মাটির ওপর জলের বসতি/জলের ওপর ঢেউ/ ঢেউয়ের সাথে পবনের পিরিতি/নগরে জানে না কেউ...। তাই ইট কাঠের এই নগরজীবন থেকে ছুটি নিয়ে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে ছুট দিলাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার সিলেটে। পাথারিয়া পাহাড়ে ট্রেকিং করে কয়েকটি ঝর্না দেখে ও ঝর্নার সুশীতল পানিতে গা ভিজিয়ে রওনা হলাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে সুন্দর ১০০ বঃকিঃ আয়তনের টাঙ্গুয়ার হাওড়ের উদ্দেশ্যে।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে সুন্দরবাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে সুন্দর

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে দুপুরের খাবার খেয়ে সিএনজি করে বিয়ানীবাজার এবং সেখান থেকে সিলেট হয়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যখন পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত ৮ টা। এরপর ঝটপট কিছু শুকনো খাবার ও পানির বোতল নিয়ে নৌকায় উঠলাম। নৌকা ছাড়তে ছাড়তে প্রায় ৯ টা বাজলো। আমরা সবাই নৌকার ছাদে বসে মুড়ি চানাচুর খাচ্ছি। আর আমাদের নৌকা ছুটে চলেছে টাঙ্গুয়ার হাওড়ের বুক চিরে। বর্ষার সময় হওয়ায় হাওড় জলে পরিপূর্ন। এই বিস্তৃীর্ন জলরাশির মধ্যে শুধু আমরা ৪ জন। যেন কোথাও কেউ নেই।

শুনশান নীরবতাশুনশান নীরবতা

চারিদিকে শুনশান নীরবতা। একটু ভয়ই লাগছে আবার ভালও লাগছে। ভয় ও ভাল লাগতে লাগতে পৌছে গেলাম টাঙ্গুয়ার হাওড়ের গোলাবাড়ী। ও হ্যা আমরা আজ গোলাবাড়ীর বেলালের আতিথেয়তা গ্রহন করবো। গোলাবাড়ী পৌছামাত্র শুরু হলো প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টি। মাঝিরা বলছে একটু আগেই ঝড় শুরু হয়ে গেলে আজ বিনাশ হয়ে যেত। যাহোক রাতে রান্না করে নৌকায় খাওয়া দাওয়া সেরে নৌকাতেই দিলাম এক জম্পেস ঘুম। সকালে নাস্তা করে বেরিয়ে পড়লাম হাওড় দর্শনে।

যাদুকাটা নদীযাদুকাটা নদী

ওয়াচ টাওয়ার থেকে হাওড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করে , টেকেরঘাট, লকমা ছড়া দেখে নীলাদ্রি লেকে গোসল করে হাওড়ের মাছ দিয়ে দুপুরের খাওয়া সারলাম। আহ্ কি সেই স্বাদ! এরপর ভাড়ায় মোটর সাইকেলে করে বারিক্কা টিলা ও যাদুকাটা নদীর অপরুপ রুপে অবগাহন করে হাওড়ে আসলাম সুর্যাস্ত দর্শনের জন্য। এতক্ষন সবই ঠিক ছিল। কিন্তু বিধাতা আর সদয় থাকলেন না। আকাশে মেঘের কারনে সূর্য মামার প্রস্থানটা আমাদের কাছে সুখকর হলো না।

টাঙ্গুয়ার হাওড়টাঙ্গুয়ার হাওড়

কখন যাবেনঃ

টাঙ্গুয়ার হাওড় দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল ও শীতকাল। তবে আমার মতে শীতকালই ভাল। কারন এই সময় দেশী পাখি সহ সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আগত প্রচুর পরিযায়ী পাখি দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর / অক্টোবর মাসে পূর্নিমায় জেলা প্রসাশন কর্তৃক হাওড়ে জোৎসনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সময়ও যেতে পারেন।

হাওড়ে হিজল গাছহাওড়ে হিজল গাছ

কি কি দেখবেনঃ

১।টাঙ্গুয়ার হাওড়ঃ

সুনামগঞ্জের তাহেরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় অবস্হিত এই হাওড়টি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য উদাহরণ। আসলে একে হাওড় না বলে প্রাকৃতিক অ্যাকুরিয়াম বলাই শ্রেয়। মেঘালয়ের পাহাড় ঘেরা এই বিশাল জলরাশি স্বচ্ছ হওয়ার কারণে পানির নীচে ২০/২৫ ফুট পর্যন্ত দৃষ্টি চলে যায় অনায়াসেই। ফলে পানির নীচের জীব বৈচিত্র্য দেখা যায়। ৫১ টি বিল আর ৮৮ টি গ্রাম বেষ্টিত টাঙ্গুয়ার হাওড় প্রকৃতির এক অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ।

দৃষ্টিনন্দন সারি সারি হিজল ও করচ বনদৃষ্টিনন্দন সারি সারি হিজল ও করচ বন

দৃষ্টিনন্দন সারি সারি হিজল ও করচ বন হাওড়কে করে তুলেছে আকর্ষণীয়। জেলেদের ডিঙি নৌকায় করে মাছ ধরার দৃশ্য এবং ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাবার দৃশ্যও মনোমুগ্ধকর। আর যদি শীতকাল হয় তাহলে তো কথায় নেই। দেশী বিদেশী নানা রং বে রংয়ের অসংখ্য পাখির কলরবে মুখরিত থাকে এই সুবিশাল জলরাশি।

মেঘ পাহাড়ের মিলন মেলামেঘ পাহাড়ের মিলন মেলা

২। ওয়াচ টাওয়ার -

এখানে থেকে হাওড় দেখতে খুব সুন্দর লাগে। এর পাশে হিজল ও করচ গাছের বন দেখলে মনে হবে রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টে আছেন।

৩। মেঘালয়ের কোল ঘেষা টেকেরঘাটঃ

এখান থেকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়গুলির সৌন্দর্য যেমন উপভোগ করা যায়, তেমনি বুকের মধ্যে চিন চিন ব্যাথা হয়। বারবার মনে হবে এই পাহাড়গুলি যদি আমাদের হত।

৪। নিলাদ্রী লেক-

চুনাপাথর উত্তোলনের ফলে এই লেকের সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার স্বচ্ছ জলে গোসল করতে ভুলে যাবেন না।

নিলাদ্রী লেক, টেকেরঘাটনিলাদ্রী লেক, টেকেরঘাট

৫। লকমা ছড়াঃ

এটি ছড়া যা মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে এসেছে। এখানে ছড়ার হিমশীতল পানিতে গোসল করতে পারেন। আরো উপভোগ করতে পারবেন পাথর উত্তোলন।

লকমা ছড়া, টেকেরঘাটলকমা ছড়া, টেকেরঘাট

৬। দৃষ্টি নন্দন বারিক্কা টিলাঃ

ভারতে সীমান্ত লাগোয়া এই টিলার কোল ঘেষে বয়ে চলেছে রুপবতী পাহাড়ী নদী যাদুকাটা। মেঘ পাহাড়ের মিলন মেলা দেখার জন্য এই টিলার জুড়ি মেলা ভার।

বারিক্কা টিলায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত পিলারবারিক্কা টিলায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত পিলার

৭। যাদুকাটা নদীঃ

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বয়ে চলা এই পাহাড়ী নদীটি ঠিক তার নামের মতই সুন্দর। আর হাওড়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত তো থাকছেই।

যাদুকাটা নদীযাদুকাটা নদী

কিভাবে যাবেনঃ

সুনামগঞ্জ > তাহেরপুর > নৌকা নিয়ে হাওড় ভ্রমন করে টেকেরঘাট> মোটরসাইকেলে বারিক্কা টিলা ও যাদুকাটা নদী।

বিঃদ্রঃ

হাওড়ের গোলাবাড়ীতে পর্যটকদের থাকার জন্যহাওড়ের গোলাবাড়ীতে পর্যটকদের থাকার জন্য

টাঙ্গুয়ার হাওড়ের গোলাবাড়ী বেলালের (০১৭২৩-০৯১৩৫২) সাথে যোগাযোগ করলে অনেক সহযোগীতা পাবেন। সব শেষে একটি গান দিয়ে শেষ করছি- " টাঙ্গুয়ার হাওড়ের ভাই বন্ধুরা করিছে মানা/ প্রাকৃতিক সম্পদ নস্ট কইরো না/ টাঙ্গুয়ার হাওড়ে মাছ আছে আগে জানলাই না/ দেশের গুনাম দেশের গুনাম বাংরাদেশে নাইরে। আর এই গানের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাই আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্য রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। তাই আমরা কোন ধরনের অপচনশীল জিনিসপত্র হাওড়ে ফেলবো না এবং জীব বৈচিত্রের ক্ষতি হয় এমন কোন কিছু করবো না, এই হোক আমাদের শপথ।