বান্দরবানের আলীকদমে বসবাসকারী টিপরা সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের মধ্যে ডিম পাহাড় নিয়ে একটি উপকথা প্রচলিত আছে। উপকথাটা এই রকম:-

উশে প্রু খুব মা ভক্ত ছেলে। মা’কে সে খুবই ভালোবাসে। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা’ই তাঁর একমাত্র সম্বল। সেই মা একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রাণ যায় যায় অবস্থা। গ্রাম্য ওঝা উশে’র মাকে দেখে জানালেন এই রোগ নিরাময়যোগ্য নয়। ধুঁকে ধুঁকে তাঁর মা’কে মরতে হবে। তবে হ্যাঁ, মা’কে বাঁচানোর একটা উপায় আছে। কিন্তু সেই উপায় অত্যন্ত ভয়ংকর। প্রাণপ্রিয় মা’কে বাঁচানোর জন্য উশে যে কোন ঝুঁকি নিতে রাজী। সে জানতে চাইল কি করতে হবে।

উশে’র সম্প্রদায় যেখানে বসবাস করে সেখান থেকে ৩ দিনের হাঁটা দূরত্বে ডিম পাহাড়ের অবস্থান। পাহাড়চূড়ার ডিমের মতন আকৃতির জন্যই এমন নামকরণ। প্রতি পূর্ণিমা রাত্রিতে ডিম পাহাড়ের চূড়ায় এক অদ্ভুত ফুল ফোটে। আবার সকালবেলায় সেই ফুল ঝরে পড়ে। সেই ফুলের রস যদি খাওয়ানো যায় তবেই উশে’র মা সুস্থ হবে।

ডিম পাহাড়ে আজ পর্যন্ত কেউই পৌঁছাতে পারে নি। যারাই চেষ্টা করেছে তারাই নিরুদ্দেশ হয়েছে। অনেকে বলে সেই পাহাড়ে এক দানব থাকে যে কি না ফুলগুলোকে পাহারা দেয়। কেউ পাহাড়ে উঠলেই দানবটা তাকে মেরে ফেলে। এতসব জানা সত্ত্বেও উশে সিদ্ধান্ত নিলে সে যাবেই। একা যেতে সাহস না পাওয়ায় বন্ধু থুই প্রু কে সাথে নিয়ে রওনা দিল ডিম পাহাড়ের উদ্দেশ্যে।

পাহাড়ি পথে তিন দিন তিন রাত হাঁটবার পর অবশেষে তাঁরা পৌঁছাল ডিম পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি। থুই প্রু কে রেখে উশে একাই পাহাড়ের চূড়ার দিকে চলল। প্রয়োজন তাঁর, ঝুঁকি সে একাই নিবে। থুই প্রু দেখল তাঁর বন্ধু ধীরে ধীরে পাহাড়ের চূড়ার দিকে উঠে যাচ্ছে। ঠিক মাঝরাতে আকাশ যখন পূর্ণিমার আলোয় উদ্ভাসিত, তখন উশে কে আবারও দেখতে পেল থুই। থুইকে উদ্দেশ্য করে উশে কিছু একটা ছুঁড়ে মারল। সেটা গড়াতে গড়াতে থুইয়ের কাছাকাছি এসে থামল। থুই দেখে একটা থলে যার ভিতরে পাথর আর তাঁদের অতি আকাঙ্খিত পাহাড়ি ফুল। উশেকে ইশারা দিয়ে থুই জানাল যে সে ফুলগুলো পেয়েছে। উত্তরে উশে জানাল সে নিচে নামবে, থুই যেন তাঁর জন্য অপেক্ষা করে। উশের সাথে থুইয়ের সেই শেষ দেখা। আর কোনদিন তাঁর খোঁজ পাওয়া যায় নি। পুরো একদিন একরাত থুই উশের জন্য অপেক্ষা করে ফেরত আসে। মা ভাল হয়ে গেলেও উশে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। কিন্তু মায়ের জন্য তাঁর এই আত্মত্যাগ চিরদিনের মত টিপরাদের মনে স্থায়ী হয়ে যায়।

কতটুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা সেটি না জানলেও ডিম পাহাড়ে যাওয়ার আগ্রহ তৈরির জন্য পর্যাপ্ত উপাদান যে এই উপকথায় আছে সেটি অস্বীকার করা যাবে না।

ডিম পাহাড়ের অবস্থান আলীকদম এবং থানচি থানার ঠিক মাঝখানে। এই পাহাড় দিয়েই দুই থানার সীমানা নির্ধারিত হয়েছে। খুব দুর্গম এই পাহাড়ে যাওয়ার কোন উপায় এতদিন ছিল না। সৌভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আলীকদম থেকে থানচি পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মাণে সময় লেগেছে ১০ বছর এবং নির্মাণকালীন বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের ৩ জন সদস্য মৃত্যুবরণ করেছেন। তারমানে বুঝতেই পারছেন ডিম পাহাড়ের রাস্তা কতখানি দুর্গম।

ডিম পাহাড়ে যাওয়ার আগ্রহ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আরেকটা তথ্য যোগ করে দেওয়া দরকার। আলিকদম-থানচি আঞ্চলিক সড়ক এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবথেকে উঁচু রাস্তা। আলীকদম থেকে এই রাস্তা উপরের দিকে উঠেছে এবং ডিম পাহাড়ের কাছাকাছি রাস্তার উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ২৫০০ ফুট। সেখান থেকে আবার নিচের দিকে নেমে থানচিতে গিয়ে শেষ হয়েছে।

যেভাবে যাবেন:-
ঢাকা-চকরিয়া-চকরিয়া থেকে (আলীকদম-থানচি)সড়ক ধরে চলতে থাকলে ডিম পাহাড়ের কাছে এসে পেয়ে যাবেন ২৫০০ ফুট উঁচু রাস্তা...

ডিম পাহাড়ের ডিম গুহা...
আলীকদম-থানচি সড়ক...
বান্দরবান...