৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই যুগবদলের এক্সপ্রেস গতির সূচনা। যুগ পরিবর্তনের এই হাওয়া লাগে আমাদের দেশীয় খেলাধুলার জগতেও। ১৯৮৬ সালের বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচার শুরু হয় বিটিভিতে। তারপরে ক্রিকেট বিশ্বকাপেরও। কিন্তু তখনো টিকে ছিল গ্রামগঞ্জের খেলাধুলাগুলো। 
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই শহরের গণ্ডি পেরিয়ে ডিশ চ্যানেলগুলো ছড়িয়ে পড়ে অজপাড়াগাঁয়ে। টেলিভিশনের পাশাপাশি এখন বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে গেছে কম্পিউটার। হাতে হাতে উঠে এসেছে মোবাইল ফোন। ছেলেমেয়েরা এখন ভার্চুয়াল ভিডিও গেমের নেশায় বুঁদ। তাছাড়া জনসংখ্যার বৃদ্ধির বাড়তি চাপে বিলীন হয়ে যাচ্ছে গ্রামগঞ্জের খেলার মাঠ, পতিত জমি। অথচ কী আনন্দেই না কেটেছে আমাদের শৈশব।
ছেলেবেলার সেসব খেলাধুলার নিয়ম কানুন যেমন বৈচিত্রময় ছিল, বিচিত্র সেগুলোর নামও। গাদি, গাছগাদি, জল-ডাঙা-ডিং, বউতোলা, খেটে খেলা, লইলাং (ডাংগুলি)। এছাড়াও পরিচিত নামের খেলা তো আছেই। মার্বেল, হা-ডু-ডু গোল্লাছুট, কুতকুত, কানামাছি ভোঁ ভোঁ।

দলগঠন

জাতীয় বা আর্ন্তজাতিক খেলায় দল নির্দিষ্ট করা থাকে। যে দেশের খেলোয়াড় সে শুধু সেই দেশের হয়েই খেলতে পারে। কিন্তু খোলাটা যখন গ্রামে তখন দল ভাগ করা একটা সমস্যা বটে। দেখা যায় দু’জনের মধ্যে খুব ভাব। তারা একই দলে খেলতে চায়। এতে হয় কী, দুই দলের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। তাই নিরেপেক্ষ সিস্টেমে খেলোয়াড় বাছাই করে দল তৈরি করতে হয়। আমরা ছোটকালে দেখেছি যেসব খেলা দুই দলের মধ্যে হয় সেই খেলাগুলোতে খেলোয়াড় বাছাইয়ের পদ্ধতি ছিল দুই রকম। একটার নাম ওপেনটু বায়োস্কোপ। আরেকটা পাতাপুতি দিয়ে ভাগানো। আমরা পাতাপুতি ভাগানোটায় বেশি পছন্দ করতাম। কারণ এতে সময় অনেক কম লাগে। আবার নিরপেক্ষও।

ওপেন টু বায়োস্কোপ

দু জন চৌকশ খেলোয়াড় হয় রাজা। মানে অধিনায়ক আরকি। দুই রাজা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই হাত উঁচু করে তোরণ তৈরি করে। বাকি খেলোয়াড়রা পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে রেলগাড়ির মতো সেই তোরণের ভেতর দিয়ে পার হয়। চিত্র-১-এর দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে। তোরণের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ছেলেমেয়ে এক যোগে একটা ছড়া কাটে। অত্যন্ত্য জনপ্রিয় ছড়া:

“ওপেন টু বায়োস্কোপ
নাইন টেন তেইশ কোপ
সুলতানা বিবিয়ানা
সাহেব-বাবুর বৈঠকখানা
সাহেব বলেছে যেতে 
পানের খিলে খেতে
পানে তে মৌরি বাটা
স্প্রিংয়ের চাবি আঁটা
যার নাম মণিমালা
তারে দেবো মুক্তার মালা”


চিত্র-১ : ওপেন টু বায়োস্কোপ পদ্ধতি

মুক্তার মালা বলার সাথে সাথে ছড়া শেষ হয়ে যায়। ছড়া শেষের মুহূর্তে যে খেলোয়াড় তোরণের ভেতর আটকা পড়ে তাকে দুই রাজা গলায় মালা দেয়ার মতো করে বন্দি করে। আগেই ঠিক করা থাকে যে খেলোয়াড় পড়বে সে কোন রাজার দলে খেলবে।এভাবে প্রথম খেলোয়াড়ের দল নির্বচন হয়ে গেলে তাকে বাদ দিয়ে আবার শুরু হয় রেলগাড়ি চলা। সাথে ছড়াতো আছেই। দ্বিতীয়বারে যে ধরা পড়ে সে দ্বিতীয় রাজার দলে খেলে। এভাবে একজন করে ধরে দলে ভেড়ায় রাজারা।

পাতাপুতি ভানোগা

পাতাপুতি ভাগোনোর সময়ও দুজন রাজা ঠিক করা হয় আগে। তারপর তাঁরা খোলা মাঠে বসে থাকে। বাকি খেলোয়াড়রা জোড়ায় জোড়ায় গলাগলি করে বের হয়ে যায় বিভিন্ন দিকে। হাত মুঠো করে জোড়া ধরে আবার ফিরে আসে তারা রাজাদের সামনে। জোড়ার একজনের মুঠোয় হয়তো ফুল লুকানো আছে, আরেকজনের হাতে হয়তো আছে পাতা। হাত মুঠো রেখেই তারা রাজাদের জিজ্ঞেস করে, ‘ফুল নিবা না পাতা নিবা?’
দুই রাজার যেকোনো একজন হয়ত উত্তর দেবে, ‘আমি ফুল নেব।’ তখন যার হাতে ফুল আছে সে মুঠো খুলে ফুল দেখিয়ে সেই রাজার দলে ভিড়ে যাবে। এভাবে সবকটা জোড়া একে একে এসে দুই রাজার দল ভারি করবে। দু’জন সমমানের খেলোয়াড় দিয়ে জোড়া তৈরি করা হয়। এতে দুই দলের শক্তিতে ভারসাম্য থাকে। দল গঠনে নিরপেক্ষতাও বজায় থাকে শতভাগ।

হা-ডু-ডু


চিত্র-২ : হা-ডু-ডু খেলার একটি দৃশ্য

আমাদের এলাকায় হা-ডু-ডু আর কাবাডি একই খেলা বলে জানে সবাই। আমাদের পাড়ায় একটা বিরাট আকারের অশ্বথ গাছ আছে। চাররাস্তার ঠিক মধ্যিখানে। পঞ্চাননতলা বলে জানে সবাই। প্রতিবছর বৈশাখ মাসে পঞ্চাননতলায় রীতিমতো ঢাক ঢোল পিটিয়ে মাইক বাজিয়ে বসত হা-ডু-ডু’র আসর। এ পাড়া-ওপাড়া কখনো বা এগ্রাম-সেগ্রামের মধ্যে লড়াই হতো। মাঝে মাঝে তরুণ ও বৃদ্ধদের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো। ৮/১০ দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সেসব টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়নারা পেত আস্ত একটা গরু। রানার আপদের দেয়া হতো জীবন্ত একটা খাসি। অনেক পরে অবশ্য বদলে যায় পদক। চ্যাম্পিয়নদের জন্য টেলিভিশন। রানার আপেরা পেত বিরাট সাইজের টেপ রেকর্ডার। 
টুর্নামেন্ট যেদিন শুরু হতো সেদিন পথে পথে বসত যেন বৈশাখী মেলা। অশ্বথ-আশ্বড় পাতার বাঁশির ভোঁ ভোঁ আওয়াজে মুখর হয়ে উঠত গোটা এলাকা। সেই সাথে ধারাভাষ্যকারের মাইক। স্টেডিয়ামের মতো অশ্বথ তলায় তো আর গ্যালারি নেই। তাই বড়রা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করত হা-ডু-ডু’র ঐন্দ্রজালিক দৃশ্য। বালক আর কিশোরদের গ্যালারির অভাব নেই। অশ্বথ আর আম গাছের প্রত্যেক ডালে ডালে থাকতো ক্ষুদে দর্শকদের ভিড়। অশ্বথতলায় পাশেই ছিল দু-তিনশ বছরের পুরোনো একটা জমিদার বাড়ি। সেই পড়োবাড়ির ছাদে ভিড়ে যেত মহিলা আর আমার মতো যারা গাছে চড়তে অক্ষম সেইসব দর্শকেরা। খেলা দেখতে গিয়ে গাছ থেকে, ছাদ থেকে পড়ে হাত-পা ভাঙ্গার ঘটনাও কম ঘটেনি।

হা-ডু-ডু খেলার নিয়ম

হা-ডু-ডু খেলায় দুটো দল দরকার হয়। প্রত্যেক দলে থাকে ১১ জন করে খেলোয়াড়। তবে ছোটদের খেলায় খেলোয়াড়ের সংখ্যার ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম থাকে না। ২২ জন ছেলে একসাথে জড়ো হয়ে খেলার মাঠে উপস্থিত হবে এমন আদেশ তো তাদের কেউ দেয়নি। তাই মোটামুটি চার-পাঁচ জনের একটা দল খাড়া করতে পারলেই খেলা শুরু হয়ে যেত। কখনো কখনো দেখা যেত দুই দলের খেলোয়াড় সংখ্যা সমান নয়। কোনো দলে ৫ জন খেলোয়াড় তো প্রতিপক্ষের দলে ৬ কিংবা তারও বেশি খেলোয়াড়। ছেলেমেয়েরা খেলতে যায় কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই। তাই সেখানে যারা উপস্থিত থাকতো তাদের কাউকে নিরাশ করা হতো না। মাঠে যদি বোজোড় সংখ্যক ছেলে থাকে তখন একটা দলে খেলোয়াড় বেশি থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।
অনেক সময় দেখা যেত একটা ছেলে খুব ভালো খেলা করে। তার সাথে লড়ে ওঠা খেলোয়াড় ওই মাঠে একজনও নেই। তাই সমতা বজায় রাখার জন্য সে যে দলে খেলবে তার প্রতিপক্ষ দলে ১-২জন খেলোয়াড় বেশি খেলানো হত। তবে বড়দের খেলায় বা টুর্নামেন্ট ভিত্তিক খেলায় খেলোয়াড় সংখ্যা সব সময় ১১ জন করে।
হা-ডু-ডু খেলায় মাটিতে আছাড় খাওয়ার ব্যাপারটা ঘটে খুব বেশি। তাই হা-ডু-ডুর কোট হতে হয় নরম। মাটিতে একটা চারকোনা ঘর কেটে পুরো ঘরটা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে নেয়া হত। তখন সেই কোপানো মাটির নরম তোশকে আছাড় খেলেও হাত-পা ভাঙার ভয় থাকে না। নরম কোটের মাঝখানে আড়াআড়ি ভাবে দাগ কাটা থাকে। দাগের দুই পাশে দুটি ঘরে অবস্থান নেয় দুই দল।


চিত্র-৩: হা-ডু-ডু খেলার কোট

হা-ডু-ডু খেলা শুরুর আগে টস হয়। টসেই নির্ধারণ হয় কোন দল আগে শুরু করবে। টস জয়ী দলের অধিনায়ক তাঁর দলের সবচেয়ে চতুর খেলোয়াড়কে পাঠিয়ে দেয় প্রতিপক্ষের কোটে। নিয়মটা ভালোভাবে বোঝার জন্য চিত্র-৩-এর দিকে চোখ বুলিয়ে নিতে পারো। ধরা যাক, চিত্রের ১ নং দলটি টসে জিতেছে। শুরুতেই এই দলের একজন খেলোয়াড় ‘টেক... টেক...টেক...’ কিংবা ‘কাবাডি...কাবাডি....কাবাডি...’ বলে ছড়া কাটতে কাটতে ঢুকে পড়বে ২ নং দলের কোটে। তার একমাত্র উদ্দেশ্য দম ধরে রেখে ছড়া কাটতে কাটতে ২নং দলের কোনো এক খোলোয়াড়কে ছুঁয়ে নিজের কোটে চলে আসা। এ কাজটা যদি ঐ খেলোয়াড় ঠিকভাবে করতে পারে তবে তার দল পাবে এক পয়েন্ট।
অন্যদিকে ২ নং দলের খেলোয়াড়দের লক্ষ্য হলো ছড়া কাটতে কাটতে যে খেলোয়াড় তাদের কোটে ঢুকে গেছে আটকে রাখা। কিন্তু যতক্ষণ ওই খেলোয়াড়ের দম আছে ততক্ষণ তার হাতে ছোঁয়া দিলে চলবে না। গা বাঁচিয়ে অপেক্ষা করতে হবে তার দম ফুরানো পর্যন্ত। দম ফুরানোর সাথে সাথে সবাই মিলে তাকে জাপটে ধরে ফেলার চেষ্টা করবে। দম ফুরানোর আগেই যদি ১ নং দলের ছড়া গায়ক ২নং দলের কোনো খেলোয়াড়কে ছুঁয়ে দেয় তবে সাথে ২ নং দলের খেলোয়াড়রা তাকে পাকড়াও করার চেষ্টা করবে। তা’ যদি পারে তবে গায়কের দম ফুরানো পর্যন্ত তাকে ২ নং ঘরে আটকে রাখতে হবে। কিন্তু গায়ক চেষ্টা করবে দম থাকতে থাকতে ২ নং দলের খেলোয়াড়দের বন্ধন ছিঁড়ে নিজের কোটে ফিরে যাবার। ২ নং দল যদি ১ নং দলের গায়ককে আটকে দিতে পারে তবে ১ নং দল কোনো পয়েন্ট পাবে না। তাদের দান বাতিল হয়ে যাবে। ২ নং দল তখন দান পাবে। তারাও তখন একজন চতুর খেলোয়াড়কে গায়ক করে পাঠাবে ১ নং কোটে। এভাবেই দান-পাল্টা দানের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে হা-ডু-ডু খেলা।


দাড়িয়াবান্ধা

ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় খেলা বোধহয় দাড়িয়াবান্ধা। খেলাটা শুধুই ছোটদের। বড়দের জন্য একেবারে বেমানান। খেলাটার স্থানীয় নাম গাদি। বারোমাসি খেলা হলেও বর্ষাকালেই এই খেলাটার প্রচলন ছিল বেশি। লম্বা টেনিস কোটের মতো কোট তৈরি করে সেখানে খেলত ছেলেমেয়েরা।


চিত্র-৪ : ডাকটিকিটে দাড়িয়াবান্ধা


চিত্র-৫ : দাড়িয়াবান্ধা বা গাদি খেলার কোট

মোটামুটি ৫টি ঘর কেটে খেলা হতো দাড়িয়াবান্ধা। পাঁচ ঘরে খেলোয়াড় সংখ্যা ৬ জন। অর্থাৎ দুই দল মিলিয়ে মোট ১২ জনের খেলা। কিন্তু গ্রাম্য ছেলেমেয়েরা অত নিয়ম কানুনের ধার ধারবে কেন? ৫ জনের জায়গায় ৮ জনের খেলাতেও তাদের যেমন আপত্তি নেই, তেমনি তিনজন খেলোয়াড় নিয়েও অনায়াসে চালিয়ে নেয়া যায় খেলাটা। 
ওপরের চিত্র-৫-এ ১নং ঘরটি মূল বা গাদি ঘর, ২নং টি নুন ঘর। প্রথমে দুই দলের মধ্যে টস হতো। টসজয়ী দলটা ঢুকত ১ নম্বর ঘরের ভেতর। অন্য দল তাদের রাখত কড়া পাহারায়। টসে হারা দলটির একজন দাঁড়াত ১ ও ২ নং ঘরের মাঝখানের দাগে, আরেকজন দাঁড়াতো ১ ও ৩ নং ঘরের মাঝখানে দাগের ওপর। খেলা শুরু হলে টসজয়ী দলটার প্রথম উদ্দেশ্যই প্রতিপক্ষের পাহারাকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে পড়া। তারপর সব দাগের সব প্রতিপক্ষকে টপকে সব ঘর স্পর্শ করে আবার প্রথম ঘরে ঢুকে পড়া। 
সবাইকে ১ নং ঘরে ঢুকতেই হবে তার কোনো মানে নেই যেকোনো একজন ঢুকলেই চলবে। সেটা করতে পারলেই তারা পেয়ে যাবে এক গাদি বা এক পয়েন্ট। এক গাদি অর্জন করতে অবশ্যই সেই খেলোয়াড়কে নুনঘর ঘুরে আসতে হবে। প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে ১নং ঘরে ঢোকার মুহূর্ত পর্যন্ত যদি প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড় তাদের যে কোনো একজনকে নিজের দাগের ওপর দাঁড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে পারে তবে সেই দান বাতিল। তখন টসজয়ী দলকে দাগে দাঁড়াতে হবে আর প্রতিপক্ষ ১ নং ঘরে ঢুকে নতুন দান শুরু করবে।
একই কোটে আরেক ধরনের গাদি খেলার প্রচলন ছিল। নুনগাদি। ১৭/১৮ বছরের ব্যবধানে স্মৃতি বড় প্রতারণা করছে। অনেক চেষ্টা করেও তাই সেই খেলার নিয়মকানুন মনে করতে পারছি না। গাদি বা দাড়িয়াবান্ধা মূলত বারমাসি খেলা তবে বর্ষাকালেই খেলটা জমত বেশি।

গাছ গাদি

বড় মজার এই খেলাটা। খেলোয়াড়ের ধরাবাঁধা কোনো সংখ্যা নেই। ৭/৮ জনের এক দল বিশেষ এক প্রক্রিয়ায় একজনকে মুচি বানায়। এখানে বলে রাখি ‘মুচি’ শব্দটা কারো মনে আঘাত দেয়ার জন্য লিখিনি। আসলে ছোট্ট কালে অধিকাংশ খেলায় এভাবে একজনকে মুচি বা অস্পৃশ্য বানানো হতো। যেসব খেলায় দল টলের বালাই থাকে না সেসব খেলায় সাধারণত একজন মুচি দরকার হয়। ‘মুচি’ একজন আর বাকি সবাই ‘উটঠা’।


চিত্র-৬: একজনকে মুচি বানোনোর প্রক্রিয়া চলছে

অস্পৃশ্য ‘মুচি’ যদি ‘উটঠা’ খেলোয়াড়কে ছুঁয়ে দেয় তবে সেও ‘মুচি’ হয়ে যায়। তখন দুজন ‘মুচি’ মিলে সব ‘উটঠাদের’ ছুঁয়ে দিয়ে ‘মুচি’ বানানোর তালে থাকে। যাইহোক, গাছগাদি খেলার সময় একজনকে মুচি নির্বাচন করে বাকিরা মাঝারি গাছে চড়ে বসে। আম-কাঁঠাল গাছ এক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট, খুব সহজেই নিচের দিকের ডালের সাহায্যে লাফিয়ে মাটিতে নেমে পড়া যায়। 
মুচির হাতে থাকে একটা লাঠি। তার একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে গাছে বসে থাকা খেলোয়াড়দের সেই লাঠির সাহায্যে ছুঁয়ে দেয়া। আর গাছের খেলোয়াড়ের উদ্দেশ্য থাকে মুচির লাঠি এড়িয়ে কীভাবে মাটিতে নেমে পড়া যায়। যে পারে তার ঝুলিতে যোগ হয় একগাদি। আর যদি মুচি ছুঁয়ে দেয় তখন সেও মুচি। এভাবে বেড়ে যায় মুচির লোকবল তখন দুজন দুটো লাঠি নিয়ে বাকিদের ছোঁয়ার চেষ্টা করে।

জল-কুমির

জল-কুমির আরেকটি মজার খেলা। আমাদের এলাকায় এর নাম জল-ডাঙা-ডিং। এ খেলাতেও একজন মুচি বা কুমির নির্বাচিত হয়। মূলত জলের খেলা। প্রথমেই ‘উটঠা’দের একজন নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মুচি বা কুমিরকে ছড়া কেটে বলেÑ
“জল ডাঙা-ডিং কড়া কড়া?”
জবাবে কুমির বলে--
“ছ’ মন ছ’ কড়া--”
‘উটঠা’ আবার জিজ্ঞেস করে--
“জল নিবা না ডাঙা নিবা?”
কুমির যদি বলে ডাঙা নেব, তখন উটঠারা সব একলাফে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কারণ ডাঙা তখন কুমিরের দখলে। কুমির যদি ডাঙায় থাকা তাদের কাউকে ছুঁয়ে দেয় তবে সেও কুমির হয়ে যাবে। তারপর দুই কুমির মিলে চেষ্টা করবে অন্যদের কীভাবে ডাঙায় তুলে ছুঁয়ে দিয়ে কুমির বানানো যায়।


চিত্র-৭ : জল-কুমির খেলার একটি স্নায়ুক্ষয়ী মুহূর্ত

জলে নামার পর উটঠাদের লক্ষ্য কুমিরকে ফাঁকি দিয় জল থেকে ডাঙ্গায় ওঠা। তার কুমিরের তাড়া খেয়ে আবার জলে নেমে পড়া। অন্যদিকে কুমির যদি জল চায় তখন ‘উটঠা’রা ডাঙায় নিরাপদ। কিন্তু জলে নামলেও কুমিরের ভয়!
জল-কুমির জলের খেলা হলেও ডাঙাতেও চলত এই খেলা। তখন মাটি হলো জল আর ঘরবাড়ি, গাছের গুড়ি কিংবা কোনো উচুঁ জায়গা হলো ডাঙা।

কুতকুত বা এক্কাদোক্কা খেলা

বাংলাদেশের মেয়েদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলো কুতকত। এই খেলারই আরেক নাম এক্কাদোক্কা সাধারণত বর্ষকালে ভেজা-নরম মাটিতে দাগ কেটে এই খেলা। প্রথমে একটা আয়তক্ষেত্র। তারপর সেই আয়তক্ষেত্রের ভেতর মোট ছয়টি ঘর করা হয়। চিত্র-৮-এর মতো। শুধু ঘর হলেই তো চলবে না দরকার গুটিরও। মাটির ভাঙা পাতিল হলো এই খেলার আদর্শ গুটি। গুটি চৌকোনা অথবা গোল হতে হবে।


চিত্র-৮ : কুতকুত খেলার ঘর

মোটামুটি দু’জন খেলোয়াড় হলেই মোটামুটি কুতকুত খেলা চালিয়ে নেয়া যায়। খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঘর গুলো কিনে ফেলা। যে যত বেশি ঘর কিনতে পারে সেই জয়ী হয়। ঘর কেনার জন্য খেলোয়াড় প্রথম ঘরের সামনে দাঁড়ায়। তারপর প্রথম ঘরে গুটি ছুঁড়ে মারে। গুটি যদি প্রথম ঘরেই পড়ে তবে সে ঘর কেনা প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। গুটি যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় তবে দান চলে যাবে অন্য খেলোয়াড়ের কাছে। তখন সে চেষ্টা করবে প্রথম ঘরটা কেনা যায় কিনা।


চিত্র-৯ : এই ছোট্ট মেয়েটা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল কিন্তু দাগে পা
দিয়ে দান বাতিল করে ফেলেছে

প্রথম ঘরে গুটি ছুঁড়ে মারার পর খেলোয়াড় এক পা উঁচু করে আরেক পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরে ঢুকে পড়বে। সেই সাথে ‘কুত...কুত..কুত..’ বলে ছড়া কাটতে থাকবে। তবে সাবধান থাকতে হবে দাগে যেন পা না পড়ে। পড়লেই দান বাতিল। তেমনি ছড়ার দম পুরালেও দান বাতিল। তারপর যে পায়ে ভর দিয়ে সে হাঁটছে সেই পা দিয়ে গুটিটা টোকা দিয়ে ঠেলে দেবে সামনের ঘরগুলোর দিকে। তখন তার লক্ষ্য গুটিটা ঠেলে শেষ ঘরে পৌঁছে দেয়া। সেটা যদি এক টোকাতেই চলে যায় তো খুবই ভালো। আর না গেলে তাখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সামনে হেঁটে আবারো গুটি ঠেলতে হবে। তবে এক্ষেত্রেও সাবধানতা অবলম্বন না করলেই নয়। কারণ গুটি এমনভাবে ঠেলতে হবে যাতে কোনো দাগে আটকে না যায়। তাহলে দান বাতিল। আবার বেশি জোরে টোকা দিলে গুটি শেষ ঘর পার হয়ে বাইরে চলে যেতে পারে। সেটা হলেও কিন্তু দান বাতিল। গুটি শেষ ঘরে ঢুকালেই চলবে না। খেলোয়াড়কে এক পা ওপরে তুলেই শেষ ঘরে আসতে হবে। তার আগে নিশ্চিত হতে হবে সে এক পায়ে ভর দিয়ে সবকটা ঘর ঘুরে এসেছে।
গুটি শেষ ঘর পার করার পর খেলোয়াড় আবার চলে আসে প্রথম ঘরের সামনে। তার পর দুই হাতে চোখ ঢেকে মাথা ওপরের দিকে তুলে তাকে পা বাড়াতে হয় সামনের ঘরগুলোর দিকে। এখন আর গুটির দরকার নেই, না দেখে সব ঘরগুলো মাড়ালেই চলবে। তবে এই মাড়ানোটা কিন্তু যেন তেন ব্যাপার নয়। কোনো অবস্থাতেই দাগে পা না পড়ে সেটা আন্দাজ করে নিতে নিতে হবে। চোখ খোলা চলবে না। আবার এক ঘরে দুই পা ফেলাও চলবে না। মানে প্রথম ঘরে এক পা থাকলে দ্বিতীয় ঘরে থাকবে দ্বিতীয় পা। তারপর দ্বিতীয় ঘরের পাটা ঠিক রেখে প্রথম ঘর থেকে পা সরিয়ে তৃতীয় ঘরে নিতে হবে। এভাবে সবক’টা ঘর ঘোরা শেষ হলেই তবে সফল ভাবে ঘর কেনা হবে। তবে শুধু প্রথম ঘরটা কেনা হলো। প্রথম ঘর কেনা শেষ হলেই আবার নতুন করে দান শুরু হবে। এবার লক্ষ্য দ্বিতীয় ঘর কেনা। এজন্যও তাকে আগের মতোই গুটি নিয়ে সব ঘর পেরুতে হবে। তারপর চোখ বুজে সব ঘর মাড়াতে হবে। এভাবে সবকটা ঘর কেনা হলে খেলা শেষ হয়ে যাবে।

শেষকথা

এরকম মজার হাজারো খেলার প্রচলন ছিল পাড়াগাঁয়ে। অঞ্চল ভেদে ছিল খেলার ভিন্নতা। কিছু খেলা বাংলাদেশের সর্বত্র খেলা হতো। গোল্লাছুট, বউ চু, কানামাছি, গুটি খেলা, ফুলটোকা, মার্বেল, লাটিম, মুঘল-পাঠান, বাঘবন্দী, ইচিং বিচিং ইত্যাদি। ছেলেবেলার সেই সব খেলাধুলার সবগুলোর কথা বলতে গেলে পাতার পর পাতা ফুরিয়ে যাবে। শুধু কি তাই স্মৃতির কাছে পরাজিত হয়ে আরো যে কত খেলার নাম, নিয়ম ভুলে গেছি তার ইয়ত্তা নেই। যেগুলো মনে আছে সেগুলোর কথা ভুলতে চাই না। কারণ হারানো শৈশব মানুষকে বড্ড বেশি কাতর করে তোলে, মানুষও কাতর হতে ভালোবাসে। মাঝে মাঝে মনে হয়, ঢাকা শহরের বন্দি জীবন ছেড়েছুঁড়ে ফিরে যাই দুরন্ত শৈশবে। কিন্তু তাই কি হয়! তাছাড়া আজকাল গ্রামে গিয়েও এসব খেলা চোখে পড়া ভাগ্যের ব্যাপার। ইচ্ছা না থাকলেও মাঝে মাঝে অতিমাত্রায় স্মৃতি কাতর হয়ে পড়ি। আল মাহমুদের একটা ছোট্ট কবিতার কতগুলো চরণ বার বার কানে বাজে। সেই ছোট্ট কালে একটা ক্যালেন্ডারের দেখেছিলাম শিরোনামহীন কবিতাটা :
গাঁয়ের শেষে বটের তলে
আমিও ছিলাম ছেলের দলে
উদোম দেহে গাছের ভিড়ে
খেলেছিলাম নদীর তীরে।
আজ মনে হয় বনের ছায়া
সেই সুদূরের সজল মায়া
বুকের নিচে রোদন করে
চোখের পাতায় বৃষ্টি ঝরে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : এই পোস্টের চারটি ছবি ওয়েবসাইট থেকে নেয়া