ভ্রমণের জন্য পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় না।  প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তির। সেই ইচ্ছাশক্তির উপরই ভর করে বের হলাম খুলনা বিভাগ ভ্রমণের জন্য। যাত্রা করেছিলাম যথারীতি আমরা ৫ জন ভ্রমণপ্রিয় মানুষ।

 টিকেট কাটা হল  রাত ১১:৩০ টায় ফ্লাগুণী পরিবহন। সময়মত বাস ছাড়লেও আমরা মাওয়া পৌছে পড়ে গেলাম ফেরীর সিরিয়ালের কবলে।মাওয়া ঘাটের খাবার দোকানগুলোতে পসরা সাজিয়ে রাখা ইলিশ আর ভাজতে থাকা ইলিশের ঘ্রাণে পুরো মাওয়া ঘাটকে মনে হচ্ছিল এ যেন এক ইলিশের রাজ্য। বাস যখন ফেরীতে উঠল তখন মধ্যরাত।চাঁদের আলো যখন পদ্মার বুকে আছড়ে পড়ছিল তখন এক দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়েছিল। ফেরী ছাদ থেকে সারারাত চাঁদের আলো আর পদ্মার জলের নীরব নিস্তব্ধ খেলা উপভোগ করতে করতে পৌছে গেলাম অপর ঘাটে। অবশেষে সকাল ৯ টায় আমরা পৌছলাম খুলনার সোনাডাঙ্গা। আগে থেকে এক বন্ধুকে জানানো ছিল। তার বাসায় ফ্রেশ হয়েই বেরিয়ে পড়লাম আমাদের স্বপ্নের বাগেরহাট ভ্রমণে। সারাদিনের জন্য একটি গাড়ি নেওয়া হল। ভাড়া ৩৫০০ টাকা।পুরো বাগেরহাটের আনাচেকানাচে ঘুড়িয়ে দেখাবে আমাদের।

প্রথমে গেলাম ষাটগম্বুজ মসজিদ।  ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই। তাই এটি কে নির্মাণ করেছিলেন বা কোন সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিলো সে সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দেখলে এটি যে খান-ই-জাহান নির্মাণ করেছিলেন সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ থাকে না। ধারণা করা হয় তিনি ১৫শ শতাব্দীতে এটি নির্মাণ করেন। এটি বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটির মধ্যে অবস্থিত; বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো এই সম্মান প্রদান করে।

 ষাটগম্বুজ মসজিদ ষাটগম্বুজ মসজিদ

 

ষাটগম্বুজে গম্বুজ সংখ্যা ৭৭টি। ৭৭টি গম্বুজের মধ্যে ৭০ টির উপরিভাগ গোলাকার এবং মধ্যের একটি সারিতে চারকোণবিশিষ্ট ৭ টি গম্বুজ আছে। মিনারে গম্বুজের সংখ্যা ৪ টি-এ হিসেবে গম্বুজের সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ৮১ তে। তবুও এর নাম হয়েছে ষাটগম্বুজ। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, সাতটি সারিবদ্ধ গম্বুজ সারি আছে বলে এ মসজিদের সাত গম্বুজ এবং তা থেকে ষাটগম্বুজ নাম হয়েছে। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, গম্বুজগুলো ৬০ টি প্রস্তরনির্মিত স্তম্ভের ওপর অবস্থিত বলেই নাম ষাটগম্বুজ হয়েছে।

ধারনা করা হয় সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-৫৯) আমলে খান আল-আজম উলুগ খানজাহান সুন্দরবনের কোলঘেঁষে খলিফাতাবাদ রাজ্য গড়ে তোলেন। খানজাহান বৈঠক করার জন্য একটি দরবার হল গড়ে তোলেন, যা পরে ষাট গম্বুজ মসজিদ হয়। তুঘলকি ও জৌনপুরী নির্মাণশৈলী এতে সুস্পষ্ট।

ষাটগম্বুজ মসজিদষাটগম্বুজ মসজিদ

 

ষাটগম্বুজ মসজিদের মূল গেইটের ঠিক উল্টোদিকেই অবস্থিত একগম্বুজ বিশিষ্ট সিংগাইর মসজিদ। এছাড়াও ষাটগম্বুজ মসজিদ এর পশ্চিম পার্শেই রয়েছে ঐতিহাসিক ঘোড়াদিঘী বা খাঞ্জালীর দিঘী। 

ঐতিহাসিক ঘোড়াদিঘী বা খাঞ্জালীর দিঘী।ঐতিহাসিক ঘোড়াদিঘী বা খাঞ্জালীর দিঘী।

 

একগম্বুজ বিশিষ্ট সিংগাইর মসজিদ।একগম্বুজ বিশিষ্ট সিংগাইর মসজিদ।

কথিত আছে হযরত খান জাহান আলী (র) এই ঘোড়াঘাট দিঘী খননোত্তর পানি না উঠায় তিনি ঘোড়ার পিঠে আরোহন করে দীঘির অভ্যন্তরে পরিভ্রমণ করেন বলে এরুপ নামকরণ করা হয়। এরপর একে একে ঘুরে দেখলাম শত শত বছরের পুরোনো নয় গম্বুজ মসজিদ, রনবিজয়পুর মসজিদ(দেশের বৃহত্তম এক গম্বুজ),বিবিবেগুনী, চুনাখোলা ও খান জাহান আলীর মাজার।

নয় গম্বুজ মসজিদনয় গম্বুজ মসজিদ

 

রনবিজয়পুর মসজিদ(দেশের বৃহত্তম এক গম্বুজ)রনবিজয়পুর মসজিদ(দেশের বৃহত্তম এক গম্বুজ)

সারাদিন ঐতিহাসিক সব মসজিদের সৌন্দর্য দেখার পর সন্ধ্যার সূর্যাস্ত রুপসা নদীতে ভাসতে ভাসতে দেখার ইচ্ছা নিয়ে চলে গেলাম রুপসা নদীর পাড়। রুপসা ব্রীজের নিচে বিকেল বেলাটা কাটিয়ে চলে গেলাম জেলখানা রোড ঘাট।একটা নৌকা ভাড়া করে চলে নদীর মাঝে ভাসতে। শান্ত ভৈরব নদীর নির্মল হাওয়া আর আমাদের বেসুরো সুরে গাওয়া গান সন্ধ্যার সূর্যাস্ত উপভোগে বাড়তি আনন্দ যোগ করেছিল।

রুপসা নদীর সূর্যাস্তরুপসা নদীর সূর্যাস্ত

 

রুপসা ব্রীজরুপসা ব্রীজ