অসমাপ্ত রাতের গল্প.. 
২য় দিনে নিঝুম দ্বীপ রাউন্ড দেবার পর আমাদের দিল মোটামুটি খুশ...পরদিন ব্যাক করবো আমরা...বাকি আছে শুধু রাতটা। ১০ টার মধ্যে খাওয়ার পর্ব সেরে আমাদের বোটের যাত্রা শুরু।ক্যাম্পসাইটে যেতে হবে।ছোট এক ডিঙ্গি নৌকায় আমরা ৯ জন। একজন একদিকে একটু সরলেই আরেকদিক উঠে যায়! আমার জলভীতি প্রবল! ডিঙ্গিতে আমরা মোটামুটি ব্যালান্স করেই বসছি। কিন্তু চৌধুরীখাল দিয়ে বের হলেই খোলা সমুদ্দুর!কূল কিনারা দেখা যায় না। নৌকা একবার এদিকে আবার ওদিক।আমার পেট প্রতিবার মোচড় দিয়ে উঠে উল্টাই গেলো কিনা! প্যানিক মোমেন্ট এটাই মনে হয়! সাতার আমরা কেউই পারি না আর পারলেও এখানে সেটার কোন ভ্যালুট্যালু নাই! তার উপর পোলাপান সমানে পেইন দিচ্ছে আমারে! প্রায় ঘন্টাখানেক পর আমরা একটা চরের কাছে পৌছলাম...

তেপান্তরের মাঠতেপান্তরের মাঠ

তখন রাত প্রায় ১২টা বাজে। চরে নেমে পড়লাম আমরা। তখন ফুল মুন নয় কিন্তু চাঁদের আলো বেশ ছিলো। আমরা বনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।বিশাল চর। এমাথা ওমাথা পুরো দেখা যায় না! এটা মূলত সোয়াম্প ফরেস্ট। বর্ষায় ডুবে থাকবে। শীতে চর। প্রায় ২০ মিনিট মত হাঁটার পর আমরা বনের শুরুর পয়েন্টে পৌছে গেছি।জায়গাটা অতিমাত্রায় নির্জন। ১০ বা ২০ মাইলের মধ্যে কেউ আছে কিনা জানিনা আমরা। বনের ভেতরে ঢুকেই আমরা একটা ছোট পুকুরের মতোন দেখলাম।এটাই হরিণের পানি খাবার জায়গা তাহলে!  সুতরাং এখানেই ক্যাম্প করতে হবে! এ অংশটা বনের একদম বাইরের দিকে। এরপর একদম ঘন হয়ে গেছে বনটা।এখানে ক্যাম্প করার দুটো সুবিধা প্রথমত বাতাস আমাদের অ্যাটাক করার সুযোগ নেই, আর জ্বালানিকাঠের অফুরন্ত ভান্ডার। আগের রাতে চরে ক্যাম্প করতে গিয়ে রাজু আর শহীদ এক মহিলার বাড়ি লুট করেছিলো খুব সম্ভবত! পরে রাত ৩ টার দিকে ২মাইল দূর থেকে উনার চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেয়েছিলাম আমরা। এখানে নো টেনশন! আস্ত বন এখানে.... সুতরাং টেন্টের পেগ গাড়ো! ৩ টা টেন্ট ট্রায়াঙ্গল শেপে রেখে মুখগুলো পুকুরের দিকে করে দিলাম আমরা। ভুলে হরিণ টরিণ যদি দেখা যায়! মাঝে আমাদের ক্যাম্পফায়ার...
যেহেতু পুরো রাত এখন আমাদের...প্রচুর জ্বালানি কাঠ আনা হলো। দাও আগুন...কি আছে জীবনে! আগুন জ্বলছে.. ঠান্ডা তেমন লাগছে না... আমরা গোল হয়ে বসে আছি! এগুলো হলো যেমন খুশি তেমন করো টাইপ সময়।যার যা খুশি করতে পারে...৯ জন সদস্য...একেকজন একেকটা করছে..কাজী ছেলেটা খুব কাজের। সে একটা স্পেশাল কাজে ব্যস্ত, রাজু, শহীদ সমানে বন সাফ করে কাঠ নিয়ে আসছে...লিংকন দারুণ সব অ্যাঙ্গেলে ছবি ট্রাই করছে...এসব জায়গায় রাজেশ ছেলেটা কেনো জানি চুপ মেরে যায়...আমার কাজ হলো বকবক করা! নাইলে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে! সবাইকে গিয়ার আপ করাটা একটা বড় কাজ বটে! এসব কাজে চান্দুকে সবসময় পাই আমি... শোয়েবের প্রধান কাজ ছিলো টেন্ট পিচের সময় টর্চ ধরে রাখা...এর থেকে সে  বেশি কি করতে পারে এটা আমাদের জানা নেই।সূর্যসেন বাবু আমাদের কাজগুলো দেখছেন খুব মনোযোগ দিয়ে.. উনি মনে হয় বেশি মজা পাচ্ছিলেন...এটা আরেকটা রাজ্যই বটে!  হঠাৎ দেখি রাজু শিবের মত তান্ডবনৃত্য শুরু করেছে!  পুরো ওয়াইল্ড ড্যান্স...সাথে আরো কে কে ছিলো মনে নেই! সবকিছু ঠিকঠাকভাবে চলছে...উৎসবের আযোজন সম্পন্ন... সুতরাং ফানুস ওড়াতে হবে!... 
এখানে বাতাসের তান্ডব নেই...ফানুস উড়িয়ে দিলাম...আহা কি সুন্দর উড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটা বিচের দিকে যাবার বদলে বনের দিকে উড়ে গেলো... এখন ড্রাই সিজন...ফানুসের আগুন কোথাও পড়ে বনে আগুন টাগুন লেগে গেলে শেষে জেলে ঢুকতে হবে! যাই হোক এটা উড়ে কই গেছে জানার সৌভাগ্য হয়নি... রাত ২ টার দিকে আমাদের অখন্ড অবসর। চিন্তা করলাম বনের বাইরের দিকে যাই...বের হয়ে বিশাল চর। মাঝে মাঝে গাছের সারি। কি যে অসাধারণ লাগছিলো জায়গাটা...এখানেই ক্যাম্প করা দরকার ছিলো আসলে...আমরা সবাই এক গাছের সারির নিচে গিয়ে শুয়ে পড়লাম....আহা কি শান্তি!

 নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে

কি সুনসান এ জায়গা...শত কোলাহল থেকে অনেক মাইল যেনো দূরে...অনেক দূরে সমুদ্র আবছা দেখা যাচ্ছে... আমরা তখন আজগুবি সব আলাপে! এতো পরিস্কার আকাশ অনেকবছর দেখি না!  রাতের এ সময়টা আকাশ মনে হয় আরো সুন্দর লাগে... চান্দু এর মধ্যে নেট অন করে কোনটা কোন তারা এসব নিয়ে গবেষণা করছে.. সপ্তর্ষিমন্ডল, জুপিটার, মার্স, আরো কি কি সব দেখলাম...আমরা শুয়ে আছি আর ভাবছি...তারাগুলো কত দূরে.. এখানে আলো আসতে আসতে হয়ত তারাটা আর জীবিত নেই...একই সাথে অতীত এবং বর্তমান!  আপেক্ষিকতার মূল রহস্যটাতো এখানেই আসলে...সময়!
রাত তখন ৪ টা বাজে... কারোরই ওঠার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না...কিন্তু টেন্টে ঢুকতে হবে! পরদিন সকালে রওনা।  এখন না ঘুমালে সকাল ১০টার আগে কেউ পারবে না উঠতে...সুতরাং...পরদিন খুব ভোরে উঠে গেলাম আমরা...৬ টার দিকে...হরিণ যদি আসে!  কিন্তু হরিণ মনে হয় বেশ ভীতু টাইপ প্রাণী... রাতে আগুন টাগুন দেখে হয়তো ভাবছে বনে দাবানল লেগেছে... ওদের টিকিটির দেখা পাইলাম না আমরা! কি আর করি.. টেন্ট সব গুছিয়ে আমরা রওনা দিয়ে দিলাম বিচের দিকে...শায়লা আপুরা আমাদের পিক করে নিবে বড় ট্রলারে। একটা জিনিস মিস করে গেছি... আগের রাতেই ডিসিশন নেয়া হয়েছিলো আমরা বড় ট্রলারে সরাসরি নিঝুম দ্বীপ থেকে নোয়াখালি চেয়ারম্যানঘাট চলে যাবো...ওটাতে সবচাইতে আরামে যাওয়া যাবে...
আমরা ছোট ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে বসেছি...ওটা যথারীতি দুলছে এদিক সেদিক...হঠাৎ বড় ট্রলারের শব্দ... দূর থেকে সিন্দাবাদের জাহাজের মতোন লাগছিলো ওটাকে..মনে হচ্ছিলো আমরা যেনো দ্বীপে আটকে পড়া এক ট্যুরিস্ট গ্রুপ উদ্ধার পাবার আশায় বসে আছি! ...ডিঙ্গি থেকে ওটাতে উঠতে কত যে কাহিনী...! যাই হোক শেষকালে উঠে গেলাম কোনমতে!  আমাদের সাথে রাতে তেমন কোন খাবার ছিলো না। সকাল থেকে ক্ষিদায় কাতর (স্পেশালি আমি)। শায়লা আপুরা আমাদের জন্য সব নিে এসছেন.. পরটা, ভাজি, ডিম...গ্রোগ্রাসে খেয়ে নিলাম সবাই! ট্রলার চলছে... আপুরা ছাদে বসে আছেন...প্রচন্ড রোদ....আমরা একটু আড়াল পাবার জন্য ওটার একমাত্র কেবিন টাইপ জায়গাটাতে ঢুকে গেলাম...পোলাপানের আর কাজ কি...তাস পেটাও!  ৪ ঘন্টা পর ১২ টার দিকে চেয়ারম্যানঘাট পৌছে গেলাম আমরা...

ক্যাম্পক্যাম্প

ট্যুর প্রায় শেষ...এখন যে যার গন্তব্যে চলে যাবো আমরা...শায়লা আপুরা যাবে কুমিল্লা..  আমরা সবাই এক হোটেলে খাওয়াদাওয়া করে নিয়ে বিদায় নিয়ে নিলাম...পিচ্চিটার কথা মনে থাকবে...আমরা বাকিরা সবাই যাবো চাটিঁগাতে... টিকেট কেটে অপেক্ষা করতে লাগলাম...
আমরা মোটামুটি ট্যুরের শেষ পর্যায়ে...এবার ক্রেডিট দেবার সময়...পুরো ট্যুরের কৃতিত্বটা আমি রাজেশকে দিবো...ওর ম্যানেজমেন্টে এর আগে সাজেক গেছিলাম.. ওটাও অসাধারণ ছিলো...এবারেরটাতে সে ছিলো একদম কি পয়েন্টে। ওর যেহেতু ফেনীতে পোস্টিং...মোটামুটি ওকেই আমাদের দিক থেকে পুরো ধকলটা নিতে হইছে...টূরের বাকি সদস্যদের কথা কমবেশি বলেছি..লিংকন ছেলেটা দারুণ ছবি তুলে এ ট্যুরের যত্ত সুন্দর পিক প্রায় সব ওরই তোলা ...শোয়েব সবচাইতে অলস টাইপ! তবে ট্যুরে সবাইকে কিছু করতে এরকম কোন রুলস নেই...তাকে শুধু টর্চ মারার জন্য নিয়ে যাবো ভাবছি নেক্সট সব ট্যুরে... রাজু, শহীদ মোস্ট অ্যাকটিভ মেম্বার...শহীদ ছেলেটা জুনিয়র হলেও ব্যাপক কাজের...চান্দু তো একপিস! ওর কাজ হলো চরম মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রেখে ডিসিশন দেয়া...কাজী ছেলেটা একটা কাজে খুব স্পেশাল সেটা আর নাইবা বল্লাম...সূর্যসেন বাবুকে আমি নিয়ে এসছিলাম আমাদের পাগলামিগুলো দেখানোর জন্য!...এরকম রিলাক্স করার জায়গা তো সচরাচর পাওয়া যায় না!  আর আমার কথা নাইবা বল্লাম!  আমিও কিছু কাজ হয়তো করি... সেটা বেশিরভাগ সময় উল্টোপাল্টা হয়... তবে এ ট্যুরের আসল ট্যুইস্ট হলো আমি যে এ গল্পটা লিখছি... আদতে আমার যাবার কোন কথাই ছিলো না...আমি চেস্টা করছিলাম অন্যদিকে যাবার... কিন্তু ট্যুরমেট দেখি প্রচুর আর সবাই ব্যাপক মজার!  মনে মনে চিন্তা করেছিলাম এ ট্যুরে না গেলে ব্যাপক মিস হবে... এগুলো Once in lifetime ট্যুর...পরে হয়তো যাওয়া হবে কিন্তু কোনটাই তো এটার মত না!  সুতরাং একদম লাস্ট মোমেন্টে আমি ট্যুরে ইন করেছি...
আমরা যারা জব করি সেটা মোটামুটি একটা মনোটোনাস লাইফ...প্রতিদিন একইরকম কাজ করে যাওয়া...এর মাঝে এধরণের ট্যুরগুলো যেনো টনিকের মতন কাজ করে... একটা ট্যুর দিলাম তো পুরো ৬ মাসের পেইন রিলিভড!  আর দেশটা তো আমাদের...এতো ছোট দেশ কিন্তু এতো ভ্যারাইটি...সেটা geographical কিংবা লিঙ্গুইস্টিক হোক...সূর্যসেন বাবুকে বলেছিলাম আপ্নি তো সারাজীবন হাওরে চাকরি করলেন...আপ্নারে আরেকটা রাজ্য দেখাবো.. কত রিমোট আর কত সুন্দর হতে পারে... উনি মোটামুটি বিমোহিত!  আমরাও কেমন যেনো প্রেমে পড়ে গেছি দ্বীপটার....আমি গল্পটা লেখার চেস্টা করেছি এভাবে অন্তত  যারা এটা পড়বে তারা যেনো মোটামুটি ভালো একটা ধারণা পায়...বিশাল গ্রুপে ট্যুর করার অসাধারণ মজা...খরচ যেমন কমে যায় তেমনি অনেককিছু অ্যাভেইল করা যায় খুব সহজে... 
শেষ রাতটা আমাদের অসমাপ্তই ছিলো...অনেকটা যাকে বলে টু বি কন্টিনিউড!... 

 

নিঝুম দ্বীপের গল্প ২

নিঝুম দ্বীপের গল্প (১)