দিবর দীঘির কথা প্রথম জেনেছিলাম কোন এক খবরের কাগজ পড়ে, বিশাল এক জলাশয়ের মাঝে দাড়িয়ে আছে পাথরের এক সুউচ্চ স্তম্ভ, কিন্তু কারা সেই স্তম্ভের নির্মাতা, কিভাবে জলের মাঝে তা স্থাপন করা হল তার কোন সঠিক ইতিহাস ব্যাখ্যা করা ছিল না শুক্রবারের সাময়িকীটিতে। তাই চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করতে কদিন আগে বেরিয়ে পড়লাম চার চাকায় চেপে, মানে কিনা দুটি মোটর সাইকেলে আমরা পাঁচ জন ( অধমের সাথে উদয়, তার ছাত্র রুহুল, ফটোসাংবাদিক ইকবাল ভাই, চিরতরুণ অভিযাত্রী তোজাম ভাই) সত্যিকারের কাক ভোরে রওনা দিয়েছিলাম রাজশাহী থেকে। সারা দিন জগদল বিহার, মঙ্গলবাড়ী শিব মন্দির, ভীমের পান্টিসহ প্রাচীন বাংলার অসাধারণ সব ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখে বিকেলে ধুলো ধূসরিত পথে বাঁশের সাঁকোর উপর দিয়ে আত্রাই নদী পার হয়ে রওনা দিলাম দিবর দীঘির উদ্দেশ্যে, নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলায় ( পত্নীতলা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৬ কিমি দূরে) ।

গোধূলি হতে সামান্য বাকি, দেবদারু ছায়া ইতস্তত পথের দুই ধারে, সর্বাঙ্গের বরেন্দ্রভূমির লাল ধুলো মেখে যখন দীঘির পারে পৌঁছালাম, বহু বছর আগে খবরের কাগজে দেখা ছবিটি যেন লাফ দিয়ে চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠল- বেশ বড়সড় একটা জলাধারের মাঝখানে উঁচু এক স্তম্ভ।

জানা যায় এখন প্রায় বর্গাকারের হলেও একসময়ে এই প্রাচীন জলাশয়টির প্রত্যেক বাহু প্রায় ১০০০ মিটার দীর্ঘ ছিল, কয়েকশ বছর আগে কোণ প্রাকৃতিক কারণে এর পাড়গুলো ধসে পড়ে উঁচু কাকচর বা বকচরে রূপান্তরিত হয়ে শত শত একর কৃষিভূমিতে পরিণত হয়েছে এবং বিশাল সেই জলাধার আজ পরিণত হয়েছে ক্ষুদ্র দীঘিতে।

তখনো মহামূল্যবান খানিকটা সময় অবশিষ্ট ছিল তাই জনপ্রতি ১০ টাকার নৌকাতে চেপে বসলাম রহস্যময় স্তম্ভটিকে কাছ থেকে দেখার আশায়। ১৮০৭/০৮ সালে ডক্টর ফ্রান্সিস বুকানন এই অনুপম শিলাস্তম্ভটি সরজমিনে অবলোকন করে এর দৈর্ঘ্য ৩০,৭৫ ফুট হবে বলে উল্লেখ করেন, তার মতে অখণ্ড গ্রানাইটে নির্মিত এই স্তম্ভ। বাংলার প্রত্নসম্পদ নিয়ে কাজ করা সবচেয়ে বিখ্যাত জন, স্যার আলেকজান্ডার ক্যানিংহ্যাম ১৮৭৯ সালে স্তম্ভটি পরিদর্শন করে বলেন জলের উপরে এটি ১০ ফুট উঁচু ছিল, তার মতে জলের নিচে, জলাশয়ের তলদেশ অবধি এর দৈর্ঘ্য আরও ১২ ফিট এবং মাটির নিচে এটি ৮-১২ ফিট প্রোথিত ছিল। কাজেই, সম্পূর্ণ স্তম্ভটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩০ ফুট ( ৯,০৯ মিটার), তার মতেও এটি অখণ্ড গ্রানাইট পাথরে নির্মিত।)।

দীঘিটির কলেবর যেহেতু অনেক হ্রাস পেয়েছে, মাত্র কয়েক মিনিটেই মাঝামাঝি পৌঁছানো গেল মাঝির দক্ষতায়, গভীরতা একেবারেই কম, স্তম্ভের কাছে লগি দিয়ে মেপে দেখা গেল জল ১ মিটারের সামান্য বেশী গভীর, তবে নিচে কাদার রাজ্য।

বছর কয়েক আগে দীঘির জল নিষ্কাশন করে পুনঃখনন করে স্তম্ভটির যে সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া গেছে তা নিচের ছবিটির মত

( ছবিটি নেওয়া হয়েছে আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়ার বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ বই থেকে, লেখার কিছু তথ্যও)

স্যার কানিংহ্যামের বর্ণনামতে স্তম্ভটিতে মোট ৯টি কোণ এবং এক কোণ থেকে অন্য কোণের দূরত্ব প্রায় ৩০ সেমি( ১২ ইঞ্চি), স্তম্ভের ঊর্ধ্বাংশে আছে পর পর ৩টি বলয়াকারের স্ফীত রেখা-অলঙ্করণ এবং তার উপরে আছে আমলকের অলঙ্করণ এবং শীর্ষদেশে আছে স্ফীতরেখার উপরে আমলকের অলঙ্করণের উপরে আছে উষ্ণীষ জাতীয় অলঙ্করণ। অনেক হিসেব কষে তিনি বলে গেছেন যে এ স্তম্ভের ব্যস হবে ৭৩ সেমি ( ২৯ ইঞ্চি)।

স্তম্ভটির নিম্নদেশ খুবই দক্ষতার সাথে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে তৈরি এবং স্থাপন করা হয়েছিল বলে এত শতাব্দী পরেও তা বিন্দুমাত্র হেলেনি এবং বরাবরের মত ঋজু অবস্থায়ই জলাশয়ের মাঝে দন্ডায়মান। ।

স্তম্ভটির মাথায় যে বিহঙ্গকুল প্রায়শই বিশ্রামাগার এবং শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করে তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেল পাথরের গায়ে সাদাটে শুকনো পদার্থ দেখে, এবং সেই দাবীকে আরও জোরালো করতেই যেন আমাদের চোখের সামনে সেই সিংহাসন অধিকার করে বসল এক বড় পানকৌড়ি ( Great Cormorant), তার পরপরই শুরু করল বিজয় সঙ্গীত গাওয়া!

কিন্তু সুখ বেশীক্ষণ সয়ল না, সেই রণডমরু শুনে আরেক বড় পানকৌড়ি এসে প্রথম আগন্তককে উড়িয়ে দিয়ে জাকিয়ে বসল প্রস্তর আসনে।

তখন আমরা আবার তীরের পথে, সেখান থেকেই দেখা যাচ্ছিল বরেন্দ্রভূমির চাষাবাদের অনুপম বৈশিষ্ট্য – ধাপে ধাপে তৈরি কৃষিক্ষেত্র। যা দেখে এতদিন মনে হত ফিলিপাইন বা পেরুর কোন শস্যক্ষেত্রে তা দেখলাম পিতৃভূমিতে! ( এই নিয়ে পরে বড় কলেবরে লেখা আসিতেছে)

কিন্তু কারা তৈরি করেছিল এই স্তম্ভ?

অনেকেই দীবর দীঘিকে ধীবর দিঘি বলে উল্লেখ করেন, এবং ধীবর অর্থাৎ কৈবর্ত বা মৎস্যজীবীদের নৃপতির সাথে এই স্তম্ভের ঐতিহাসিক যোগাযোগ আছে বলে মনে করে থাকেন, কিন্তু প্রমাণ সাপেক্ষে বলা যায় সেইসব ধারণা কেবলই গুজবমাত্র।

স্তম্ভটি সম্পূর্ণ গ্রানাইট পাথরে নির্মিত, এবং অবশ্যই নির্মাণের আগে আদি অবস্থায় এর ওজন বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশী ছিল। উপমহাদেশে গ্রানাইট পাথরের প্রাপ্তিস্থান সাধারণত মধ্য ও দক্ষিণ ভারতে। সেখান থেকে এত বড় আকৃতির পাথর স্থানীয় নৃপতির পক্ষে আনা আদৌ সম্ভবপর বলে মনেও হয় না। এবং কেবল কৈবর্ত নৃপতিরাই নয়, প্রব্ল ক্ষমতাশালী পাল বংশীয় রাজারাও তাদের প্রস্তরকর্ম সাধারণত বেলেপাথর দিয়েই করেছিলেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। এইসব বিচার করে স্যার কানিংহ্যাম সেই আমলেই বলেছিলেন- no single shaft of such a large stone as 30 feet in length and 3.5 feet in diameter has not yet been found of the later date than the time of Asoka and it seems to me quite possible that this may be one of the Asokas monoliths.

আমরা নতুন কোন তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত ধরে নিতে পারি এত বিরাট দিঘি খনন এবং দীঘির মাঝে সুবৃহৎ স্তম্ভ স্থাপন বিশেষ বিজয়কে চিরস্মরণীয় করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু কোন বিজয় উপলক্ষে এত বড় কীর্তি নির্মাণ করা হয়েছিল এবং কোথা থেকে এত বড় গ্রানাইট পাথর আনা হয়েছিল সে প্রশ্ন খুবই যুক্তিসঙ্গত।

খুব সম্ভব দীঘি এবং স্তম্ভের আদিনামটি হারিয়ে যাওয়ার ফলে অনেক অনেক পরে এর নামকরণ করা হয়েছিল কিংবদন্তী ভিত্তিক। কী অপূর্ব বাংলার ইতিহাস, কত রহস্যের হাতছানি এর পরতে পরতে, চলার বাঁকে বাঁকে, ভাবতেই শিহরণ জাগে মনে, প্রাণে। সেই পুলক জাগা শিহরণ নিয়েই সম্ভবত সম্রাট অশোকের আমলে নির্মিত রহস্যময় স্তম্ভের দিকে শ্রদ্ধা ভরা দৃষ্টি বোলানোর পরপরই শুরু হল নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে গোধূলিলগ্নে পথচলা।