LGED র চাকরির জন্য গত ৩ বছর ধরে সুনামগঞ্জেই আছি। আপাতত on deputation এ সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদে। এই চাকরিটা ব্যাপক মজার!!!....সারা জেলা ঘুরে বেড়াতে হয়। প্রথম যখন এখানে আসি জায়গা দেখেই মাথা ঘুরে গেছিলো।  চারিদিকে শুধু পানি আর পানি...!!! উদ্ভট টাইপ জায়গা।  আমি বাই বর্ন চিটাইংগা সুতরাং আমার কাছে পাহাড় আর সমুদ্র খুবই কমন ব্যাপার কিন্তু  হাওর এলাকা সত্যিই অদ্ভুত ধরণের... বর্ষাকালে পানি শীতে পুরাই ধানক্ষেত....পুরাই অদ্ভুত এবং উদ্ভট...!!!

ফানুস ওড়ানোর ব্যর্থ চেস্টা!ফানুস ওড়ানোর ব্যর্থ চেস্টা!

হাওরে আমি অনেকবারই গেছি কিন্তু থাকা হয়নি রাতে কখনো... সুনামগঞ্জকে বলা হয় জৌৎস্নার শহর... সেটা কেন এটা গত ২ বছরে মোটামুটি বুঝেছি... এখানে তেমন বড় কোন স্থাপনা নেই তাই ভরা পূর্ণিমায় পুরা শহর কেমন যেন আলোকিত থাকে....আমার রেস্ট হাউজের ঠিক সামনে থেকেই চাঁদটা উঠতে থাকে... দেখতে এতো যে অসাধারণ...তবে বেশি মজা হলো হাওরে পূর্ণিমা... হাওরের পানি মোটামুটি স্টিল ওয়াটার, বাতাসে হালকা হালকা কাপতে থাকে....এর মধ্যে চাঁদের আলোটা কেমন যেন অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করে....তাই পূর্ণিমা রাতে হাওরে থাকার ইচ্ছে আমার অনেকদিন থেকেই... আর তার জন্য পারফেক্ট হলো টাঙ্গুয়ার হাওর... এটা UNESCO declared World Heritage... আর এই জায়গায় থাকার জন্য পোলাপান তো অলটাইম রেডি...এবারের প্ল্যানটা একদম হঠাতই... সম্ভবত ৩০ তারিখের দিকে রক্তিম ফোন করে বলে,  মামা আমরা আসছি ঢাকা থেকে,  টাঙ্গুয়ারে থাকবো... আমি তো শুরু থেকেই না!!!...এই ঝড়বাদলে নিজের চেহারাই ভালোমতো দেখা যায় না আবার পূর্ণিমা....!!!!

হাওরে দাপাদাপি...হাওরে দাপাদাপি...

তার উপর টাঙ্গুয়ারে বোটে থাকা....!!!....প্লাস আমার তখন চিটাগাং থাকার কথা....রক্তিম বলে,  মামা তুমি না থাকলে হবে না!!!!... আর কি করা!!!....মাথা খারাপ পোলাপানের তালে পড়লে ঝামেলা ওইটা জানা কথা...!!!! আর আমারো যে মনে মনে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না সেটা কেমনে বলি... (কিছু কথা থাকনা গুফন!!!!)....যাই হোক ট্যুর প্ল্যান মোটামুটি ফাইনাল হলো ঢাকা থেকে ৪ জন (রক্তিম, রিমন, সজল আর তৌহিদ), চিটাগং থেকে ৪ জন ( চান্দু, জাহিদ ভাই, আলম ভাই আর জনৈক ভদ্রমহিলা...::p:p) আর সিলেট থেকে ১ জন আর আমি। কিন্তু আইটেম বয় অনুপ কুমার কে ছাড়া এই ট্যুর করতে আমি রাজি না....সে হইলো একটা জ্বলজ্যান্ত মাল..!!!!....ওকে আমি বাই ডিফল্ট ট্যুরে রাখার ট্রাই করি... আসলে যেকোন ট্যুরে পেইন দেবার মত পোলাপান না থাকলে মজা নাই...!!!!....

'অনুপ কুমার ''অনুপ কুমার '

অনুপ কুমার কে পেইন দেবার মজা হইলো ও কখনো পেইন খায় না... কারণ আর্থ্রাইটিসের কারণে ও এতো বেশি  পেইনকিলার খাইছে ওর মস্তিস্কের ব্যথা পরিমাপক অঙ্গটি এখন প্রায় বিকল!!! ....তাই ওকে আসাই লাগবে...!! মজা হইছে সে আসার টাইমে তুষার দা কেও নিয়ে আসছেন যিনি অলরেডি ইন্ডিয়ার সব কয়টা স্টেট ঘুরে ফেলেছেন( সিকিম সহ তাও ২ বার!!!) মোটামুটি ৩৫ বার গেছেন... কঠিন পাব্লিক!!...সিলেট থেকে যে ভাইয়া আসছেন  (পুসন ভাই) তিনিও ব্যাপক পাব্লিক। TOB র অ্যাডমিন ছিলেন একসময়। টাঙ্গুয়ারে গেছেন অনেকবার তাই পুরা জায়গাটা তার খুব চেনা।  উনি অনেকগুলো জটিল কাজ যেমন বোট ঠিক করা, কেনাকাটা করা মানে ঝামেলার জিনিসগুলো সব খুব সহজ করে দিয়েছিলেন। বোটওয়ালা উনার খুব পরিচিত লোক।  এই ধরণের রিমোট প্লেসে এরকম জানাশোনা লোক না থাকলে কি পরিমাণ প্যারা খাইতে হয় এইটা আমি খুব ভালো জানি। পুরা ট্যুরটা খুব সাকসেসফুল হইছে এই ছেলের কারণে সো তাকে স্পেশাল থ্যাংকস। আর আমি যাবো শুনে  আমার রেস্ট হাউজের এক দাদা ও বললো যাবেন উনি (সুমন দা)। এভাবে ঢাকা থেকে ৬ জন, চিটাং থেকে ৪, সিলেট থেকে পুসন ভাই আর আমি সহ এখানে ২ জন!!!....টোটাল ১৩ জনের গ্রুপ ( নাম্বারটা সত্যিই একটু আনলাকি)!!!!.....ঢাকার পাব্লিকগুলো সকাল ৬ টা বাজেই পৌছে গেল,  চিটাইংগাগুলো ৯ টার দিকে সবাই মোটামুটি ১০ টার ভেতর আমার রেস্ট হাউজে উপস্থিত। এখানে হালকা খাওয়াদাওয়া করেই রওনা, প্রথমে যেতে হবে তাহিরপুর সুরমা নদী পার হয়ে।  তাহিরপুরে যাবার নরমাল বাহন হলো মটরসাইকেল!!!....এটাও একটা ইউনিক জিনিস তবে বেশি লোক হলে লেগুনা বা সিএনজি করেও যাওয়া যায়।  পুসন অভিজ্ঞ লোক, সে আগে থেকেই একটা লেগুনাকে বলে রেখেছিল, আমরা নদী পার হয়ে কিছুক্ষণ ওয়েট করতে করতেই লেগুনা হাজির। এরপর রওনা। মটরসাইকেলে লাগে ১ ঘন্টা, লেগুনা তে পৌনে ২ ঘন্টার মত। লেগুনা ড্রাইভার বেশ মজা পাইছিল আমাদের মত উড়াধুরা পাব্লিক দেখে। মোটামুটি হাওয়ার বেগে দেড় ঘন্টায় পৌছে গেলাম।  এখানে একটু বলে রাখা ভালো মটরসাইকেলে তাহিরপুর যাওয়াটা খুব মজার, একপাশে মেঘালয়ের পাহাড়, রাস্তা বেশ ভালোই...লেগুনাতে এই ফিলিংসটা পাওয়া যায় না...!!! 

তাহিরপুরে পৌছালাম ২ টার দিকে। তাহিরপুর উপজেলাটা পুরাই হাওরের ভেতর।  একপাশে বিশাল শণির হাওর আরেকপাশে মাটিয়াল হাওর তার পাশে টাঙ্গুয়ার। মাঝে একটুকরো ভূমি।  ওটাই উপজেলা!!


...এখানে পৌছার পর প্রধান কাজ হলো আমরা যেহেতু বোটেই থাকবো সুতরাং খাওয়াদাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, মুরগি,মাছ, এসব কেনাকাটা করা,মাঝিই সব রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করবে।দলে একজন মেয়ে থাকলে কত যে সুবিধা কারণ বোটের ৫ জন সহ ১৮ জন মানুষ তিনবেলা খাবার জন্য কি পরিমাণ চাল লাগে এটার কোন আইডিয়াই আমাদের নাই!!!... কেউ বলে ৫ কেজি কেউ বলে ১০ কেজি!!... আজমা আপু থাকার কারণে তিনিই বলে দিলেন কোনটা কেমন লাগবে!!... সুতরাং আমাদের অ্যাকাউন্টেন্ট সজল পুসন ভাইকে নিয়ে তাহিরপুর বাজারে গেলেন এই ফাঁকে আমরা বাজারের এক দোকানে মনের সুখে ছোলা, চা এসব খেতে লাগলাম।   গরুর দুধের টা টা অসাধারণ ছিলো।  এর ফাকে রক্তিম আম, আনারস কোথক জানি কিনে আনলো। ৩০ মিনিটের ভেতর সজল আর পুসন ভাই হাজির।  সবার আর তর সইছে না কখন বোটে উঠবে,  টাঙ্গুয়ারে যাবে!!...লন্চঘাট বাজারের পাশেই, বোটওয়ালা পুসনের অনেকদিনের পরিচিত, সে আগেই বোট নিয়ে ওয়েট করছে ঘাটে। আমরা মিনিট পাঁচেকের ভেতর লন্চঘাটে হাজির। বোটটা দেখেই মন ভরে গেলো। মোটামুটি বড় সাইজের কাঠের বোট। দেরি না করে মালপত্র সমেত উঠে গেলাম। দেখা গেল যে পরিমাণ খাওয়াদাওয়া নেয়া হইছে তাতে মনে হয় টাঙ্গুয়ারে হাওরে শুধু খাইতেই গেছি!!!...

বোট ছাড়লো। আমরা ব্যাগট্যাগ সব ভেতরে রেখে ছাদে সবাই উঠে পড়লাম। তাহিরপুর থেকে ছাড়ার পর প্রথমে মাটিয়াল হাওর পড়ে তার পাশেই টাঙ্গুয়ার। বোট চলছিল হাওরের মধ্য দিয়ে। সবাই চিৎকার চেচামেচি, টাঙ্গুয়ারে অবশেষে যাচ্ছি আমরা। লাফালাফি চলছে রীতিমতো, কেউ ছবি তুলছে,  কেউ ঝিমুচ্ছে,  কেউ বা অন্যজনকে কোন কারণ ছাড়াই ডিস্টার্ব করছে...!!!! মোটামুটি ঘন্টাখানেক চলার পরেই হিজলের বন দেখা গেল মানে টাঙ্গুয়ারে ঢুকে গেছি আমরা। মাঝিও তাই বললো।  মোটামুটি সবাই এক্সাইটেড আমরা। এরপর আরো ভেতরে চলে গেলাম আমরা। তখন মোটামুটি বিকেল। টাঙ্গুয়ার হাওরের মাঝেই মাঝি বিল্লাল ভাইয়ের বাড়ি। আমরা প্রথম খাওয়াদাওয়া করবো সন্ধ্যায় ইফতারির পরে। তাই প্রথমেই উনার বাড়িতে জিনিসপত্র গুলো দিয়ে দেয়া দরকার। নৌকা যখন গ্রামে ভিড়লো ওখানকার বাচ্চাগুলো আমাদের দিকে মোটামুটি ভিনগ্রহের প্রাণীর মত তাকাই ছিল।  তাদের কাছে আমরা সবাই বিদেশী। আমরা বোটেই ছিলাম, আজমা আপু দেখি বোট থেকে নেমে বাচ্চাগুলোর সাথে ব্যাপক আড্ডা জমিয়ে ফেলেছেন!!...পিচ্চিগুলোও খুব মজা পাচ্ছিল উনাকে পেয়ে। আপু পেশায় ডাক্তার। আমরা ভয় পাচ্ছিলাম উনি আবার না ডাক্তারি শুরু করে দেন!!!...যাই হোক বিল্লাল খুব তাড়াতাড়িই জিনিসপত্র গুলো বাসায় দিয়ে বোটে চলে এলো।

আমরাআমরা

আবার যাত্রা শুরু। কিছুটা গিয়েই একটা ওয়াচ টাওয়ার চোখে পড়লো। এটা বনবিভাগের তৈরি। বেশ উঁচু। এটার পাশেই হিজলের বন। আমরা ওটার দিকেই যাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই পৌছে গেলাম ওই জায়গায়। বিল্লাল ওই টাওয়ারের কলামের সাথে বোট বেঁধে দিল। পানি টা এতো পরিস্কার যাকে crystal clear water. এটার কারণ আছে। এটা শুধুই বৃস্টির পানি। পানির নিচে গাছপালা, ছোট মাছ সব স্পস্ট দেখা যায়। দেখেই সবার মুখে এক কথা পানিতে তো নামতেই হবে রে!!!...আমাদের সাথে লাইফ জ্যাকেট ছিল না থাকলেও কোন প্রব নাই। গলা সমান পানি, ডুবার বিন্দুমাত্র চান্স নাই কোন।  আর মাঝি ভাইরা তো পাশে বসে আছেনই। সুতরাং কোন দেরি নাই যে যার মত ড্রেস চেন্জ করেই পানিতে ঝাপ। আমাদের মোটামুটি গলা সমান পানি, আলম ভাইয়ের কোমর সমান হবে। উনি মোটামুটি রাজপথে হেটে বেড়ানোর মত এদিক ওদিক চলে যাচ্ছেন!!!...পাশেই হিজল গাছ, পুসন ভাই হ্যামক টানিয়ে দিলেন। আহ,  হ্যামক একটা দারুণ জিনিস, পানির উপরে শুয়ে থাকা যায় আরাম করে!! সবার তখন অস্থির অবস্থা।  কেউ এদিকে লাফ দেয় কেউ ওদিকে। এর মধ্যে দেখি আমাদের অনুপ কুমার মোটামুটি রেসকিউ সাতারুর পোশাক পড়ে ফেলেছে। মুখে স্নোরকেলিং এর মাস্ক আর বাতাস টানার জন্য নল। তাকে এখন মোটামুটি ভাবে ভিনগ্রহের প্রাণীর মত দেখাচ্ছে!!!..হঠাৎ শুনি বাজ পড়ার শব্দ!!  আসলে অনুপ বোটের উপর থেকে  লাফ দিসে... সবার কাছে মনে হইছে ছোটখাট কোন হাতি আকাশ থেকে পানিতে পড়ছে... ওই জায়গাটা মোটামুটি গর্ত টাইপ হয়ে গেছে আমি শিউর!!!...এরপরে শুরু হলো অনুপের সার্কাস শো। সে এরকম বেমক্কা ফাল দেবার কারণে কত মাছ যে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে কে তার খবর রাখে!!!....প্লাস তার উল্টাপাল্টা স্নোরকেলিং এবং সাতার কাটার কারণে পুরা জায়গাটাই ঘোলা হয়ে গেলো!!!...পুসন ভাই চেস্টা করছেন সেলফিস্টিক দিয়ে আন্ডারওয়াটার সেলফি তোলার কিন্তু ঘোলা পানির জন্য হলো না!!..আমরা যে যার মত লাইফ জ্যাকেট, বয়া এগুলো দিয়ে ভেসে আছি। পানিতে ডুব মারছি, আবার উঠছি, ভাসছি। পানি মোটামুটি ঠান্ডা,  সারাদিনের গরমের ক্লান্তি কেমন যেন এক মুহুর্তেই উধাও,  খুব রিফ্রেশিং লাগছিলো।  ওইদিকে হ্যামকে আমরা পালা করে উঠছিলাম,  এটা বেশি আরামের জায়গা হওয়াতে সবার টার্গেট ওটাতে চড়া!!..পরবর্তীতে আলম ভাই আর আজমা আপু অনেকক্ষণ ওখানে বসে কত গুজুর গুজুর ফুজুর ফুজুর করলেন,  মাথায় আবার লতাপাতা দিয়ে বসে ছিলেন দুজন,  কেমন যেন আফ্রিকান আদিবাসীদের মতো। খুব সুন্দর লাগছিল দুজনকে আর আমরা চেয়ে চেয়ে রইলাম!!!... সুমন দা এর ফাকে পানিতে স্নান করে উঠে পড়েছেন,  ক্যামেরা নিয়ে টাওয়ার থেকে আমাদের বাঁদরামি ক্যামেরাবন্দী করার চেস্টা করছেন।তুষার দা হিজল গাছ থেকে লাফ দেবার চেস্টা করছেন উল্টো হয়ে, আমি আর চান্দু উল্টো হয়ে ভেসে থাকা যায় কিনা তার প্র্যাকটিস করছি, রিমন এর মধ্যেই তার ডিএসএলআর পানিতে নিয়ে এসেছে, তৌহিদ এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে, রক্তিম আর সজল সাতার কেটে কেটে পুরো টাঙ্গুয়া পার হওয়া যায় কিনা সেটার একটা হিসেব করছে,  কিন্তু অনুপ যে কি করার চেস্টা করছিল সেটাই বোঝা যাচ্ছিল না,  সে সাঁতার কাটতে পারে সর্বোচ্চ ১০ ফিট পর্যন্ত কিন্তু তার পোশাকআশাক দেখে মনে হবে সম্প্রতি অলিম্পিকে মাইকেল ফেলপসকে অল্পের জন্য হারাতে পারেনি!!!...তার কান্ডকারখানা আমরা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিলাম!!... এর মাঝে অনুপ আবার লাফ দিলো এবং তার গগলস হারাই গেলো পানিতে,  যেটা দিয়ে পানির নিচে দেখবে ওটাই নাই!!...পরে অবশ্য এক মাঝি ভাই কস্ট করে খুজে দিয়েছিলেন এটা, কিন্তু আমাদের সবার জলকেলি যেন থামছেই না, আমরা মোটামুটি ২ ঘন্টা ছিলাম পানিতে,  আজান দেবার কিছুক্ষণ আগে উঠে পড়লাম সবাই কারণ পুসণ রোজা,  তাই আমাদের যেতে হবে কিন্তু সবাই ফ্রেশ হয়ে বোটে উঠতেই মোটামুটি আজান দেবার সময় হয়ে এলো।  আমার চানাচুর, জিলাপি, মিনারেল ওয়াটার এ ধরণের জিনিস নিয়ে নিয়েছিলাম,  সমস্যা হলো না। পানিতে অনেকক্ষণ দাপাদাপি করার কারণে সবার পেটে ক্ষিধা,  এগুলোই চাবাইতে চাবাইতে আমরা গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম....বোটে যেতে যেতেই ইফতার সারা হলো...কিন্তু পেটে ছুচো ডন মারছে মোটামুটি,  ১০ মিনিটেই গ্রামে পৌছে গেলাম। ততক্ষণে আকাশ মুখ গোমরা করে ফেলেছে কেন জানি, পুরো আকাশ ভেঙ্গে বৃস্টি আসবে এই টাইপ,  নৌকা বাতাসে দুলছে, প্রচন্ড বাতাস, খুব শান্তি শান্তি ফিলিংস তার মধ্যে আমাদের খিচুরী চলে এসছে উইদ ডাল এন্ড ডিম ভাজা, আহ পৃথিবীর সব সুখ তখন আমাদের!!...বোটের উপর ছাদে ঝিরি ঝিরি বৃস্টির মাঝে শুরু হয়ে গেলো গ্রোগ্রাসে গেলা , কিছু ভাবার টাইম নাই তখন, বাকিদের কথা জানি না অনুপ খেতে পারছিল না দেখে তার অর্ধেক ডিম মেরে দিয়েছিলাম!!!...পেট খারাপ মানুষ, তাকে সাহায্য করা নৈতিক দায়িত্ব!!!...খাওয়াদাওয়ার পর পুরাই আয়েশ করা, এরপর কাজ হলো ফানুস উড়াতে হবে, সুতরাং প্রস্তুতি সারা, পুসন ক্যামেরা নিয়ে রেডি, আলম ভাই বাঁশিতে কঠিন সুর তুলে ফেলেছেন এই উপলক্ষে,  কিন্তু ব্যাড লাক কেমন যেন। প্রচন্ড বাতাসে ফানুস বেশি উড়লো না। প্রকৃতি একটু বিরুপই ছিল আমাদের উপর,  (এতো সুখ মনে হয় খাওয়া যায় না!!!) সো আর কি করা, এর মাঝে বৃস্টি একবার আসছে আবার কমে যাচ্ছে, আমরা আর নামলাম না, সবাই আয়েশ করে ছাদে শুয়ে আড্ডা দিচ্ছি, আলমভাই বাঁশি বাজাচ্ছে, প্রচন্ড বৃস্টি কিন্তু খুব ভালো লাগছে সবার। আমরা শুয়ে শুয়ে চাঁদ ওঠার প্রতীক্ষায় তখন।সময় বয়ে যাচ্ছে,  মিনিট ঘন্টা বয়ে যাচ্ছে , কিন্তু চাঁদ উঠার নাম নেই । পুরো আকাশ কালো হয়ে  বজ্রপাত শুরু হোল।হাওরে বজ্রপাত খুব ডেঞ্জারাস । কখন মাথার উপ্রে পড়ে বলা মুশকিল!!!...কিন্তু কে আর এগুলর কেয়ার করে !!!! সবাই বোটের ছাদেই রইলাম ...সাথে মুশুলধারে  বৃস্টি ...এর মধ্যেই আড্ডা শুরু হোল... অনুপ দেখি এর মধ্যেই তার বেশভুশা পরিবর্তন করে  মাথায় হেডলাম্প জ্বালিয়ে ঘুরাঘুরি শুরু করেছে ...কেমন যেন সার্চ অ্যান্ড ডেস্ট্রই টাইপ ব্যাপার !!! সে এদিক সেদিক ঘুরে তেমন কিছু না পেয়ে আমাদের সাথে আড্ডায় যোগ দিল...সে কি আড্ডার ধরণ!! ইহজাগতিক, পরজাগতিক, আমরা কোথক এলাম, কেনই বা এলাম , বিস্তর আলোচনা...অনুপ আলম ভাই কে বিচিত্র সব প্রশ্ন করছে... আলম ভাই উত্তর দিয়ে কূলাতে পারে না!  এর মাঝে তুষার দা বলছেন উনার গল্প...ইন্ডিয়ার সবগুলি স্টেট একাএকা ঘুরে ফেলা মানুষের গল্প বিশাল...আমাদের প্রতিটা ট্যুরের মাঝে আরেকটা ট্যুরের প্ল্যান হতে থাকে... আমরা চিন্তা করছি এরপর নেক্সট জায়গা কি হতে পারে!  চিল্যাক্স করার জন্য এমন জায়গা দেশে আর আছে কি! এসব আজগুবি কিন্তু সিরিয়াস লেভেল আলোচনা করতে করতে রাত প্রায় ১০ টা। মাঝিি বারবার বলছে খেয়ে নেবার জন্য.. এটা অত্যন্ত অত্যন্ত প্রত্যন্ত একটা এলাকা... ৯ টার ভেতর সবাই ঘুমায় পড়ে... আমরা খেয়ে নিলে পড়ে উনারা ফ্রি হতে পারবে.... খেতে বসার পর দেখা যায় বোটের উপর রীতিমতো আলোক স্বল্পতা.. অনুপ মোটামুটি ব্যাগভর্তি করে জিনিসপত্র নিয়ে এসছে... তাকে আমরা বলি চলমান ডিসপেনসারি... তার কাছে জ্বর, হাঁপানি, মাথাব্যথা... এমনকি ম্যালেরিয়ার, টাইফয়েড, জন্ডিস সবধরণের ওষুধ পাওয়া যায়! কিন্তু এখন তার একটা জিনিস সত্যিই কাজে লাগছে.. সেটা হলো হেডল্যাম্প। সে হেডল্যাম্প দিয়ে সবাইকে আলো দিচ্ছে এ কারণে সে নিজে খেতে পারছে না...এমন মহান মানুষ কালেভদ্রে জন্মায়!

( চলবে)