লেখা- আহমাদ ইশতিয়াক 

মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় দুই দিনের এই ভ্রমণে আমাদের মোট খরচ হয়েছিলো ২৫০০ টাকার মতো!

এই ভ্রমনে আমরা যা দেখেছি শিলাইদহের
রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি, লালন সাঁইয়ের আখড়া, মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, আমঝুপি নীলকুঠি, ভাটপাড়া নীলকুঠি, বৈদ্যনাথতলা, শৈলকুপা জমিদার বাড়ি, নলডাঙ্গা রাজবাড়ি ও পুরাতন মন্দির, ঐতিহাসিক গাজীকালু চম্পাবতীর মাজার।

প্রথমে আপনাকে রাতের বাসে চলে যেতে হবে মেহেরপুরে। সকালে পৌঁছাবেন। পথে ফেরীঘাটে নেমে হালকা নাস্তা করে নিতে পারেন। মেহেরপুরে নেমে সকালের নাস্তা করে নিবেন। এখান থেকে এবার চলুন যাওয়া যাক আমঝুপি। আমঝুপিতেই বিখ্যাত নীলকুঠি। কুষ্টিয়ার বাসে উঠলে বললে নামিয়ে দিবে।

অনেকে আবার মুজিবনগর ঘুরে তারপর যায়। কারন এতে সময় বাঁচে। উল্টো পথ ঘুরতে হয়না। তবে আমরা আগে নীলকুঠিতে গিয়েছিলাম। 
মোঘল সেনাপতি মানসিংহ এবং নবাব আলীবর্দি খাঁর স্মৃতি বিজোড়িত এই আমঝুপিতেই পলাশীর পরাজয়ের নীলনকশা রচিত হয়েছিল। কথিত আছে এই নীলকুঠিই ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভ লয়েড ও মীলজাফরের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের শেষ বৈঠক হয়েছিল। যার পরের গল্প অত্যাচার আর নির্যাতনের। আমঝুপির ষড়যন্ত্রেই 
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় ঘটে। পরে এখানেই নীলকুঠি গড়ে উঠে।

আমঝুপি নীলকুঠি আমঝুপি নীলকুঠি

বাংলায় নীলচাষ নিষিদ্ধ হলে সেটি রূপান্তরিত হয় মেদীনিপুর জমিদারদের কাচারীতে। নীলকুঠির পাশেই রয়েছে অপরূপ কাজলা নদী। 
এখান থেকে চলে যাবেন গাংনী। কারন এখানে আরেকটা বিখ্যাত নীলকুঠি আছে। ভাটপাড়া নীলকুঠি। 
১৭৯৬ সালে এখানে নীল চাষ শুরু হয়। এ সময় বিখ্যাত বর্গী দস্যু নেতা রঘুনাথ ঘোষালির সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে গোয়ালা চৌধুরী নিহত হলে মেহেরপুর অঞ্চল রানী ভবানীর জমিদারীভুক্ত হয়। রানী ভবানী নিহত হলে কাসিম বাজার অঞ্চলটি ক্রয় করেন হরিনাথ কুমার নন্দী। পরে হাত বদল হয়ে গোটা অঞ্চলটি মথুরানাথ মুখার্জির জমিদারীভুক্ত হয়। এক সময় মথুরানাথ মুখার্জির সঙ্গে কুখ্যাত নীলকর জেমস হিলের বিরোধ হয়। অথচ মথুরানাথের ছেলে চন্দ্র মোহনই বৃহৎ অঙ্কের টাকা নজরানা নিয়ে মেহেরপুরকে জেমস হিলের হাতে তুলে দেয়। বর্তমানে মূল ভবন ছাড়াও জেলখানা, মৃত্যুকূপ ও ঘোড়ার ঘর আছে।

এবার এখান থেকে চলুন বিখ্যাত মুজিবনগর। প্রথমে মেহেরপুর এসে, মেহেরপুর থেকে লোকাল বাসে মুজিবনগর ।ভাড়া জনপ্রতি ২০ টাকা। আধা ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর আম্রকাননে শপথ গ্রহণ করে অস্থায়ী সরকার গঠন করে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করে। মুজিবনগরের স্মৃতিসৌধ দেখুন, আম বাগানে হেঁটে বেড়ান। ভালো লাগবে! 

credit- mujibnagar.comcredit- mujibnagar.com


দেখা শেষ হলে মেহেরপুর হয়ে চলে যাবেন কুষ্টিয়া। আসতে আসতে দুপুর হয়ে যাবে। খেয়েদেয়ে হোটেলে উঠে পড়ুন। ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে যাবেন রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে। এটি শিলাইদহে। কুষ্টিয়া শহর থেকে খুব সহজেই আসতে পারবেন। 
রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮০৭ সালে এ অঞ্চলের জমিদারি পান। পরবর্তিতে ১৮৮৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে জমিদার হয়ে আসেন। এখানে তিনি ১৯০১ সাল পর্যন্ত জমিদারী পরিচালনা করেন। এ সময় এখানে বসেই তিনি রচনা করেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী, ইত্যাদি, গীতাঞ্জলী কাব্যের অনুবাদ কাজও শুরু করেন ।


কুঠিবাড়ির তিন তলার কামরাটা ছিল কবি গুরুর লেখার ঘর। কবি এই ছাদের উপর বসে সুর্যোদয়, সূর্য্যাস্ত ও জ্যোৎস্না প্লাবিত প্রকৃতির শোভায় মুগ্ধ হতেন। এই খানে বসে কবির দু’চক্ষুকে যে সমস্ত দৃশ্য তন্ময় হতো। তা তিনি নিজেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ করেছেন। এই ঘরের জানালা দিয়ে এখন শুধু পদ্মাকে দেখা যায়। আগে পদ্মা গড়াই দুটো নদীকে দেখা যেত। কবি রবীন্দ্রনাথ তখন ঘরে বসেই শুনতে পেতেন নদীর ডাক। নদী যেন কলকল ছলছল করে কবিকে ডাকতো। কবিও সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন পদ্মার বুকে, গড়াইয়ের বুকে। কখনো পদ্মার বুকে সাঁতরিয়ে তিনি আনন্দ উপভোগ করতেন।

কুঠিবাড়িকুঠিবাড়ি

 

এখান থেকে যাবেন ছেউড়িয়াতে। এখানেই লালনের আখড়া। কুঠিবাড়ি থেকে খুব সহজেই এখানে আসা যায়। দেখতে দেখতে দেখবেন সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। এবার কুষ্টিয়া ফেরার পালা। ফিরে আসুন কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়া শহর ঘুরে দেখতে পারেন সন্ধ্যার পর। ভালো লাগবে।

লালনধাম লালনধাম

রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ুন। প্রচন্ড ক্লান্তি পেয়ে বসেছে জানি। চেষ্টা করবেন সাড়ে দশটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তে। কারন আগামীকাল বেশ পরিশ্রম যাবে। সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিন। নাস্তা করে চড়ে বসবেন ঝিনাইদহের গাড়িতে। তবে ঝিনাইদহ সদরে যাবেননা। নামবেন শৈলকুপায়। কারন এখানে আমরা দেখবো শৈলকুপা জমিদার বাড়ি।