এই ভ্রমণে আমরা দেখবো বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ মৎস্য প্রকল্প, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র মুহুরী প্রজেক্ট , বিখ্যাত প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি, ভাষা শহীদ আবদুস সালামের জন্মভিটে, মোঘল আমলের অপূর্ব নিদর্শন দাগনভূঁইয়া জামে মসজিদ, মাতুভূঁইয়া জামে মসজিদ, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের জন্মধন্য সেনেরখিল গ্রাম ( যে গ্রামের অপূর্ব দৃশ্যাবলী উল্লেখ আছে সেলিম আল দীনের কয়েকটি নাটকে) সেনেরখিল জমিদার বাড়ি, হাজার বছর ধরে উপন্যাসের বিখ্যাত পরীর দিঘি, জহির রায়হান ও শহীদুল্লাহ কায়সার শৈশব বিজড়িত মজুপুর।

ঢাকা থেকে ভোরে ট্রেনে ফেনী নামলে টমটম কিংবা শহর বাস সার্ভিসে চলে যাবেন ফেনীর মহিপাল। আর বাসে আসলে মহিপালেই নেমে যেতে পারেন। মহিপাল থেকে উঠবেন নোয়াখালীগামী বাসে। বলবেন সেবারহাট বাজারে নামিয়ে দিতে। 
সেবারহাট বাজার পড়েছে নোয়াখালী জেলায়, ফেনী জেলার শেষ সীমানা থেকে দুরত্বমাত্র এক কিলোমিটার। এটি ফেনী জেলার পরে নোয়াখালী জেলার প্রবেশদ্বার।

আমরা যাবো প্রতাপপুর জমিদার বাড়িতে। প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি পড়েছে ফেনী জেলার দাগনভূঞায় উপজেলায়। সেবারহাট বাজারে বাস থেকে নেমে বাজারের বাঁপাশ (উত্তরপাশে) চলে আসুন। একটা লোহার ব্রিজ আছে, কাউকে প্রতাপপুর যাওয়ার সিএনজির কথা বললেই বলে দিবে। সিএনজিতে উঠে পড়ুন। রাস্তার দুপাশে ধানক্ষেত, গ্রাম্য বাড়িঘর, অপূর্ব সুন্দর গ্রামের হাজারগুনে দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবেন প্রতাপপুর বাজারে। বাজারের পাশেই প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি।

Tonmoy Debnath । প্রতাপপুর রাজ বাড়ি Tonmoy Debnath । প্রতাপপুর রাজ বাড়ি

জমিদার বাড়িতে ঢুকতেই স্বাগতম জানাবে বিশাল এক চালতা গাছ। এতো বৃহৎ আকৃতির চালাত গাছ হয়তো প্রথমবার দেখছেন আপনি।

প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি এলাকায় রাজবাড়ি, বড় বাড়ি হিসেবে ও পরিচিত। বাংলা ১২২৮ সালের ১৩ ফাল্গুন এটির নির্মান কাজ শেষ হওয়া। রামনাথ কৃষ্ণ সাহা জমিদার বাড়িটির সীমানা সাড়ে ১৩ একর । নিজ নামেই তিনি নির্মাণ করে যান রাজপ্রাসাদসম বাড়ি। রামনাথরা ছিলেন পাঁচ ভাই। তারা থাকতেন পাঁচটি দ্বিতল ভবনে। বাড়িতে রয়েছে মোট ১৩টি পুকুর এতো পুকুর বাংলাদেশের আর কোন জমিদার বাড়িতে নেই। 
এখনো প্রতি বছর বৈশাখে সনাতন ধর্মালম্বীরা এ বাড়িকে ঘিরে তিন দিনব্যাপী উৎসব পালন করেন। দেখতে পারেন প্রতাপপুরের জমিদারদের তৈরী করা প্রতাপপুর হাইস্কুল।

এবার আসুন ফের সেবারহাট। উঠে পড়ুন দাগনভূঁইয়া গামী সিএনজিতে। নামবেন চৌধুরী বাড়ির সামনে। চৌধুরী জামে মসজিদ। 
নোয়াখালীতে মোগল বিজয়ের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে দাগনভূঞার চৌধুরী দরজা জামে মসজিদ। এটি বর্তমানে অলি আহমদ ভূঞা চৌধুরী জামে মসজিদ নামে পরিচিত।
প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছরের পুরনো এ মসজিদ বৃহত্তর নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী এবং মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন।
এ এলাকায় এক সময় হিন্দু জলদস্যুদের বিচরণ ছিল। ১৬৭০ সালে নোয়াখালী অঞ্চলে মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হওয়ার পর বারো ভূঞা নামে একদল মোঘল সদস্য এ নোয়াখালীতে আসেন। এদের মধ্যে একজন সেনাপতি দাগনভূঞা চৌধুরী এ জেলার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। সেই থেকে এ জায়গার নাম হয় দাগনভূঞা। নোয়াখালী বিজয়ের দুই বছর পর ১৬৭২ সালে দাগনভূঞা চৌধুরী এখানে তার নামে দুইশ’ একর জমি অধিগ্রহণ করে জমিদারি প্রথা চালু করেন। তার বাড়ির সামনের দরজা ঘেঁষে নিজ নামে নির্মাণ করেন দাগনভূঞা চৌধুরী দরজা জামে মসজিদ।

এ মসজিদের অপূর্ব কারুকার্য মুগ্ধ করবে নিমিষেই। দাগনভূঞা চৌধুরী মসজিদটির পেছনে এবং সামনে একশ’ একর জমির ওপর বাড়ি ও মসজিদ নির্মাণ করেন। বাড়ি ও মসজিদ থেকে পূর্বদিকে ফেনী ও বসুরহাট সড়কে একশ’ একর জমির ওপর দাগনভূঞা নামে একটি বাজারও স্থাপন করেন তিনি।

 দাগনভূঞা চৌধুরী দরজা জামে মসজিদ দাগনভূঞা চৌধুরী দরজা জামে মসজিদ


দাগনভূঞা চৌধুরী বাড়ির সামনে কবরস্থানের পাশে স্থাপিত ফলক অনুযায়ী ১৬৭২ সালে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদটি নির্মাণশৈলী অনুপম নিদর্শন। এ মসজিদ বর্গ আকারে, যার দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট ও প্রস্থ ৩৫ ফুট। উত্তর ও পূর্ব দিকে প্রবেশপথ রয়েছে। ওপরে পুরো ছাদে আছে তিনটি গম্বুজ। এ ছাড়া চার কোণে নিপুণভাবে তৈরি মসজিদের দেয়ালে সাড়ে ৫ ফুট গাঁথনি, যা চুন, চুরকি দিয়ে গাঁথা।

মসজিদের বাইরে, ভেতরে সুন্দর কারুকার্য করা নকশা। বাইরে সুরম্য দরজাসহ পুরো সীমানার চারপাশে দেয়াল রয়েছে। মসজিদের সম্মুখে আঙ্গিনা পাকা করা। পাশে বড় দীঘি। চার কোনার পিলারের ওপর রয়েছে ১৫টি মিনার। মিনারগুলো ছাদের কিছু ওপরে ওঠে গম্বুজ আকৃতিতে শেষ হয়েছে। মিহরাবের পশ্চিম দেয়ালের সমান্তরালভাবে মসজিদে প্রবেশের জন্য ছয়টি মেহরাবে পাঁচটি ধনুক আকৃতির প্রবেশপথ রয়েছে। প্রতিটির উচ্চতা ৭ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৫ ফুট ৩ দশমিক ৪ ইঞ্চি।

এবার উঠে পড়ুন সিএনজিতে। দাগনভূঁইয়া নেমে উঠুন বেকেরবাজার কিংবা সিলোনিয়াগামী সিএনজিতে। নামবেন মাতুভূঁইয়া রাস্তার মোড়ে। মাতুভূঁইয়া দাগনভূঁঞার ভাই। রাস্তা থেকে হেঁটে এক আধা কিলোমিটার হেঁটে গেলে পাবেন নদীর পাড়েই পাবেন মোঘল স্থাপত্যের আরেক অপূর্ব নিদর্শন মাতুভূঁইয়া জামে মসজিদ। এই মসজিদটি ৩০০ বছরের ও প্রাচীন। মসজিদের পাশেই রয়েছে ২০০ বছরের প্রাচীন একটি বটগাছ। ফিরে আসুন মূল রাস্তায়।