নিঝুম দ্বীপে আমাদের প্রথম রাত কেটে গেছে...পরদিন খুব সকালেই উঠে পড়লাম আমরা। রাজেশ তাগাদা দিচ্ছিল বারবার। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন দলের বাকি সদস্যরা। মানে সেই কাপল গ্রুপ।উনারা হোটেলে ছিলেন। আমরা ৮ জন ছিলাম টেন্টে। কিন্তু বললেই কি রেডি হওয়া যায়! শীতার্ত এক রাত কাটানোর পর আমাদের মাথা প্রায় নস্ট! টেন্ট প্যাক করা, সবকিছু গুছিয়ে হোটেলে ফিরতে ফিরতে আমাদের ৮ টা বেজে গেছিলো। দেন খাওয়াদাওয়া করে রেডি হতে হতে প্রায় ৯ টা বাজে। উনারা সেই সকাল থেকে রেডি আমাদের জন্য। মনে মনে একটু বিরক্ত হওয়াই স্বাভাবিক। যাই হোক ট্যুরে এসব ঘটেই.... আমরা সবাই বের হয়ে পড়লাম। নেক্সট কাজ পুরো দ্বীপ ট্রলারে রাউন্ড দিবো!

ট্রলারে রাউন্ডট্রলারে রাউন্ড

চৌধুরীখাল দিয়ে বের হতে হতে দ্বীপটার আয়তনটা পরিস্কার হচ্ছিলো আমাদের কাছে। নিঝুম দ্বীপ মূলত মেঘনা নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা বিশাল চর। মেঘনা নদী প্রচুর পলিমাটি বহন করে। ওখান থেকেই বালি আর কাঁদামাটি একটা জায়গায় জমতে জমতে এ চরগুলো তৈরি হয়। এ দ্বীপের পুরনো নাম ছিল চর ওসমান। সেখান থেকে কিভাবে নিঝুম দ্বীপ নাম এলো সেটা আমাদের জানা নেই। দ্বীপটা ঘুরছি আমরা এর ধার ঘেষে।  কিছুক্ষণ পর একটা জায়গায় নামলাম আমরা। নাম নাকি কমলার চর। কমলা আছে কিনা জানি না কিন্তু বেশ সুন্দর জায়গা। আর এখানে প্রচুর হরিণের পায়ের ছাপ দেখলাম।ওগুলো অনুসরণ করে করে বেশ কিছুটা গেলামও আমরা।কিন্তু হরিণ বাবাজীদের দেখা পাওয়া সত্যিই কঠিন। খুব নিঃশব্দ না হলে দেখা পাওয়া মোটামুটি অসম্ভব!আমি যখন ২০১০ এ এসছিলাম তখন দেখা পেয়েছিলাম কিছু। এখন মনে হয় সংখ্যায় কমে গেছে। ট্যুরিস্টদের হরিণের মাংস খাবার লোভ সংবরণ না করলে এদের সংখ্যা কমতেই থাকবে। যাই হোক আমরা তখন এক্টু হতাশ বৈকি! আমাদের ট্রলার মাঝি বলে দুপুরে আপ্নাদের একটা জায়গায় নিয়ে যাবো সেখানে নাকি প্রচুর হরিণ আসে। কমলার চরে শ্বাসমূল দেখলাম প্রচুর কিন্তু তেমন ঘন নয়। ওখানে বেশ কিছু সময় ছিলাম আমরা। ছবি টবি তোলা হল।আমাদের দলের পিচ্চি সদস্য ডিএসএলআর দিয়ে দারুণ দারুণ সব পিক তুলছিলো। এই বয়সেই নিঝুম দ্বীপ ঘুরতে আসা মাই গড!  শায়লা আপুর পিচ্চি এটা। রাজ্যের কৌতুহল ওর চোখে...পুরো ট্যুরের মজাটা যেন ওর মধ্যেই দেখতে পাচ্ছিলাম আমরা...কিন্তু জায়গাটা থেকে যেন উঠতেই মন চাইছে না...সবকিছু কি শান্ত!এটাই কি সেই 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসের রহস্যময় চরিত্র হোসেনমিয়ার নিঝুম দ্বীপ....!

হোসেন মিয়ার দ্বীপহোসেন মিয়ার দ্বীপ

আমরা আবার বের হয়ে পড়লাম.. এরপর আমরা ঘুরে চলে গেলাম নিঝুম দ্বীপের ঘাটে যেখান থেকে স্পেশাল গরুর দুধের চা পাওয়া যায়। আহ! ক্ষিদে লেগে গেছে সবার ব্যাপক।  আগে খাওয়া দেন দ্বীপ টিপ সব দেখা যাবে। যেমন খুশি তেমন সাজো স্টাইলে যে যার মতো ইচ্ছে সব খেলাম! আবার রওনা। এবার আমরা চলেছি নতুন জেগে ওঠা এক বিশাল চরের দিকে...নামটা ভুলে গেছি... কেউ তেমন থাকে না মনে হলো... দূরে বিশাল বন।  এই চরে মনে হয় একসাথে লাখখানেক টেন্ট পিচ করা যাবে!  মাথার ওপর ঠাঠা রোদ... ছাউনি নাই। আমরা আর কেউ নামার সাহস করলাম না।  এবার দ্বীপের মোটামুটি পেছন দিকে চলেছি আমরা। মাঝি একটা বনের মধ্যে নৌকা ভেড়াল। কিন্তু এটা আসলে কি ধরণের বন বুঝলাম না। ঠিক পরিস্কার ভাবে দেখা দেখা যায় না,  সব কেমন কাঁটাকাঁটা গাছ, আর খুব ঘন শ্বাসমূল। দেখে যা বুজলাম এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির বন। আমরা মোটামুটি ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচলাম!  এরপর আবার বোটে... এখন আমরা দ্বীপে ব্যাক করছি। দ্বীপটার একটা অংশে বালি আরেক বাকি বিশাল অংশে মূলত কাঁদা। বোট যখন দ্বীপের কাছাকাছি জীবনে প্রথমবারের মত Flying Fish দেখলাম। ছোট ছোট মাছগুলো কেমন যেন উড়ে উড়ে যাচ্ছে।  আর নানান ধরণের পাখি ও চোখে পড়লো।  পুরো নিঝুম দ্বীপটা রাউন্ড দিয়ে অনেকগুলো জিনিস পরিস্কার হলো। দ্বীপটা বিশাল বড় আর দিনদিন বড় হচ্ছে। একেকটা দিক একেকরকম। কোনদিকে অল্প ঘন ম্বাসমূল আবার কোনদিকে খুব ঘন। আবার একদিকে বিশাল বন,  কোন শ্বাসমূল নেই।(সোয়াম্প ফরেস্ট)।সবমিলিয়ে সুন্দরবনের মিনিয়েচার ভার্সন বলা যায়। আমরা চৌধুরীখাল দিয়ে আবার ঢুকলাম। তখন বেলা প্রায় ২ টা বাজে। আমাদের আবার বের হতে হবে! তোরা যে যা বলিস ভাই হরিণ দেখা আমাদের চাই!

চৌধুরী খালচৌধুরী খাল

লান্চ শেষ করে সবাই বের হবে।মাঝি বলেছে চৌধুরীখালের কাছেই একটা জায়গা আছে...প্রচুর হরিণ নাকি আসে পানি খেতে... সেখানে সন্ধ্যায় গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে হবে। হোটেলটার খাওয়ার মধ্যে জাদু টাদু আছে কিনা জানি না!  এতো টেস্ট সবকিছু...খাওয়ার পর সবাই বের হবার প্রস্ততি নিচ্ছে আমি বুজলাম আমাকে একটু রেস্ট নিতেই হবে! আমি আর আমার সাবঅ্যাসিটেন্ট ইনজিনিয়ার সূর্যসেন বাবু এসছি সেই সুনামগঞ্জ থেকে। ফেনী মহিপাল নেমে বন্ধুদের সাথে দেখা হয়েছিলো চেয়ারম্যান ঘাটে।  ওরা সবাই গেলো... আমি ঘুমালাম আরাম করে! হরিণ দেখা থেকে ঘুমানো মহৎ কাজ (কোন কবি লিখেছেন জানিনা!) সন্ধ্যাবেলা সবাই দেখি বিরসবদনে হোটেলে হাজির। আমি তো ভাবছি সবাই হরিণ টরিণ দেখবে পারলে দুএকটার সাথে সেলফিও তুলবে!  কিন্তু হরিণ কি আর গাছে ধরে!  সবাই নাকি অনেত ধৈর্য ধরে বসে থাকার পরেও কোন হরিণ চোখে পড়েনি!  তবে ওরা একটা কাজের কাজ করে এসেছে রাতে ক্যাম্প করার জায়গাটা দেখে এসেছে... আগেররাত চরে থাকার পর আমরা বুঝছি এখানে আর থাকন যাইতঁ ন! থাকলে দুএকজনের হাইপোথার্মিয়ায় প্রাণ সংশয় আছে।বাঁচতে হলে যেহেতু জানতে হবে,  এবার আমরা থাকবো বনে। বাতাস থেকে প্রটেকশন পাবার আর কোন রাস্তা নাই তখন আমাদের.... আর এ জায়গাতে সকালে নাকি প্রচুর হরিণ আসে পানি খেতে...আমরা হরিণ দেখার আরেকটা চান্স নিবো না তা হয় না! 

আমরাআমরা

রাতের খাওয়াদাওযা জম্পেশ হলো... এতোক্ষণে আমাদের সবার মাঝে বেশ একটা সুসম্পর্ক দাড়িয়ে গেছে। এখানে মূলত তিন টা গ্রুপ একসাথে অ্যাড হয়েছি আমরা... শায়লা আপুরা ৪ জন (পিচ্চিছাড়া) দুটো কাপল সবাই জুডিসিাল ম্যাজিস্ট্রেট। ওরা সবাই রাজেশের পরিচিত বড় ভাই। আমরা সবাই বন্ধু। আমার সাথে আছেন সূর্যসেনবাবু,  ওদিকে শোয়েবের সাথে আছে শহীদ আর কাজী। আমি, চান্দু রাজু, শোয়েব আর রাজেশ অনেক আগের বন্ধু সাথে আছে ফটোগ্রাফার কাম ক্লোজ ছোট ভাই লিংকন। এসব ট্যুরে ডিএসএলআর ছাড়া যাওয়ার মানেই হয় না! সব মিলিয়ে একটা হযবরল গ্রুপ।  কিন্তু ট্রিপের এ পর্যায়ে এসে সবার মোটামুটি একটা বন্ধু বন্ধু ভাব চলে এসেছে। ট্যুরের এ জিনিসটাই সবচাইতে আসলে মজার। একদল অপরিচিত লোক আপ্নার সাথে এমনভাবে পরিচয় হবে যাদের সাথে আপ্নার অসাধারণ কিছু সুখস্মৃতি থাকবে।  শায়লা আপুদের নাকি প্ল্যান ছিলো সুন্দরবন যাবার। কি কারণে হয়নি। এর মাঝে উনারা নিঝুম দ্বীপের প্ল্যান করলেন আর আমরা অটোমেটিক অ্যাড হয়ে গেছি! আমাদের সাথে আরেকটা বড় টেন্ট থাকলে খুব সম্ভবত উনারাও তাঁবুতে থাকতেন...

আমাদের রাতের ক্যাম্পিং এর প্রস্ততি চলছে। এবার আমাদের ছোট ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে উথালপাথাল ঢেউ ভেঙ্গে যেতে হবে ক্যাম্পসাইটে! ওই জায়গা সম্পূর্ণ নির্জন। সুতরাং সবকিছু ফাইনালি চেক করে বের হবো..তখন কে জানি বললো এখানেই আরেকটা ফানুস উড়াই...আমাদের তখনো ৩ টা ফানুস আছে সুতরাং নো চিন্তা! সবাই আছে....কোনকিছু উদযাপনের জন্য এর ধেকে ভালো জিনিস হতেই পারে না.....ফানুস উড়ে যাচ্ছে....সবাই বেশ এক্সাইটেড!  সবকিছু গুছিয়ে আমরা বোটে উঠে পড়লাম.....

আরেকটা বিনিদ্র রাতের অপেক্ষা....

 

(চলবে)

 

নিঝুম দ্বীপের গল্প (১)