প্রথমেই যাবেন বালিয়াটি জমিদার বাড়ি।

ঢাকার গাবতলী থেকে সকাল ৭টার মধ্যেই উঠে পড়ুন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বাসে। পথে বাসের জানালার পাশ দিয়ে বয়ে যাবে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের ক্ষেত আর অসংখ্য গ্রাম। ঢাকার জ্যাম আর দূষিত বাতাসকে বিদায় জানিয়ে নিন প্রশান্তির হাওয়া। এবার ফিরি আজকের ভ্রমণে।

“গোবিন্দ রাম সাহা” বালিয়াটি জমিদার পরিবারের গোড়াপত্তন করেন। ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি লবণের বণিক ছিলেন। জমিদার পরিবারের বিভিন্ন উত্তরাধিকারের মধ্যে “কিশোরী লাল রায় চৌধুরী, রায়বাহাদুর হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী তৎকালীন শিক্ষাখাতে উন্নয়নের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কিশোরিলাল রায় চৌধুরীর পিতা জগন্নাথ লাল। যার নামানুসারে উক্ত প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের

বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের ১৯ শতকে নির্মিত রেনেসা যুগে নির্মিত স্থাপত্যকৌশলের সাহায্যে নির্মিত অন্যতম নিদর্শন। এই বিশাল প্রাসাদটি ২০ একরের চেয়ে বেশি স্থান জুড়ে অবস্থিত। আসলে এই প্রাসাদটি একই রকম দেখতে কিন্তু পাঁচটি স্বতন্ত্র ব্লকের সমন্বয়ে গঠিত যার সর্ব পূর্বদিকের একটি ব্লক ব্যতিত বাকি চারটি ব্লক এখনো বিদ্যমান। বর্তমানে চারটি ব্লক আছে যার মধ্যে মাঝের দুইটি ব্লক, যার একটি দ্বীতল বিশিষ্ট এবং আরেকটি টানা বারান্দা বিশিষ্ট যা তিনতল বিশিষ্ট।

এই প্রাসাদের চারটি ব্লকের পিছন অংশে চারটি আলাদা আভ্যন্তরিণ ভবন বা অন্দরমহল আছে। উত্তরদিকে কিছুদূরে অবস্থিত পরিত্যক্ত ভবনটি হল বহির্মহল যা কাঠের কারুকার্য সম্পন্ন। এই ভবনে প্রাসাদের চাকর বাকর, গাড়ি রাখার গ্যারেজ, ঘোড়াশাল ছিল বলে ধারনা করা হয়। এই বিশাল প্রাসাদটির চারপাশ সুউচ্চ দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই প্রাসাদের তিনটি প্রবেশপথ আছে। যার প্রত্যেকটিতে অর্ধবৃত্তাকার খিলান আকৃতির সিংহ খোদাই করা তৌরণ বিদ্যমান।

উনিশ শতকে বাংলাদেশে নির্মিত প্রাসাদ সমূহের মধ্যে অন্যতম এই বালিয়াটি এ জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনৈক গোবিন্দ রাম সাহা। যিনি একজন মহাজন ও ব্যবসায়ী ছিলেন। জমিদার বাড়িটিতে অনেকগুলো স্থাপনা রয়েছে যেগুলো পাচঁটি পৃথক ভাগে বিভক্ত। সর্বমোট আটটি সুবিশাল দ্বিতল ও ত্রিতল স্থাপনা রয়েছে। স্থাপনাগুলো ঘিরে রয়েছে প্রাচীর। প্রাসাদটির দক্ষিণ দিকে প্রবেশদ্বার হিসেবে চারটি সিংহদুয়ার রয়েছে এবং উত্তরে বিশাল আকৃতির পুকুর রয়েছে। দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ সম্মুখভাগের ইমারতগুলোতে কোরিনথিয় সত্মম্ভের সারি রয়েছে। এছাড়াও স্থাপনাগুলোতে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য লক্ষ করা যায়। জমিদার বাড়ির ভেতরে রং মহল নামে একটি ভবনে এখন জাদুঘর রয়েছে।

বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে ঘোরা শেষে এবার চলুন তেওতা জমিদার বাড়িতে।

সতেরেশো শতাব্দীর শেষ ভাগে এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি নির্মাণ করেছিলেন পঞ্চানন সেন নামক একজন জমিদার। পঞ্চানন সেন এক সময় খুবই দরিদ্র ছিলেন ও দিনাজপুর অঞ্চলে তিনি তামাক উৎপাদন করে প্রচুর ধসম্পত্তির মালিক হওয়ার পর এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। পরবর্তিতে এখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠিত করে জয়শংকর ও হেমশংকর নাম দুজন ব্যক্তি।

বালিয়াটি থেকে বের হয়ে যাবেন সাটুরিয়ায়। ওখান থেকে ধানকোড়া বাজার। পিছনে বিশাল পুকুর। একটি ভবনই টিকে আছে এখন।

তেওতা জমিদার বাড়িটি মোট ৭.৩৮ একর জমি নিয়ে স্থাপিত। মূল প্রাসাদের চারপাশে রয়েছে আরও বিভিন্ন ধরণের স্থাপনা ও একটি বড় পুকুর।[২] প্রাসাদের মূল ভবনটি লালদিঘী ভবন নামে পরিচিত। এখানে একটি নটমন্দিরও রয়েছে। এছাড়াও এখানে রয়েছে নবরত্ন মঠ ও আর বেশ কয়েকটি মঠ। সবগুলো ভবন মিলিয়ে এখানে মোট কক্ষ রয়েছে ৫৫টি।


এ জমিদার বাড়িতেই কাজি নজরুল ইসলাম প্রমীলা দেবীর প্রেমে পড়েছিলেন। লিখেছিলেন,

"তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় / সেকি মোর অপরাধ"

রাজবাড়ি সংলগ্ন একটি স্থাপনা ‘নবরত্ন’ নামে পরিচিত ছিল যা পারিবারিক দেবতার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল। 
কাচারি এবং দোলমঞ্চর মধ্যবর্তী পুকুরের পূর্বদিকের পাড়ে দোলমঞ্চটি স্থাপিত। এটি এখনও বেশ ভাল অবস্থায় টিকে আছে। নবরত্ন অংশটি ৫০×৫০ বর্গফুটের একটি বর্গাকার অট্টালিকা যা তিনটি ধাপে নির্মিত। প্রতিটি ধাপ মোট নয়টি ছোট কুটির সদৃশ ‘রত্ন’ দ্বারা শোভিত। রত্নগুলোয় অর্ধবৃত্তাকার তোরণসংযুক্ত প্রবেশমুখ আছে। এটি ১৮৫৮ সালে নির্মিত হয়। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ১৯০৬ সালে এটি সংস্কার করা হয়।এর উচ্চতা ৭৫ ফুট। 
বসন্তকালীন দোলযাত্রা উৎসবের সময় এই মন্দিরটি ব্যবহার করা হত। এছাড়া নবরত্ন মঠে দুর্গাপূজার রঙিন উৎসবও উদযাপিত হত।

বিকেল ঘনিয়ে আসলে যাবেন পাটুরিয়া ফেরী ঘাটে। ঘাট অব্দি পাবেন সিএনজি। এখানে বসেই পদ্মা নদীতে সূর্যাস্ত দেখুন। সন্ধ্যার পরে ঢাকার বাসে উঠে পড়ুন।

যেভাবে যাবেন - ঢাকার গাবতলী থেকে মানিকগঞ্জ বা সরাসরি সাটুরিয়া যাওয়ার বাস পাবেন। ভাড়া ৭০ টাকা। সাটুরিয়া পৌঁছে লোকাল সিএনজিতে করে ১০ টাকা ভাড়ায় জমিদার বাড়ি যাওয়া যাবে।

বি:দ্র: - প্রকৃতি ও পুরাকীর্তি আমাদের সম্পদ। দয়া করে পুরাকীর্তির গায়ে আঘাত করবেন না, প্রকৃতিতে যত্রতত্র অপচনশীল ময়লা ফেলবেন না।