মিথের কথা শুনলে সবাই আমরা মহাভারত, গ্রীক বা মিশরীয় পুরানে ঢু মারি। কখনও কি খাঁটি বাংলা মিথের গল্প শুনেছেন? সেইটা শুনিলে কহিয়া উঠিবেন মশকরা করছেন মশাই। এ বঙ্গদেশে আবার মিথ!

সেই মিথের খোঁজে আমাদের যেতে হবে চম্পক নগর। চম্পক নগরের চাঁদ সদাগর ছিলেন কঠিন শিবের ভক্ত। পেশায় বণিক চাঁদের ছিল ছয় সন্তান। স্ত্রী পুত্রদের নিয়ে বেশ চলে যাচ্ছিলো চাঁদ সদাগরের জীবন। চিত্রপটে উপস্থিত হইলো শিবের কন্যা মনসা।

মনসা পূজা প্রার্থনা করলো চাঁদ সওদাগরের কাছে। দেবী হতে চেয়েছিল মনসা। তাতে সফল হওয়ার জন্য চাঁদ সদাগরের হাতে পূজাগ্রহণ তাঁর কাছে ছিল বাধ্যতামূলক। শিব ভক্ত চাঁদ প্রত্যাখ্যান করিলো মনসা কে। ছলেবলে কৌশলে পূজা আদায়ের চেস্টা করলো মনসা।

শিবের কৃপায় মহাজ্ঞান মন্ত্রে সিদ্ধ চাঁদ সদাগর মনসার সব ছলনা ভেস্তে দেন। উপায় না দেখে মনসা এক অপূর্ব রমনী বেশে উপস্থিত হন চাঁদ সদাগরের কাছে। রুপের সুধায় চাঁদ সদাগর কে ভুলিয়ে তার মনের গোপন কথা জেনে নেন। এর ফলে চাঁদ মহাজ্ঞানের অলৌকিক রক্ষাকবচটি হারিয়ে ফেলেন। চাঁদের এই বিপদে এগিয়ে আসে বন্ধু ধন্বন্তরী। ধন্বন্তরীর অলৌকিক ক্ষমতাবলে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয় চাঁদ সওদাগর। তাই ছলনা করে মনসা হত্যা করে ধন্বন্তরীকে। যথারীতি অসহায় হয়ে পড়ে চাঁদ।

মনসা পুনরায় চাঁদের কাছে পূজার আহবান করে। এরপরেও চাঁদ মনসার পূজা করতে অস্বীকার করে। ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে মনসা। ক্রোধান্ধ মনসা চাঁদ সদাগরকে অভিশাপ দেন যে তার প্রত্যেক পুত্রের জীবন বিনাস করবে। সর্প দর্শনে মৃত্যু হয় এক এক করে চাঁদ সদাগরের ছয় পুত্রের।

ভগ্ন হৃদয় চাঁদ সদাগর এতে বাণিজ্যে যাবার উৎসাহ হারিয়ে ফেললো। এরপরও জীবিকার তাগিদে ভাসিয়ে দিল বাণিজ্যতরী। এত দুঃখ কস্টের মাঝে সফল বাণিজ্য করে ধন সম্পদে পরিপূর্ণ করে চম্পক নগরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তার মন আবারও ভাল হতে শুরু করলো।

ততদিনে ভুলে গেছেন মনসার কথা। কিন্তু মনসা ভুলে নেই চাঁদ সদাগরের কথা। পুরান ক্ষোভে ক্রোধান্বিত হয়ে সমুদ্রে ভয়ানক এক ঝড় তৈরি করে। সে ঝড়ের বেগে চাঁদের বাণিজ্যতরী শেরপুর শহরের অদূরে গরজরিপার অন্তর্গত কালিদাস সাগরে ডুবে যায়। সে ঝড়ে তার সংগী সাথীরা মারা গেলেও কোন ক্রমে বেঁচে যায় চাঁদ সদাগর।

চাঁদকে উদ্ধার করতে দেবী দূর্গা যায় কালিদাস সাগরে। মনসার অনুরোধে পিতা শিব বারণ করে দেবী দূর্গা কে চাঁদ সদাগর কে উদ্ধার করতে। মনসার ভাগ্য যেন লেগে ছিল চাঁদ সদাগরের সাথে। যতদিন না চাঁদ সদাগর মনসার উদ্দেশ্য পূজা দিচ্ছে ততদিন পাবে না দেবীত্বের স্বাদ। অকুল দরিয়ার মাঝে একাকি ভাসতে থাকে চাঁদ সদাগর। মনসা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে আসে এক দ্বীপে।

সৌভাগ্যক্রমে সে দ্বীপে ছিল চাঁদ সদাগরের পুরানো বন্ধু চন্দ্রকেতু। চন্দ্রকেতু ছিল মনসা অনুসারী। এত কিছুর পরও মনসা ভেবেছিল ভেংগে যাবে চাঁদের সদাগরের মনবল। চন্দ্রকেতু চেস্টা করলো চাঁদ কে মনসা অনুসারী করতে। প্রত্যাখ্যান করলো চাঁদ চন্দ্রকেতুর প্রস্তাব, রয়ে গেল শিব দূর্গার অনুসারি হয়ে। শত বিপদের মাঝেও মনসার আরাধনা করতে রাজি হননি।চরম দারিদ্র‍্যতায় তাকে গ্রহণ করতে হয় ভিক্ষাবৃত্তি।

এরপরও থেমে থাকেনি মনসা। সহায়তা গ্রহণ করে স্বর্গের দুই নর্তক-নর্তকির। তারা মানব সন্তান হয়ে ভূমিষ্ঠ হতে রাজি হয়। লখিন্দর হয়ে জন্মগ্রহণ করলো স্বর্গের নর্তক সদাগরের ঘরে, নর্তকী বেহুলা হয়ে জন্মগ্রহণ করলো চাঁদের ব্যবসায়িক সতীর্থ সাহার ঘরে। এভাবেই শুরু হল লখিন্দর ও বেহুলার এক কালজয়ী উপাখ্যান।

এত মিথিক্যাল ঘটনার সাথে ভ্রমণের সম্পৃকতা কোথায় মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। কারন প্রাচীন বাংলার এই মিথের সাথে জড়িয়ে আছে যে বগুড়ার গোকুল মেধের নাম। লখিন্দর বেহুলার বাসুরঘর/গোকুল মেধ আমরা সবাই ঘুরতে যাই। কিন্তু এর পিছের মিথ/ইতিহাস কয়জন বা জানি?

প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার পিছের ইতিহাস/মিথ না জেনে দেখতে যাওয়া আর আপনার ঘরের পিছে সুন্দর একটা বাড়ী দেখতে যাওয়া একই কথা। মিথ কিন্তু ইতিহাসের অংশ নয়। তবে এই মিথ গুলো আপনার ভ্রমণ কে করে তুলে আরও আনন্দময়।

প্রাচীন মিসরের মিথ/ইতিহাস জেনে আমরা যেমন পিরামিড দেখার আগ্রহ পাই, মোগল ইতিহাস জেনে যেমন আগ্রহ পাই মোগল স্থাপনা দেখার। তেমনেই প্রাচীন বাংলার মিথ/ইতিহাস জেনে এক সময় আমরা এই প্রাচীন বাংলা নিয়ে জানার আগ্রহ পাব, সে আশায় না হয় লখিন্দর বেহুলার অমর প্রেম কাহিনী জমিয়ে রাখলাম।  বলবো পরের লেখায়।

কি ভাবে যাবেন : ঢাকা শহর থেকে সড়ক পথে খুব সহজেই বগুড়া যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী,শ্যামলী, টেকনিক্যাল থেকে বগুড়ার বাস ছাড়ে। বগুড়া শহর থেকে রিক্সা, অটো, সিএনজি করে খুব সহজেই লখিন্দর বেহুলার বাসুরঘর আসা যায়।

"প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা দেশের সম্পদ, প্রত্ন স্থানে দাগাদাগি করা থেকে বিরত থাকুন। ভ্রমণ মানুষ কে আলোকিত করে। ভ্রমণ স্থান ময়লা অর্বজনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন।"