এম এন প্রেস, কাঙাল কুটির।

এই লেখা সাইনবোর্ড ছিল সামনের পোড়ো বাড়ীর দেয়ালে, পাশে নতুন একটি ভবন যার উপরে লেখা কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। দেখেই মনের মাঝে বেশ আশার সঞ্চার হল, নিশ্চয়ই দর্শনীয় কিছু মিলবে এই জাদুঘরে। কিন্তু দরজায় তালা দেখে ফের সেই পোড়ো বাড়ীতে প্রবেশপথের সন্ধানে ফিরলাম আমরা, আমরা বলতে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বি এম টি সি)- এর কয়েকজন সদস্য, যাদের সাথে বেড়াতে এসেছি কুষ্টিয়া। উদ্দেশ্য আসন্ন হিমালয় অভিযান নিয়ে আলোচনা করা এবং কুষ্টিয়ার কয়েকটা বিশেষ স্থান পরিদর্শন করা, যার মধ্যে অন্যতম এই এম এন প্রেস।

এম এন প্রেস, কাঙাল কুটিরএম এন প্রেস, কাঙাল কুটির

 

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার ১৮৭৩ সালে কুমারখালির নিজ গ্রামেই গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকাটির জন্য নিজস্ব ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এই ছাপাখানাতেই মীর মশারফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু ছাপা হয়েছিল, এবং ছাপাখানা কক্ষেরই এক কোণে কালজয়ী উপন্যাসটির কিছু অংশ রচিত হয়েছিল। জানা যায় এই প্রেস যন্ত্রে রয়েছে কাঙাল হরিনাথ, লালন, মীর মশাররফ ও জলধর সেনের হাতের স্পর্শ।
লালন ফকির? তাঁর সাথে প্রেসের কী সম্পর্ক?

ছাপাযন্ত্রছাপাযন্ত্র

 

আসলে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকায় হরিনাথ সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের পাশাপাশি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশ করেন। একটা পর্যায়ে জমিদাররা তাঁর ওপর হামলার পরিকল্পনা করেন। তখন লালন সাঁই অনুসারীদের নিয়ে হরিনাথের বাড়িতে এসে পাহারা দিয়ে তাঁকে রক্ষা করেন। ফকির লালন সাঁইয়ের সঙ্গে হরিনাথের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা ছিল।হরিনাথ নিজেও ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক। ‘কাঙাল ফকির চাঁদ বাউল’ নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। এই নামেই তাঁর রচিত অসংখ্য গান ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে।

অবশেষে আমাদের ক্ষুদে অভিযাত্রীদের দলটি প্রেসের মূল দরজাটি খুঁজে পেতে সক্ষম হয়, এবং সেখানে অনুপ্রবেশের চেষ্টা মাত্রই পাশের বাড়ী থেকে এক পক্ককেশ অমিততেজা বৃদ্ধ ছুটে আসেন, তাঁর নাম অশোক মজুমদার। তিনি কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের প্রপৌত্র। বর্তমানে ইতিহাসের অংশ ছাপাখানাটির একমাত্র অভিভাবক। খুলে ধরলেন তাঁর গল্প ও অভিজ্ঞতার ঝাঁপি-

 কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের প্রপৌত্র কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের প্রপৌত্র

 

কাগজ দেখে বললেন লন্ডনের ১০ ফিন্সবারি স্টিটের ক্লাইমার ডিক্সন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে কলম্বিয়া প্রেস মডেলের ১৭০৬ নম্বর এ মুদ্রনযন্ত্রটি তৈরি করা হয় ১৮৬৭ সালে। এডওয়ার্ড বিভান এ যন্ত্রটি পেটেন্ট করেন। ৩০-৩৫ মণ ওজনের ডাবল ক্রাউন সাইজের বিশাল মেশিনটিতে কাগজ ছাপাতে তিনজন লোক লাগত।

নিজে একটু চালিয়েও দেখালেন মেশিনখানা। ১৯৬২ সালে জনৈক বিদেশী দুই লক্ষ টাকার বিনিময়ে ঐতিহাসিক মেশিনখানা কেনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও হরিনাথের বংশধরেরা সেই ব্যপারে উৎসাহ দেখান নি, বরং অশোক দাদুর কাছে শোনা গেল বিগত এক দশকেরও বেশী সময় ধরে প্রভাবশালী মামলাবাজ প্রতিবেশীদের ঠুকে দেওয়া মিথ্যা মামলার কারণে এই প্রেস রক্ষা করতেই তারা হিমশিম খাচ্ছেন। মাত্র ১৪ বছর আগেও কিছু না কিছু নিয়মিত ছাপাতেন যন্ত্রটিতে, কিন্তু আজ সে নীরব। একপাশে ডাই করে রাখা সেই ইতিহাসের কিছু সাক্ষী, নানা পোস্টার, লিফলেট, পুরনো পত্রিকার ফটোকপি। যেই না জিজ্ঞসা করেছি জাদুঘরে কী আছে, অশোক দাদু তেড়েফুঁড়ে বললেন- আছে চামচিকা আর পাখির বিষ্ঠা! কেউই দাম দিলো না কাঙালেরে!

ইতিহাসের কিছু সাক্ষী, নানা পোস্টার, লিফলেট, পুরনো পত্রিকার ফটোকপিইতিহাসের কিছু সাক্ষী, নানা পোস্টার, লিফলেট, পুরনো পত্রিকার ফটোকপি

 

অবাক হয়ে ঘোর লাগার অনুভূতি নিয়ে প্রেসটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম আমরা, আজ থেকে দেড় শ বছর আগে একদিন এই প্রেস থেকেই বের হতো গ্রামের নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা'। জমিদারদের নৃশংস অত্যাচারের কথা তুলে ধরতে পত্রিকাটি ছিল সোচ্চার। স্থানীয় জমিদার ও ইংরেজদের প্রজাপীড়ন ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছিল হরিনাথকে। এসব নিয়ে তিনি প্রথম লেখালেখি শুরু করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায়। এভাবেই তাঁর সাংবাদিকতার শুরু। পরে ১৮৬৩ সালে নিজেই প্রকাশ করেন মাসিক গ্রামবার্তা প্রকাশিকা। পরে এটি পাক্ষিক এবং একপর্যায়ে সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। যদিও পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে যায় গণমানুষের পত্রিকাটি।

এই এলাকাতে তখন ছিল মূলত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারি, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময় নানা কারণে সাধারণ প্রজারা জমিদারদের লাঠিয়ালে অত্যাচারের শিকার হচ্ছিল, যদিও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কোলকাতায় মহর্ষি বলে পরিচিত ছিলেন কিন্তু নিজের জমিদারীর এই সমস্ত অত্যাচারের প্রতিকার ও সুবিচার করেন নি। যেগুলো নিয়ে ছাপা কাঙাল হরিনাথের সংবাদ ও রোজনামচা পড়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাহিনীর সত্যতা জানতে পেরে পত্রযোগে হরিনাথকে অনুরোধ করেছিলেন অন্তত পিতার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেন এই সমস্ত অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশিত না হয়।

 

অল্প বয়সেই পিতা-মাতাকে হারানোর ফলেই কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের কোনোদিন কোনো বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেখা হয়নি। বেঁচে থাকার তাগিদের কারণে বালক বয়সে কুমারখালী বাজারের এক কাপড়ের দোকানে কাঙাল হরিনাথ কাজ নিতে বাধ্য হন দৈনিক দুই পয়সা বেতনে। এরপর ৫১টি কুঠির হেড অফিস কুমারখালীর নীলকুঠিতে শিক্ষানবিস হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু নীলকুঠিরে স্বল্পকালীন কর্মজীবনে হরিনাথ প্রজার ওপর কুঠিয়ালদের অত্যাচার ও শোষণের স্বরূপ নিজ চোখে দেখেন এবং স্থানীয় জমিদার ও ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। সেই তাঁর সাংবাদিকতার শুরু। পরে ১৮৬৩ সালে নিজেই প্রকাশ করেন ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ নামের মাসিক পত্রিকাটি। ২৫ বছর ধরে পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছিল। একইসাথে তিনি বিদ্যানুরাগী ও সমাজ সচেতন ছিলেন। নিজ গ্রামে তিনি বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় একটি ভার্নাকুলার স্কুল খুলেছিলেন ১৮৫৫ সালে। সেখানেই অবৈতনিক শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। পরের বছর তিনি কুমারখালীতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৮৫৮ সালে এই বালিকা বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

ছাপাযন্ত্রের নকশাছাপাযন্ত্রের নকশা

 

কী বিপুল প্রতিভা নিয়েই জন্মছিলেন মানুষটি! সারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন দেশের মানুষের কল্যাণের লক্ষে। কাঙাল হরিনাথ হয়ত বুক ভরা অভিমান নিয়েই লিখেছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত গান- ”ওহে দিন যে গেল সন্ধ্যা হল পার কর আমারে ---”। আমরা কি কিছুটা এগিয়ে আসতে পারি না তাঁর মহান কীর্তিকে সংরক্ষণের জন্য? নিদেনপক্ষে ঐতিহাসিক প্রেসটি যেন যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করা হয় এবং জাদুঘরটি ঠিক মত চলে সেই ব্যাপারে?


( কাঙাল হরিনাথের এই ছবিটি উইকি থেকে নেওয়া)( কাঙাল হরিনাথের এই ছবিটি উইকি থেকে নেওয়া)