লেখা ও ছবি- আহমাদ ইশতিয়াক  

নাটোর ভ্রমণ শেষে এবার উঠে পড়ুন রাজশাহীর লোকাল বাসে। তবে রাজশাহী নয়, নামবেন ঠিক পুঠিয়া বাজারে। বাজারের এক পাশেই পুঠিয়া রাজবাড়ি। পুঠিয়া রাজবাড়ী বা পাঁচআনি জমিদারবাড়ী হচ্ছে মহারানী হেমন্তকুমারী দেবীর বাসভবন।

সপ্তদশ শতকে মোগল আমলে তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে পুঠিয়া জমিদারি ছিল প্রাচীনতম। কথিত যে জনৈক নীলাম্বর মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের (১৬০৫—২৭ খ্রি.) কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করার পর সেটি পুঠিয়া রাজবাড়ীরূপে পরিচিতি লাভ করে। ১৭৪৪ সালে জমিদারি ভাগ হয়। সেই ভাগাভাগিতে জমিদারের বড় ছেলে পান সম্পত্তির সাড়ে পাঁচ আনা এবং অন্য তিন ছেলে পান সাড়ে তিন আনা।

১৯৫০ সাল পর্যন্ত জমিদারি প্রথা ছিল। প্রথা বিলুপ্ত হলে পুঠিয়া রাজবাড়ীর জমিদারিও বিলুপ্ত হয়। কিন্তু জমিদারি বিলুপ্ত হলেও সে আমলে নির্মিত তাঁদের প্রাসাদ, মন্দিরও অন্যান্য স্থাপনা ঠিকই এখনো টিকে রয়েছে। অপরূপ এ প্রাসাদটি ১৮৯৫ সালে মহারানী হেমন্ত কুমারী দেবী তাঁর শাশুড়ি মহারানী শরৎ সুন্দরী দেবীর সম্মানে নির্মাণ করান।

এই বাড়ির ভবনের সম্মুখ ভাগের স্তম্ভ, অলংকরন, কাঠের কাজ, কক্ষের দেয়ালে ও দরজার উপর ফুল ও লতাপাতার চিত্রকর্ম চমৎকার নির্মাণ শৈলীর পরিচয় বহন করে। রাজবাড়ীর ছাদ সমতল, ছাদে লোহার বীম, কাঠের বর্গা এবং টালি ব্যবহৃত হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য রাজবাড়ির চারপাশে পরিখা খনন করা হয়েছিলো। 

পুঠিয়া জমিদার বাড়ি পুঠিয়া জমিদার বাড়ি

পুঠিয়া রাজবাড়ীর আশে পাশে ছয়টি রাজদিঘী আছে। প্রত্যেকটা দিঘীর আয়তন ছয় একর করে। মন্দিরও আছে ছয়টি। সবচেয়ে বড় শিব মন্দির। এ ছাড়া আছে রাধাগোবিন্দ মন্দির, গোপাল মন্দির, গোবিন্দ মন্দির, দোলমঞ্চ ইত্যাদি। প্রতিটি মন্দিরের দেয়ালেই অপূর্ব সব পোড়ামাটির ফলকের কারুকাজ। জোড়বাংলা মন্দির, বাংলো মন্দির, পঞ্চরত্ন অর্থাৎ চূড়াবিশিষ্ট মন্দির অর্থাৎ বাংলার বিভিন্ন গড়নরীতির মন্দিরগুলোর প্রতিটিই আকর্ষণীয়। এ ছাড়া রানির স্নানের ঘাট, অন্দর মহল মিলিয়ে বিশাল রাজবাড়ী প্রাঙ্গণ। ঘুরে দেখুন চারপাশ। এখানে নাস্তা করে নিন।

এবার চলুন হাওয়াখানায়

তারাপুর বাজার থেকে প্রায় আধা কিলো দক্ষিণে এবং পুঠিয়া বাজার থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে একটি পুকুরের মধ্যবর্তী স্থানে হাওয়াখানাটি
দ্বিতল এ ইমারতের নীচতলার আর্চযুক্ত। এ ইমারতের দক্ষিণ পাশে দোতালায় উঠার জন্য সিড়ি আছে। পুঠিয়া রাজবাড়ীর সদস্যরা রাজবাড়ী থেকে রথ বা হাতীযোগে, পুকুরে নৌকায় চড়ে এসে অবকাশ যাপন এবং পুকুরের খোলা হাওয়া উপভোগ করতেন বলে জানা যায়।

এবার উঠে পড়ুন রাজশাহীগামী বাসে। নেমে চলে যেতে পারেন পদ্মার পাড়ে। দেখতে পারেন পদ্মার রূপ, ঘুরে আসতে পারেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সাহেব বাজারের বড় মসজিদে এসে চা চেখে দেখতে পারেন। হোটেলে ফিরে খেয়ে দেখে ঘুম দিন। কারন পরদিন ভোরে উঠবেন। প্রথমেই চলে শাহ মখদুম (র:) এর মাজারে।

কথিত আছে, শাহ মখদুম কুমিরের পিঠে চড়ে নদী পার হতেন। তার অতিপ্রাকৃত শক্তিতে শুধু কুমির নয়, বনের বাঘও বশ্যতা স্বীকার করতো বলে জনশ্রুতি আছে। বর্তমানে শাহ মখদুমের কবরের পাশে সেই কুমিরকে সমাহিত করা হয়। কুমিরটির কবর এখনো আছে।


নোয়াখালী থেকে নৌপথে শাহ মখদুম রূপোশ রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় এসে অবতরণ করেন। বাঘায় পদ্মা নদী থেকে ২ কিলোমিটার দূরে তিনি বসতি স্থাপন করেন এবং এ অঞ্চলের সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থার ওপর গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। রাজশাহী তখন মহাকালগড় নামে পরিচিত ছিলো।মহাকালগড় শাসন করতেন তৎকালীন সামন্তরাজ কাপলিক তন্ত্রে বিশ্বাসী দুই ভাই। তাদের একজনের নাম হলো আংশুদেও চান্দভন্ডীও বর্মভোজ এবং অপর ভাই হলেন আংশুদেও খেজুর চান্দখড়্গ গুজ্জভোজ। এই দুই ভাইয়ের অত্যাচারী শাসন ব্যাবস্থায় জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠে।

সেই সময় রাজশাহী বা মহাকালগড় অঞ্চলে নরবলী দেওয়ার প্রচলন ছিলো। জনগণ এই প্রথার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদী চেতনা লালন করতো। সর্বোপরি প্রশাসনিক ব্যাবস্থা ছিলো একদম দুর্বল। শাহ মখদুম শাসকের এই দুর্বলতা কে উপলব্ধি করে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি একই সাথে নৌবাহিনী, অশ্বারোহী বাহিনী এবং পদাতিক বাহিনীর জন্য লোকবল সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যে তার বাহিনী অপরাজেয় শক্তির অধিকারী হয়ে উঠে। সেখানে তিনি একটি ছোট কেল্লাও নির্মাণ করেছিলেন। এদিকে শাসকচক্র এসব সংবাদ পেয়ে পাল্টা বাহিনী গঠন করেন। ফলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে।

এবার চলুন যাই আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে। রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাস পাবেন। বাসে উঠে সোজা নামবেন সোনামসজিদ বন্দরে। এখানে একটু ঘুরে দেখুন। তারপর চলে আসুন ছোট সোনা মসজিদে।

ছোট সোনা মসজিদছোট সোনা মসজিদ

মসজিদে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, সুলতান আলা-উদ-দীন শাহের শাসনামলে ওয়ালী মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি প্রাচীন গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত ফিরোজপুর গ্রামে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। সে কারণে অনেকের কাছেই এটির অন্য পরিচয় ছিল 'গৌরের রত্ন' হিসেবে। যদিও মসজিদটির বাইরের সোনালি রঙের আস্তরণটিই একে সোনা মসজিদ নামে পরিচিত করে তোলে।

এদিকে প্রাচীন গৌড়ে সুলতান নুসরত শাহের তৈরি অপর আরেকটি মসজিদও সোনা মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করায় স্থানীয়রা একে ছোট সোনা মসজিদ নামে অভিহিত করতে শুরু করেন। মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৮২ ফুট লম্বা ও পূর্ব-পশ্চিমে ৫২.৫ ফুট চওড়া। আর উচ্চতায় প্রায় ২০ ফুট। মসজিদের দেয়ালগুলো প্রায় ছয় ফুট পুরু এবং এগুলো তৈরিতে মাঝে ইট ও ভেতরে-বাইরে পাথরের ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে মসজিদের খিলান ও গম্বুজগুলো তৈরিতে শুধুই ইটের ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদের চারকোণে চারটি বুরুজ আছে। এগুলোর ভূমি নকশা অষ্টকোণাকার এবং বুরুজগুলোতে ধাপে ধাপে বলয়ের কাজ আছে।

মসজিদের পূর্ব দিকের দেয়ালে পাঁচটি খিলানযুক্ত দরজা আছে। খিলানগুলো বহুভাগে বিভক্ত এবং নানা অলংকরণে সমৃদ্ধ। এ ছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দেয়ালেও তিনটি করে দরজা আছে। এ ছাড়া উত্তর দেয়ালের সর্ব-পশ্চিমের দরজাটির জায়গা থেকে একটি সিঁড়ি মসজিদের অভ্যন্তরে উত্তর-পশ্চিম দিকে দোতলায় অবস্থিত একটি বিশেষ কামরায় উঠে গেছে। পাথরের স্তম্ভের উপর অবস্থিত এই কামরাটি জেনানা-মহল কিংবা সুলতান বা শাসনকর্তাদের নিরাপদে নামাজ আদায়ের জন্য ব্যবহূত হতো বলে ধারণা করা হয়। মসজিদটির অভ্যন্তরভাগ কালো ব্যাসাল্টের ৮টি স্তম্ভ দ্বারা উত্তর দক্ষিণে তিনটি আইল ও পূর্ব-পশ্চিমে পাঁচটি সারিতে বিভক্ত। আবার পূর্ব দিকের দেয়ালের পাঁচটি দরজা বরাবর মসজিদের অভ্যন্তরে রয়েছে পাঁচটি অর্ধ-বৃত্তাকার নকশার মিহরাব। এদের মধ্যে মাঝেরটি আকারে বড় এবং প্রতিটির মিহরাবেই পাথরের ওপর অলংকরণ রয়েছে।

মসজিদের অভ্যন্তরের ৮টি স্তম্ভ ও চারপাশের দেয়ালের উপর তৈরি হয়েছে মসজিদের ১৫টি গম্বুজ। মাঝের মিহরাব ও পূর্ব দেয়ালের মাঝের দরজার মধ্যবর্তী অংশে ছাদের ওপর যে গম্বুজগুলো রয়েছে সেগুলো মূলত চৌচালা গম্বুজ এবং এদের দুপাশে দুসারিতে তিনটি করে মোট ১২টি গম্বুজ রয়েছে এরা অর্ধ-বৃত্তাকার গম্বুজ। এ মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, বাইরের যে কোনো পাশ থেকে তাকালে কেবল পাঁচটি গম্বুজ দেখা যায়, পেছনের গম্বুজগুলো চোখে পড়ে না। সম্পূর্ণ মসজিদটির অলংকরণে প্রধানত পাথর এবং এরপর ইট, টেরাকোটা বা টাইল ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া কারো কারো বর্ণনা অনুযায়ী একসময় এই মসজিদটির গোটা বহির্ভাগে অথবা গম্বুজগুলোর ওপরে সোনালি রঙের আস্তরণ ছিল বলেও জানা যায়।
মসজিদের পাশেই রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও ক্যাপ্টেন নাজমুল হক টুলুর কবর। 
মসজিদের সামনে রয়েছে কয়েকটি প্রাচীন কবর।

(চলবে...)