে আপনি দুই একটি দিন কাটিয়ে আসতে পারেন অনায়াসে। যেখানে নেই কোন কোলাহল, বাড়তি টুরিস্টদের কলকাকলি, নেই জ্যাম, ঘাম, গরম বা ধুলোর আস্তরণ। আছে সবুজ মাঠ, স্নিগ্ধ ঘাস, হিমালয়ে থেকে আসা ঠাণ্ডা হাওয়া, কোমল আর দিগন্ত বিসৃত চা বাগান, মহানন্দা নদীর অবগাহন, আর ভাগ্য ভীষণ ভালো হলে, পরিষ্কার আকাশ থাকলে দেখা পেতে পারেন অপরূপ কাঞ্চনজঙ্ঘার! আর শ্বেত শুভ্র পাহাড় চুড়ার।

 দিগন্ত বিসৃত চা বাগান দিগন্ত বিসৃত চা বাগান

কোন এক ছুটির অলস বা অবসের বাসে করে চলে যেতে পারেন পঞ্চগড় বা সরাসরি তেতুলিয়ায় ভাড়া নেমে ৬৫০ টাকা নন এসি। অথবা ট্রেনে করে দিনাজপুর নেমে, বাসে করে পঞ্চগড় হয়ে তেতুলিয়া। আগে থেকে বলে রাখলে, বা যোগাযোগ করে গেলে সরকারী এসি ডাক বাংলোর ডাবল রুম পেয়ে যাবেন ৮০০-১০০০ টাকায়। খেতেও পারবেন সেখানে আগে থেকে কেয়ারটেকার কে বলে রাখলে। এরপর রিক্সা নিয়ে চলে যেতে পারেন ডাকবাংলোর কাছে। বা হালকা নাস্তা করে পায়ে হেটেই।

দারুণ কৃষ্ণচুড়ার লালে সাজানো, সবুজের ছায়ায় ঘেরা, মহানন্দার অববাহিকায়, হিমালয়ের কোল ঘেঁসে দাড়িয়ে থাকা, সমতলের চা বাগানের এক সবুজ, নীরব আর কোলাহল মুক্ত শান্ত শহর তেতুলিয়ার সরকারী সেই ডাকবাংলো। যেখানে গিয়ে আপনার আর ফিরতে মন চাইবেনা। কখনো ইচ্ছে হবে পুরো দিন মহানন্দার তীরে কাটিয়ে দিতে, চা বাগানে গেলে মনে হবে এখানেই কেন থেকে যাইনা একটি দিন, জিরো পয়েন্ট এ গেলে ইচ্ছা হবে ওপারের হিমালয় যদি ছুঁয়ে আসা যেত? এমনকি ডাকবাংলোর বারান্দায় বসেও আপনি উপভোগ করতে পারবেন এই সকল নান্দনিকতা একই সাথে!

জিরো পয়েন্টজিরো পয়েন্ট

হিমালয় ছোঁয়া না হোক, তেতুলিয়ার সরকারী ডাকবাংলোয় মহানন্দার নদীর পাড়ে বসে অন্তত দেখা তো যাবে দূরে দাড়িয়ে থাকা পাহাড়ের সারি গুলোকে। সকালটা একটু বিশ্রাম নিয়ে, ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে পরতে পারেন কাজী এন্ড কাজী টি ষ্টেট এর বিসৃত চা বাগান, খামার, ঘাস ও অন্যান্য চাষাবাদ দেখতে। দেখতে পারেন চা প্রসেসিং এর ব্যাপার স্যাপার। বেলি ফুলের দুর্লভ বাগান! আর সবুজের গালিচা, আনন্দ ধারা।

সবুজের গালিচাসবুজের গালিচা

শেষ দুপুরে ফিরে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে পারেন তেতুলিয়া বাজারের সত্যি কারের জীবন ও বৈচিত্র উপভোগ করতে, আর একটু এগিয়ে একই সাথে উপভোগ করতে পারেন তেতুলিয়া আর জলপাইগুড়ির চা বাগানের মনোমুগ্ধকর সবুজের খেলা, সবুজ গাছ আর শেষ বিকেলের হলুদ রোদের আলিঙ্গন। সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসতে পারেন তেতুলিয়া বাজারে, উপভোগ করতে পারেন গরম পুরীর সাথে বিশাল রসগোল্লার অমৃত। এরপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আধার নামতেই ফিরে আসতে পারেন মহানন্দার তীরের ডাকবাংলোয়, পায়ে হেটেই। বসতে পারেন ঝিরঝিরে বাতাস বয়ে যাওয়া নদীর তীরে, নিতে পারেন বুক ভরে বিশুদ্ধ বাতাস। অনেক রাত পর্যন্ত কাটাতে পারেন এখানেই, পাশের দোকানের চা উপভোগ করতে করতে।

এমনকি যদি রাতে না থেকে ফিরে আসতে চান, তবে সেটাও সম্ভব যদি থাকে নিজেদের গাড়ি। তবে ধরতে পারেন ফেরার পথ, কাটিয়ে একটি অবসর দিন, সমতলের সবুজ চা বাগানে আর ঝিরঝিরে বাতাসের মহানন্দার তীরে। 
ঢাকা থেকে ৬৫০ টাকায় বাসে করে যাওয়া যায় তেতুলিয়া, সরকারী ডাকবাংলোর ভাড়া পরে ৮০০-১০০০ টাকা, আগে থেকে বলে রাখা সাপেক্ষে।

খাওয়া-দাওয়া সারাদিন-রাত ২৫০-৩০০ টাকা খরচ করলেই পেয়ে যাবেন মনের মত আর তাজা সব খাবার। ব্যাক্তিগত ভাবে থাকার হোটেলও আছে কয়েকটি সেগুলোর ভাড়াও সাধ্যের মধ্যেই।