বেহুলার বাসুরঘরের সাথে জড়িত প্রাচীন মিথ বহু বছর ধরে গ্রাম বাংলার মানুষের প্রাণের খোড়াক ছিল। মনসামংগল কাব্যের প্রধান দেবী ছিল সর্পদেবী মনসা। অনেক আদিবাসী সমাজে মনসা এককানী দেবী হিসাবে পরিচিত। মংগলকাব্য অনুযায়ী শিবের স্ত্রী চণ্ডী মনসা কে শিবের জারজ সন্তান মনে করতেন। মনসা কে অপমানিত করার জন্য তার এক চোখ দগ্ধ করেন চণ্ডী।

বহু ঘাত প্রতিঘাত অতিক্রম করার পর মনসা এক সময় নেমে আসেন মর্ত্যে মানব ভক্তের খোঁজে। প্রথম প্রথম মানুষ মনসা কে নিয়ে উপহাস শুরু করলো। অস্বীকার করল মনসার ক্ষমতা। তাদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলে মনসা তাদের বাধ্য করলেন তাকে সমীহ করতে। দেবীত্বের স্বাদ গ্রহনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল চাঁদ সদাগর। আগের পর্বে এর বিস্তারিত লেখা আছে। এই পর্বে শুরু করলাম লখিন্দর ও বেহুলার গল্প।

চম্পক নগর ফিরে এসে চাঁদ সদাগর নতুন করে শুরু করলো জীবনের অধ্যায়। লখিন্দর নামে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হল চাঁদ সদাগরের ঘরে। অপর দিকে সাহার ঘরে বেড়ে উঠতে থাকে বেহুলা। ছোটবেলা থেকে বেহুলা লখিন্দর এক সাথে বেড়ে উঠে। যেন তারা জন্মেছে এক অপরের জন্য।

শৈশবের দূরন্ত দিন পার করে প্রবেশ করে যৌবনে। তাদের দুজনের অভিভাবক চিন্তা করে তাদের বিয়ের কথা। কিন্তু বিধিবাম। কোষ্ঠী মিলিয়ে দেখা যায় বিবাহের রাতে সর্প দংশনে মৃত্যু হবে লখিন্দরের। বেহুলা ছিল মনসার ভক্ত। বেহুলার মনে জায়গা করে নিয়েছিল লখিন্দর। তাই শেষ পর্যন্ত উভয়ের বিবাহ স্থির হয়।

মনসার অভিশাপ কাটানোর জন্য চাঁদ সওদাগর নির্মাণ করেন লৌহবাসর। দেবতা বিশ্বকর্মার সাহায্যে এমন এক বাসর ঘর তৈরি করা হয় যেখানে সাপের প্রবেশ ছিল অসম্ভব। সুইয়ের মাথার মত একটি চিকন ও সরু ছিদ্র খোলা রাখা হয় বেহুলা লখিন্দরের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য। মনসার কি মায়া এই ছোট ছিদ্র দিয়ে কালনাগনী মতান্তরে সুতনালি সাপ প্রবেশ করান। সাপের তীব্র বিষে লখিন্দর মৃত্যুবরণ করেন বাসর রাতেই। প্রফেসি সত্য হল সর্প দংশনে মৃত্যবরণ করলো লখিন্দর।

সে যুগের রীতি ছিল সর্প দংশনে কার মৃত্যু হলে দাহ করতো না কলার ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হত। শোকাহত বেহুলা তার মৃত স্বামীর সংগী হন, শুনেন না কারো বারণ। কলার ভেলায় লখিন্দরের সাথে ভাসিয়ে দেওয়া হল বেহুলা কে। ছয় মাস ধরে জলের সাথে ভাসতে ভাসতে গেল এ গ্রাম থেকে সে গ্রাম। পচন ধরা শুরু করলো লখিন্দরের দেহে।

বেহুলা ক্রমাগত প্রার্থনা করতে থাকলেন স্বামীর প্রাণভিক্ষা চেয়ে মনসার কাছে। কিন্তু মনসা শুধু ভেলাটিকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা ছাড়া কিছুই করলেন না। এক সময় ভেলাটা এসে ঠেকে এক গ্রামের ঘাটে। সে গ্রামে বাস করতো মনসার পালক মাতা নিতা। নিতা ঘাটে বসে দেখতে লাগলো মনসার কাছে ভক্ত বেহুলার প্রার্থনা। তার মন গলে গেল। নিতা নিজের অলৌকিক ক্ষমতাবলে বেহুলা ও মৃত লখিন্দরকে স্বর্গে উপস্থিত করেন।

চোখ খুলে বেহুলা দেখতে পেল মনসা কে। মনসা বলে উঠলেন, তুমি তোমার স্বামীকে ফিরে পাবার যোগ্য কিন্তু শর্ত হচ্ছে তোমার শশুড় কে আমার পূজারী করতে হবে। বেহুলা উত্তর দিল আমি পারবো মা। তাতেই প্রাণের ঢেউ খেলে গেল লখিন্দরের দেহে। তাঁর পচাগলা দেহের অস্থিমাংস পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। চোখ মেলে তাকায় লখিন্দর, বেহুলার দিকে তাকিয়ে হাসে। নিতার সাহায্যে আবার মর্ত্যে ফিরে এল বেহুলা। তার শশুড় কে সব ঘটনা খুলে বললো। এরপর আর চাঁদ সদাগরের পক্ষে আর না বলা সম্ভব হল না।

প্রতিমাসের কৃষ্ণা একাদশী তিথিতে চাঁদ সদাগর মনসার পূজা করতে সম্মত হন। কিন্তু মনসার প্রতি সদাগরের ক্ষোভ একটুও কমলো না, পুরাপুরি ক্ষমা করতে পারলেন না মনসা কে। বামে হাতে ফুল দিয়ে প্রতিমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পূজা দিত সদাগার। তাতেই খুশী হল মনসা। ফিরিয়ে দেন চাঁদ সদাগরের ছয় পুত্রের জীবন। স্ত্রী পুত্রদের নিয়ে সুখ শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো সদাগর। বেহুলা ফিরে পেল লখিন্দর কে। আর মনসা, মনসা থেকে পরিণত হল দেবী মনসা'য়।

সে যুগ থেকে আজ পর্যন্ত লোক মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে লখিন্দর বেহুলার প্রেম কাহিনী। এই লোক কাহিনী এত জনপ্রিয় ছিল তার উপর নির্ভর করে ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান নির্মাণ করেন বাংলা চলচিত্র "বেহুলা"। যেখানে বেহুলার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিল সুচন্দা। আর নায়করাজ রাজ্জাক অভিনয় করেন লখিন্দরের ভূমিকায়। বেহুলা-লখিন্দর প্রাচীন বাংলার মিথে এক অপূর্ব সম্পদ।বর্তমান বগুড়া শহরের ৯ কি.মি. উত্তরে গোকুল গ্রামেই কালজয়ী এই বেহুলার বাসর ঘরের অবস্থান।

কি ভাবে যাবেন :

ঢাকা শহর থেকে সড়ক পথে খুব সহজেই বগুড়া যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী,শ্যামলী, টেকনিক্যাল থেকে বগুড়ার বাস ছাড়ে। বগুড়া শহর থেকে রিক্সা, অটো, সিএনজি করে খুব সহজেই লখিন্দর বেহুলার বাসুরঘর আসা যায়।

"প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা দেশের সম্পদ, প্রত্ন স্থানে দাগাদাগি করা থেকে বিরত থাকুন। ভ্রমণ মানুষ কে আলোকিত করে। ভ্রমণ স্থান ময়লা অর্বজনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন।"