লেখা ও ছবি- মাকসুদুল আলম 

সংসারের ঘানি টানার উপমা প্রায়ই শুনি আমরা, আবার প্রাচীন বাংলার যে বর্ণনা আমরা পাই তাতে প্রায়ই ঘানি ভাঙ্গা তেলের বর্ণনা পাওয়া যায়। আধুনিক কালে অত্যাধুনিক মেশিন সহ তেলের মিল চলে আসায় ঘানি ভাঙ্গা তেল এর ব্যাপারটা বিজ্ঞাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।

তারপরও, দেশের কিছু মানুষ ধরে রেখেছে তাদের পূর্বপুরুষ দের পেশা, তেল ভাঙ্গানোর আদিম ঐতিহ্য। ঘানি তে ভাঙ্গানো তেল এখনো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।

মুসলমানদের মধ্যে যারা তৈল প্রস্তুত করতো তাদের বলা হতো কলু আর হিন্দুদের বলা হতো তেলি।  পূর্ববঙ্গে একসময় ঢাকার কলুদের প্রধানকে বলা হতো পরামাণিক।

তৎকালে ময়মনসিংহ অঞ্চলে কলুদের একটি শ্রেনী ছিলো এদের বলা হতো বক-কলু।

সব রকম বীজ থেকেই তৈল তৈরী করতো কলুরা। কলুরা নিজের গরুকে সরষের বর্জ্য খাওয়ায়;  আর সার হিসেবে খইল বিক্রি করে।

জেমস ওয়াইজ তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেনঃ ১৮৭২ সনে বঙ্গদেশে তেলি তিলি ও কলুদের মিলিয়ে তৈল উৎপাদনকারী জাতের সংখ্যা হবে ৫৭২৬৫৯ জন। আর শুধু ঢাকা শহরে তেলি পাঁচ জন কলু ৫৫৫ জন ও তিলি ১৩১৫০ জন।

বর্তমানে তৈল প্রস্তুতকারী সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় মনোনিবেশ করেছে।

কলুর ঘানি আধুনিক এই যুগে এক দুষ্প্রাপ্য জিনিস।  এখন আধুনিক সভ্যতার এই যুগে যন্ত্রের মাধ্যমে তৈল উৎপাদন হয়।  গরুর টানা ঘানি যা একসময় আমাদের বাপ-দাদাদের মুখে আমরা শুনে এসেছি তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

তেমনি এক  গরুর টানা ঘানির সন্ধান পেলাম। জামালপুর জেলাশহর থেকে দশ পনেরো কিমি দূরে কেন্দয়া বাজার নামক স্থানে। কেন্দয়া বাজার রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় এই কলু পরিবারটির বসবাস। ওনার চার পুরুষ ধরে ধরে রেখেছেন তাদের ঐতিহ্য।  বাড়ির উঠোনে  বলদ দিয়ে ঘানি টানা হচ্ছে এবং সরিষার তৈল তৈরি হচ্ছে ঘানিতে। ফোঁটা ফোঁটা সেই তৈল জমা হচ্ছে  বাটিতে।

শতভাগ খাঁটি সরিষার তৈল। একেবারে প্রাকৃতিক এবং কোনোরকম রাসায়নিক মিশ্রণ নেই এতে। সেই যেন চিরায়ত গ্রাম বাংলার ছবি আধুনিক সভ্যতার এই যুগে।

কলু পরিবারটির সাথে কথা বললাম । ওনারা নিজেদের মধ্যেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন যাতে পেশার ধারা বজায় থাকে। কলু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য বংশ পরম্পরায় এখনো ধরে রেখেছেন এই পরিবারটি।