লেখা ও ছবি- সাইফ মাহমুদ 

যারা নিজের মত করে ঘুরে বেড়াতে চান এবং নিরিবিলি ঘুরতে পছন্দ করেন তাদের জন্য এই সময়টা বেস্ট। এখন অফ সিজন হওয়াতে পুরো দ্বীপ পর্যটক শূন্য। তাই হোটেল ভাড়া ও কম পড়বে। আমাদের ছয় জনের ভ্রমণের বিস্তারিত তুলে ধরছি এখানে। আমাদের বাড়ি যেহেতু নোয়াখালী, আমরা চেয়ারম্যানঘাট রুট ব্যাবহার করেছি।

আপনারা যারা ঢাকা থেকে আসবেন চাইলে সরাসরি লঞ্চে হাতিয়া আসতে পারেন কিংবা বাসে অথবা ট্রেনে নোয়াখালী এসে চেয়ারম্যানঘাট দিয়ে হাতিয়া যেতে পারেন। লঞ্চে আসলে আপনাকে নামতে হবে তমুরুদ্দী ঘাট। আর নোয়াখালী হয়ে গেলে নলছিরা ঘাট। আমরা ভোরে সোনাপুর থেকে সিএনজিতে রওনা দিয়ে ৭ টার মধ্যে চেয়ারম্যানঘাট পৌঁছাই। ভাড়া নিয়েছে ৫০০ টাকা। এখান থেকে একটাই সি-ট্রাক ছাড়ে জোয়ারের উপর নির্ভর করে। ভাড়া ৯০ টাকা। সকাল ৯ টায় আমাদের সি-ট্রাক ছেড়ে দিয়েছিল।

নিঝুম দ্বীপ যাওয়ার পথে। (ছবি-bonhi mahbuba) নিঝুম দ্বীপ যাওয়ার পথে। (ছবি-bonhi mahbuba)

এছাড়া ট্রলার এবং স্পীড বোট ও পাওয়া যায়। এগুলো সারাদিন থাকে। ট্রলার ভাড়া হাতিয়া পর্যন্ত ১৫০ টাকা আর স্পীড বোট ভাড়া ৪০০ টাকা। দেড় ঘন্টার মধ্যে আমরা নলছিরা ঘাটে পৌঁছে যাই। আমরা চেয়ারম্যানঘাট নাস্তা করি। নলছিরা ঘাট থেকে মোটরবাইক, চাঁদের গাড়ি, সিএনজি যায় মোক্তারিয়া ঘাটে। বাইক ভাড়া প্রতি জন ২০০ টাকা, চাঁদের গাড়ী ১০০ আর সিএনজি ১৫০ করে।

নলছিরা থেকে মোক্তারিয়া ঘাট প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। আমরা বাইকে করে যাই। জাহাজমারা পর্যন্ত রাস্তা অসাধারণ। বাকী অল্প কিছু রাস্তা খারাপ। বাইকে ১ ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম। চাঁদের গাড়িতে গেলে মিনিমাম ২.৫ ঘন্টা সময় লাগে মোক্তারিয়া ঘাটে যেতে। আমরা মোক্তারিয়া ঘাটে দুপুরের খাবার খেয়ে নিই। খরচ প্রতি জন ৫০ টাকা করে পড়ে। সাথে নদীর মিস্টি বাতাস ফ্রি । এরপর স্পীড বোট অথবা ট্রলারে আবার নদী পাড়ি দিতে হয়। এটা আসলে শাখা নদী। ট্রলার ভাড়া ২০ টাকা আর স্পীড বোট ভাড়া ৬০ টাকা। আমরা স্পীড বোটে ৪ মিনিটে নিঝুম দ্বীপের বন্দরটিলা পৌঁছে যাই।

নৌকা থেকে চোখে পড়বে এরকম অসম্ভব সুন্দর কিছু বাঁক (ছবি- bonhi mahbuba) নৌকা থেকে চোখে পড়বে এরকম অসম্ভব সুন্দর কিছু বাঁক (ছবি- bonhi mahbuba)

একটা কথা নিঝুম দ্বীপ গেলে কিন্তু প্রচুর জার্নি করার অভ্যাস থাকতে হবে। এরপর বন্দরটিলা থেকে আবার মোটর বাইকে করে নামার বাজার আসি জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে। এসে শাহীন হোটেল এ ডাবল রুম একটা নেই। ভাড়া ৫৫০ টাকা করে। এরপর আমরা একটু রেস্ট নিয়ে চলে যাই বীচে। বীচ থেকে ফিরে সন্ধ্যায় যাই ছোয়াখালীতে হরিণ দেখতে।

দিনের আলো নিভে আসার সাথে সাথে রাস্তা থেকে একটু দূরে হরিণ এর আনাগোনা বাড়তে থাকে। আমরা যখন দূর থেকে লাইট এর আলো ফেলি শত শত হরিণ এর চোখ জ্বলে ওঠে। ওরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তাদের চাইতে দ্বিগুন অবাক আমরা হয়ে যাই । মৃদু বাতাসে অন্ধকারে লাইট দিয়ে হরিণ দেখার যে অনুভূতি, তা বোঝানোর মত না।

দ্বীপে বিস্তীর্ন সবুজ প্রান্তর দ্বীপে বিস্তীর্ন সবুজ প্রান্তর

আমরা ভাই ভাই হোটেল এ রাতের খাবার খেয়ে নিই। খাবারের ব্যাপারে যার যার মত করে খেতে পারেন। পরের দিন ভোরে আমরা চোধুরী খাল ঘুরতে যাই। ওখান থেকে ফিরে বীচে লাফালাফি করে বীচের একদম উত্তর প্রান্তে চলে যাই। যেখানে দ্বীপের মানুষের জীবনধারণ খুব কাছ থেকে দেখা যায়। দুপুরে হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেতে ভাই ভাই হোটেল যাই। এখানে নতুন এক মাছের সাথে পরিচয় হয়। স্থানীয়দের দেওয়া নাম ভাংগা মাছ। আমরা এটা আগেই কিনে হোটেলে দিয়ে গিয়েছিলাম রান্না করে দিতে। ওনারা খুব সুন্দর করে রান্না করে দিয়েছেন। স্বাদ এক কথায় অসাধারণ। নিঝুম দ্বীপ গেলে এটা অবশ্যই খাবেন। আর এখানকার মিস্টি গুলো খুব ভালো, খেয়ে দেখতে পারেন।

দ্বীপের সমুদ্র তটদ্বীপের সমুদ্র তট

দুপুরের খাবারের পর চলে যাই বনবিভাগের ওয়াচ টাওয়ারে। ওখান থেকে পুরো বীচ এবং বনের অনেক দূর পর্যন্ত খুব সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। সূর্যাস্ত দেখার জন্য আমরা বিকেলের দিকে ওয়াচ টাওয়ার থেকে বীচে যাই। বেশ রাত পর্যন্ত বীচে আড্ডা দিয়ে আমরা হোটেলে ফিরে আসি। রাতে কাঁকড়া আর লুচি দিয়ে রাতের খাবার সেরে ফেলি। পরের দিন ভোরে আমরা একই রুটে নোয়াখালী ফিরে আসি।


নিঝুম দ্বীপে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। স্থানীয় লোকজন খুবই হেল্পফুল। বনে যেতে চাইলে গাইড ভাড়া পাওয়া যায়। এখানে পুলিশ ফাঁড়ি ও আছে। তবে এখন এই সুন্দর দ্বীপে অবাধে বন উজাড় চলছে, যার ফলে সংকুচিত হচ্ছে হরিণের আবাস্থল। আমি একটা মৃত হরিণ ভাসতে দেখেছি বীচে। 

 মৃত হরিণ মৃত হরিণ

আর একটা জিনিস অবশ্যই মনে রাখবেন, এই দেশ, এই দ্বীপ আমাদের। তাই এগুলো পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদের। বন এবং বীচ নোংরা করবেন না।