আগের দিনের মুসাফিররা কোন পরিকল্পনা নিয়ে ঘর থেকে বের হত না। পথ দিয়ে দিত পথের সন্ধান। তখন ছিল না কোন গুগল ম্যাপ্স, জিপিএস। বিখ্যাত পরিব্রাজক হিউয়েন সাং, ইবনে বতুতা, মার্কো পোলার রোজননামা পড়লে বুঝা যায় তারা কতটা ভ্রমণ পাগল ছিল। ম্যাপের যুগে আমরা আধুনিক হচ্ছি কিন্তু এইটার ব্যবহার অনেকেই বুঝে না। আজকে শুনাবো গুগল ম্যাপ দেখে কি ভাবে তিস্তা ব্যারেজ থেকে পঞ্চগড় আসলাম। ডালিয়া-ডিমলা-ডোমার-দেবীগঞ্জ-বোদা-পঞ্চগড় এ রোড টু রিমেম্বার।

সেদিন সারাদিন ঝিরি ঝিরি বৃস্টি ছিল। আকাশ করছিলো মোদের সাথে মেঘের খেলা। ভিজতে ভিজতে কাক ভেজা। হাড় কাপুনি শীত কে গীত শুনিয়ে হেটে চলছে অদ্ভূত তিনটা মানুষ। কেউ সমবয়সী না। ঘুরতে গিয়ে পরিচয়। কোন এক বিখ্যাত ব্যক্তি বলেছেন বাবা সফরে বের হও, সফরে গেলে মানুষ চিনা যায়। তো এই ইউনিভারসাল ভাই-ব্রাদার-ব্রো সম্পর্ক গুলার বন্ধন অনেক মজবুত হয়। বৃস্টির এই কঠোর হানার মধ্যেও উত্তরবংগের জাতীয় যান ব্যাটারি চালিত অটো করে তিনবিঘা করিডোর থেকে যখন ডিমলা আসলাম তখন প্রায় বিকেল।

বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টবাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট

ক্ষিধায় পেট চো চো। ব্রীজের পাশে চানাচুরওয়ালা মামার বানানো চানাচুর তখন অমৃত লাগে। চানাচুর খেতে খেতে এক পলক তিস্তা ব্যারেজ দেখে নিলাম। ইহা উত্তরবংগ তথা দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প। এর সুফল ভোগ করছে নীলফামারি, লালমনিরহাট, রংপুর, দিনাজপুরের মানুষ। ব্রীজের উপর হেটে হেটে উপভোগ করতে লাগলাম গ্রাম বাংলার রুপ। এই রুপের আধার দেখে মন পুলকিত হল। আর মনে হল এমন একটা বিকেলে এখানে না আসলে খুব পাপ হয়ে যেত। এখানে পর্যটন শিল্প তেমন ভাবে গড়ে উঠেনি। তবুও এর আশেপাশের পরিবেশ পথিকের মনে ভরাতে বাধ্য।

তিস্তার উজানে বাঁধ দিয়ে ঘেরা কৃত্রিম জলরাশি, সেচ বাইপাস খাল, বনায়ন আর পাথর দিয়ে বাধাঁনো পাড় সব মিলে এক মনোরম পরিবেশ। কিছুদূর পর যাবার পর দেখতে পারলাম একদল জাল পেতে মাছ ধরছে। কখন যে দেখতে দেখতে ঘন্টা পার হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। এখন যাবার পালা ঘনিয়ে এল। এখানেই বাধলো বিপত্তি। গুগল ম্যাপ বলে ডালিয়া থেকে ডিমলা ডোমার-দেবীগঞ্জ-বোদা হয়ে পঞ্চগড় যাওয়া যায়। আর আমাদের স্নেহের ছোট ভাই বলছে রংপুরের পাগলাপীর হয়ে পঞ্চগড় যাব। ওভাবে হিসাব করে গেলে দেখলাম প্রায় ৫ ঘন্টার উপরে লাগবে। আর ম্যাপ দেখাচ্ছে ডোমার-দেবীগঞ্জ হয়ে গেলে ২ থেকে ৩ ঘন্টা লাগবে।

আমার ভাইডি আবার বিশিষ্ট বাস গিক। হানিফ শ্যামলী ছাড়া তার চলেই না। পাগলাপীর যামু হানিফ শ্যামলী করে পঞ্চগড়। কোন এক দার্শনিক বলেছিলেন ম্যাপে তোমার বিশ্বাস না হলে লোকাল মানুষ কে জিজ্ঞেস কর। দে নো দ্যা রুট। ডালিয়া পয়েন্টে অটো মামা কে যখন জিজ্ঞেস করলাম উনি কহিলেন পাগলাপীর হয়ে গেলে ১২টার আগে আর পঞ্চগড় যেতে পারবেন না। ভেংগে ভেংগে যান।

শুনেই ব্যাপারটা রোমাঞ্চকর মনে হল। নীলফামারীর বুক চিরে যাব পঞ্চগড়। কতগুলা উপজেলা ক্রস করবো। তাও আবার উত্তরবংগের জাতীয় যান অটো, মহেন্দ্রা করে। ছোট ভাই গাই গুই করার পরও বড়দের বুঝে রাজি হয়ে গেল। অটোতে চড়ে বসলাম। প্রথম গন্তব্য ডালিয়া টু ডিমলা। অটো চলছে হেলেদুলে, মনে আনন্দ মিলে। নচ্ছার বৃস্টি সে তো পিছে লেগেই আছে।

বাংলাবান্ধাবাংলাবান্ধা

এত বাজে রাস্তা আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাকে চানাচুরের ডিব্বার ভিতর ভরে ঝাকাচ্ছে। দেখতে দেখতে এসে পড়লাম ডিমলা। এইবার তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়লাম ডোমারের অটোতে। ডোমার পৌচ্ছাতে আমাদের সন্ধ্যা হয়ে গেল তখন মাগরিবের আজান পড়ছে। পেটেও ইদুর দৌড়াচ্ছে। সে কবে থেকে না খাওয়া। ভাতের ক্ষিধা কি চানাচুরে মিটে। সাত পাচ না ভেবে ঢুকে পড়লাম হোটেল। এর মধ্যে একজন আছে উনার আবার দুই ডিম না হলে চলেই না। হাল্কা নাস্তা সারার পর সিগারেটে সুখ টান দিতে দিতে উঠে পড়লাম মহেন্দ্রায়।

এবারের গন্তব্য দেবীগঞ্জ। পথ যেন আর শেষ হয় না। পাছা সিটে সেলাই হয়ে গেছে। এ যন্ত্রনা কেমনে বুঝাই। যাক একসময় এসে পড়লাম দেবীগঞ্জ। দেবীগঞ্জ আসার পর একটু রেস্ট নিয়ে উঠলাম বোদার মহেন্দ্রায়। ততক্ষনে মনে হচ্ছিলো এইবার পঞ্চগড় যেতে পারলে একটা বিজয়ের লাফ দিব খুশিতে। বোদা আসার পর ছোট ভাই আবার গো ধরলো আমার এই নধর ক্লান্তি দেহ নিয়ে মহেন্দ্রায় আর বসা সম্ভব না। পা এর স্পেস কম। হানিফ শ্যামলিতে যামু। আবার সেই ভাংগা রেকর্ড।

যাক বোদার মোড়ে ১৫ মিনিট দাড়ানোর পরও কোন হানিফ শ্যামলী পেলুম না। এরপর এক দোকানদার মামু কহিলো আপনারা কি মফিজ। এখন সব গাড়ী পঞ্চগড় থেকে বের হচ্ছে। এই সব গাড়ী ঢাকায় যাবে। পঞ্চগড়ে এখন কোন গাড়ী ঢুকবে না। মলিন মুখে আবার সেই পুরান সাথী মহেন্দ্রায়। এইবার মামা কহিলেন পঞ্চগড় আর বেশি দূরে নয়। আহ কি সুখ। ঝড়ের গতিতে মহেন্দ্রা চলছে।

আমাদের চেয়ে মামার তাড়া বেশি। যাত্রী ছাড়াই দিছে টান। ৩০ মিনিটের রাস্তা ২০ মিনিটে পাড়ী দিল। বাস, ট্রেন, লঞ্চের মত যদি মহেন্দ্রা গিক থাকতো নিশ্চিত আমি সেই গিকের প্রথম হতাম। এমন ড্রাইভিং দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসলো। পঞ্চগড়ের বাতাসে নাকি কাঞ্চনজংঘা ভাসে। পঞ্চগড়ে এসে হিলি এরিয়ার ফিলিংস পেতে লাগলাম। ম্যাপ ভুল বলে না এইটাই এই লম্বা জার্ণির মূল শিক্ষা। কিছু কিছু জার্ণি স্মৃতি হিসাবে থেকে যায়। নীলফামারীর বুক চিরে পঞ্চগড় মনে থাকবে অনেকদিন।