খাওয়াদাওয়া শেষ। আলো নাই কি আর করা। দুএকটা টর্চ আর অনুপের হেডল্যাম্পের আলোতে যা খাওয়া গেছে।মেন্যুতে  মুরগির মাংস আর ডাল। আসলে পানিতে দাপাদাপি করে শরীর এতো ব্যথা যে খাওয়ার ইচ্ছেও নাই। খাওয়ার পর শরীর চলছেই না আর। গুড়িগুড়ি বৃস্টি ছিলো। ১০ টার পর যেনো পুরো আকাশ ভেঙ্গে বৃস্টি নেমেছে। এক একটা বৃস্টির ফোটা মোটামুটি শেলের মতো বিঁধছে। সাথে প্রচন্ড বাতাস। আমরা এসছি পূর্ণিমা উপভোগ করার জন্য কিন্তু কিসের কি... চাঁদের টিকিটিও দেখলাম না। প্রকৃতি এটা কিরকম ষড়যন্ত্র করলো মাথায় ঢুকছে না!

রাত প্রায় ১২ টা বাজে। ননস্টপ বৃস্টি চলছেই। আমাদের আর বোটের উপরে থাকার সুযোগ নেই। সব সদস্যই বোটের ভেতর। মাঝি বিল্লাল বোটটাকে একটা শক্ত খুটির সাথে বেঁধে দিয়েছে। না হলে বাতাসে ভাসতে ভাসতে কই চলে যাবো তার দিশা পাওয়া মুশকিল। ভেসে হয়তো যায়নি কিন্তু দুলছে প্রচন্ড। বোটের ভেতর সব সদস্য মোটামুটি আঁটোসাটো টাইপ অবস্থা। একমাত্র এনি আপু ছাড়া আমাদের বেশিরভাগ সদস্যই গাট্টাগোট্টা টাইপ। উনি মোটামুটি শূণ্যের উপরে ছিলেন আমার যতটা ধারণা। কারণ সব সদস্য আর ব্যাগ, আরো জিনিসপত্র ভেতরে ঢুকে যাবার ফলে ভেতরে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের ভাষায় যাকে বলে  dx পরিমাণ জায়গাও খালি নেই।যে পরিমাণ খাওয়া হইছে আর বাইরে কি সুন্দর বাতাস, তাতে একটা নরম গদিঅলা বিছানা পেলে... (আহা, আফসোস করে কি হবে আর!)।সবাই কাঠের পাটাতনের উপরে শুয়ে আছি(এ কাঠের পাটাতনের উপর ডিরেক্ট শোওয়া মোটেই আরামদয়ক নয়)   আমি শুয়েছি মাঝামাঝি। বাম পাশে সুমনদা। আমার অপোজিটে অনুপ। সে একের পর এক উদ্ভট প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। তবে একটা প্রশ্ন খুব লজিক্যাল...এখানে সবদিকে পানি আর পানি... আমরা আসলে কি সৌন্দর্য দেখতে এসছি!  এটার উত্তর আমাদের কারো জানা নাই সম্ভবত... উদ্ভট সব কথাবার্তা বলতে বলতে রাত প্রায় ৩ টা।সবার চোখে ঘুম। আমারো যথারীতি। হঠাৎ দেখি চোখে তীব্র আলো। অনুপ ওর টর্চটা জ্বালিয়ে সোজা আমার চোখের উপর দেখছে আমি ঘুমাচ্ছি কিনা! কতবড় ফাজিল হলে এরকম করা যায়। নেহায়েৎ মনমেজাজ ভালো ছিলো নাহয় ঘুষি মেরে ওকে হাওরে ফেলে দিলে দুনিয়ার সবিশেষ কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হোতো না!

ইচ্ছেমতন হাওরেইচ্ছেমতন হাওরে

ভোর ৬ টা। বাইরে তুমুল বৃস্টি তখনো। কেউ কেউ জেগেেছে। বাকিরা সব গভীর ঘুমে। ৭ টার দিকে সবাই উঠে পড়েছি আমরা। বোটের জানালা দিয়ে বৃস্টি দেখছি। ' একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্য' আমরা রচনা লিখতাম। তার থেকে একটা বর্ষণমুখর সকাল অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং! আর বৃস্টি তো যেনো তেনো না  ইংরেজিতে যাকে বলে একদম টরেনসিয়াল রেইন। সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে এরকম বৃস্টি দেখার মাঝে ও কিছু সুখ আছে মনে হয়!

সকাল ৮ টা। বিল্লাল আমাদের  সকালের নাস্তা রেডি করে ফেলেছে। খিচুরি আর ডিমভাজি। ওগুলো সবসহ আমরা বোট ছেড়ে দিলাম আবার। এবার গন্তব্য বর্ডারের দিকে। আমারা যাবো বাগলী নামের এক জাযগাতে। পুসন আগে গেছে। সে বেশ ভালোই জানে জায়গাটা। বর্ডারের দিকে যাচ্ছি। বৃস্টি কিছুটা ধরে এসেছে। এখন অনেকটা গুড়িগুড়ি ধরণের। কিছুটা দূরে পাহাড়ের গায়ে তুলোর মত মেঘ জমে আছে। আমরা ওদিকেই যাচ্ছি। আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে। ওই আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে কিনা জানি না কিন্তু আশপাশের পুরো জায়গাটার মধ্যে একটা অন্যরকম কালার চলে এসছে।গতকাল রাতের প্রচন্ড বৃস্টির তোড়ে পাহাড়ি ঢল নেমেছে স্পস্ট বোঝা যায়।আমরা যাচ্ছি আপস্ট্রিমের দিকে।  আমাদের ইন্জিন বোট পুরো এনার্জি দিয়েও চলছে খুব ধীরে ধীরে। এভাবে প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর একটা খাল ধরে আমরা একদম বর্ডারে পৌছে গেছি।

বাগলী হলো মূলত কয়লা আমদানি করার জায়গা। ওখানে বিজিবি একটা ক্যাম্পও আছে। আমরা ওই ক্যাম্পের অপোজিট পাড়ে বোট ভেড়ালাম। ওরা বারবার ওই পাড় থেকে মানা করছিলো ওদের ক্যাম্পটাকে ক্রস না করতে। আমরা এখন যে জায়গাতে নেমেছি এটা মূলত নোম্যানস ল্যান্ড। ওখান থেকে ২০০ গজের কম দূরত্বে খাসিয়াপাড়া যেটা ইন্ডিয়াতে পড়েছে। আসার সময় আমরা অনেক দূর থেকে একটা প্রচন্ড জলস্রোতের শব্দ পাচ্ছিলুম। এখানে আসার মূল কারণ ওটাই। বৃস্টি না থাকলে সাধারণ অবস্থায় এটাকে ঝিরি বলা যায় কিন্তু প্রচন্ড বৃস্টিতে এটা ছোটাখাটো জলপ্রপাতের মত অবস্থা ধারণ করেছে। এ জায়গাটা অনেকটা পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত ফানেলের মতোন। অনেকগুলো ঝিরি এজায়গার আপস্ট্রিমের কোন এক জায়গায় মিশেছে আর সব পানি এই একটা দিকে বের হচ্ছে। তাই পানির এই প্রচন্ড স্পিড। ওই জায়গার কাছাকাছি যাবার কোন সুযোগ নেই কারণ ওই অংশটা পড়েেছে ভারতে। আমরা খালি দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখলুম। তবে আমরা যে অংশে আছি সেটাও বেশ মজার জায়গা। অনেকগুলো গাছ অনেকটা বনের মতন। আপাতত এখানে ছবি তোলা ছাড়া তেমন আসলে কাজ নেই ( আসলে পুরো ট্যুরেই তেমন কোন কাজ নেই)। আলম ভাই আর অ্যানি আপু কতরকম পোজে যে ছবি তুলছেন তার কোন হিসাব কিতাব নাই। দলের বাকি রা যে যার মতোন ছবিটবি তুলছে। পুরো ট্যুরের গ্রুপ ছবিটা সম্ভবত এ জায়গায় তোলা। আমরা প্রায় ঘন্টাখানেক ছিলাম ওখানে। দেন বোটে উঠে রওনা। গন্তব্য আবার সেই ওয়াচ টাওয়ার।

এতো সুন্দর পরিস্কার জলএতো সুন্দর পরিস্কার জল

এবার আমরা অনেক তাড়াতাড়ি পৌছে গেলাম ওখানে। বেলা প্রায় ১২ টা মতন হবে।সময় যেহেতু আছে সুতরাং পানিতে আবার নামতেই হবে। আসলে এতো সুন্দর পরিস্কার জল। পানিতে নামার লোভ সামলানোই দায়।আমরা আবার ঝটপট ড্রেস চেন্জ করে নেমে পড়লাম। আজকে পানির হাইট একটু বেশি কারণ রাতের বৃস্টি। গতকাল আমরা একই জায়গাতে কত সুন্দর সাপোর্ট পাচ্ছিলাম। পানি ছিলো গলা অব্দি সর্বোচ্চ আজকে মাথা ক্রস করে যাচ্ছে। হাওর এলাকার এটাই বৈশিস্ট্য অবশ্য। এগুলো মূলত মেঘালয়ে যে পরিমাণ বৃস্টি হয় তার একটা বিশাল ওয়াটার রিজার্ভার। এখান থেকে সুরমা নদী তারপর মেঘনা হয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে চলে যায় পানিটা। পানিতে দাপাদাপি অবশ্য তার জন্য কিছু কম হইছে বলে মনে হোলো না। দুপুর ২ টার দিকে আমরা সবাই উঠে পড়লাম পানি থেকে। খাওয়াদাওয়া করে রওনা দিতে হবে আমাদের। কারণ এখান থেকে তাহিরপুর হয়ে সুনামগঞ্জ যেতেই প্রায় আড়াইঘন্টা লাগবে। সন্ধ্যা ৭ টার বাসে চিটাংর পাবলিকরা চলে যাবে। আর ঢাকার যারা তাদের বাস রাত ১০ টায়।

৩ টা বেজে গেছে। রওনা দিতে হবে। খাওয়া শেষ করেই রওনা দিলুম আমরা।বোট চলছে। এখন বৃস্টি নেই। আমি ভেতরে শুয়ে আছি। সবাই যে যার মতোন আছে। শরীরে একগাদা ক্লান্তি সবার। কিন্তু কেমন যেনো সুখের একটা ছাপ সবার চোখে। আমি শুয়ে ভাবছিলাম এ জায়গাটার আসল বিশেষত্বটা কি!...কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম...  নিঃস্তব্ধতা। বিশাল হাওর একপাশে পাহাড়। কিন্তু পুরো জায়গাটা কেমন যেনো শান্ত, নিঃস্তব্ধ ধরণের। এটা অনেক রিমোট একটা জায়গা। গাদাগাদা ট্যুরিস্টের কোন ভেজাল নেই। অনেক দূরে দূরে ছোট ছোট দ্বীপের মত এক একটা গ্রাম। অন্যান্য হাওরগুলোর এ সব বৈশিস্ট্য আছে কিন্তু এখানের স্পেশাল জিনিসটা হলো একপাশটা বিশাল পাহাড়। বৃস্টির পরে মেঘ জমে থাকে... সবমিলিয়ে এতো অসাধারণ  ল্যান্ডস্কেপ বাংলাদেশে আর আছে কিনা সন্দেহ। ঠিক একারণেই মনে হয় এটা ফটোগ্রাফারদের বেশ প্রিয় জায়গা। দেশে অনেক জায়গায় ঘুরতে গেছি সেটা  কোন দ্বীপে হোক বা পাহাড়ে ... কিন্তু  জায়গাটার প্রেমে পড়েছি একবার এসেই। এরকম জায়গার প্রেমে না পড়াটাই বরং অস্বাভাবিক! তবে এ ট্রিপের সবচাইতে আসল ব্যাপার হলো এটা অতিমাত্রায় রিল্যাক্স একটা ট্রিপ। গাড়িতে আসবেন,  বোটে থাকবেন, পানিতে নামলে নামলেন নাহলে নাই, আর ইচ্ছেমতন হাওরের মাছ খেলেন! মানে অনেকদূর হাঁটতে হবে বা পাহাড় বাইতে হবে এজাতীয় কোন প্যারাদায়ক ব্যাপারস্যাপার বিন্দুমাত্রও নেই!

ট্যুরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে...হাওরে দিন রাত মিলিয়ে পুরো একদিনের উপর আমরা...কিন্তু মনে হচ্ছে এতো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো! অনুপের ভাষায় কোন সৌন্দর্যই তো দেখতে পারলুম না...ঘন্টাখানেক পর তাহিরপুর পৌছে গেছি। লেগুনাকে আগেই বলা ছিলো সবাই বিল্লাল আর বোটের বাকি দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বিল্লাল পুরো দুদিন আমাদের জন্য অনেক কস্ট করেছে গাইড কাম মাঝি হিসেবে। সেজন্য ওকে স্পেশাল থ্যাংকস দিতে ভুললাম না। ওরাও বেশ মজা পেয়েছে মনে হলো আমাদের কাজকর্ম আর কথাবার্তা শুনে। ঘন্টাখানেক পর সুনামগঞ্জ পৌছে গেলাম আমরা। বিকেল সাড়ে পাঁচটা তখন। রেস্টহাউজে চলে এলুম সবাই। সবার মনে কেমন ফুর্তি ফুর্তি ভাব। হাওরে একরাত থাকার পর সবার বয়স মনে হচ্ছে বেশ কিছুটা কমে গেছে! ক্রিস্টাল ক্লিয়ার জলে দাপাদাপি করলে নবযৌবন পাওয়া যায় কিনা সেটা অনুপের জন্য একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে! আপাতত সেটা তোলা থাক। ( নবযৌবনের আরেকটা তরিকা অবশ্য ওকে দিয়েছিলুম... বেচারার অনেকদিন ধরেই পেটের সমস্যা...টাঙ্গুয়ারে প্রচুর পরিমাণ ফাইটো আর জুয়োপ্ল্যাংকটন আছে। অনুপকে বলেছিলাম পানির নিচের কিছুঘাস লতাপাতা চিবিয়ে খেতে তার পেটের সমস্যাটা যদি কিছুটা কমে! উল্টোপাল্টা আইডিয়া  দিতে আমার সারাজীবনই বেশ ভালো লাগে! ) সন্ধ্যা ৭ টায় চিটাং এর বাস। পৌছবে সেই সকাল ৬ টায়। হালকা চা বিস্কিট খেয়ে নিলাম সবাই। পুরো ট্যুরে সবাই বেশ মজা করেছে তবে স্পেশালি অ্যানি আপুর কথা বলবো। সব ছেলে দের মাঝে উনি একাই ছিলেন মেয়ে। দলের দুএকজন সদস্য উনাকে আগ থেকে চিনলেও আমরা বেশিরভাগই চিনতাম না। কিন্তু এতোগুলো ছেলের মাঝে উনি মনে হয়না একবারের জন্যও বিরক্তি বোধ করেছেন। এটাই সত্যিকার ট্যুর স্পিরিট। আমাদের প্রতিটা ট্যুরেই নতুন কোন সদস্য থাকে। এবারের ট্রিপে দলের অর্ধেকের সাথে আগে কোন পরিচয়ই ছিলো না যেমন পুসন, সজল, রিমন। কিন্তু ট্যুর শেষে সবার মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়। মনে হয় যেনো আমরা অনেকদিনের পরিচিত। এ ট্যুরে প্রতিটা সদস্যই ছিলো স্পনটেনিয়াস টাইপ। একটা মুহুর্ত বোরিং কাটবে তার কোন চান্সই নাই। সবাই কোন না কোন কাজে ব্যস্ত। কেউ ফানুস উড়াচ্ছে,  কেউবা ছবি তুলছে। কেউ বা হয়তো জীবনের গভীর কোন মর্মার্থ বিশ্লেষণে ব্যস্ত !তুষারদা মানুষটা একটা সত্যিকার যেনো বোহেমিয়ান। ভারতের সব স্টেট ঘুরেছেন একা একা...তুষারদা পুরো গ্রুপের জন্যই বলতে গেলে নতুন। উনিও মনে হয় বেশ মজা পেয়েছেন।.আলম ভাই যে কি মজাতে আছেন ( কিছু কথা থাকনা গুপন!) ....সুমনদা হাওরের মাঝেই বড় হয়েছেন কিন্তু উনার ভষ্যমতে এরকম রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা নাই...চান্দুর কথা নতুন করে বলার কিছু নাই...এ ছেলেটার মধ্যে যেনো কোন দুঃখই নাই....সজল ছেলেটা বেশ কুল টাইপ.... রিমন আর তৌহিদও বেশ বিন্দাস টাইপ পাবলিক। এ বিজাতীয় টাইপ ট্যুরে বিন্দাস লোকজনই সবসময় দরকার...আর দু একরাত থাকলে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ পুরোদস্তুর দার্শনিক বনে যেতো এটা নিশ্চিত বলতে পারি!

টাঙ্গুয়ার হাওরটাঙ্গুয়ার হাওর

একটা অসাধারণ রাত হিসেবে সারাজীবনই এটা ট্যুরটা মনে থাকবে আমার। চাঁটগার পাবলিকগুলারে বাসে তুলে দিয়ে আমি, রক্তিম আর সজল সুনামগঞ্জ শহরটা একটু ঘুরতে বের হলাম। রক্তিমের মতে... ' মামা, বেশি মজা হইছে '...! এ কথাটা আসলে নতুন করে বলার নাই।  রাত ১০ টার বাসে ঢাকার পাবলিকেরা রওনা দিয়ে দিলো আর...'আমি একা রইলাম ঘাটে '...অর্থাৎ রেস্ট হাউজে ব্যাক করলুম!

ট্যুরের গল্প শেষ। এবার ক্রেডিট দেবার পালা। আমার প্রতিটা লেখাতেই এটা থাকে। টাঙ্গুয়ার ট্রিপের পুরো ক্রেডিট টা দিবো রক্তিম আর পুসনকে। হাওরে রাতে থাকবো এটাইপ উদ্ভট আইডিয়া একমাত্র রক্তিমের মাথাতেই আসতে পারে...এ চিন্তাটাই ট্যুরের শুরু। প্রতিটা ট্যুরই কাউকে না কাউকে শুরু করতে হয় এবং আমার ধারণা একাজটাই সবচাইতে জটিল!  এর পরের কাজটা হলো লোকজন জোগাড় করা। আমাদের ক্ষেত্রে অবশ্য এ জিনিসটার অভাব কোনকালেই তেমন নাই। আর বাকিটা হলো কিভাবে যাবো, কোথায় থাকবো বা কিভাবে পুরো ম্যানেজমেন্ট। এটার ক্রেডিট পুসনের। ও এর আগে বেশ কয়েকবার এসছে। এধরণের রিমোট জায়গাতে ঘুরতে আসার জন্য এ টাইপ পাবলিক খুবই দরকারি। আরেকটা কথা সে একই সাথে বেশ ভালো ফটোগ্রাফার। ট্যুরের বেশিরভাগ ছবিই ওর তোলা।

এখন লিখবো সম্পূর্ণ নতুন ট্যুরিস্টদের জন্য। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ খুব সহজে আসা যায়। রাতের বাসে সুনামগঞ্জ সকালে নেমে লেগুনা কিংবা সিএনজিতে সরাসরি তাহিরপুর। তারপর বোটে উঠে সরাসরি টাঙ্গুয়ার হাওর। দুদিন যথেস্ট এ ট্রিপের জন্য। হাতে যদি একটা দিন বাড়তি রাখতে পারেন বর্ডার এরিয়াতে আরো বেশ কিছু সুন্দর জায়গা আছে। সেগুলো কভার করতে পারেন। আমাদের সময় ছিলো না তাই পারিনি। বারিক্কার টিলা একটা জায়গা আছে জাদুকাটা নদীর উপরে। জায়গাটা অসাধারণ সুন্দর অনেকটা যাকে বলে ছবির মতোন!  তার জন্য আপনাকে টেকেরঘাট আসতে হবে দেন মটরসাইকেলে যেতে হবে। টেকেরঘাটেই একটা বেশ সুন্দর সবুজ পাহাড় রয়েছে আর আছে নীলাদ্রি লেক।  লাকমাছড়া একটা জায়গা আছে সিলেটের বিছনাকান্দির আরেকটা ভার্সন। সবগুলোই বর্ডারের এক একদিকে পড়েছে। বোটের মাঝির সাথে কথা বলে আপনার সময় অনুযায়ী যেকোন দিকে যেতে পারেন। এবার সিকিউরিটি নিয়ে বলি। হাওরে রাতে থাকা নিয়ে কখনো তেমন কোন সমস্যা হয়েছে শোনা যায়না। তারপরেও একদম খোলা হাওরের মাঝে থাকাটা আমি সাপোর্ট করবো না কখনোই। যেদিকেই থাকেন লোকবসতির আশেপাশে থাকার চেস্টা করাটাই ভালো। সিকিউরিটির ব্যাপারটা আরেকটু সিরিয়াস হয়ে যায় দলে যদি কোন মেয়ে সদস্য থাকে। তবে এক্ষেত্রেও কোন সমস্যা নেই। এখন অনেক ট্যুরিস্ট গ্রুপ যাচ্ছে। যাবার আগে তাহিরপুর থানাতে একটু ইনফর্ম করে যাওয়া ভালো। এতোক্ষণ বাইরের মানুষের থেকে বিপদের কথা বলছিলাম। বিপদের কারণ আপনি নিজেই হতে পারেন! এটা ভাটির দেশ। পানি আর পানি। মাথা খারাপ হওয়াটা স্বাভাবিক। সাঁতার জানেন বা না জানেন লাইফ জ্যাকেট রাখার চেস্টা করবেন সবসময়। হাওরে অনেক জায়গা আছে হাঁটুপানি আবার কোন জায়গা তলই পাবেন না। ভালো সঁাতার না জানলে বেশি পানিতে না নামাটাই মনে হয় বুদ্ধিমানের! কদিন আগেই নীলাদ্রি লেকে একটা ছেলে মারা গেছে লাইফ জ্যাকেট থাকা সত্তেও। সুতরাং সাবধান থাকাটাই ভালো। আসল কথা ১০ বা ১২ জন মিলে ট্যুর করতে গেলেন, কেউ পানিতে ডুবে গেলো... দায়টা আসলে সবারই!  এবার বলবো সময় নিয়ে। টাঙ্গুয়ারে আপনি যেকোন সসয়ে আসতে পারেন। এ জায়গা শীতে একরকম বর্ষায় পুরো অন্যরকম। তবে হাওর ঘোরার পারফেক্ট সময়টা হোলো বর্ষা। অর্থাৎ জুন থেকে নভেম্বর... এরপর পানি শুকিয়ে যায়..তখন ক্যাম্প করে থাকতে পারেন...আমরা ছিলাম একবার এভাবে... এসময়ে , অতিথি পাখি আসে প্রচুর। যারা ছবি তুলতে ভালোবাসেন বা একদম নিজের মত করে প্রকৃতির মাঝে থাকতে চান...  তাদের টাঙ্গুয়ার সবসময়ই যেনো স্বাগত জানায়। ( সবকিছু লিখে ফেলছি আসলে... আর বাকি নাই!) 

আমরাআমরা

এ ট্যুরের গল্পটা লেখার চেস্টা করেছি খুব সহজভাবে। বেশি জটিল লেখার কোন সুযোগ অবশ্য নাই কারণ ট্যুরটাই সিম্পল! সবাই হয়তো এখানে যেতে পারবে না... লেখাটা পড়ে যাতে  কারো মনে হয় সে নিজে ওই জায়গাতে ছিলো!  আমি গল্পটা লিখছি দুবছর আগেকার। এরপর থেকে আমাদের প্রতিবছরের কমন ট্যুর হয়ে গেছে এটা। গত কদিন আগেও ঘুরে এসছি...নতুন কোন জায়গায় প্রথমবারের মত যাওয়া সত্যিই খুব অসাধারণ। প্রতিবছরই যাই...মজা করি কিন্তু প্রথমবারের মতোন কোনটাই যেনো না..... প্রথম প্রেম মানুষ নাকি কখনো ভুলতে পারে না....প্রকৃতির জন্যও বোধকরি কথাটা অনেকাংশে সত্যি!

 আমাদের দেশটা আসলে অসাধারণ সুন্দর। এর একেকটা দিক একেকরকম.... জিওগ্রাফিকাল ভ্যারাইটির সাথে সাথে লিঙ্গুইস্টিক একটা অসাধারণ ভেরিয়েশন আপনি সবসময় পাবেন। গল্প লিখেছি মনে হয় এ জায়গার ১% সৌন্দর্য ও আনতে পারিনি!  নিজের চোখে না দেখা অব্দি কোনকিছুই পূর্ণ না....দেশ ঘুরলে দেশপ্রেম কিছুটা হলেও বাড়ে মনে হয়....এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা..আসল কথা দেশ টা তো আমাদের সবারই....ধন্যবাদ সবাইকে।

এইসব দিনরাত্রি.... টাঙ্গুয়ার হাওর, টাইমলাইন ৩-৭-১৫....