লেখা ও ছবিঃ জাকির হোসেন রাজু

প্রথমে বলে নেই আমি কোন লেখক নই তাই লেখার মাধুর্যে আপনাদের বেধে রাখার চেষ্টা করবো না। পদ্মা মেঘনার মিলন বললেই যে যায়গাটার কথা মনে পড়ে তা হল চাঁদপুর, এই জায়গাটা সমুদ্র সৈকতের থেকে কিছু কম নয় বৈকি!  দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসার মধ্যে যে কয়টি জেলার নাম সবার আগে আসে তার একটির নাম চাঁদপুর, এই চাঁদপুর আবার ইলিশের বাড়ী নামেও বেশ জনপ্রিয়।

শহরের ক্লান্তি ভুলে একটিদিন আনন্দে নদী আর প্রকৃতির মাঝে কাটিয়ে আসতে চাঁদপুর হতে পারে আদর্শ জায়গা যদি আপনার হাতে সময় এবং টাকা কম থাকে। যারা শুধু বুড়িগঙ্গার নোংরা কালো পানি দেখেছেন তারা মেঘনার উত্তাল তরঙ্গে সচ্ছ পানিতে নিজেকে হারাতে প্রস্তুত থাকতে পারেন, মায়াময় সুর্যাস্ত দেখতে প্রস্তুত হয়ে যান। মেঘনা-পদ্মার মিলনে চাঁদপুরকে করেছে রূপবতী আর একই সাথে সৌন্দর্যের একখণ্ড লীলাভূমি, নদীর কলকল শব্দে মন মাতানো প্রকৃতি। নদী পথের বড় বড় স্টিমার, ছোট জেলে নৌকা, কচুরিপানার বুক চিরে বয়ে চলা আপনার লঞ্চ মনে গেথে থাকার মত কিছু স্মৃতির পাতা তৈরি করবে, চাইলে মাঝে মাঝে হারিয়ে যাতে পারবেন সেই স্মৃতির পাতায় বা কাউকে শোনাতে পারবেন গল্পগুলো।

নদীর অপুর্ব রূপনদীর অপুর্ব রূপ

পদ্মা-মেঘনার মোহনার বেশ কয়েকটি চর আছ, চলে যেতে পারেন সেখানে আর নিতে পারেন সমুদ্র সৈকতের অনুভূতি, তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো যারা ভাবছেন তাদের বলছি নেই মামার চেয়ে কিপটা মামা কম কিসে। মাত্র কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের এক ঝাক সমাজকর্মী ঘুরে এসেছে ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরের বিখ্যাত বালুর চর, নিয়ে এসেছে এক বুক সজিবতা আর আনন্দ। সেই ভ্রমণ বৃত্তান্তই শোনাবো আজ।

সকাল সকাল চলে যাই আমরা সদর ঘাটে আর চেপে বসি বোগদাদীয়া নামক বিশালাকার লঞ্চটিতে। সবার পেটে ছুচোমারা ক্ষিধে থাকায় বুড়িগঙ্গার উটকো পরিবেশেও সকালের নাস্তা করে নিতে কারো একটুও আপত্তি ছিলো না বৈকি। আমাদের লঞ্চ ছাড়ে ঠিক ৮.৩৫ সে। আমরা সবার উপরে ছাদে জায়গা নেই, যদিও সচারাচার এই জায়গায় উঠতে দেয় না সবাইকে। কিছুক্ষণের মধ্যে ছাদের রোদ বুঝতে শুরু করি কিন্তু বেশ বাতাস থাকায় আর আনন্দিত থাকায় পাত্তা না দিয়ে আমরা ছাদেই অবস্থান নেই। বুড়িগঙ্গার নোংরা জল পেরিয়ে ধলেশ্বরী আর তারপর আমরা মেঘনাতে পড়ি। আমরা যেন সুখের সাগর পাড়ি দিচ্ছিলাম বড় ভাই, বন্ধু, ছোটভাই মিলিয়ে আমরা লঞ্চের ঠিক সামনে গিয়ে বসি এবং মেঘনার মায়াময় রুপ আর নদীপাড়ের জীবন দেখতে দেখতে এগিয়ে যেতে থাকি, দু একটা বক আর পানকৌড়ির ছবি তোলার চেষ্টা করতে ভুল করিনি, তবে কচুরিপানা কেটে এগিয়ে যাওয়া ছিলো দেখার মত দৃশ্য।

বালুর চরবালুর চর

আমরা চাঁদপুরে পৌছে আগে দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা করি, তারপর আমাদের রিজার্ভ ট্রলারে রওনা হই বালুরচরের উদ্দেশ্যে। বালুর চর চাঁদপুর রক্তধারা বা মোহনা থেকে মাত্র ২/৩ কিলো দূরে সময় লাগে ১ ঘন্টার কাছাকাছি, কিন্তু ট্রলার ছোট আর নদী বেশ উত্তাল থকায় আমরা সেই একটা থ্রিলার নিতে পেরেছিলাম বৈকি! যাইহোক চরে পৌছে দেখে সে এক বিশাল কান্ড- চর ত না যেন সমুদ্র সৈকত, যারা কক্সবাজার বা কুয়াকাটা যাননি তারা এটাকে সমুদ্র সৈকত ভেবে ভুল করতেই পারেন। শুরু হয় ঝাপাঝাপি, বেশ কয়েকটি লেয়ার আছে তাই সচ্ছ পানিতে ঝাপাঝাপি করতে আপনার বেশ ভালো লাগবে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি।

এর পর আমাদের ফুটবল ম্যাচ হয়ে যায় একটি, বাংলাদেশের দুটি বিখ্যাত নদী পদ্মা এবং মেঘনার মোহনায় এই বালুর চরে ফুটবল খেলা সত্যি একটু ভিন্ন রকম আনন্দ, ভিন্ন রকম ভালোলাগা। একসময় ক্লান্ত দেহগুলো আবার ঝাঁপিয়ে পরে মোহনার জলে আর জলাঞ্জলি দেয় সকল ক্লান্তি। ফিরে আসি রক্তধারাতে আর দুপুরের খাবার শেষ করতেই বিকেল গড়িয়ে এসেছে, ৫ টার লঞ্চে উঠে পড়ি। এর পর লঞ্চের ছাদেই পদ্মা-মেঘনার মোহনায় উপভোগ করি এক অসাধারণ সুর্যাস্ত। টকটকে লাল সুর্যটা যখন মোহনায় অস্ত যাচ্ছিলো চলে যাওয়ার বেদনায় সারা আকাশ লাল করে, সে এক উপভোগ্য বিষয় ছিলো। এর পর একবুক শান্তি আর সুখানুভূতি নিয়ে রাতের লঞ্চ ভ্রমণ করে ফিরে আসি ঢাকাতে।

ফুটবল ম্যাচফুটবল ম্যাচ

কিভাবে যাবেন? সদরঘাট এর লালকুঠির লঞ্চঘাট (নাম টা মনে রাখবেন) থেকে ছেড়ে যায় চাঁদপুরগামী লঞ্চ, সকাল ৮.৩৫ থেকে (৮.৩৫ মানে ৮.৩৫ কিন্তু) ১১ টা পর্যন্ত লঞ্চ থাকে, ভাড়া কম বেশি ১০০ ডেকে, ১৫০ চেয়ারে, আর কেবিনের গুলো ভ্যারি করে। চাঁদপুর থেকে মোহনা বা রক্তধারা পর্যন্ত যেতে পারেন অটোতে ভাড়া ১০ টাকা, চাইলে নদীর ধার দিয়ে হেটেও যেতে পারেন যেমনটা আমরা গিয়েছিলাম, তবে না যেতেই সাজেস্ট করবো। মোহনা থেকে ট্রলার ভাড়া করবেন দামাদামি করে ৭০০ করা যায়, এর কম আর নামেনি। কয়েকটা চরের নাম বলবে, আপনারা বালুর চরের কথা বললেই হবে, আর ফেরার সময় কোথায় নামবেন সেটা আগেই বলে নেবেন, যদি লঞ্চঘাট হয় ফেরার যায়গা। চাঁদপুর একটি বেশ সুন্দর যায়গা, বালুর চরের তো কোন তুলনা হয় না, দয়া করে আপনার চিপসের প্যাকেট বা অন্যান্য অপচনশীল দ্রব্য নদী বা চরে ফেলা থেকে বিরত থাকবেন। আপনার ভ্রমণ শুভ হোক।

আমরা সবাইআমরা সবাই